[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের লালসার শিকার ছাত্রীর অন্ধকারের গল্প…


প্রকাশিত: March 27, 2015 , 3:37 pm | বিভাগ: আপডেট,ক্যাম্পাস,ঢাকার ক্যাম্পাস,পাবলিক ইউনিভার্সিটি


সানিয়া নাসরিন : অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। রক্ষণশীল ফ্যামিলির মেয়ে আমি, তাই স্বপ্নটাও ছিল এমন একটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা যেখানে আমি ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজের মান সম্মান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে পারি। তাই ভর্তি হই ইসলামিক হিস্ট্রি এন্ড কালচার বিষয়ে।

যেদিন ভর্তি হয়েছিলাম, বাবা আমাকে নিয়ে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। ভর্তি শেষে বাবা বললেন। মা অনেক স্বপ্ন নিয়ে ও বিশ্বাস নিয়ে আমি তোমাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে যাচ্ছি। আশা করি তুমি এমন কিছু করবে না যাতে আমার মাথা হেট হয়ে যায়। তিনি এও বলে গেলেন, তুমি আজ থেকে অনেক স্বাধীন। তবে সেই স্বাধীনতাটা রক্ষা করে চলবে আশা করি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাবার সেই কথাগুলো সবসময় আমার কানে বাজতো। তাই ক্যাম্পাসে অন্য দশটি মেয়ের চেয়ে আমি অনেক কম স্বাধীনতাই ভোগ করেছি। ক্যাম্পাসে ভালোবাসার অফারও পেয়েছিলাম কিন্তু ওই যে স্বাধীনতা…

যাই হোক সেদিকে যাচ্ছি না। আমি আমার জীবনের কিছু গোপন জিনিস শেয়ার করতে চাই। যেগুলো শুনলে হয়তো আপনার গাঁ শিউড়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পবিত্রতার আড়ালে কি চলে? বাবার সমতুল্য শিক্ষকদের আসল চেহারার একটা নমুনা হয়তো কিছুটা হলেও ফুটিয়ে তুলতে পারবো।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির নারী কেলেঙ্কারি ও যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অপর এক শিক্ষকের ছাত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তবে এ দুটি ঘটনা হয়তো প্রকাশ পেয়েছে তাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা কখনও প্রকাশ হয়না। আর প্রকাশ হলেও পরে মিনিমাইজ হয়ে যায়। আড়ালেই থেকে যায় নির্যাতনের গল্প। কিন্তু গল্পের সেই খলনায়করা আবারো নতুন কোন গল্পে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

আর এই সুযোগটা হয়তো আমার মতো ভীতু কিছু মেয়েই করে দেয়। যাদের বুক ফাটে তবুও মুখ ফাটে না। যাই হোক আজ আমি আর ঢাবিতে পড়ি না। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করছি। বাকৃবি ও যবিপ্রবির ঘটনাগুলো আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে বাকৃবির ঘটনা। ওখানকার ভিসি যে মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তাকে নাকি বহিস্কার করা হয়েছে। চমৎকার শাস্তি!!! উদুর পিন্ডি ভুদোর ঘারে দিয়ে ভিসি মহোদয় তৃপ্তির হাসি হাসছেন। এবার বুঝো স্ক্যান্ডাল প্রকাশ করার শাস্তি কি হতে পারে…!!!

সম্ভবত এমন শাস্তির ভয়েই অনেকে নিরবে সহ্য করে যান যৌন হয়রানির বিষয়টি। আবার যারা আমার মতো বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না তারা একাডেমিকলি মারাত্মকভাবে হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্থ হন।

আসল কথায় আসি। সময়টা ২০০৮ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। রঙ্গীন স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। ক্লাস ফাইভে, এইটে বৃত্তি, এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন এ+ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর স্বপ্নটা আরো বেড়ে গেল। বিভাগের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আমি।

সম্ভবত বিষয়টা আমার বিভাগের দুইজন স্বনামধন্য শিক্ষক বুঝতে পেরেছিলেন। তাইতো আমি তাদের চোখ এড়াতে পারিনি। ক্লাস শেষে আমাকে প্রায়ই তাদের কক্ষে ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো। এসময় নানা ধরণের স্বপ্ন আমাকে দেখানো হতো। কিভাবে পড়াশোনা করলে প্রথম হওয়া যায়। কোন কোন টেকনিক অবলম্বন করা দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি…

এমনকি একজন স্যার!!! তো রীতিমতো আমাকে তার হাতে লেখা স্পেশাল নোট দিয়েও সাহায্য করেছেন। ওই দুই স্যারের স্পেশাল কেয়ারে প্রথম সেমিস্টারে আমি ভালই ফলাফল করলাম। স্বপ্নটা আরো বেড়ে গেল।

দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে তাই স্যারদের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে গেল। যেকোন পরামর্শের জন্য ছুটে যেতাম স্যারদের কাছে। তারাও আমার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন।

একদিন আমার ফোন নম্বর চাইলেন শ্রদ্ধেয় এক শিক্ষক!!! সরল বিশ্বাসে দিয়ে দিলাম ফোন নম্বরটি। এটাই সম্ভবত আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ওই স্যার রাত ১১টার পর আমাকে ফোন করতেন। প্রথম প্রথম আমার পড়াশোনা কেমন চলছে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতো। আস্তে আস্তে তার ফোনের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। কখন কোথায় যাই। খেয়েছি কিনা, ঘুমাবো কখন ইত্যাদি ইত্যাদি…

আমি বুঝতে পারতামনা স্যার!!! আমার এতো কেয়ার নিচ্ছেন কেন। একদিন বুঝতে পারলাম তার আসল উদ্দেশ্য। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার দুই দিন আগের রাতের কথা বলছি। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক!!! আমাকে ফোন করলেন রাত সাড়ে ১২ টায়। আমি দেরি করে ঘুমাই এটা স্যার জানতেন। স্যার ফোন করেই প্রথমে পড়াশোনার খোঁজ খবর নিলেন। প্রস্তুতি কেমন তাও জানলেন। এরপরেই এই কথা সেই কথা বলে প্রায় আধঘন্টা ধরে কথা চললো তার সঙ্গে। এরই ফাঁকে তিনি বললেন আমার প্রতি তার অন্য একধরণের অনুভূতি কাজ করে। জানতে চাইলে তিনি নানা উদাহরণ টানলেন, এই যেমন নদীতীরে ঘুরে বেড়ানো, ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকি পোকা ধরা। চাঁদনী রাতে অচেনা পথে হেঁটে চলা। তার নাকি খুব শখ এগুলোর। আমি পাশে থাকলে তার সেই শখ পূর্ণ হবে….

বুঝতে বাকি রইলো না আমাদের সম্পর্কটা কোনদিকে গড়াতে যাচ্ছে। চট করে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি ঘুরেফিরে একই প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। সেদিন প্রায় ১ ঘন্টা কথা হলো। ঘুম পেয়েছে বলে নিস্তার পেয়েছিলাম। এর পর সকালে ঘুম ভেঙেছে ওই স্যারের!! ফোন পেয়ে। ফোনটা ধরতেই শুভ সকাল, ভালো ঘুম হয়েছে নিশ্চই…!!! ইত্যাদি ইত্যাদি… স্যার!! শুধু বলেই গিয়েছেন আমি শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ করেছি।

এর পর থেকে স্যার!!! যতবার আমাকে ফোন করতেন আমার ততবারই রাগে ক্ষোভে গাঁ জ্বলতো। আমি সহ্য করতে পারতামনা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সঙ্গে কেন যে কথা চলতে থাকলো বুঝতে পারতামনা। হয়তো এটা আমার দুর্বলতা। আমি কাউকে কিছু বলতে পারতামনা। টেনশনের কারণে প্রথম পরীক্ষাটা খারাপ হলো। ওইদিকে স্যারের ফোন জ্বালাতন চলতেই থাকলো। অপরদিকে আরেক শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নিয়ে যাওয়া অব্যাহত রইলো। আমি আর পারছি না…। ওই স্যারকেও আমার অসহ্য লাগতে শুরু করলো। যদিও তিনি কোন আপত্তিকর কথা বলেননি।

এদিকে কাল পরীক্ষা আবারো ফোন করলেন সেই স্যার। আমাকে কয়েকটি প্রশ্নের কথা বলে জানালেন এগুলো যেন ভালোভাবে পড়ি। পরদিন সেই প্রশ্নই পরীক্ষায় আসে। পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। স্বীকার করছি আমার ভালো ফলাফল করার লোভ কাজ করতে শুরু করলো…

রাতে ফোন করলেন স্যার!! ফোন করেই বললেন স্যারদের সহযোগিতা ছাড়া ভালো ফলাফল করা যায় না…!!! তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছো। এখনও ছোট মনমানসিকতা নিয়ে থাকলে কি হয়? তোমার বড় আপুদের দিকে তাকাও। তারা কিভাবে ভালো ফলাফল করছে একটু জেনে নিও।

যাই হোক স্যারের বদৌলতে অন্তত দুটি পরীক্ষা আমি টেনশন ছাড়াই দিয়েছি। মানে বুঝতে পেরেছেন নিশ্চই কেন…!! প্রশ্ন আগেই জেনে গিয়েছিলাম।

স্যারদের!! বদৌলতে প্রথম বর্ষে সেরা ছাত্রীর তকমাটি পেয়ে গেলাম। কিন্তু বিভাগের অন্য একটি গন্ধ ছড়াতে থাকলো। স্ক্যান্ডাল গন্ধ…

প্রচণ্ড মানষিক যন্ত্রণায় ভূগতে লাগলাম। কি করবো আমি। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন…
এগিয়েও গেছি একধাপ। আর ৩ টা ধাপ বাকি…!!! ঘুম আসতো না প্রায়ই। অন্যদিকে ওই স্যারের ফোন চলতেই লাগলো।

এক রাতে স্যার আমাকে সরাসরি অফার করে বসলেন। স্যার একটি কাজে ঢাকার বাইরে যাবেন। আমাকেও তিনি সঙ্গে নিযে যেতে চান!!! সেখানে তিনি ৩ দিন থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয় তখন বন্ধ থাকবে। তাই আমি ইচ্ছা করলে তার সঙ্গে যেতে পারি। তিনি আমাকে নাকি জোছনা দেখানোর সুযোগটা হাতছাড়া করতে চান না। আমার গাঁয়ে তখন ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। এসব কি বলছেন স্যার!!! আমি আপনার মেয়ের মত… স্যারের উত্তর সবাই যদি মেয়ে হয় তাহলেতো কেউ কাউকে বিয়ে করতে পারতো না… তাই না??
আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই… সরাসরি ওফারটা এলো। স্যার আপনি না বিবাহিত, এমন প্রশ্ন করতেই বললেন তোমার জন্য সব কিছু ছাড়তে পারি।

তুমি অনেক ভালো মেয়ে, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। লেগে থাকলে তোমাকে আমি অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানিয়েই ছাড়বো। স্যার বিভাগে অনেক প্রভাবশালী ছিলেন এটা হয়তো তিনি পারতেন…. কিন্তু আমার বাবার দেয়া সেই কথা… আমি রাখতে পারতামনা নিশ্চই???

নিজের বিবেককে অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। আমি স্যারকে সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম। আমি আর দশটা মেয়ের মত নই। আপনি আমাকে আর কখনও ফোন করবেন না। ওই রাতেই স্যারের সঙ্গে শেষ বারের মত ফোনে কথা বলা। এরপর অনেক ফোন দিয়েছেন কিন্তু আমি আর ফোন রিসিভ করিনি।

এর পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকলো আমার জীবন। আমি আর ওই স্যারের কক্ষে যাই না। সিদ্ধান্ত নিলাম একা একা নিজের চেষ্টায় ভালো ফলাফল করে দেখিয়ে দেব। কারো অন্যায় আবদার মেনে নেব না। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছি।
প্রচুর পড়াশোনা করতে লাগলাম। এদিকে বিভাগে ছড়িয়ে পড়লো স্যারদের কাছে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। তারা এখন অন্য পথ ধরেছেন। কারণ ওই স্যারদের চরিত্র সম্পর্কে বিভাগের অনেকেই অবগত রয়েছেন।

যাই হোক সমালোচনা আর প্রচণ্ড মানষিক টেনশন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। গভীর রাতে জায়নামাযে বসে কত যে চোখের জল ফেলেছি তার কোন হিসেব নেই। এতোদিন আমি ভুল পথে ছিলাম। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতাম। বাবা-মাকে ফোন করে কান্নাকাটি করতাম। আমার বাবা ওই সময়টাতে আমাকে প্রচুর সাপোর্ট দিয়েছেন।

সামনে পরীক্ষা। প্রস্তুতিও ভালো। পরীক্ষাও ভালো দিলাম। কিন্তু সে অনুযায়ী ফলাফল এলো না। বুঝতে বাকি রইলো না, শিক্ষকদের অ্যাকশন মানে প্রতিশোধ শুরু হয়ে গেছে। তৃতীয় সেমিস্টারের ফলাফল খারাপ হওয়ার পর সমালোচকদের ধারণাই সত্য হলো। তারা এখনও বিশ্বাস করে আমার সঙ্গে ওই স্যারের কিছু একটা সম্পর্ক ছিলো। স্যারের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর তিনি আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন।

কিন্তু কে কাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে সেটা অজানাই রয়ে গেলো…

কথাগুলো বাবা-মা ছাড়া এতোদিন কেউ জানতো না। আজ জানাতে ইচ্ছে হলো তাই জানালাম। জানি ওই শিক্ষকরা এখন আর আমার ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তারা যাতে নতুন কাউকে লালসার শিকারে পরিণত করতে না পারে সেজন্য সচেতনতার জন্য বিষয়টা শেয়ার করলাম।

সানিয়া নাসরিন
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[বি:দ্র: অন্ধকারের গল্পে ছাত্রীটির ছদ্দনাম ব্যবহার করা হয়েছে]

ঢাকা, ২৭ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন