[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



তৃষা: একটি নিঃসঙ্গ মেয়ের গল্প (বাকৃবির সত্য ঘটনা)


প্রকাশিত: March 7, 2015 , 12:33 pm | বিভাগ: আপডেট,ক্যাম্পাস,পাবলিক ইউনিভার্সিটি,রাইম, স্টোরি এন্ড জোকস


nishongo

নষ্ট বিলাস: কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি নদীর এই পাড়টার নির্জনতায় আমি আর নিঃসঙ্গ নই। একজন সঙ্গী জুটে গেছে। তবে আমি আমার মতো, সে তার মতোই এখনো একা। মনের কোণে একটা কৌতূহল মাথাচাড়া দিচ্ছে। এই মেয়েটাকে সেই ফার্স্ট ইয়ারে দেখেছি বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করতে, নিয়মিত ফেসবুকে ছবি, সেলফি আপলোড করতে। এই চার বছরে কি এমন হলো তার, এখন এতো একা থাকে কেনো? কৌতূহল নিবারণের একটাই পথ- কথা বলা। এর আগে কখনো কথা বলিনি, আজ প্রথম সাহস করলাম। কথাও বললাম, যা শুনলাম, গল্পটা কিছুটা এরকম-

এই যে এত্তো এত্তো কোলাহল, আনন্দ, চিৎকার… এসবের কিছুই তার ভালো লাগছেনা। আজ নদীর এ পাড়টায় বড্ড বেশী রঙ। একটু খানি নিরবতাই যেখানে কাম্য, সেখানে এতো রঙ, এত আনন্দ- সব কিছুই তার কাছে হয়ে উঠছে অসহ্য। তাই নদীর এ পাড়টা ছেড়ে ঐ পাড়ে পাড়ি জমালো তৃষা। যেখানে একটুখানি নির্জনতা- একাকিত্বের সাধটা আজ সেখানেই… (কিন্তু সেখানেও আমি তাকে ডিস্টার্ব করা শুরু করে দিলাম)।

নদীর এই পাড়ের নীরব সবুজের তীর ধরে তৃষা হেঁটে চলেছেন বিস্মৃতির সীমাহীন পথ ধরে, পাশাপাশি হাঁটছি আমি, নিরব শ্রোতা। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই সব রঙ্গীন দিনগুলোর প্রতিচ্ছবি। তৃষা বলা শুরু করলো-

আজ অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করলাম আমি। এই ভার্সিটিতে যখন প্রথম আসি তখন অপরিচিতদের ভিড়ে নিজেকেই খুঁজে পেতে মাঝে মাঝে কষ্ট হতো আমার। সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে কয়েকটা বন্ধু জুটে যায়। তাদের মধ্যে সব থেকে কাছের যে বন্ধুগুলো- একটা গ্রুপের মতো, আমি শখ করে তার নাম দিয়েছিলাম- “জোশ গ্রুপ”। আমি এই গ্রুপটার মধ্যমণি ছিলাম। হঠাৎ প্লান করে ঘুরতে যাওয়া, কারো বার্থডে সেলেব্রেট করা, বিকেল বেলা আড্ডা দেয়া- সব প্লান আসতো আমার মাথা থেকেই।

এই গ্রুপের আর যে বাকি ৬ জন- তারা কেউ না কেউ ছিলো কোন এক বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী। ৭ জন ইঁচড়েপাকা বন্ধুকে নিয়ে এই যে জোশ গ্রুপ – তা ছিলো একটি পরিবারের মতো। পরিবার ছেড়ে এসে এই বাকৃবির ১২০০ একরের বিশাল প্রঙ্গনে হঠাৎ পাওয়া এই পরিবারের আপন মানুষগুলোই থাকতো আমার অবসর সময়টার অনেকটা জুড়ে। খুব আপন করে ভাবতাম আমি। কখনো যদি মনের অন্তরালে হঠাৎ দৈব বাণী শুনতে পেতাম- একটুখানি আশংকাও যদি জাগতো মনে- কখনো এদেরকে ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে, হু হু করে কান্না পেতো তখন। অবুঝ বালিকাটির মতো বুঝতেই চাইতাম না- আমার এইসব বন্ধু কখনো আমায় ছেড়ে যাবে।

কিন্তু…
আজ আমার পুরো জগৎটা জুড়ে শুধু আমিই একা। একে একে সবাই চলে গেছে এই জোশ গ্রুপ নামের মিথ্যে মায়ার পরিবারটিকে ছেড়ে। আর আমি তৃষা…… তৃষা হয়ে গেলাম আবার একা।

যাবেই না বা কেনো। যার যার প্রয়োজন ফুরালেই কেটে পড়েছে এই গ্রুপ টা থেকে। রাজ আর মুশফিকা… গ্রুপ থেকে ছিটকে পড়লো তাদের মধ্যে প্রেম এসে বাসা বাধলো বলে। খবরটা শুনে আমি প্রথমে খুবই খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সে খুশি বেশি দিন থাকেনি। ওদের দুজনের কাছে আসা টা হঠাৎ করেই দুজনকেই গ্রুপের বাকি সবার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলো।

আমার কাছে ভালো ঠেকেনি বিষয়টা। চোখের সামনে অনেক সাধের পরিবারটার বিলীনতা যেন দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু কিছুই করার ছিলোনা। কিছু বলতে গেলে পাছে ওদের চোখে খারাপ হয়ে যাই- তাই কষ্টটুকু চেপে রেখেই অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম।

এদিকে সজয় এর বিষয়টাও আমার চোখ এড়িয়ে যায়নি। রাজ আর মুশফিকার রিলেশনটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি সজয়। হয়তো মানতে কষ্ট হচ্ছিলো এই প্রেমের পরিনতিহীন ভবিষ্যৎ, খুব কাছের বন্ধু দুটির ভাবি কষ্টের কথা। তাই গ্রুপের বিভিন্ন আয়োজনে আসাটা তার অনিয়মিত হয়ে গেলো। এই যে হিন্দু মুসলিম অসামজস্য রিলেশন- যার কোন ভবিষ্যৎ নেই, সেটার ভাঙ্গনের পর এরা যে কেউই সুখি হবেনা- এটা সজয় যেমন বুঝে ছিলো, তেমনি আমিও। মাঝে এটা নিয়ে ঝগড়াও বেধেছিলো একবার। এর প্রেক্ষিতে রাজ-মুশফিকা জুটি গ্রুপের আর সবাইকে ওদের প্রেমের পথে বাধা ভাবতে শুরু করলো, তাই আসাটা একদম ছেড়েই দিলো।

৭ জনের গ্রুপটা হঠাৎ হয়ে গেলো ৪ জনের- তৃষা, জ্যোতি, রাহাত আর কেয়ার।
নিজেদের মধ্যে আগের সেই আবেগটাও এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সব কেমন জানি হায়-হ্যালোতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেলো।

এসবের মধ্যেই হঠাৎ একদিন ঘটা করে সবাই মিলে খেয়ে আসলাম জ্যোতির বিয়ে। এদিকে কেয়া গ্রুপে আসা বাদ দিলো তার বয়ফ্রেন্ড এটাকে পছন্দ করেনা বলে। বয়ফ্রেন্ড নামক জিনিসটার কাছে জিম্মি হয়ে সে এখনি হয়ে পড়লো চার দেয়ালে আবদ্ধ। সেকেন্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতেই রাহাত একটা জুনিয়র মেয়ের প্রেমে পড়লে তার সাথেও আমার আর সেরকম কথা হতোনা।

আজ চারটা বছরের এতোটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একা – নিসঙ্গ। এতো এতো বন্ধু… কেউ পাশে নেই।। কেউ না। শুধু কি তাই? ওই চার বছরে অনেক কিছুই দেখেছি আমি। ভেঙ্গে গেছে রাজ-মুশফিকার অমর প্রেম। চলে গেছে কেয়ার সেই বয় ফ্রেন্ড নামক জন্তুটা। থার্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতেই রাহাতের সেই প্রেমিকাকে দেখেছি অন্য আর একটা ছেলের সাথে প্রেম করতে। সজয়কে এখন সিগারেট খাইতে দেখা যায়। যে ছেলে কখনো এটার ধোয়া সহ্য করতে পারতোনা, সে নাকি এখন দিনে ৮ থেকে ১০ টা সিগারেট খায়!!! আর তৃষা… আমি আমার মতোই একা… আজো খুব মিস করি ওদের… এখনো ভেবেই চলেছি- কি দরকার ছিলো তোদের এই পুতুল খেলার??

আর বলতে পারেনি মেয়েটা, গলাটা ধরে আসে তার। চোখের দিকে তাকাতে পারিনি… মাথা নিচু করে হয়তো আড়াল করছিলো আনমনে গড়িয়ে পরা দু-ফোটা অশ্রু।

সন্ধ্যা হয়ে এলে দুজনেই একি নৌকায় এপারে আসলাম। কোলাহলটা খুব বেশি কানে বাধছিলো আমার, হয়তো তৃষারও। দ্রুত চলে আসলাম হলে, সেও ফিরে গেছে তার চার দেয়ালের আবদ্ধ ঠিকানায়।

দু দিন পর সবাই সবার মতো কর্মক্ষেত্রে ব্যাস্ত হয়ে পড়বে। কারো মনে না পড়লেও সবার কথাই মনে পড়বে তৃষার… কর্মব্যস্ত জীবনে মনের অন্তরালেই চোখের কোণে যে জলকণাটুকু জমবে- সেখানে হয়তো প্রতিফলিত হবে সেদিনের সেই জোশ গ্রুপের সে সাতটি প্রাণের ফেলে আসা কিছু স্মৃতি, কিছু অব্যাক্ত কথা, চেপে রাখা বোবা কান্না।

তৃষার গল্পটা যে শুধুই তার- বাস্তবে কিন্তু তা নয়… আবার ফার্স্ট ইয়ার আসবে, আবার সৃষ্টি হবে একেকটা ‘জোশ’ গ্রুপের, আবার কোলাহলে মেতে থাকবে সবাই… কেউ হয়তো গ্রুপে আসবে একান্তই ভালো লাগবে বলে, আর কেউ হয়তো বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে রাখবে প্রেমের আবেদনটুকু। প্রয়োজনটুকু ফুরালেই কেটে পড়বে একে একে। ৪ বছর পর সবাই আবার… তৃষার মতই একা।

এমন অনেক গল্পই হয়তো পরে আছে ব্রহ্মপুত্রের ওই দুই পাড়ের বালুরাশির মাঝে… যেখানে গল্পকথায় জমে আছে কতো গান, কতো হাসি, কতো কান্না… দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ… হয়তোবা শতাব্দীর পর শতাব্দী- যার নিরব সাক্ষী এই ব্রহ্মপুত্র নদ।

নষ্ট বিলাস (সামস সুমন)
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০৭ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন