[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ছেলেবেলার ঈদ সেলামী


প্রকাশিত: July 24, 2015 , 6:16 pm | বিভাগ: আপডেট,চট্টগ্রামের ক্যাম্পাস,পাবলিক ইউনিভার্সিটি,ফিচার


শামসুজ্জোহা বিপ্লব চবি: ঈদ। আনন্দের। বিলাসের। হাসি আর খুশির। নতুন জামার। নতুন আয়োজনের। অপর দিকে কারো জীবনে বেদনার। বিষাদের। কষ্টের। দু:খ আর হতাশার। ওই ঈদ কে কখন, কিভাবে, কোথায়, কোন পরিবেশে কাটায় তাই হলো আজকের বিবেচ্য বিষয়।

আমার জীবনের ছোটবেলার নানা কাহিনী নিয়েই সাজানো হলো গল্পটি। আব্বা দূরে চাকুরী করার কারণে, ঈদ আসলেই আমাদের পরিবারের সবাই মিলে দাদার বাড়িতে চলে যেতাম, ঈদ পালন করার জন্য । তখন দাদার বাড়িতে যাওয়াটাই ছিল একটা মজার বিষয়।

eid-mobarokদাদার নাতি ছিল, প্রায় সাত জন। দাদা অন্য নাতিদের চেয়ে আমাকে কেন জানি, অনেক বেশি ভালবাসতেন। ঈদের দিন ভোরে দাদা আমাদের গোসল করার জন্য ডেকে তুলতেন। শীতকালের ঠান্ডার মধ্যে উঠতে চাইতাম না। কিন্তু দাদা ছিল নাছোড়বান্দা। আমাদের জোড়করেই ডেকে তুলতেন। আমার বড় চাচার পাম্প মেশিন ছিল। ঈদের দিন সকালে তিনি পানি তোলার জন্য চালু করে দিতেন। গ্রামের প্রায় সবাই সকালে গোসল করার জন্য আসতো। দাদা এবং আমরা মিলে সবাই সেখানে গোসল করতাম।

ঈদের দিন নতুন পোশাক পরে দাদার কাছে যেতাম, আতর সুরমা মাখার জন্য।চাচাত ভাইদের সাথে রীতিমত প্রতিযোগিতা লেগে যেত। কে আগে দেবে, কে পরে দেবে, কার বেশি হল, কার কম হল এটা নিয়ে। দাদা, নাতিদের সবাইকে এক এক করে ডেকে ডেকে আতর সুরমা লাগিয়ে দিতেন।

তারপর চলে যেতাম ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। দাদারবাড়ির আঙিনায় নামাজ পড়ার জন্য ব্যবস্থা করা হত। গ্রামের প্রায় সবাই একসাথে ফজরের নামাজ আদায় করতাম। নামাজ পড়া শেষে, শুরু হত মিষ্টি  বিতরণ। যার যে রকম সামর্থ ছিল সবাই সবাইকে সেমাই, পায়েশ, মুড়ি খাওয়াতেন।

আমার চাচা ছিলেন পাঁচজন। ঈদগাহ’র মাঠে যাওয়ার আগে, ঈদের সেলামী নিয়ে শুরু হত মহা আয়োজন। আমরা চাচাত ভাইরা এক এক করে চাচাদের কাছে যেতাম, ঈদের সেলামি নেয়ার জন্য। আমরা সবার আগে যেতাম বড় চাচার কাছে। তিনি অনেক টাকা পয়সার মালিক ছিলেন। আমরা একসাথে তার কাছে গেলে, তিনি বুঝতে পারতেন। এরা সব ঈদের সেলামীর জন্য আসছে। তিনি হাসতে হাসতে বলতেন, সেলামী নিতে আসছো, সালাম করা ছাড়া তোমাদের সেলামী দেয়া হবে না। ভাগো, তোমরা এখান থেকে।

কিন্তু আমরা চাচাত ভাইরা ছিলাম বিচ্ছু বাহিনী। সেলামী ছাড়া কাউকে ছাড়াছাড়ি নাই। আসলে আমাদের কারোরই হাত দিয়ে সালাম করার অভ্যাস ছিল না। সবাই কেমন জানি লজ্জা পেতাম। কিন্তু আমাদের যন্ত্রণায় চাচা একসময় আমাদের সেলামি দিয়ে দিতেন। যে, যে কয়টাকা সেলামি চাইতো, তাকে সে কয় টাকাই সেলামি দিতেন। তবে সেলামি শুরু পাঁচ টাকা থেকে, আমি সবার বড় ছিলাম বলে, আমার সেলামি ছিল বিশ টাকা।

এরপর যেতাম মেজ চাচার কাছে। তিনি ছিলেন অনেক মজার মানুষ। তিনি আমাদের বিচ্ছু বাহিনীকে দেখলেই দৌড় দিতেন। আর বলতেন আইলো রে বিচ্ছু বাহিনী। কিন্তু আমরা তাকে ধরে ফেলতাম। তারপর সবাই মিলে সেলামি নিতাম।

আমাদের ছোট চাচা ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তিনি সরকারি চাকরি করতেন। তার সাথে আমরা কেউ তেমন কথার বলার সাহস পেতাম না। একটু সবাই ভয়ই পেতাম। আমাদের বিচ্ছু বাহিনীর দল তার কাছে গিয়ে চুপ করে থাকতাম। তিনি আমাদের দেখে মিটিমিটি হাসতেন। একসময় বলতেন তোমরা কি সবাই সেলামির জন্য আসছো, নাকি। আমরা তখন সমস্বরে বলে উঠতাম।

হ্যাঁ….সেলামির জন্য আসছি। তিনি সবাইকে ভালই সেলামি দিতেন। এভাবে সবার কাছে সেলামি নিয়ে দাদার সাথে চলে যেতাম ঈদগাহ’র মাঠে।

আমরা ঈদের নামাজ পড়তাম বাজারের বিশাল স্কুল মাঠে। নামাজ পড়ে, মনোযোগ দিয়ে অনেক্ষণ খুৎবা শুনতাম। কিন্তু ঈমামের কথা তখন তেমন বুঝতাম না। তারপর শুরু হত বিশাল মোনাজাত। মোনাজাত শেষকরে দাদা আমাদের বাজারের হোটেলে নিয়ে যেতেন। যার যা মন চাইতো তাই খেয়ে দাদার সাথে চলে আসতাম বাড়িতে।

বাড়িতে এসে শুরু হত এক এক করে চাচীদের কাছে খাবারের বাহানা। কে কি রান্না করেছে, সবার বাসায় একটু একটু করে খেতাম। আমাকে চাচীরা অনেক বেশি আদর করত বলে, আমাকে সবার বাসায় খাইতে হত।

দুপুরের দিকে শুরু হত বিটিভি দেখার আয়োজন। সাতদিন ব্যাপী টিভিতে ঈদ আয়োজন থাকতো। আমরা সবাই বসে যেতাম ঈদের বিশেষ বাংলা সিনেমা দেখতে। তখন টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখা কতটা মজার ছিল, এটা বলে বোঝনো সম্ভব নয়। সন্ধ্যার দিকে টিভিতে শুরু হত বিশেষ শিক্ষামূলক কার্টুন ‘মন্টু মিয়ার অভিযান’। আমার মনেপড়ে এই কার্টুন দেখে আমি অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

ছোটবেলার ঈদগুলো আমাদের এভাবেই কেটে যেত। অনেক দুষ্টামি আর হাসি তামাশায়।

আজ দাদা আর জীবিত নাই। পারবারিক বন্ধনটাও আগের মত নাই। আমরাও এখন বড় হয়ে গেছি। এখন আর আয়োজন করে তেমন দাদাবাড়িতে যাওয়া হয় না। সবাই কেমন জানি আত্মকেন্দ্রিক আর ব্যস্ত হয়ে গেছে। আমরা নিজেরাও ব্যস্ত হয়ে গেছি।

প্রতিবছর ঈদ আসলে শুধু মনেপড়ে ছোটবেলার ঈদের কথা। কত সুন্দর আর মজার ছিল ঈদের দিনগুলি। কোথায় হারিয়ে গেল, আমার ছেলেবেলার ঈদ।

আমি কি এই বড়বেলা চেয়েছিলাম?

আজ ঈদের দিন। বাড়ি থেকে অনেকদূরে ক্যাম্পাসে ঈদ করতে হয়। এটাই মনেহয় জীবনের বাস্তবতা।
আজকের দিনে ছোটবড় সবাইকে ঈদের অনেক অনেক শুভেছা রইলো।

ঈদ মোবারক……!

ঢাকা// ২৪ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এইচএস