[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



দেশ এখন যাদের হাতে জিম্মি: প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক


প্রকাশিত: February 6, 2015 , 9:40 pm | বিভাগ: আপডেট,ইন্টারভিউ


রাজনৈতিক আকাশে চলছে তুমুল বাক যুদ্ধ। কেউ পিছিয়ে নেই। সরকার কিংবা বিরোধী পক্ষ। সবাই সোচ্চার। এর ফলে গোটা দেশ আজ দু’টি মেরুতে বিভক্ত। বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন,স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক, বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং সেক্যুলারিজম নিয়ে বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা- সমালোচনা চলছে।  এসব বিষয়ে কথা হয়েছে খোলামেলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিথযশা একজন প্রফেসর নানা বিষয়েই মুখ খুলেছেন।  বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক অন্তরঙ্গ পরিবেশে তার মতামত তুলে ধরেছেন ক্যাম্পাসলাইভ এর কাছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শামন্ত চৌধুরী

ক্যাম্পাসলাইভ: প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক, আপনি জানেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিতর্ক দিন দিন বাড়ছে এবং মূলত দুটো বিষয়কে কেন্দ্র করেই এ বিতর্ক চলছে। প্রথমটি হচ্ছে, সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানকে অস্বীকার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা আর দ্বিতীয়ত, সরকার যেহেতু সেক্যুলারিজমের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে- সেহেতু সংবিধানে বিসমিল্লাহ, আল্লাহর ওপর আস্থা এবং রাষ্ট্রধর্ম থাকবে কি থাকবে না-এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। আপনি বিতর্কের এই মূল দু’টি কারণকে কিভাবে দেখছেন?

প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল: দেখুন, বাংলাদেশে শাসনতন্ত্র নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তাতে কল্যাণকর কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক সেই গোড়া থেকে আছে। যখন বলা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে এগারটায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, তখন থেকেই এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে কেউ কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা শোনেননি। এখন যারা এটি দাবি করছেন তারা দেশের বাইরে থেকে বলছেন। যেমন- পাকিস্তান, আমেরিকা ও ব্রিটেন থেকে এ বিষয়ে কে কি বলেছেন সে সব বক্তব্য উল্লেখ করে বলতে চাইছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়টি নিয়ে জোর-জবরদস্তি করে; জনমত যাচাই না করে সংবিধানে সংযোজনের যে চেষ্টা তা ভুল এবং এর ফল ক্ষতিকর হবে।

সে সময় জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন এটি কিন্তু সবাই শুনেছিলেন এবং তা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু সে বিষয়টি আওয়ামী মহল সহ্য করতে চাইছে না। আর যদি আওয়ামী লীগ সরকার এটি সংবিধানে সংযোজনের চেষ্টা করে তাহলে ভুল করবে এবং তার ফল ভাল হবে না বলে আমি মনে করি।
আর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বাড়াবাড়ি চলছে- এটির দরকার কি ? যদি গণতন্ত্র – বলা হয় তাহলেই তো কাজ হয়; যদি সমাজতন্ত্র বলা হয় তাহলেই তো কাজ হয়; যদি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয় তাতেও কিন্তু কাজ হয়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে এত জবরদস্তি চালানো সম্পূর্ণ অন্যায়।

এছাড়া, যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলছেন তারা আবার বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখবেন, বিসমিল্লাহ রাখবেন-এটা কি করে হয়? এর মাধ্যমে তাদের কথার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই বিতর্কের মধ্যে গিয়ে দেশকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলা হচ্ছে এবং এর ফল সরকারের জন্যও ভাল হবে না একই সঙ্গে দেশবাসীর জন্যও ভাল হবে না।

ক্যাম্পাসলাইভ: বাংলাদেশে ৮৫ ভাগেরও বেশি মানুষ মুসলমান। প্রতিবেশি সেক্যুলার রাষ্ট্র ভারতের মত এদেশে কখনও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি, সংখ্যালঘুরা চাকরি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে-এমন কোন নজীর এদেশে নেই। তাহলে কেন এ দেশে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার জন্য এত জোর দেয়া হচ্ছে ?

প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল: এ বিষয়টি নিয়ে জেদাজেদি আছে। রাজনৈতিকভাবে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এ ধরনের বিষয়কে সামনে আনা হচ্ছে। দেখুন, এই যে অসাম্প্রদায়িক বা সাম্প্রদায়িকতা- এ ধরনের কথা রাজনীতিতে বলার কোন অর্থ আমি খুঁজে পাই না। এই শব্দটি আমি কখনও ব্যবহার করি না, তবে যারা এই শব্দটি ব্যবহার করেন তারা এই শব্দের মধ্য দিয়ে ভালো কিছু বোঝান বা বোঝাতে পারেন এটি মনে হয় না। রাজনৈতিক আদর্শের কথা দলগুলো বলবেন সেটা খুবই স্বাভাবিক। আর সেই আদর্শ হয় গণতন্ত্র অথবা সমাজতন্ত্র এ রকম যে বিষয়টি আছে সেটা তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা উচিত। কিন্তু গণতন্ত্র বলতে গেলে তো সে রকম কোন অর্থপূর্ণ আলোচনা বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে গণতন্ত্র একটি শ্লোগান সর্বস্ব কথা। তো সাম্প্রদায়িক এবং অসাম্প্রদায়িক এসব কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। যারা অসাম্প্রদায়িক কথাটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন তারা কিন্তু অসাম্প্রদায়িক কথার অর্থটা স্পষ্ট করছেন না। ফলে আমার মতে, এটা বলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মধ্যে নেই।

ক্যাম্পাসলাইভ: সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করেছি, সরকারের শরীক দল ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন ইসলাম এবং বিসমিল্লাহ সম্পর্কে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। যারা ইসলাম বুঝেন তারা মেনন সাহেবের যুক্তিকে বিভ্রান্তিমূলক বলছেন। এই গত দুই বছর ধরে ইসলাম, বিসমিল্লাহ নিয়ে টানাটানি, বিভ্রান্তিমূলক ব্যাখ্যা এর কি কোন প্রতিক্রিয়া জনগণের মধ্যে হবে না? আপনি কি মনে করেন?

প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমি মনে করি অবশ্যই জনগণের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া আছে। রাশেদ খান মেনন সাহেব কথাগুলো যেভাবে বলেছেন- তার কথাগুলো যে এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী গ্রহণ করবেন বলে মনে হয় না। আর মেনন সাহেব যে গোঁজামিল দিয়েছেন তার দরকারইবা কি? যে বিষয়টি দেশ জাতি ও জনগণের জন্য কল্যাণকর সে ধরনের বক্তব্য রাখা উচিত। মানুষের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে জবরদস্তি বা ধর্মকে অশ্রদ্ধা করে কথা বলা সম্পূর্ণ অন্যায়। দেশবাসী তা কখনও গ্রহণ করবে না।

ক্যাম্পাসলাইভ: আচ্ছা, একটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি এক সুরে কথা বলেন;যেমন বলা হচ্ছে, দেশে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না, সংসদ কার্যকর হচ্ছে না, আর এসবের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য এবং পরমত সহিষ্ণুতা। কিন্তু সংসদে যেভাবে গালিগালাজ ও অন্য দলের নেতাদের প্রতি কটুক্তি এবং স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক চলতে,তাতে দেশ কোথায় যাচ্ছে?

প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক: দেখুন,রাজনৈতিকভাবে দেশ খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। বলা যায়, কোন সুস্থ চিন্তার দিকে যাচ্ছে না দেশ। সংসদে যে গালিগালাজ, অশোভনভাবে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ হচ্ছে- এগুলো খুবই দুঃখজনক। আমি কখনও কখনও লক্ষ্য করেছি যে, সংসদে বা সংসদের বাইরে সরকারপক্ষ থেকে এমন অনেক কথা বলা হয় যা বিরোধীদলের জন্য উস্কানীমূলক। আর বিরোধী দল তখন একইভাবে তার জবাব দেয়। আর তখনই শ্লীলতার সীমা লংঘন করে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে থাকে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে বেশি সহিষ্ণু হওয়া উচিত সেখানে তাদেরকে বেশি অসহিষ্ণু মনে হচ্ছে। ফলে আমার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে একটা জেদাজেদির বিষয় রয়েছে। তবে যারা জেদের বশে উত্তেজিত মন ও মানসিকতা নিয়ে কথা বলেন -সাধারণত তারা সঠিক কথা বলতে পারেন না। তারা একটি ভুল থেকে আরেকটি ভুলের দিকে অগ্রসর হন। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটাই হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আজ দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের মধ্যে জিম্মি হয়ে পড়েছে। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা নেই, কথা বলার স্বাধীনতা নেই। তাছাড়া দেশের প্রচার মাধ্যমগুলো জনগণের ধারার সাথে মিশে তাদের ভূমিকা পালন করছে সে কথাও বলা যাবে না। এখনও বিবিসি রেডিও বা আমাদের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে। এসব বিষয় সত্যিই দুঃখজনক দেশের জন্য।

আমি মনে করি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভাল নেতৃত্ব এবং বড় রকমের পরিবর্তন দরকার। আর এ পরিবর্তন শুধু রাজনীতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নয় অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আসা খুবই দরকার। আর সেই পরিবর্তনের সমর্থনে দেশে কোন প্রচার মাধ্যম নেই এবং ইতিবাচক পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতাও আমরা দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আর অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য দিক থেকে মানুষ জীবনের তাগিদে বা জীবনের প্রয়োজনে এক রকমভাবে কাজ-কর্ম করে যাচ্ছে।

যদি সরকার এবং দেশের রাজনীতি উন্নয়নের সহযোগী হতো তাহলে বাংলাদেশ এই মুহুর্তে অনেক উন্নতি করতে পারত। কিন্তু দেশের রাজনীতি বিকারগ্রস্ত হয়ে যাওয়ায় এবং সরকার প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের অনুকূল সহযোগী না হওয়ার ফলে -বাংলাদেশের উন্নতির যে সম্ভাবনা তা ব্যর্থ হচ্ছে।

ক্যাম্পাসলাইভ: দেশের রাজনীতি, সংসদের অবস্থা, অযাচিত বিতর্ক এসব কিছুকে সামনে রেখে আপনি জনগণের উদ্দেশ্যে কি বলবেন?

প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমি জনগণের উদ্দেশ্যে প্রথমে যে কথা বলতে চাই তা হচ্ছে, জনগণকে সচেতন হতে হবে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা না এলে বা জনগণ যদি ঘুমিয়ে থাকে, তাদের মধ্যে যদি শুভ বা ভাল চিন্তা প্রকাশ না পায় তাহলে জনগণের ওপর সরকার বা শাসক মহলের শাসন ও শোষণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে তাতে সরকার এবং প্রচার মাধ্যম নতুন কোন চিন্তা চেতনাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে না -প্রগতি তো দূরের কথা! আর বৈরী বাস্তবতার মধ্যে জনগণকে নিজ গুণেই জাগতে হবে। জনগণকে নিজের চেষ্টায় নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য অগ্রসর হতে হবে। যদি কোন ভাল চিন্তা বা ভাল কর্ম দেখা দেয় তাহলে জনগণকে সেই চিন্তা বা কাজকে সমর্থন দেয়া উচিত।

সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার প্রতিরোধ করার জন্য বা দূর করার জন্য গণজাগরণ দরকার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য শাসক শ্রেণী থেকে সব ধরনের আয়োজন করে থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সহযোগী বিদেশী শক্তিগুলো। তারাও বাংলাদেশকে একটা ছকের মধ্যে ফেলে তাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে সচেষ্ট। আর এ সমস্ত ব্যাপারে প্রতিরোধের জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হওয়া খুবই জরুরী। জনগণকে চোখ খুলতে হবে। সচেতন জনগণই বুঝিয়ে দেবে দেশের নেতৃত্ব কারা দেবে। সচেতন জনগণের মধ্যে থেকে নতুন শক্তির জাগরণই পারে এসব রুখতে।

ঢাকা// এসসি, ৬ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এআর