[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ফেনসিডিলের মরণ ছোবল যেভাবে গ্রাস করে


প্রকাশিত: July 5, 2015 , 10:33 pm | বিভাগ: আপডেট,ফিচার


phenchydylআবুল বাশার মিরাজ বাকৃবি থেকে: “হাজার টাকার নেশা তোমার সাথে বেঈমানি করতে পারে কিন্তু ১০ টাকার গাঁজা কখনো বেঈমানি করবে না”- ডায়লগটা গাঁজা খোরদের। ডায়লগটা থেকে বুঝাই যাচ্ছে গাঁজা অনেক হাইভোল্টেজ নেশা। আর এই গাজার নেশাটাকে মিনিমাম ১৫০ গুন বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আধা বোতল ফেনসিডিলই যথেষ্ট।

ফেনসিডিলকে সাধারণত ছাত্রনেতা, পাতিনেতা, লোকাল মাস্তানদের নেশা বলা হয়। সাধারণত অন্যান্য মাদক থেকে এর দুষ্প্রাপ্যতা এবং বেশী দামের কারণে এটাকে পলিটিক্যাল নেশা বলা হয়। কিন্তু ভয়াবহ সত্য হল রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে সমাজের উঁচুতলার অনেক ভদ্রলোকও এটা ব্যবহার করে।

তবে এটায় বেশির ভাগ আসক্ত হল ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে, বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদীয়মান তরুণ নেতা, লোকাল ছাত্র নেতারা। ইদানীং মেয়েদের মধ্যেও এর আসক্তি চোখে পড়ার মত।

এটা এক ধরনের ঔষুধ। কাশির ঔষুধ। সাধারণত ইন্ডিয়া, নেপাল এবং বাংলাদেশের লোকদের মাঝে এর আসক্তি দেখা যায়। তবে এর মাঝে বাংলাদেশের লোকদের মাঝেই এর আসক্তি খুব বেশী। তবে অন্যান্য দেশের মধ্যে একমাত্র সাউথ আফ্রিকাতেই উল্লেখযোগ্যভাবে এর আসক্তি দেখা যায়।

ফেনসিডিল ইন্ডিয়াতে তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করা হয়েছিলো এই ঔষুধ তৈরীর কারখানা বন্ধ করার জন্য। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি তা বোঝা যাচ্ছে ভালোভাবেই। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ ফেনসিডিল আসক্ত এবং তা ক্রমেই বেড়ে চলছে।

ছদ্মনাম: ফেন্সি/ডাইল/ফান্টা/ফান্টু/ইঞ্চি/টাকা (১০০০টাকা মানে একটা ফেনসিডিল) /মধু/বাঘের দুধ/লাইন/মবিল/মাল ইত্যাদি। মাদকাসক্তরা নিজেদের মধ্যে ফেন্সিডিল নিয়ে আলাপ করার সময় কিংবা কেনার সময় এই ছদ্ম নাম ব্যবহার করে যাতে সাধারণ মানুষ তা বুঝতে না পারেন।

বর্তমানে ফেনসিডিল একটু দামী নেশা। একটু রিমোট এরিয়াতে এর বেচাকেনা হয় এবং এক জায়গায় ৫-৬দিনের বেশী থাকেনা। বেশিরভাগ সময়ই মোটর সাইকেল না থাকলে এটা সংগ্রহ করা কষ্টকর। মাঝে মাঝে যারা বিক্রি করে তারাও মোটর সাইকেল ব্যবহার করে ক্রেতার কাছে দিয়ে আসে। লোকাল লিডারদের ছত্রছায়ায় এর বেচা কেনা চলে। ঐ লিডাররাই লোকাল আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রাখে।

আর দামের ক্ষেত্রে বলা যায়, আজ থেকে ৬-৭বছর আগেও এক বোতল বিক্রি হতো ৮০-১০০টাকায়। বর্তমানে এলাকাভেদে এর দামের তারতম্য দেখা যায়। বর্ডার এরিয়াতে ২০০-২৫০ টাকায়, বর্ডারের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩০০-৩৫০ টাকায়, এবং অন্যান্য এলাকায় ৭০০-৮০০টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। দামের ক্ষেত্রে ক্রেতা বিক্রেতা দুইজনই একক সংখ্যা ব্যবহার করে। মানে ৭ টাকা/৮টাকা। এবং এর কেনাবেচা অত্যন্ত তড়িৎ গতিতে সম্পন্ন হয়।

দিন কে দিন ফেনসিডিল আসক্তি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর সেবনের সুবিধার জন্য। অন্য যে কোন ধরনের মাদক সেবনের জন্য নুন্যতম একটু সময় এবং জায়গা দরকার। কিন্তু ফেনসিডিল এর জন্য সময় এবং জায়গা কোনটারই দরকার নেই। অনেকে মোটর সাইকেলের পেছনে বসেও খেয়ে থাকে। দাম একটু বেশী হওয়ার কারণে দুইজন শেয়ার করে এক বোতল খায়। আর এক বোতলে থাকে ১০০মিলি।

যদি গ্রুপ করে খাওয়া হয় অর্থাৎ ৪-৫জন খায় তখন এক জায়গায় বসে গ্লাসে ঢেলে পানি মিশিয়ে খায়। ছুটির দিনের আগে, বিশেষ উৎসবের দিনে খাওয়া হয়। আবার অনেকে লং জার্নির শুরুতে এটা খেয়ে থাকে। তবে যারা কয়দিন কন্টিনিউ করে তাদের জন্য উৎসব লাগেনা। প্রতিদিনি তারা কোন না কোন উৎসব বের করে ফেলে।

কৌতুহল থেকেই অনেকেই ফেনসিডিল খেয়ে থাকেন। তবে অনেক সময় ডিপ্রেশান, ছ্যাকা খাওয়া মানুষ সহজেই এতে জড়িয়ে পড়েন। শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, রুচি নষ্ট হওয়া, এবডোমিনাল পেইন, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু ফেন্সিখোরদের পরিণতি খুব বেশিই ভয়াবহ।

আর বেশিরভাগ ফেন্সিখোরদের কেউই এমনকি পরিবারের সদস্যরাও ট্রেস করতে পারেনা। যারা একেবারেই ফেন্সিখোর তারা একা একা চলাফেরা করে। দিনের বেলায় কাজ না থাকলে বের হয় না।

নিজে নিজে খুব বেশী চিন্তা ভাবনা করে। এবং একসময় তা নেগেটিভ পর্যায়ে চলে যায়। সবাইকেই সন্দেহ করতে থাকে। এবং এটা তার নিজের ভেতরেই রেখে দেয়। কারো সাথে শেয়ার করেনা। চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে ফেন্সিখোরদের কনফিডেন্স অনেক বেশী। সবসময়ই ভাবে তারা যা চিন্তা করে তাই সঠিক। আর সবার চিন্তা ভাবনাই ভুল। এবং একটা সময় মানসিকভাবেই অসুস্থ্য হয়ে যায়।

ফেন্সিডিলের নেশা ত্যাগের জন্য খুব বেশীই আত্মবিশ্বাসী হওয়া লাগে। তারপরও পারেনা। একমাত্র উপায় হচ্ছে তাকে ঘরের মাঝে বন্দী করে রাখা। অনেকেই আবার এক নাগাড়ে কয়দিন খেয়ে আবার কিছুদিনের জন্য বাদ দেয়। এর ফলে কিছুক্ষনের জন্য প্রচন্ড খারাপ লাগে। কোনকিছুই ভালো লাগেনা। ঘন্টাখানেক পর আবার সব ঠিক হয়ে যায়। তখন সে ভাবে ফেন্সির উপর তার কন্ট্রোল আছে।

কিন্তু এটাই ভুল ধারনা। ফেন্সি ছাড়ার পর যতদিন যেতে থাকে, ফেন্সি ছাড়ার এফেক্টটাও বেশী প্রকট হতে থাকে। এবং একটা সময় ঘুম আসেনা। দেখা যায় ৭-৮ দিন টানা ঘুমাতে পারছেনা। তীব্র মাথা ব্যাথা করে, অনেক সময় জ্বর আসে।

তখন সে মনে করে এক ফোটা ফেন্সি খেতে পারলেও হতো। তবে ফেন্সিখোরদের পরিণতিই হলো ধ্বংসের অতল গহবরে হারিয়ে যাওয়া। অবশ্য হারিয়ে যাওয়া নয় অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় বেঁচে থাকা।

বাকৃবি// ০৫ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// জেআর