[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ভারত সফর: কিছু মজার অভিজ্ঞতা


প্রকাশিত: July 23, 2015 , 6:28 pm | বিভাগ: আদার্স,আপডেট,ট্যুরিজম এন্ড এনভায়রনমেন্ট


সানাউল্লাহ মাহি, ভারত থেকে ফিরে: আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী। ৫মে থেকে ৮জুন স্নাতক সম্মান শ্রেণির চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের ৪বছরের ইতি ঘটল। প্রতি বছরের মত এবারও বিভাগের উদ্যেগে আয়োজিত হল ‘সার্ক স্টাডি ট্যূর-২০১৫’। সার্ক ভুক্ত দেশগুলোতে এ ভ্রমণ হওয়ার কথা থাকলেও সাধারণত ভারত সফরটাই হয়ে থাকে। সময় স্বলতা ও অর্থনৈতিক দৈন্যতা দু’টোই এর কারণ।

আমাদের এবারের আয়োজন নেপাল ও ভারত দু’টোতেই ছিল। তবে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কারণে কেউই নেপাল যেতে রাজি হয়নি। ফলে যোগ হল কাশ্মির।

১৫ জুন রাতে ক্যাম্পাস থেকে কোলকাতার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। ২জন শিক্ষকের সাথে রয়েছে আমদের ১৩জন শিক্ষার্থীর দল।

উদ্দেশ্য কোলকাতা, আগ্রা, জয়পুর, দিল্লি, সিমলা, মানালি ও জুম্মু-কাশ্মির। স্থানগুলোর দর্শনীয় স্থান দেখার পাশাপাশি আমাদের স্বল্প পরিসরে সেমিনার, পরিচয়পর্ব ও দ্বিপাক্ষিক শিক্ষা উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা ছিল জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (দিল্লি), কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয় (শ্রীনগর, কাশ্মির) ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়তে (কোলকাতা)।

চলার পথে ট্রেনে বসে, দোকানে, বাজারে বা হোটেলে নিজেদের মধ্যে বা ভারতীয়দের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে চোখে পড়েছে নানা কিছু। অনেক বিষয়ই ছিল আমাদের থেকে ভিন্ন।

ভারতের মত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও রাজ্যভিত্তিক দেশে আমাদের সাথে তাদের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের তুলনায় তাদের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ভিন্নতা কোন অংশে কম দেখিনি।

এক রাজ্যের সাথে অন্য রাজ্যের ভাষার মৌলিক পার্থক্যর পাশাপাশি আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচরণ বিধি ও বিশ্বাসে মনে হল বিস্তর ফারাক রয়েছে।

বহু ভাষার দেশ ভারতের একজন মুর্খ মানুষও কমবেশি একাধিক ভাষা জানেন। যা তার যোগ্যতাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করি।

ভারত একটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অগ্রসরমান দেশ ও জাতীর দাবিদার হলেও আমাদের অনেকের কাছেই তা মনে হয় নি। দিল্লির বস্তির করুণ দশা আর কাশ্মিরিদের কারাভুক্ত জীবন-যাপন ভাবিয়ে তোলার মত! মনে হল সেখানকার সামাজিক বন্ধুরতা কোন অংশে কম নয়।

আমাদের চলার পথে সবচেয়ে যে বিষয়টি অবাক লেগেছে তা হল তাদের সেনেটিশন ব্যবস্থাপনা। খোলামাঠে নারী-পুরুষের স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রাকৃতিক কার্য-সাধন আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য।

যেসব স্থানে সেনেটিশন ব্যবস্থা পেলাম সেখানেও দৃষ্টিগোচর হল ‘বদনা’র অনুপস্থিতি। এর স্থলে রয়েছে মোটা কন্টেইনার কাটা। ও দিয়ে আর কী হবে? আস্ত বাবুকে (শিশু) ডুবিয়ে দেয়া যাবে। ভারতীয়দের ট্রেন ও খোলামাঠে খাবার পানির বোতল দিয়েই এসব কাজ সারতে দেখা গেছে।

আমাদের গ্রাম পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা বিলুপ্ত বা সংস্কার হয়ে গ্রাম আদালত (ইউনিয়ন পরিষদ) প্রতিষ্ঠা হলেও সেখানে এর উপস্থিতি বিদ্ধমান।

পশ্চিম বঙ্গ থেকে যতই উত্তর প্রদেশের দিকে এগুচ্ছি ততই দেখছি পানির আকাল। খাবার পানির চরম কষ্ট। আমাদের উত্তর বঙ্গের মানুষ অনেকটা কৃত্রিম কারণে পানি কষ্টে থাকলেও তাদেরটা প্রাকৃতিক কারণ বলেই ধর্তব্য। তবে হিমাচল প্রদেশের কথা ভিন্ন। পুরো পাহাড়ি অঞ্চলেই মিলল যথেষ্ট বরফ পুষ্ট জলধারা।

রাজস্থানের থর মরুভূমির লেজুর ধরে আমাদের রেলগাড়ি ছুটে চলছে জয়পুরের দিকে। দো-দো বিরানভূমি। দু-চারটে বাড়ি-ঘর। সরকারী ভাবে জনগণকে স্বল্পমূল্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়ে জনবসতি গড়ার চেষ্টা চলছে। পাশেই সবুজ বনায়ন করার চেষ্টা করছে সরকার। তবে লাভ কী? যে মানুষের মূলে রয়েছে পানি সে মানুষের আগেতো পানিই চাই। তাই এখনো সরকারের প্রকল্প বোধ হয় সফলতার প্রথম পর্যায়েই রয়েছে।

হিজরাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও তুলনামূলক ভিখারির সংখ্যা কম মনে হল। তবে উত্তর প্রদেশে এটা কিছুটা বেড়েছে।

খুচরো টাকার বেশ সঙ্কট দেখলাম। দোকানদাররা কোন মতেই খুচরো টাকা দিতে রাজি ছিল না। ক্রেতা খুচরো টাকা না দিলে তার কাছে মাল বিক্রি না করাটা ছিল হরহামেশা ব্যাপার। তবে হাজার টাকার বাজার করার পরও এক টাকার চকলেট খেলে তা উসুল না করে কোন ক্রেতা আসতে পারে বলে প্রমাণ দেখিনি।

যানবাহন ভাড়া বেশ কম। আমাদের ট্যাক্সি-ক্যাব চালকরা নিজেদের মর্জি অনুযায়ী যাত্রী বহন করে। কিন্তু সেখানকার ট্যাক্সি-ক্যাব পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে। যাত্রী লাইনে দাড়িয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে টিকেট সংগ্রহ করে। চালক যাত্রীর গন্তব্য স্থলে যেতে আইনগত ভাবে বাধ্য এবং তারা তা পালন করে। সিলিপারে ৪৮ ঘন্টার ট্রেন ভাড়া মাত্র সাড়ে ৮শ রুপি। আর আমাদের ৩শ কিলোমিটার যেতে গুণতে হয় ৬শ টাকা!

ওদের ট্রেনে ওয়েটিংয়ে থাকা যাত্রিদেরও টিকেট সংগ্রহ করতে দেখছি। এমনকি লোকাল ট্রেনগুলোতে সাধারণত টিকেট চেক না করা সত্ত্বেও সবাই টিকেট কেটে ওঠছে।
১৭, ২৫ ও ৪৮ ঘন্টার ট্রেন জার্নিসহ কোন পাবলিক প্লেসে একটি লোককে ধুমপান করতে দেখিনি। যা দেখেছি তা কোলকাতা ও কাশ্মিরে সীমিত হারে। তাও রাস্তার একপাশে একা দাড়িয়ে। তবে এক প্রকারের তামাক হাতের তালুতে পিষে ঠোটের নীচে দিতে অনেককেই দেখেছি।

মোড়ে মোড়ে বার থাকলেও শপিংমল থেকে শুরু করে স্টেশন সর্বত্রই মাধক দ্রব্য নিয়ে যাতায়াতকে কঠোর ভাবে দমন করা হয়।

এ বছরের প্রথম দিকেই নরেন্দ্র মোদি পরিস্কার মাতৃভূমি গড়ার জন্য দেশ বাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। আমাদের টিমের সবারই মনে হল সে জন্যই হয়ত কোথাও কোন রাজনৈতিক পোস্টার চোখে পড়ছে না। তবে আমি তাদের মতের সাথে বাধ সাদি। এর আগেও এসব জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তখনও তেমন কোন রাজনৈতিক পোস্টার দেখিনি। দু’একটা যা দেখলাম তা উল্লেখ করার মত নয়। এখানেই ভারতীয়দের একটি বড় রাজনৈতিক উন্নতি দেখতে পেলাম।

আমাদের দেশের রাজনীতি এখন পোস্টার সর্বস্ব রাজনীতি। এক একটি রাজনৈতিক দলের ডজন কুড়ি অঙ্গ সংগঠন। আর একই ব্যক্তির পদ শতেকের ঘরে। পোস্টারে এমন জনবাহুল্যতা লক্ষ্যনীয় যে, যিনি পোস্টার ছাঁপালেন তার সৌজন্যের স্থলে সৌ: লিখে ক্ষান্ত দিতে হয়।

রাজনৈতিক পোস্টার উন্নতির ফলে পাড়া-মহল্লা, শহর-নগর সর্বত্র বিরাজ করছে বিভিন্ন সমিতিসহ ব্যবসায়ীক পোস্টার। নগর বাসীর বাড়ির দেয়ালে আস্তর বা রং করার প্রয়োজন হচ্ছে না। পোস্টারময় শহর, চমৎকার ডাস্টবিন!

তবে এসব স্থানগুলোতে কু-সংস্কারের বেশ সয়লাভ দেখতে পেলাম। বিশেষ করে লোকাল ট্রেনগুলোতে বিভিন্ন যাদু- টোনা, বশিকরণ, ব্যবসায়ীক সাফল্যতাদান ইত্যাদি ঝার-ফুঁক, দেব- দেবির তাবিজের মাধ্যমে করা হয় বলে অসংখ্য পোস্টারের উল্লেখ রয়েছে। আমাদের দেশের সাপের তাবিজ বিক্রেতাদের মত এসব পোস্টারেরও উল্লেখ রয়েছে কামরুক কামাক্ষা থেকে সিদ্দি লাভ করে আসা ওমুক সাধু এসব করে থাকেন।

তাদের আন্ডা (ডিম) ব্যবস্থার কথা না বললেই নয়। ভাতের সাথে ডিম খাবেতো দু’টো খাবে। কোথাও একটি আন্ডা পেলুম না।

জাবি// এসএম, ২৩ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এইচকে