[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



মহানায়কের বিদায়


প্রকাশিত: August 15, 2015 , 1:05 pm | বিভাগ: ফিচার


মোশারফ রিমন: সময় তখন দুপুর আড়াইটা। সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার ও সাধারণ সৈন্য হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে নামলেন টুঙ্গিপাড়ায়।

খবর পেয়ে ততক্ষণে গোপালগঞ্জের এসডিও একদল পুলিশ নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় চলে এসেছেন। চলে এসেছে আশেপাশের গ্রামের জনতাও। হেলিকপ্টার থেকে কফিনে ঢাকা লাশ নামানো হল টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে।

ডাকা হল পেশ ইমাম মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমকে। সেনাবাহিনীর অফিসাররা মৌলভিকে বললেন কফিনসহ লাশ কবরে নামিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হোক। মৌলভী সাহেব এবং আশেপাশে উপস্থিত জনতা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, এটা হতে পারে না। এটা ইসলামসম্মত নয়।

সেনাবাহিনীর অফিসাররা এইবার বলল, ‘তাহলে লাশ কফিন থেকে বের করে সঙ্গে সঙ্গে কবর দিতে হবে। কিন্তু গ্রামের লোকেরা দাবি জানালেন, তারা লাশ দেখবেন।

সেনাবাহিনীর অফিসাররা এইবার জনতার কাছে অনেকটা আবদারের সুরেই বললেন, লাশ না দেখে মাটি দেওয়া যায় না?

এইবারও এগিয়ে গিয়ে উত্তর দিলেন মৌলভি হালিম সাহেব। তিনি সেনা অফিসারদের আবাদারের জবাবে বললেন, হ্যাঁ, দেয়া যায়। তবে অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে যে শেখ মুজিব একজন শহীদ।

বলতেই হবে মৌলভি সাহেব অসীম সাহসী। সেনা অফিসারদের রুদ্রমূর্তির সামনে দাড়িয়েও তিনি একের পর এক ডিফেন্স করে যাচ্ছিলেন, যেখানে মুজিবের অনেক সহকর্মীই ততক্ষণে মোস্তাকের পদলেহনকারী চামচা!

উর্দিপরা অফিসাররা মৌলভির ডিফেন্সের জবাবে কী বলবের ভেবে পাচ্ছিলেন না। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে মৌলভি সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, আপনাদের কি এই লাশ দাফন-কাফন করাতেই হবে?

মৌলভি সাহেবের দৃঢ় জবাব, দাফন-কাফন ছাড়া চলবেই না।

সব সেনাঅফিসার চুপ হয়ে গেলেন। তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছিল লাশ যেন কোনোভাবেই কেউ দেখতে না পারে। কিন্তু ততক্ষণে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ এসে হাজির হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন যে, লাশ ইসলাম ধর্মমতে দাফন না করলে মানুষজন কিছু একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে বসবে।

কিছু সময় নিয়ে আবারো আলোচনা করে সেনাঅফিসাররা সিদ্ধান্ত দিল, ঠিক আছে। লাশ কাফন-দাফন করা হোক। কিন্তু সবকিছু আমাদের সামনেই হতে হবে।

কফিন খোলা হলো। দেখা গেল, বঙ্গবন্ধুর শরীর গুলিতে একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। কফিন পুরোটাই রক্তে রঞ্জিত। আগত জনতা তার লাশের চারদিকে সমবেত। কেউবা লাশ দেখে হতবাক। কেউবা নীরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু, কেউবা উচ্চস্বরে রোরুদ্যমান।

অবস্থা বুঝে সৈন্য ও পুলিশরা লাশের চারদিকে কর্ডন করে দাঁড়ালো। কিন্তু জনতার চাপ যেভাবে বাড়তে শুরু করেছিল তাতে যে কোনো মুহূর্তে কর্ডন ভেঙ্গে যেতে পারে।

অফিসাররা ভীত স্বন্ত্রস্থ হয়ে চিৎকার-চেঁচামেছি শুরু করল, দেরি হচ্ছে কেন? শিগগিরই কাজ সম্পন্ন করুন। আর মাত্র ৫ মিনিট সময় দেওয়া হলো।

মুজিবের লাশ নিয়ে রাখা হলো তার প্রিয় টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির বারান্দায়। পুরো শরীরে ২৯টি গুলির চিহ্ন। অটোম্যাটিক রিভলবারের একেকটি গুলি একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবির পকেটে পাওয়া গেল তাঁর প্রিয় পাইপ ও চশমা। চশমাটি ভেঙ্গে গেছে।

মুজিবের বাড়ির আশপাশের সব দোকানপাট বন্ধ। একজন অনেক কষ্ট করে খুঁজে একটি কাপড় কাঁচা সাবান নিয়ে আসল। একজন রাষ্ট্রনায়ককে শেষ বারের মত গোসল দেবার জন্য পানি গরম করার সময়টুকুও পাওয়া গেল না। ঠাণ্ডা পানিতেই গোসল দেওয়া শুরু হলো।

কিন্তু রক্ত পরিষ্কার না হতেই অফিসারদের আবার হাকডাক শুরু হয়ে গেল, আর কত দেরি করবেন আপনারা!

মুজিবের আম্মা সায়েরা খাতুনের নামে নির্মিত গ্রামের হাসপাতাল থেকে শাড়ি নিয়ে এসে তার লাল পাড় ছাড়িয়ে মুজিবের লাশকে কাপড়ে জড়ানো হলো। কিন্তু লাশে ঠিকভাবে কাফনের বাধনগুলো দিতেও সময় দেওয়ার জন্য আর রাজি ছিলেন না সেনা অফিসাররা।

ওই অবস্থাতেই লাশ কবরের কাছে নিয়ে আসা হলো। জানাজা হবে এইবার। কিন্তু এইখানেও সেনা অফিসারদের ঘোর আপত্তি! তাদের কথা হলো জানাজার কী দরকার!

কিন্তু মৌলভী হালিম সাহেবের দৃঢ় অবস্থান, জানাজা অবশ্যই পড়াতে হবে।

অবশেষে জানাজার সম্মতি মিলল। উপস্থিত পুলিশরাও জানাজায় শরিক হতে চাইলেন, তারা অজু করার সময় চাইলেন। কিন্তু সেনা অফিসাররা তাদেরকে আর সেই সময় দিতে সম্মত ছিলেন না।

অবশেষে জানাজা সম্পন্ন হলো। ইতিহাসের এই সূর্যসন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

শান্তিতে ঘুমাও, হে স্বাধীনতার মহানায়ক!

(Who Killed Mujib – এর লেখক এ এল খতিবের লেখা অবলম্বনে)

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা

ঢাকা, ১৫ আগস্ট//(ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম)//আরকে