[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



এক কাপ কফি-হৃদয়ের বোবা কান্না


প্রকাশিত: May 23, 2015 , 2:49 pm | বিভাগ: আদার্স,আপডেট,রাইম, স্টোরি এন্ড জোকস


ইসমত পারভীন (রুনু): আমি সেই সকালটার কথা বলছি, যে সকালের শুরুতে দোয়েল শিস দেয়নি, যে সকালের শুরুতে ভোরের পুব আকাশে সোনালী আলোর ঝলকানি দেখিনি, ঝিরঝির বাতাসে মন-প্রাণ জুড়ায়নি, পাখির কলতানেও ঘুম ভাঙ্গেনি।

সেই সকালটা ছিল সীমাহীন বেদনার, ততোধিক কষ্টের, অপূরণীয় শূন্যতার, সর্বোপরি প্রিয় মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবার, শোকের আবহ মিশ্রিত আবেগের, হঠাৎ করে সবকিছু থেমে যাওয়ার, এক অজানা বিষণ্ণতায় পরিপূর্ণ, অসহ্য মন-ভাঙ্গা এক অন্যরকম সকাল।

সত্যি, এমনি সকাল আমার বড্ড অচেনা, অপ্রত্যাশিত, অনাকাক্সিক্ষত। ২০১৪ সাল, ২৩ মে, শুক্রবার। ‘সড়ক দূর্ঘটনা’ নামক হিংস্র দানব কেড়ে নিয়েছে আমাদের নয়নের মণি, অনেক সাধনায় পাওয়া, সাত রাজার ধন, আমাদের বংশের একমাত্র রাজকন্যা, আদরের সোনামণি- চৌধুরী ফারাহ্ নাজনূর শাওনি মামণিকে। সেদিন রাতের ফ্লাইটে তোমার অস্ট্রেলিয়া যাবার কথা ছিল। উচ্চ শিক্ষায় নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশে ফিরবে বলে। তাইতো ‘কফি’ খাওয়ার বায়নাতে বাবার অনুমতিটুকু কৌশলে আদায় করে নিয়েছিলে। কিন্তু সে অনুমতিই যে চির বিদায়ের অনুমতি ছিল, সেটা কে জানতো?

তোমাকে ‘বাবা’ অনুমতি দিতে চান নি। কিন্তু ঐ কফি শপে সবসময়ই তুমি যাও সবাইকে নিয়ে। সেদিনও তেমনি গিয়েছিলে, কফি খেয়েছিলে, শুধু ফিরলে না তুমি, আর ফিরবেও না কোনদিন। তোমাকে চিরতরে হারিয়ে তোমার ‘বাবা-মা’ নিঃস্ব, দিশেহারা, বাকরুদ্ধ। সর্বত্রই খুঁজে বেড়ান তাঁরা তোমার চঞ্চল পদচারণা, তোমার কোমল স্পর্শ, কিন্তু কোথাও তুমি নেই। নিঃসঙ্গতার হাহাকার সর্বত্র।

তোমার মামণিও অপেক্ষায় থাকেন তুমি ভার্সিটি থেকে কখন ফিরবে। আজও মামণি তোমার পছন্দের খাবার নিয়ে খাবার টেবিলে বসে থাকেন নীরবে, নিঃশব্দে। কখনও হয়ত ভাবেন, এই বুঝি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মাকে চমকে দিয়ে বলবে, “আমি এসে গেছি”। তোমার নিজের নামটা যত না মিষ্টি, তার চেয়েও অনেক মিষ্টি করে সবাইকে ডাকতে। দাদী, গোধন, বুবু, তিতি, ছোট, চাচ্চু আব্বি, ছোটমা, দিদি, আন্না- আবেগ জড়ানো, মমতা ভরানো কত না নামের বাহার।

সারাক্ষণই আমাদের ছুঁইয়ে থাকতে। রাত জাগা আড্ডায় তুমিই ছিলে মধ্যমণি। বার বার জানতে চাইতে চা হবে কিনা? আজও তেমনি ছুঁয়ে আছো, শুধু কষ্ট এখানেই তোমাকে আর দেখতে পাবো না কখনও। শুধু অনুভবে ফিরে পাওয়া। ভেবোনা, তোমাকে ভুলে গেছি। তুমি মিশে আছো এ মনের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে। তোমার আবির্ভাব ধুমকেতুর মতো।

উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার আদরের দুলালী হয়েও তোমার মধ্যে ছিল নির্মল সরলতা। তা দেখে শুধু আমরা নই, এলাকার সবাই ছিল দারুণ মুগ্ধ।

সবাইকে আপন করে নেয়ার এক তীব্র ক্ষমতা ছিল তোমার। তাইতো তোমার অকালে চলে যাওয়া কেউই মেনে নিতে পারছি না। তোমার মন পড়ে থাকতো মতলব কলাদির ‘চৌধুরী ভিলা’য়। সময় পেলেই ছুটে যেতে সেখানে নির্দ্বিধায়। সবাইকে নিয়ে থাকতেই যেন তোমার আনন্দ।

আমাদের মতলবের বাড়ি আধুনিকতার সব সুবিধা সেখানে অনুপস্থিত। প্রশস্ত উঠোন, ঝোপ-ঝাড়, লেবু বাগান, সারি সারি মেহগনি গাছ, আমের বাগান, পেয়ারা গাছে পেয়ারা, গ্রামীণ পরিবেশ সব সময়ই তোমাকে আকর্ষণ করতো। সবসময়ই বলতে, “ওখানে আমার দাদী আর চাচ্চু আব্বি থাকেন। ওখানে সময় কাটাতে আমার বেশ লাগে”।

তোমাকে ছাড়া গত এক বছর আমরা কেমন আছি, নাইবা জানলে। শুধু দোয়া করি, তুমি ভালো থেকো। আল­াহ্পাক তোমাকে শান্তি তে রাখুক। এখনও তোমার মুঠোফোনের অপেক্ষায় থাকি, তোমার কণ্ঠ শুনবো বলে। পছন্দের খাবার খেতে পারি না, কোকিলের কুহুতানে মন ভরে না, সহস্র ফুলের সমাহার তেমন আকর্ষণও করে না। নিয়মিত আমাদের খোঁজ-খবর নেয়ার আর কেউই রইলো না।

ভালবাসতে চাচ্চু, ফুপ্পিদের গান। নিজেও ভাল গাইতে পারতে। আজকে আর কেউ বলে না, “ফুপ্পি, গাওতো- দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা…কিংবা তুই যদি আমার হইতি রে…”। তোমাকে চিরতরে হারিয়ে সব সুন্দরের মাঝে তোমাকে খুঁজি।

চাচ্চু আব্বি ছিল তোমার খুবই কাছের, আপনজন, তোমার প্রাণ। চাচ্চু আব্বি আজ আর আগের মতো গাইতে পারেন না। তুমি চাচ্চুর গান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে, অনুপ্রেরণা যোগাতে। আজ সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে, সবার পরে এসে, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে, সবার আগেই চলে যেতে হলো তোমাকে?

দাদীর সাথে ছিল তোমার টক-ঝাল-মিষ্টি সখ্যতা। দাদীকে খুবই যত্ন করতে, পান সাজিয়ে দিতে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। সেজন্যই কি এভাবে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দাদীর সহযাত্রী হলে?

হৃদয়ের অন্তরালে গুমরে আছে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস। সে যে কখনও বোবা কান্না হয়ে সুপস্ট হয়ে ওঠে আবার কখনও স্বাভাবিকতায় নিজেকে মিলিয়ে নেয়।

এখন মধ্যরাত। কিন্তু ঘুমহীন চোখে শুধুই চেয়ে থাকা, ক্লান্তির বিহ্বলতায় আচ্ছন্ন দুটি চোখ, শুধু খুঁজে বেড়ায় তোমাকে, তোমার স্মৃতিগুলোকে। আমরা আছি বিভোর শুধু তোমাতেই।

তাইতো লিখছি, কি অভিশপ্ত এ রাত্রি, এ রাতের প্রত্যাশায় কখনই কেউ আগ্রহের সবটুকু বাড়িয়ে দেয় না। কিন্তু তবুও এ অনন্ত রাত্রি ফিরে আসবে বার বার, যুগে যুগে আমাদের কান্না হয়ে। তুমি থাকবে অনুভ‚তিতে, আবেগে, উচ্ছ্বাসে, ভাললাগায়। তুমি থাকবে স্মৃতিতে, চেতনায়, আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

(অকালপ্রয়াত একমাত্র ভাতিজির স্মরণে লিখিত)

লেখিকা: গৃহিণী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সিলেট ।

ঢাকা// ২৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এইচকে