[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



হিজড়াদের জন্ম রহস্য


প্রকাশিত: July 30, 2015 , 10:41 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট,রিসার্চ


gaffarড. আব্দুল গাফফার মিয়া: ‘হিজড়া’ শব্দটির ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো হার্মাফ্রোডাইট (Hermaphrodite), যার আভিধানিক অর্থ উভয় লিঙ্গ Common Gender), ইংরেজীতে একে ট্রান্সজেন্ডার (Transgender) বলে। হেলেনিস্টিক যুগের গ্রিক পুরাণের দুটি চরিত্র হার্মেস এবং আফ্রোদিতি থেকে হার্মাফ্রোডাইট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

গ্রিক পুরাণে বর্ণিত আছে, একদা হার্মেস ও আফ্রোদিতি দম্পত্তির সুদর্শন পুত্র হার্মাফ্রোদিতাসের প্রেমে পড়ে যায় ঝরনার উপদেবী। সেই উপদেবী দেবতার কাছে প্রার্থনা করে সে যেন চিরতরে হার্মাফ্রোদিতাসের সঙ্গে একীভূত হতে পারে। অবশেষে দেবতা তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলে সে দু’জনের সংমিশ্রনে একজন অর্ধ-পুরুষ ও অর্ধ-নারী স্বত্তাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

হিজড়া সন্তান জন্ম হওয়ার কারন হিসেবে আধুনিক জেনেটিক্স বা চিকিৎসাবিজ্ঞান কি বলে? জেনেটিক্স বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে হিজড়া হলো সেক্র ক্রোমোজোমের ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাস Chromosomal aberration) বা জিন জনিত জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধি ব্যাক্তি যাদের জন্ম পরবর্তী সঠিক লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়।

আমরা জানি সৃষ্টির ধারা রক্ষার্থে প্রাকৃতিক নিয়মেই সুস্থ ও প্রাপ্ত বয়স্ক একজন পুরুষের শুক্রাশয়ে (অন্ডকোষ) প্রতিনিয়তই শুক্রাণু তৈরি হয় এবং একজন মহিলার ডিম্বাশয় থেকে সাধারণত প্রতি আটাশ দিন অন্তর অন্তর একটা করে ডিম্বাণু তৈরি হয়। ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম (2n) বিশিষ্ট আদি জনন কোষ থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে মাইটোসিস ও মিয়োসিম কোষ বিভাজনের মাধ্যমে স্পার্মাটোজেনেসিস এবং ওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোজোম (n) বিশিষ্ট শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু তৈরি হয়।

সাধারনত ডিম্বাণু একধরনের সেক্র ক্রোমোজোম (X) বিশিষ্ট হলেও শুক্রাণু দু’ধরণের হতে পারে, হয়তো X, নয়তো Y সেক্র ক্রোমোজোম বিশিষ্ট; যখন x ক্রোমোজোম বিশিষ্ট শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু (X) নিষিক্ত হয়ে ঢঢ ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট তৈরি হয়, তখন সেই জাইগোট থেকে কন্যা শিশুর জন্ম হয়। পক্ষান্তরে y ক্রোমোজোম বিশিষ্ট শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু (x) নিষিক্ত হয়ে যে জাইগোট (xy ক্রোমোজোম বিশিষ্ট) তৈরি হয় তা থেকে ছেলে শিশুর জন্ম হয়।

কিন্তু xx ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রণের কণ্যা শিশুতে পরিণত হওয়া যতটা স্বাভাবিক, xy ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রণের ছেলে শিশুতে পরিণত হওয়া ততটা স্বাভাবিক নয়। হয়তোবা, এ কারণেই পৃথিবীতে মেয়েদের চেয়ে পুরুষদের সংখ্যা কম। কেননা, xy ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রণটি কণ্যা ভ্রণ হিসেবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত y ক্রোমোজোমের SRY (Sex determining region of Y chromosome) জিন সক্রিয় না হয়ে উঠে।

প্রায় চার সপ্তাহ পর এম্ব্রায়োনিক গোনাডের মেডুলা হতে অন্ডকোষ তৈরিতে SRY wRb TDF (Testis determining factor) কে নির্দেশ প্রদান করে। এ অন্ডকোষ টেষ্টোষ্টেরন এবং এন্টি মোলারিয়ান ডাক্ট হরমোন নি:সরণের মাধ্যমে ভ্রণটিকে পরিপূর্ণ ছেলে শিশুতে পরিণত করে। কিন্তু, SRY জিনের অনুপস্থিতি বা নিস্ক্রিয়তায় এম্ব্রায়োনিক গোনাডের মেডুলা অন্ডকোষে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে কর্টেক্স ডিম্বাশয়ে পরিণত হয়। আর এ ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন হরমোন উৎপাদন করে যা মেয়েলি বৈশিষ্ট প্রকাশে অন্যতম ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও বিপত্তি ঘটে ঠিক তখনই, যখন ওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক মিয়োসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সেক্র ক্রোমোজোমের অবিচ্ছেদ্যতার (Nondisjunction) ফলে অসম বিন্যাস বিশিষ্ট অস্বাভাবিক ডিম্বাণু (“xx” অথবা ” X0″) তৈরি হয়। আর এসব অস্বাভাবিক ডিম্বাণু স্বাভাবিক শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলেও সেক্র ক্রোমোজোমের বিভিন্ন অস্বাভাবিক বিন্যাস বিশিষ্ট জাইগোট (xxy, xxx বা x0) তৈরি হতে পারে (চিত্র দেখুন)।

sex

এসব অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম বিন্যাসের প্রভাবে ছেলে শিশুর দেহে পরিপূর্ণ অন্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর দেহে ডিম্বকোষ তৈরি হয় না বা অসমম্পূর্ণ অন্ডকোষ বা ডিম্বকোষ বা দুটোই তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে এসব শিশুরা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তখন তাদের দেহে পর্যাপ্ত সেক্র হরমোন (টেস্টোস্টেরন বা ইস্ট্রোজেন) নি:সরণ হয় না। আর তারাই বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ নিয়ে আমাদের সমাজে অভিশপ্ত হিজড়া নামে পরিচিতি পায়।

প্রতি ২০০০ জনের মধ্যে xxy ক্রোমোজোম বিন্যাস বিশিষ্ট একজন ছেলে শিশু জন্ম হতে পারে, যাদের পুরুষ জননাঙ্গ থাকলেও শুক্রাণু তৈরি হয় না। কারোর কারোর ক্ষেত্রে স্তন যুগল বড় হতে পারে। তাদের ভালভাবে দাড়ি গোঁফ গজায় না, মেয়েলি আচরণ করতেই তারা বেশী পছন্দ করে।

তবে তারা স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এবং অপেক্ষাকৃত লম্বা আকৃতির হয়ে থাকে। জেনেটিক্সের বা চিকিৎসা শাস্ত্রে এ ধরনের সমস্যা Klinefelter’s syndrome নামে পরিচিত। অপরদিকে প্রতি ১৫০০ জন শিশুর মধ্যে xxx ক্রোমোজোম বিন্যাস বিশিষ্ট একজন কন্যা শিশু জন্ম হতে পারে।

এ ধরনের কন্যা শিশুরা লম্বা ও হালকা গড়নের হয় এবং এরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরেও ডিম্বাণু তৈরি করতে পারে না। এ ধরনের অস্বাভাবিকতাকে Triple X syndrome বলে। আর x0 ক্রোমোজোম বিন্যাস বিশিষ্ট কন্যা শিশুরা দেখতে খাটো গড়নের হয়।

পরিপূর্ণ জননাঙ্গ তৈরি হয় না। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য Turner syndrome নামে পরিচিত। এদের জন্মের সম্ভাবনাও প্রতি ১৫০০ জনে একজন। ত্রিশোর্ধ মহিলাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ ধরনের সমস্যা জনিত শিশুর জন্ম হার বেশি হয়ে থাকে।

দুঃখের বিষয় এসব শিশুরা সমাজের কুসংস্কারাপূর্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে বাবা-মায়ের ভালবাসায় বড় হতে পারেনা। তার আগেই আপনজনদের অবহেলা, অবজ্ঞাসহ ক্রমাগত পাল্টে যাওয়া আচরণ মায়ের ভালবাসার আঁচল ছিড়ে, রক্তের বন্ধন ছিন্ন করে পরিবারের মায়াঝাল থেকে চিরদিনের জন্য বের করে দেয়। ফিরে আসার সব পথ বন্ধ করে দেয় চিরতরে।

প্রিয় পাঠক একবার ভাবুনতো বিষয়টি কতটা মর্মপীড়াদায়ক; আমাদের জীবনে বা পরিবারেওতো এমনটি হতে পারত বা পারে, তাই না ? তবে কেন এত অবহেলা আর অবজ্ঞা? তবে কি জন্মই তাদের আজন্মের পাপ? অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের বেলায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে নয় কেন? তারাও তো একধরনের প্রতিবন্ধী।

সরকারিভাবে গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্প কারখানা তৈরি করে কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করলে তারা হয়তো সমাজের বোঝা না হয়ে আর্শীবাদ হত। তাদেরওতো দু’মুঠো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। প্রয়োজনীয় খাওয়া-পড়া, কর্ম না পেয়েই আজ তারা নিযন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

ড. আব্দুল গাফফার মিয়া
পোস্টডক্টোরাল রিসার্চ ফেলো
ল্যাবরেটরি অব এনিমেল রিপ্রোডাকশন
সিডনি ইউনিভার্সিটি

 

ঢাকা// ৩০ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// জেআর