[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বাংলা কবিতায় ভাষা আন্দোলন


প্রকাশিত: February 20, 2015 , 6:38 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


রাসেল মাহমুদ: বাংলা সাহিত্যে নদী, নারী ও স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখির যে স্রোত প্রবাহিত হয়েছে, তার সঙ্গে সমানতালে তাল মিলিয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়েও লেখা হয়েছে অসংখ্য লেখা। অতীতে যেমন একুশ নিয়ে সাহিত্যকর্ম লেখা হয়েছে তেমনি ভবিষ্যতেও হবে। সাহিত্যের সকল শাখায় ভাষা আন্দোলন স্বগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলা কবিতা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলনের উপস্থিতি আমাদের মনে বিস্ময়ের জন্ম দেয়। বাংলা কবিতায় ভাষা আন্দোলনের উপস্থিতি নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করেছে বারবার।

৫২’র ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম কবিতা রচিত হয় চট্টগ্রামে। ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে ১২০ লাইনের কবিতা লেখেন মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। কবির এ কবিতা শুধু কবিতা ছিল না। ছিল প্রতিবাদের বিস্ফোরণ। কবিতাটির প্রতিটি শব্দ বাঙালির রক্তের কণায় কণায় প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সে কী অনবদ্য কাব্যিক প্রতিবাদ!

‘যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিলো ওখানে

যারা এসেছিলো নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে

আমরা তাদের কাছে

ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ

আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।’

কবিতার এ দাবি সেদিন হয়ে উঠেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির দাবি। কবিতার মাধ্যমেই আছড়ে পড়ে ক্ষোভ, দুমড়ে মুচড়ে দিতে চাইল সব অন্যায়-অবিচার।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ কবিতাটি; ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লিখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। আবদুল লতিফ ও আলতাফ মাহমুদের সুরে এক সময় কবিতাটি গান হয়ে ওঠে। এ গানটি একুশের মাহাত্ম্য আর বাংলা ভাষাপ্রীতির প্রথা স্মরণ করিয়ে দেয় বারবার।

বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল কবিই ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবিতা লিখেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সাহিত্যিক আলাউদ্দীন আল আজাদ লিখেছেন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটি। কবির পঙ্ক্তিমালা…

‘ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা

চার কোটি কারিগর

বেহালার সুরে রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।

পলাশের আর

রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়

দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন,যুগে যুগে সেই শহীদের নাম।

এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলাায়, তোমাদের নামে।

তাই আমাদের

হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্য্যরে মতো জ্বলে শুধু এক শপথের ভাস্কর।’

কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ ভাষা আন্দোলন নিয়ে যে  কবিতাগুলো লিখেছেন তার মধ্যে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতাটি বেশ সমৃদ্ধ। কবি লিখেছেন

‘পাড়ায় পাড়ায় নাটক ব্রতচারী নাচ

মুকুলের মাহফিল-কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুল

আর সবুজের স্বরগ্রাম :

কলাপাতা-সবুজ, ফিরোজা, গাঢ় সবুজ, নীল,

তারই মধ্যে বছরের একটি দিনে

রাস্তায় রাস্তায় উঠে আসে মুষ্টিবদ্ধ হাত’

‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই! রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই!’

‘মাগো ওরা বলে’ কবিতার মাধ্যমে এক দুঃখিনী মায়ের চিত্রকল্প এঁকেছেন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। কবির উচ্চারণ…

‘…চিঠিটা তার পকেটে ছিলো/ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা/মাগো, ওরা বলে/সবার কথা কেড়ে নেবে/তাই কি হয়?/তাইতো আমার দেরি হচ্ছে।/তোমার জন্য কথার ঝুরি নিয়ে/তবেই না বাড়ি ফিরবো…’

বলা যায় কবিতাটি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত অন্যতম সেরা কবিতা।

বাংলা ভাষা উচ্চারণকে ভিত্তি করে কবি শামসুর রাহমানের লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে’ কবিতাটি। এ কবিতায় কবি প্রাকৃতিক রূপকল্পের সঙ্গে সঙ্গে এনেছেন প্রগাঢ় মানব জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাংলা শব্দ উচ্চারণ হলে কবির চোখে ভেসে ওঠে একুশের প্রথম প্রভাত ফেরি। কবির ভাষ্য

‘…বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে চোখে ভেসে ওঠে/কত চেনা ছবি; মা আমার দোলনা দুলিয়ে কাটছেন ঘুম পাড়ানিয়া ছড়া…/নানী বিষাদ সিন্ধু স্পন্দে দুলে দুলে রমজানি সাঁঝে ভাজেন ডালের বড়া/আর একুশের প্রথম প্রভাত ফেরি, অলৌকিক ভোর।’

সমকালীন কবি মহাদেব সাহা ‘তোমরা কি জানো’ কবিতায় দেখিয়েছেন শহীদের তাজা রক্তে কিভাবে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।

‘একুশের রাজপথ জুড়ে এতো রঙিন আল্পনা আঁকা/তোমরা কি জানো সে তো নয় কোনো রঙ ও তুলির ব্যঞ্জনা কিছু/এই আলপনা, পথের শিল্প শহীদের তাজা রক্তের রঙ মাখা!’

একুশের  প্রেক্ষাপটে অনেক কবিই কবিতা রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে  পল্লাী কবি জসীমউদদীনের ‘একুশের গান’, ‘মাজহারুল ইসলামের ‘স্বাগত ভাষা’, ‘সুফিয়া কামালের ‘এমন আশ্চর্য দিন’, কায়সুল হকের ‘একুশের কবিতা’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর ‘স্মৃতির মিনার’, আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’, আসাদ চৌধুরীর ‘ফাগুন এলেই’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘একুশের কবিতা’ বেশ উল্লেখযোগ্য।

একুশের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত কবিতায় কখনো ফুটে উঠেছে সন্তানহারা মায়ের নির্মম প্রতীক্ষা, কখনো কবিতায় স্থান পেয়েছে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধ তীব্র ঘৃণার অক্ষরে প্রতিবাদ। একুশের কবিতাগুলো দেশের ঐতিহ্যগত চেতনারই ফসল। এসব কবিতার প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ পৃথিবীকে জানিয়ে দেয় বাঙালিরা তাদের মায়ের ভাষাকে কত ভালোবাসে।

এসব কবিতার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত হবে একুশের ইতিহাস, ভাষাপ্রেমের নমুনা। তাই একুশকে মনে রাখতে, ভাষাশহীদদের সম্মান জানাতে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতায় কবির আহবানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলি

‘হে নতুন প্রজন্ম!/ভুলে যেয়ো না সেইসব কিশোরের কথা/যারা একদিন কচি গলায়/বাংলাদেশের সব শহরের রাস্তায় রাস্তায়/অজস্র কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুলের গন্ধে/ফুটিয়ে তুলেছিলো আরেক রকম রক্ত-লাল-ফুল;/’রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’

লেখক,
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ ও সাধারণ সম্পাদক
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (কুবিসাস)

কুবি// আরএম, ২০ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আরজে