[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেমের পরিণতি: আজ কেয়ার বিয়ে…


প্রকাশিত: March 20, 2015 , 12:50 pm | বিভাগ: আপডেট,রাইম, স্টোরি এন্ড জোকস


নষ্ট বিলাস: লাল-নীল বাতি, ফুল আর রঙ্গীন কাপড়ে সজ্জিত বাড়িটি কেয়াদের। লোকের সমাগম আর তাদের কোলাহলে বাড়িটি সরব হয়ে আছে গত ৫দিন ধরে। অনেক আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এসেছেন। উৎসবমুখর বাড়িটিতে কেয়ার ঘরে বিছানার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুজে বসে আছে মিলি। সে কেয়ার খুব কাছের বান্ধবী, ছোট বেলা থেকে আজ পর্যন্ত এক সঙ্গে আছে। তাই কেয়া সব কিছুই শেয়ার করে ওই মিলির সঙ্গেই।

মিলিঃ “কেয়া আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু। খুব ভালো আর আমার দেখা সব থেকে সুন্দর একটা মেয়ে। আমি ওকে খুব ভালবাসি, এতোটা ভালবাসি যে আমার মনে হয় অন্য কেউ আমার থেকে কেয়াকে এতোটা ভালবাসতে পারেনা। ওহ হ্যাঁ, ভুল বললাম। আমার থেকেও ওকে যদি কেউ ভালবাসতে পারে তা হলো সিয়াম। অনেক ভালো একটা ছেলে।

কেয়াকে খুব ভালবাসে। কেয়ার ক্লাসমেট, ওরা একসঙ্গেই পড়তো। কেয়ার ভালবাসা পাওয়ার জন্য কতকিছু যে করেছে পাগলটা, তা বলে শেষ করা যাবে না।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কেয়ার জীবনে কিছু অদ্ভুত কান্ড ঘটতে দেখা যেতো। কোন একজন ক্লাসে কেয়ার বসার জায়গাটিতে একটি করে লাল গোলাপ রেখে দিতো মাঝে মাঝে। কেয়ার বার্থডেতে স্পেশাল গিফট পাঠাতো- একটা বক্সে ১০১ প্রকারের বিভিন্ন দেশী-বিদেশি চকোলেট। বক্সে কিছুই লেখা থাকতোনা। মাঝে মাঝে বেনামে চিঠি লিখতো কেয়াকে। একবার ভালবাসা দিবসে কেয়ার হলের ঠিক সামনের রাস্তাটায় অনেক বড় করে লাভ এঁকে “আই লাভ ইউ” লিখেছিলো কেউ।

কেয়া প্রথমে বুঝতে পারেনি এটা কার কাজ, পরে সিয়ামকে জিজ্ঞেস করলে ওর আমতা আমতাই বলে দেয় এটা ওর ছাড়া আর কারো কাজ না। কেয়ার একটা এক্সিডেন্টে ওর ও-নেগেটিভ ব্লাড পাওয়া যাচ্ছিলোনা। পরে কোথা থেকে জানি ম্যানেজ হয়ে গেলো- কেউ বলতে পারলোনা। কেয়া আর আমার ধারণা এটা সিয়ামের কাজ। ব্লাড ডোনার শীট চেক করতেই ধরা পরে গেলো বেচারা। কেয়া ধীরে ধীরে সিয়ামের প্রতি আসক্ত হয়ে পরে। খুব কাছের বন্ধু হাওয়ার পরেও কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেনি সিয়াম।
sumon-live

ছবি: লেখক

উপরন্তু, কেয়াকে ভালবেসেই যাচ্ছিল। এভাবেই কেয়া যখন সব কিছু বুঝে উঠলো। প্রেমের শুরু সেখান থেকেই। আজ ওদের বিয়ে। আমার সব থেকে কাছের বন্ধুটির বিয়ে। আমি না এসে পারি? পাগলিটা আমার কাধে অনেক দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে,- সব কিছু সামলে নিয়ে শুভ কাজটা ভালভাবে শেষ হলেই বাঁচি বাবা”।

কেয়াঃ “আজ আমার সব থেকে খুশির দিন। আমার ভালবাসার মানুষটিকে আজ আমি আমার করে পাবো। পরিবারের অনেক বাধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমি আজ জয়ী হতে যাচ্ছি। সিয়াম আর আমার নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে।

সিয়াম আমার খুব কাছের বন্ধু ছিলো। ইউনিভার্সিটিতে আমরা একসাথে সবসময় ঘুরতাম, ফিরতাম, আড্ডা দিতাম, তারপরেও আমি কখনো বুঝতেই পারিনি পাগলটা আমাকে এতোটা ভালবাসে। ও কখনো আমাকে বলেইনি, আমিও কতোটা বোকা ছিলাম যে সে আমার পাশে থাকার পরেও আমি এই সিম্পল বিষয়টা বুঝতে পারতাম না! ও আমাকে মুখে বলতে পারেনি, কিন্তু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো অনেক ভাবেই। আমার সিটে গোলাপ রাখা, বেনামে চিঠি লেখা, বার্থডেতে চকলেট পাঠানো- এগুলো সবই ওর কাজ ছিলো। এক্সিডেন্টে যখন ও আমাকে ব্লাড দিয়েও গোপন রেখেছিলো বিষয়টা, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি আমি।

লজ্জার মাথা খেয়ে আমিই একদিন ওকে চমকে দিয়ে বললাম- সিয়াম, আমাকে বোকা বানানোর জন্য তোর শাস্তি আছে। কান ধরে ১০বার উঠবি-বসবি। বোকাটা তখন ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ধরা পরার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গেছিলো সেদিন। আমি আর ঠিক থাকতে পারিনি, আবেগে সিয়ামকে জড়িয়ে ধরে বলে ফেললাম- কিরে পাগল, এতোটা ভালোবাসিস আমাকে? আমার সাথে আর লুকোচুরি খেলবি?”

সিয়ামঃ “কেয়া আমার বন্ধু ছিলো, পরে আমাদের মধ্যে রিলেশন হয়ে যায়। আজ আমাদের বিয়ে। আমাদের এই ভালবাসাটার একটা দারুণ গল্প আছে, না বলে পারছিনা।

ক্লাশে মোটামুটি ভালো ছাত্র ছিলাম, দেখতেও হ্যান্ডসাম। এটা আমার কথা না, সবার কথা। সেই কলেজ লাইফ থেকে টাঙ্কিতো আর কম মারলাম না। হ্যান্ডসাম না হলে কি আর এমনিতেই এতোগুলো মেয়ে আমার জন্য ফিদা হতো? আজ সেই হ্যাপি ব্যাচেলর লাইফটার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ফিদা হাওয়ার আরও একটা কারণ আছে- সেটা হল আমার বাবার অঢেল টাকা। একমাত্র সন্তান যেহেতু, সেহেতু সবই আমার। একটু স্টাইলিশ ড্রেস-আপ, স্মার্ট স্টাইলে চলাফেরা করলে এযুগে গার্লফ্রেন্ড এর আর অভাব হয়না।

যাই হোক, আসল কথায় আসি- ভার্সিটিতে ভর্তি হাওয়ার পর ক্লাশের একটা মেয়েকে আমার ভালো লেগে যায়, আর মেয়েটা হলো কেয়া। এই প্রথম কোন মেয়েকে আমার ভালো লাগলো, এর আগেরগুলোতো আমার ভালোলাগার কিছু ছিলোনা। ওরাই আমার পিছে পরে থাকতো, আর আমি মজা নিতাম।

কেয়া দেখতে সুন্দর, স্মার্ট, স্টাইলিশ। প্রথম দেখাতেই ভাললেগে যায় আমার। কেয়ার প্রেমে যখন আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, তখন মাথাও হ্যাং। কিছুতেই সাহস করতে পারছিনা, ভয়ে ওকে বলতেও পারছিনা। পাছে না আবার বিগড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত একটা বুদ্ধি করলাম- ওর বন্ধু হাওয়ার চেষ্টা করলাম। কাজ হলো। বন্ধু হাওয়ার সুবাধে কেয়া আর আমার কাছাকাছি আসাটা সহজ হয়ে গেলো। থার্ড ইয়ারে একবার কেয়া এক্সিডেন্ট করলে যতোটা পেরেছি ওকে হেল্প করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু রেয়ার ব্লাড গ্রুপ ও-নেগেটিভ আমার হওয়ার পরেও আমি দিতে পারিনি সেদিন। ক্রস মেচিং এ কি একটা সমস্যার কথা বলে ডাক্তার আমার ব্লাড নিলোনা। পরে কোথা থেকে হঠাৎ করেই ব্লাডটা ম্যানেজ হয়ে গেলো আমি বলতে পারিনা। ঘটনা যেটাই হোক, ঐ ব্লাড কান্ডে লাভ কিন্তু আমারই হয়েছে। একদিন হঠাৎ কেয়া এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে ফেললো-“আই লাভ ইউ”।

ওর ধারণা আমিই এই ব্লাডটা ওকে দিয়েছি। এরপর ওর কাছ থেকে জানতে পারি আমি নাকি বেনামে চিঠি লিখতাম, চকলেট পাঠাতাম, গোলাপ রাখতাম। আরো কি কি সব পাগলামি… আমি তো পুরাই অবাক। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে সেদিন বলতে পারিনি- যে এগুলোর আমি কিছুই করিনি। সেদিন বলতে পারিনি সত্যটা যে কেয়া আমি তোমাকে ভালবাসলেও এতোটা ভালবাসতে পারিনি এখনো। এটা হয়তো অন্য কেউ, আমি না। ওকে হারানোর ভয়ে সেদিন চরম সত্যটাও আমাকে লুকিয়ে রেখে শুধু অভিনয় করে যেতে হয়েছিলো। আজ তার আর একটা অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে”।

সুজনঃ “আজ কেয়ার বিয়ে। রাস্তা থেকে ওদের বাড়িটা আজ দেখে আসলাম। অনেক সুন্দর করে সাজিয়েছে। কতো বড় বাড়ি! কেয়াও হয়তো এতোক্ষণে সেজেগুজে বসে আছে। জানি না কতোটা সুন্দর লাগছে ওকে।

আমি কখনো বলতে পারিনি কেয়া। তোমার সামনে কখনো দাঁড়ানোর যোগ্যতাও আমার ছিলোনা। আমার লেখাপড়া আর তোমার প্রতি অগাধ ভালবাসাটুকু ছাড়া আমার আর কিছুই ছিলোনা। না ছিলো সুন্দর চেহারা, না ছিলো বাবার অঢেল সম্পদ। আর তাই কখনো বলা হয়নি তোমাকে কতোটা ভালবেসেছি আমি। এখনো বাসি, যতোদিন বেঁচে আছি ভালবেসে যাবো। তোমাকে সুখে রাখার মতো আমার কিছুই ছিলোনা। তাই তোমার জীবনে এসে তোমার সাজানো গোছানো সুন্দর জীবনের সুখগুলোকে নষ্ট করতে চাইনি।

গ্রামের অজোপাড়াগায়ের ছেলে আমি। অভাব আর অনাটনের মাঝে বড় হাওয়া। দরিদ্র পিতা মাতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই আমার ভার্সিটিতে আসা। এখানে লেখাপড়ার বাইরের জগতে আমি চিনতাম শুধু তোমাকে আর শুধু জানতাম আমি তোমায় কতোটা ভালবাসি। তোমার খুব কাছাকাছি থেকেও কখনো বুঝতে দেইনি আমি তোমার কে। টিউশন থেকে জমানো টাকায় তোমার জন্য চকোলেট কেনায় আমার যে কি সুখ সেটা আজও তোমাকে বোঝাতে পারবোনা।

যেদিন বুঝতে পারলাম সিয়াম আর তোমার মাঝে বন্ধুত্বের পরেও কিছু একটা আছে, সেদিন আমি নিজেকে আরো দূরে সরিয়ে নিয়েছিলাম। তোমাদের মাঝে আমি আসতে চাইনি কখনো। আসাটা তুমি হয়তো ভালভাবে নিতেও না। যে ফুলগুলোকে তুমি ভালবেসে আদর করেছিলে, বেনামি চিঠির যে মানুষটাকে তুমি মনের অজান্তেই ভালবেসেছিলে সেটা যে আমিই ছিলাম এটা জানার পর তোমার সে ভালবাসাটা ঘৃণায় পরিণত হোক- এটা আমি চাইনি। সহ্য করতেও খুব কষ্ট হতো আমার। আজ সেই ভালবাসার মানুষটা তোমার যেই হোক না কেন তুমি সিয়া কে নিয়ে হ্যাপি আছো, এটাই আমার সুখ। ভালো থাকবে কেয়া”।

আজ কেয়ার বিয়ে। আজও সুজন কেয়াকে বলতে পারেনি, যেমন সেদিনও বলতে পারেনি সে সত্যটা। দুটি দেহে বহমান একি রক্তের দুটি মানুষ জানলোনা তার ভালোবাসার কথা। সেদিন কেয়ার ইমার্জেন্সিতে ব্লাড ডোনেট সুজন করেছিলো ঠিকই, কিন্তু ডোনার শীটে নাম লিখেছিল সিয়ামের। সুজন জানাতে চায়নি কেয়াকে, আর তাই নিজেকে আড়াল করতেই এই মিথ্যের আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিলোনা। হয়তো কখনো আর বলাও হবেনা।

কেয়াও হয়তো কখনোই জানবেনা যে তারই ক্লাসেরর কোন এক অখ্যাত যুবক তাকে ভালবেসে গেছে আজীবন।

মহাকালের অনন্ত স্রোতে এরকম কতো প্রেম যে রয়ে যায় অজানা… কতো গল্পই যে হয়ে ওঠে মহকাব্য। … আর কতোই না প্রাণের গহীন কোণে রয়ে যায় না পাওয়ার হাহাকার। সময়ের পরিক্রমায় তা শুধু ঘুরে ফেরে প্রাণ থেকে প্রাণে।

লেখক: নষ্ট বিলাস (সামস সুমন)
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ২০ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন