[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



মেঘের আড়ালে সোনালী রোদ্দুর


প্রকাশিত: July 20, 2015 , 12:59 pm | বিভাগ: আপডেট,রাইম, স্টোরি এন্ড জোকস


sky-live

ইসমত পারভীন রুনু : গাছে গাছে বাহারী কদম ফুল, আর বর্ষা মৌসুমের ভারি বর্ষণ দেখলেই বাবাকে বড্ড বেশি মনে পড়ে। সারাক্ষণই বাবা আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগায় দারুণভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। ‘মা-মণিরা বৃষ্টিতে একদম ভিজবেনা, ঠান্ডা লাগবে। তারপর ঠিক জ্বর এসে যাবে’। বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ হবে বলে বাবার কত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা! অথচ জীবন যুদ্ধে নাম না জানা কত ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছি কতবার, মোকাবেলাও করেছি। আর সেকথা বাবা-মা কেউই জানতেও পারলেন না।

দীর্ঘশ্বাস, একবুক কষ্ট, পুরনো বিয়োগ ব্যথা, এ মুহূর্তে দীপা হকের মনকে ভারাক্রান্ত করে ফেললো। আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘আমি কি ছোট ভাই-বোনকে বাবা-মায়ের আদর দিয়ে মানুষ করতে পেরেছি? আমি কি ওদের স্বপ্ন দেখাতে পেরেছি? নাকি নিজের দায়িত্বটুকুও সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি?’

দীপা হক আমার বড় বোনের আদরের প্রথম সন্তান। বিপন্ন মানবতা, সমাজের নিষ্ঠুরতা, পাঁচ ভাই-বোনের অস্ফুট আর্তনাদ সেদিন কাউকেই এতটুকু বিচলিত করেনি। আজও করেনা। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটির একাকি পথচলা আর প্রতিক‚ল পরিস্থিতির কথাই বলছি। অনুভব করলাম নিজের দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, কারণ এ গল্পগুলো আমার মনের অন্তরালেও গুমরে কাঁদে। জীবন চলায়, এই উত্তাল প্রতিক‚লতার বিরুদ্ধে লড়াকু মনোভাবকে সঞ্চয় করে শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই সেই ছোট্ট মেয়েটির। পেছনে তাকানোর সময়ও ছিল না।

সেই ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি আজ অনেকটা পরিপূর্ণ, সার্থক, জীবন যুদ্ধে অপরাজিতা, উচ্চশিক্ষিতা, প্রেমময়ী স্ত্রী, মমতাময়ী মা, ছোটদের একমাত্র আশ্রয়, নিরাপত্তার এক বিশাল বটবৃক্ষ শ্রদ্ধেয়া দিদি, দাদা-দাদির চোখের মণি, কর্মস্থলে আন্তরিক সৎ, পরোপকারী, দায়িত্বশীল, সবার প্রিয় ফারজানা আপা (দীপা)।

বাবা সরকারি কর্মকর্তা, মা শৌখিন আধুনিকমনা, বিচক্ষণ গৃহিণী। বাবা-মা, তিন বোন আর দুভাইকে নিয়ে দীপা হকের পরিবার। সে পরিবারে কোন কিছুরই যেন অভাব নেই। শুধু আনন্দ আর আনন্দ। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রঙিন প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়ানো ছাড়া দীপা হকের আর যেন কিচ্ছুটি করার নেই।

সময় করে পরিবারের সবাই মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, শপিং-এ গিয়ে পছন্দের পোশাকটি কেনা, প্রিয় ফলের ঝুড়িটি হাতের কাছে পাওয়া, সেই সাথে মায়ের চমৎকার সব রান্না। তিনবোনের পরে দুভাইয়ের আবির্ভাব সে আনন্দকে যেন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মায়ের মাখানো ভাতের প্রতি দীপার দূর্বলতা ছিল। যেন অমৃত! কতদিন বায়না ধরেছে, ‘তুমি খাইয়ে না দিলে খাবোই না’। আজ সবই স্মৃতির মণিকোঠায়। বাবার আদর মাখানো ডাকে ঘুম ভাঙ্গতো ওদের। বাবা কত মিষ্টি করে বলতেন, ‘এই যে মা-মণিরা উঠে পড়তো। গরম চা আর তোমাদের পছন্দের ব্রেড রেডি’। বুকের গভীরে জমানো আবেগটুকু আজ বারবার স্মৃতিতে ভিড় করছে। কতদিন বাবার সে ডাক শোনা যায় নি। আর শুনবোও না কোনদিন। এইতো নিয়তি! সত্যি বাবা, তোমাকে খুবই মিস করি।

কিছুদিন পরই দীপার এসএসসি পরীক্ষা। পড়াশোনার কিছুটা চাপ ছিল বৈকি। সব কাজ গুছিয়ে মা সবার শেষে বিছানায় যেতেন। তাইতো মাকে কিছুটা বিশ্রাম দিতেই বাবা বলতেন, ‘নামাজ শেষে আর একটু ঘুমিয়ে নাও, মাত্র তো সকাল হল। আমি বাচ্চাদের সাথে আছি’।

সে অনাবিল আনন্দ আর নিশ্চয়তার জীবন দীপাদের ভাগ্যে বেশিদিন ছিল না। একটু একটু করে মেঘ জমতে শুরু করলো ওদের জীবনে। তারপর? প্রচণ্ড ঝড়! সে ঝড়ে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেলো। মায়ের অকাল মৃত্যু। মা সংসার থেকে চির বিদায় নিলেন মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায়। ১৯৯০ সালের ২৯ আগস্ট, সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সুস্থ হয়ে আর ফিরতে পারলেন না প্রিয় আঙিনায়।

শৈশবের মাতৃকোল, মায়ের শরীরের মিষ্টি গন্ধ, অকৃত্রিম আদর, অন্যায় আবদার, সর্বোপরি দৌড়ে এসে মায়ের আঁচলে মুখ লুকানো, মুহূর্তেই সব দুঃস্বপ্নে পরিণত হল। মন ভেঙে গেলো দীপার। মাকে হারিয়ে শুরু হল জীবন যুদ্ধ। মা চলে যাওয়ার পর বাবারও দায়িত্ব বেড়ে গেল কয়েকগুণ। নিয়মিত অফিস করা, বাসা সামলানো, সবার দেখাশোনা। বেশিদিন এভাবে চালাতেন পারলেন না। একা একা সবকিছু সামলাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ওদের বাবা মুক্তিযোদ্ধা, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁকে নিয়ে ওদের কত গর্ব, অহংকার। বাবা দীপা হকের আদর্শ, প্রিয় ব্যক্তিত্ব।

সেদিন বাসায় ফেরার পর থেকেই বাবাকে অন্যরকম লাগছিলো। কথাবার্তায় অস্পষ্টতা; ক্ষীণ স্বরে শুধু বলে যাচ্ছেন, ‘মা-মণি, চা করতো। আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে’। দীপার সাথে এটিই বাবার শেষ কথা। বাবার আর চা খাওয়া হলো না। সে ঘুমও আর ভাঙ্গলো না। ১৯৯০ সালের ১০ ডিসেম্বর। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটুকুও মুহূর্তে শেষ। বাবাও মায়ের সহযাত্রী হলেন। কান্না ভুলে গেছে দীপা। শুধু ভাবছে, আমি এখন কী করবো? সামনে এসএসসি পরীক্ষা, শুধুই অন্ধকার। ওরা একা, কোথাও কেউ নেই।

দীপা হকের একক ইচ্ছায় পাঁচ ভাইবোন চলে এলো গ্রামে দাদাবাড়িতে। বৃদ্ধ দাদা-দাদির দেখাশোনা, ভাইবোনের যত্ন, নিজের পড়াশোনা, অর্থনৈতিক তীব্র সংকট, ভয়ানক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গ্রামেই ওদের বেড়ে ওঠা। সম্বল শুধু বাবার পেনশন, কল্যাণ তহবিল আর স্কুলশিক্ষক দাদার পেনশন। নিজের জীবন বাজি রেখে এই মহাযুদ্ধ একাই মোকাবেলা করেছে মেয়েটি। বলতে গিয়ে আজ আর কান্না থামাতে পারছে না সে। ছোটদের সব আবদার এড়িয়ে গেছে নিঃসঙ্কোচে। আজ নিজে যখন মায়ের ভূমিকায়, কেবলই বাবা-মায়ের মুখগুলোই চোখের সামনে ভাসছে। মায়ের মত আপন কেহ নাই…, কিংবা কাটেনা সময় যখন… আয় খুকু আয়… ; বাবা-মায়ের প্রতি অনুভূতি জাগানো গানগুলো শুনলেই চোখ ভিজে আসে কান্নায়।

বাবা-মায়ের জন্য হাহাকার অনুভবে, আবেগে, কান্নায়, উপলব্ধিতে। আল্লাহ্পাক যেন তাদের শান্তিতে রাখেন। তাদের জন্য আজ দিগন্ত বিস্তৃত আকুতি। একবার এসে দেখে যাও, তোমাদের সন্তানেরা আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। শুনতে কী পাও আমাকে? দোয়া করো, আমাদের পারিবারিক বন্ধন যেন অটুট থাকে। দীপাদের আজ সবই আছে। শুধু বাবা-মাকে ফিরে পাওয়া হলো না। ভাইবোনদের কাছে চাওয়া, প্রাচুর্যে নয়, মনুষ্যত্বে বলিয়ান হতে হবে প্রত্যেককে। আজ ওরা সবাই সবার অভিভাবক। দীপার জীবন যুদ্ধে আজ ছোটরাও সমান অংশীদার।

আমাদের এই লড়াকু মেয়ে, পরিবারে সবার বড় ফারজানা হক দীপা আজ মাস্টার্স শেষ করে আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত। পরের দুবোনের মধ্যে মেজো তারানা হক নিপা স্নাতক আর ছোট রুমানা হক লুনা সমাজকল্যাণে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে দুজনেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তিন বোনের আদরের ছোট দুভাই মাশফিক তামিম আর তৌফিক প্রতীমও আজ মানুষের মত মানুষ হয়েছে। তামিম র্ব্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি (অনার্স) সম্পন্ন করে একটি বিদেশী প্রকল্পের ফেলোশিপে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। আর প্রতীম চুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিএসসি(ইঞ্জিঃ) সম্পন্ন করে একটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত।

তিনবোনের জীবনসঙ্গীদের কাছে কৃতজ্ঞতা, সব শূন্যতার মাঝেও পূর্ণতার পরিবেশ সৃষ্টিতে। শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা বুলু খালামণির নিঃস্বার্থ দায়িত্বশীলতায়, আর গভীর শ্রদ্ধা নানুর আশির্বাদসহ নানা সহায়তার জন্য। আরও যারা পাশে ছিলেন, আছেন তাদের সকলের জন্যও কৃতজ্ঞতা।

স্যালুট! দীপা হক তোমাকে, তোমার জীবন যুদ্ধকে। তুমি সাহসী, তুমি অনুপ্রেরণা, তুমি বীরত্বগাঁথায় সোনালী রোদ্দুর, জীবন যুদ্ধে অপরাজিতা এক কিংবদন্তি।

লেখিকাঃ গৃহিণী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সিলেট

ঢাকা, ২০ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন