[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



মায়া


প্রকাশিত: October 26, 2015 , 10:40 pm | বিভাগ: রাইম, স্টোরি এন্ড জোকস


mayaলামিয়া মহসিন: জীবনটা বড্ড বেশী সরল তূর্যর। এই রুটিনমাফিক, পানসে জীবন থেকে ‘রোমাঞ্চকর’ শব্দটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বহু আগেই। মফঃস্বলের ছোট্ট শহরকে  আঁকড়ে  ধরে বেড়ে উঠেছে যার  শৈশব, কৈশোর আর বয়ঃসন্ধিকাল, তার জীবনটা নিদারুণ সাদামাটা, উদ্যমহীন হবে তাই তো স্বাভাবিক । শহরের চাকচিক্য আর মোহনীয় দ্যুতি তার ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল সবসময়, তাই তো সেই মায়ানগরীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে তূর্য প্রায়শই। এই অনুন্নত, শ্রীহীন শহর তাকে কখনই টানে নি সত্যি কথা বলতে। আধো গ্রাম, আধো শহরের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ , যাকে বলে জগাখিচুড়ী । বিদ্যুৎ সংযোগ, নেটওয়ার্ক টাওয়ার, টেলিভিশন, রেডিও আরও যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তি আর আসবাবপত্রের ব্যাপকতা বিরাজমান আজ প্রায় বছর সাতেক যাবত । আগে যেখানে কৃষিখাতই ছিল  বেশীরভাগ মানুষের প্রধান পেশা, সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে শিল্প-কারখানা, ফ্যাক্টরি, দালানকোঠা।

সাপ্তাহিক হাটবাজারের চল এখনও বজায় থাকলেও , সদ্য  গড়ে ওঠা বড় বড় দোকানপাটে ভিড় হয় বইকি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে কিনা। মাটির ঘর আর টিনের ছাউনি ছাপিয়ে তৈরি হয়েছে ইমারত, ইট-কাঠের খাঁচা । চুন-সুরকি আর সিমেন্ট বাঁধানো পাকা রাস্তাঘাট দিয়ে দিব্যি চলাচল করছে মানুষ । মোড়ের চায়ের দোকানে এখন চলতি হিন্দি গান তারস্বরে বাজে,  ছুটির দিনে রূপালী পর্দার দৃশ্য হা করে গেলে শিশুকিশোর , এমনকি বয়োবৃদ্ধরাও । শহরে তথাকথিত আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, এ কথা অনস্বীকার্য । কিন্তু সবকিছু থেকেও কি যেন নেই। বর্ষাকালে ভাঙ্গারাস্তার হাঁটুজল আর থিকথিকে কাদা পাড়ি দিয়ে স্কুলকলেজে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, ঝড়ে বৈদ্যুতিক তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় হারিকেনের টিমটিম আলোয় পড়ালেখা আর আশেপাশের মানুষজনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যানধারণা , অজ্ঞানতাই বলে দেয়, আধুনিকতার মুখোশ আঁটলেই অন্তঃসার আমূল বদলে যায় না। অতি প্রাচীন সমাজব্যাবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলা সহজ নয়, হয়ত কোন একদিন সত্যিকার অর্থেই ‘মডার্ন’ হবে তার শহর।

কিন্তু তার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে কি ? মায়ানগরীর সম্মোহনী হাতছানিকে আর কত উপেক্ষা করবে সে ? কাকডাকা ভোরে আঁখিপল্লবে লেগে থাকা সেই স্বপ্নগুলো  যে তাকে নেশাগ্রস্তের মত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়,  আকাশ ছোঁয়ার অদম্য স্পৃহা যেন বশীকরণ বাণে বেঁধে ফেলেছে তাকে । তারকাখচিত রাতে উঠোনে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে একেক সময় তন্দ্রাছন্ন হয়ে যায় তুর্য । মশার বিনবিনুনি আর ঝি ঝি পোকার ডাক  ছাপিয়ে এক বিচিত্র কোলাহল শুনতে পায় সে । গভীর রাতের গাঢ় নৈঃশব্দে মস্তিষ্কের অসংখ্য ছাড়াছাড়া ভাবনারা হানা দেয়, অযাচিত শোরগোল তোলে । এতালবেতাল কত অজস্র চিন্তার হল্লায় চোখ বুজে আসে একসময় । ফিসফিস করে, অজ্ঞাতসারে বলে ওঠে তুর্য,

উপরে উঠতে হবে আমায়, আরও অনেক উপরে…।

কয়েকদিন এর বৃষ্টিতেই কেমন শ্যাওলা পড়ে গেছে উঠানে ।  মাটিতে সবুজ ছোপ ছোপ জায়গাগুলো সাবধানে ডিঙ্গিয়ে ঘরের দাওয়ায় এশে উঠল তূর্য । পাশেই রান্নাঘরে  তৈজসপাতি নাড়াচাড়ার টুং টাং ভেসে আসছে। কলসি হাতে বের হল মা, লঘু পায়ে হেঁটে যাচ্ছে কলতলার দিকে। হড়াস হড়াস পানি পড়ার শব্দ ছাপিয়ে মায়ের গলা,

‘গরুটাকে বেঁধে আসছিস ঠিক মত ?’

‘হু । খরগাদা বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে । ঘাস-বিচালি ছিল গোয়াল ঘরে । ওইটাই খেতে দিয়ে আসলাম।’

‘একবার শুরু হলে থামার নাম নাই,’ বিরক্তির ঝাঁজে বলল মা।

‘বৃষ্টিবাদলের দিন, সাবধানে হাঁটা চলা করিস । সবজায়গা পিচ্ছিল হয়ে আছে ।,’ বলেই রান্নাঘরে সেঁধিয়ে গেল। বেলা পড়ে আসছে।  দ্বিপ্রহরের এ সময় বাবা ভাত খেতে আসে বলে, মায়ের বেশ তাড়াহুড়ো ।

সারাজীবন অন্তঃপুরিকাই রয়ে গেল মা। ছোটকাল থেকে এই মাকে কত ঝড়ঝাপটা, ঝঞ্ঝাট, এর সাথে লড়াই করে আসতে দেখছে সে । সহজ-সরল বাবাকে ঠকিয়ে যখন নিজের জ্ঞাতি ভাইয়েরা জমিদখলের মতলব ফাঁদছিল, মাই তো  কত লাঠালাঠি, বিবাদ করে বাবার অধিকার ঠিকই আদায় করে নিল। আইনি জটিলতা, কথার মারপ্যাঁচ , চাচাদের হুমকি –কিছুই টলাতে পারেনি মাকে। রক্ত-জল পরিশ্রম করে, তিল তিল গড়ে ওঠা মায়ের এ সংসারে বাবা যেন চিরকালই অনভ্যাগত ।  কাপড়ের  ব্যবসা থেকে কতই বা আয় তাও, মাস শেষে সেই মুনাফাটুকু মায়ের হাতে তুলে দিয়ে   যথাসম্ভব নিজের দায়দায়িত্ব পালন করে বাবা। খামখেয়ালি , সোজাসাপটা বাবা  মায়ের সামনে সবসময়ই কেমন যেন কুঁকড়ে থাকে।  বাড়ির কর্তা হয়েও কখনও সেভাবে জোর খাটাতে, কতৃত্ব ফলাতে পারেনি, হয়ত সেজন্যই । ম্যাট্রিক পাশ মার লেখাপড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বিয়ের পর, আর আট দশটা নারীর মতই সংসার, ঘরবার, সন্তান লালনপালনের সেই চিরায়ত ছকে আটকা পরে গেল মা। সমাজ, বস্তাপচা সংস্কারের যাঁতায় পিষ্ট  হয়ে গেল মায়ের স্বপ্নগুলোও । এইজন্যই কি অপরাধবোধে ভোগে বাবা? নাকি সংসারটা কখনোই সচ্ছলতার মুখ দেখল না বলে স্রেফ নিজের অক্ষমতার মাশুল গুনছে ?

জাগতিক সব বিষয়ে মার দক্ষতা অসীম । নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা না হলেও,  ঠিক  অবস্থাপন্নও নয় তারা। অন্যান্য গেরস্থালীর মত নিজের ছোটোখাটো স্বাদ-আহ্লাদ, শখ পূরণ করার মত বিলাসিতা ভাগ্যে ছিল না বলেই কি চোরা কাঁটা বিঁধে আছে মায়ের মনে? নাইলে কেন এমন কঠিনমুখী হয়ে থাকে মা ?  কেন সুযোগ পেলেই অপমানের সাঁড়াশি তাগ করে দুর্বল বাবার দিকে ?

এইসব চিন্তাভাবনা আজকাল প্রাইয়শই হানা দেয় তার মনে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরে আসল সে । খাটের এক কোণে দলাপাকানো সার্ট-প্যান্ট গুছিয়ে আলনায় রাখল।  এলোমেলো করে ছড়ানো ছিটানো বইগুলো গুছিয়ে টেবিলের তাকে সাজাল । অগোছালো ঘর দেখলে মা রাগ করে। এমন সময় আলটপকা সাঁই করে ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল তমা। পরনের লাল ফ্রক কাদায় মাখামাখি, ক্লেদ্ মাখা হাতে চুপসে যাওয়া ফুটবল । চোখমুখ ঝকঝক করছে ।

‘কি দস্যিপনা করে এলি আজকে ?’ কপট রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল বোনকে ।

মিটিমিটি হেসে অকপট স্বীকারোক্তি তার , “ ওদের হারিয়ে দিলাম দাদা। আমাকে বলে কিনা, মেয়েরা ফুটবল খেলতে পারে না । মু খে চুনকালি মেখে তিন তিনটা গোল দিয়ে এলাম।“

ভ্রূকুটি হানতে গিয়েও হেসে দিল তূর্য ।কথার কি ঢঙ ! দেশোদ্ধার করে আসলো যেন।

‘যা হাতমুখ ধুয়ে,  জলদি কাপড় বদলে আয়। মা তোকে দেখলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে আবার।’

‘কিইইই , কি মূর্তি ?,’ কোমরে হাত দিয়ে মুখ কুঁচকে প্রশ্নবাণ ছুড়ল দাদার দিকে।

‘কিছু না , যা নইলে এখনি মাকে ডাক দিয়ে তোর বারোটা বাজাচ্ছি ।’,

‘চলন্তিকা ডিকশনারি থামো এবার, যাচ্ছি।’ ভেংচি কেটে দৌড়ে পালাল বিদ্যুৎ গতিতে।

মুচকি হাসল তূর্য । ভারী ইঁচড়ে পাকা হয়েছে তো !

‘তূর্য অ্যাই তূর্য, কোথায় তুই?’ হঠাৎ করে মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল উঠোন থেকে।

তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে চৌকাঠে ধাক্কা খেল,

‘কি হল মা?’

‘তোর মামা টেলিফোন করেছিল মাত্র, রেজাল্ট আউট হয়েছে একটু আগেই। তুই টিকে গেছিস পরীক্ষায় !, এক নিঃশ্বাসশে, রুদ্ধরাসে বলল মা ।

মায়ের উজ্জ্বল মুখশ্রীর কিছুক্ষণ বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইল সে, বিস্ময়ে তার বাকরোধ হয়ে গেল।  সে স্বপ্ন দেখছে না তো ?

মা এসে জড়িয়ে ধরতে সৎবিত ফিরল তার।

‘আমি জানতাম তুই পারবি,’ তাকে আঁকরে ধরেই মা বলে চললেন । ‘আমার মানিক রে , তুই কি দিয়েছিস আমাকে তোকে বলে বোঝাতে পারব না । ’, ডুকরে কেঁদে উঠল মা।

সব কিছু কেমন অবাস্তব লাগছিল তূর্যর । প্রার্থিত স্বপ্ন যখন বাস্তবের দিকে পা বাড়ায়, সেই অভিব্যাক্তি কি এরকমই হবার কথা ? চিনচিনে শুখানুভুতির সাথে একটু দুঃখও মিশে ছিল কি? খেয়াল করল না সে ।

সুদিন কি তাহলে চলেই এল ?…………

খুব সন্তর্পণে সিটের উপরে মালপত্র রাখার ফাঁকা জায়গাটায় ব্যাগটাকে বসাল তূর্য । মা হরেক রকমের খাবার দাবার দিয়ে বলেছেন,’ খেয়াল রাখবি কাত হয়ে পরে না যায় আবার। নাইলে কিন্তু নতুন ব্যাগটার দফারফা হবে ।’

টিকিটের সাথে সিট নাম্বার  আরেকবার মিলিয়ে নিল সে । বড্ড গুমোট ট্রেনের ভেতরটা । পাদানিতে পা দিয়ে এক লাফে স্টেশন এ নামলো ।

মা অদূরে দাড়িয়ে ছিল। উদ্বিগ্ন মুখে প্রশ্ন করল,

‘ কি রে ট্রেন ছাড়বে কখন ?’

‘এই তো আর দশ মিনিট ‘, মাকে আশ্বস্ত করতে গয়ে দেখল স্টেশন এর ভিতরে এক মুদি দোকান এর সামনে থেকে বাবা  হেঁটে আসছে । হাতে শুকনো খাবারের প্যাকেট।

‘ ওমা সে কি !’ আঁতকে উঠল সে , ‘মা এতকিছু রান্না করে দিল, আবার এগুলো কেন?‘

অল্প হেসে বাবা বলে উঠল ,’ ওটা ত তোর মায়ের দেয়া। তার অধিকার। এটা আমার পক্ষ থেকে। এত লম্বা সফরে ট্রেন এ খিদে লাগবে । খেয়ে নিস। ’ ।

বাবার হাসিটা বড্ড মলিন। কেন যে ?…

সহসাই হইচই, কোলাহল বেড়ে গেল। এতক্ষন যেসব যাত্রীরা মন্থর গতিতে স্টেশনে পায়চারি করছিল, উঠে পড়ার জন্য তোড়জোড় করতে লাগলো ।

মৃদুভাষী বাবা পিঠে হাত রেখে  তাগাদা দিলেন ,’ তোর ট্রেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দিবে বোধয় । উঠে পর এবার। ’

মার চোখের কোণ চিকচিক করছিল। বড় কষ্ট হচ্ছিল তূর্যর। উহু, সে কাঁদবে না। কিই বা পিছুটান তার ?

‘কোন অসুবিধা হলে মামাকে বলবি। আর পৌঁছে ফোন করে দিস একটা । ভাল মত খাওয়াদাওয়া করবি। আর শোন মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করিস কেমন ?’ মার গলা কেঁপে উঠল খানিকটা ।

শেষবারের মত মা-বাবার দিকে সোজাসুজি তাকাল তূর্য । বাবার আধময়লা, সার্ট , মার পাণ্ডুর মুখ ,আটপৌরে শাড়ির শতচ্ছিন্ন আঁচল । কেন এত বেশী চোখে পড়ছিল এসব ?

বিকেলের কড়করে রোদ পড়ে এসেছে খানিকটা। সূর্য লুকোচুরি খেলছে মেঘের ফাঁক দিয়ে। কখনো ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে পৃথিবী, কখনও বা পলকেই নিস্তরঙ্গ । আলোছায়ার এক অদ্ভুত বোঝাপড়া।

ট্রেন ছুটে চলেছে আপন গতিতে। উথাল-পাথাল বাতাস, শান্তির প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে চুলে ।

আর ছুটছে কিছু স্মৃতি । চিত্রার্পিত হচ্ছে শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা ছবির মত…

কিছু প্রিয় মানুষের মুখ । কিছু আবদার, কিছু অভিমান , কিছু ভালোলাগা …

‘দাদা তুমি আবার কবে আসবে ?’, অশ্রু নয়, যেন বিদ্যুৎ গড়িয়ে পড়ল নিমীলিত চোখের দু পাশ দিয়ে, ফর্সা গাল নিমিষেই রক্তাভ…

সহস্র মাইল দুলে ফেলে আসা ছোট্ট শহরটা কেন হানা দেয় এভাবে ? শত অবহেলা, উপেক্ষার পরও ?

হঠাৎ খাঁখাঁ করে উঠল বুক। বেবাক শূন্যতা ঘুরপাক খাচ্ছে যেন সমস্ত হৃদয় জুড়ে…

জীবনে এই প্রথমবার উপলব্ধি করল সে..

একেই বলে পিছুটান…

এরই নাম মায়া…