[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



আবুল বাশার: তার বিষয়ে পুনর্ভাবনা


প্রকাশিত: February 8, 2016 , 9:24 pm | বিভাগ: গেস্ট কলাম


প্রফেসর ড. শিমুল মাহমুদ

আবেগের দরকার আছে, আবেগ দিয়ে দেশপ্রেম হয়। দেশপ্রেমের দরকার আছে, না হলে সব শেষ হয়ে যাবে। আমাদের কী অবশিষ্ট আছে যে, নতুন করে শেষ হবে? আছে, এই বিয়াল্ল­শ বছরে আমরা সামান্য হলেও কিছু না কিছু তো অর্জন করেছি, সেই অর্জনই বা অপচয়ে অপহাতে নষ্ট হতে দেবো কেন?

অর্জন করেছি, স্বাধীনতা। স্বাধীনতা কি শেষ পর্যন্ত নষ্টদের অধিকারে চলে যাবে? যদি বলি চলে গেছে! কীভাবে? আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে। ৩০ লাখ মানুষ জীবনপাত করতে বাধ্য হয়েছেন। ২ লক্ষাধিক নারী নির্যাতিত ও ধর্ষিত হয়েছেন। লাখো বাঙালি ভিটেমাটি ছেড়ে রিফিউজি হতে বাধ্য হয়েছেন। তারপর স্বাধীন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে গণমানুষের প্রাণের দাবি ছিল, সত্যিকার অর্থেই যারা যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীন বাংলাদেশ, স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করাবে। তারপর পদ্মা শুকালো, ব্রহ্মপুত্রে বন্যা বইলো, আবার শুকালো, আবারো বন্যা, তারপর ঘোলাজল গড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেল। আর সেই সুযোগে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই রং বদলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানা পরিচয়ে মিশে গেল। এর পেছনে যে কারণটি মুখ্য, তা হলো যারা সরকারে ছিলেন বা আছেন তাদের শৈথিল্য এবং প্রকৃত বাস্তবতায় বিচারকার্য অনুষ্ঠানে অনীহা।

উদাহরণ হিসেবে বিশেষ একটি বাস্তব চরিত্রের কথা এখানে বলা সম্ভব। জামালপুর জেলার বখশীগঞ্জের বাবুল চিশতি ওরফে বাবলু বদর। এই ব্যক্তি ও তার কতিপয় সাগরেদ যারা আলবদর বাহিনীর সদস্য, তারা ১২ নভেম্বর ১৯৭১ সকাল ৭ টার সময় ঐ এলাকার সৈয়দ জামাল সরকারসহ আরও ৪ জনকে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে বকশীগঞ্জ হাইস্কুলের মাঠে নিয়ে যায়। অন্য একটি গ্রেপ্তারকৃত দলের মধ্যে ছিলেন জনৈক আব্দুল কুদ্দুস। উল্লেখ্য স্কুলে তখন প্রায় শতাধিক মিলেটারি অবস্থান করছিল। এদিন ছিল ২২ রমজান। গ্রেপ্তার করা মানুষেরা প্রায় সকলেই রোজা ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতদের জেরা শুরু হওয়ার এক পর্যায়ে শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদের শেষ দিকে উল্লেখিত আবদুল কুদ্দুসকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি প্রাণভয়ে দৌড়ে স্কুলের মাঠ থেকে পালিয়ে যান। তখন প্রায় সন্ধ্যা।

সন্ধ্যার পর, বাবুল চিশতি যে এখন এলাকায় ‘বাবুল বদর’ নামে পরিচিত। এই বাবুল চিশতি তার গ্রেপ্তারকৃত চারজনকে, যার মধ্যে ছিলেন সৈয়দ জামাল। এই সৈয়দ জামালকে স্কুলের উত্তর পাশে নাবাল জমিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এবং বাবুল চিশতি তার সহযোগী নব্যরাজাকারদের সহায়তায় সেখানে ৪ জনকে একসাথে মাটি চাপা দেয়!

পাক মিলিটারির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া আবদুল কুদ্দুস এর উল্লেখিত নির্মম অভিজ্ঞতার সরাসরি বর্ণনা শহিদ জামালের পুত্র ফজলুর রহমান ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ শিরোনামে চিত্র পরিচালক জনাব নাসিরউদ্দিন ইউসুফের কাছে বর্ণনা করেন। প্রতিবেদনটি ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এর আগের দিন ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু প্রতিবেদনটি প্রত্যক্ষ করেন।

অথচ মর্মান্তিক ও অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলাবাজারের বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের একটি ইতিহাসগ্রন্থে উক্ত বাবুল চিশতির নাম রাজাকার হিসেবে মুদ্রিত হওয়ায় সে জামালপুর কোর্টে প্রকাশক সিকদার আবুল বাশারের নামে মামলা করে। সেই মামলায় সিকদার আবুল বাশার নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের ৬৪ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়ণে যে প্রকাশকের মুখ্য ভূমিকা, সেই ব্যক্তি সময় শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করে সুদূর ঢাকা থেকে জামালপুর আদালতে মামলার জন্য প্রতিমাসে হাজিরা দিয়ে চলেছেন, এই বিড়ম্বনা থেকে তার মুক্তি আছে কিনা তা আমরা জানি না। জানি না এই কারণে যে, রাষ্ট্র আজ কার পক্ষে তা আমরা পরিষ্কার নই। তা না হলে যারা আজ সত্য কথা বলতে চাইছে, এই স্বাধীন দেশে তাদের আর কতদিন এভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে? অথচ রাজাকার বাবুল চিশতি ওরফে বাবুল বদরের বিচার সরকার আদৌ করবে কি না, গণমানুষ আজ সেই প্রশ্নে হতাশ। এই হলো নির্মম বাস্তবতা, এই হলো স্বাধীনতা। বর্তমানে বাবলু বদর রং বদলে রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত। বাবুল বদরের মতো অনেকেই আজ দেশপ্রেমিক, আমরাতো আর দেশপ্রেমকে উপেক্ষা করতে পারি না, তাই আমরাও আজ তাদের সাথে রাজা-উজিরের শক্তির ছায়ায় মিশে থাকতে নিরাপদ বোধ করছি!

জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জ যখন সাংবাদিক, তখন কালোবাজারির মালিকদের বানানো মিডিয়া ডেড হয়ে যায়। দুর্নীতিতে ডুবে থাকা পুলিশি তদন্তের প্রতি মানুষের আর আস্থা নেই। ঔপনিবেশ আশ্রিত আইনের মারপ্যাঁচও বুঝতে ব্যর্থ আমজনতা। ফলে এ রকম হাজারো অসঙ্গতি অনুধাবন করতে পারে না রাষ্ট্রযন্ত্র। কেন না ততদিনে রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণকে রাষ্ট্রের দাস ভাবতে শিখেছে এবং আজ আমরা অল্প হলেও বুঝতে পারছি, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত রয়েছে জনগণকে দাসে রূপান্তরিত করার ভেতর, এই দাসত্ব মূলত চিন্তায় ও দর্শনে। এটাই জনশাসনের মোক্ষম অস্ত্র। কাজেই আমরা অনুগত এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সুতরাং বাবুল চিশতিরা আজ আইনের শাসন বাস্তবায়ন করছে, আর সিকদার আবুল বাশারের মতো যারা এখনো ঠিক রাষ্ট্রের দাস হয়ে উঠতে পারেননি, তাদেরকে ট্রায়ালে নেওয়া হচ্ছে, যাতে যথাযথভাবে আইনের শাসন বাস্তবায়ন হয়!
ক্ষমতা যখন টার্গেট তখন শত্রু “-মিত্রর পার্থক্য চিহ্নিত করা কঠিন। কেন না তারা তখন কমন ইন্টারেস্টের প্রশ্নে মিশে যেতে বাধ্য হয়। অনেকটা কালো টাকা সাদা করার মতো। এভাবে শত্র“-মিত্র মিশ্রণে গণমানুষ উপেক্ষিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে গণমানুষ উপেক্ষিত হয়ে আসছে। রাজনীতির লেবাসে, সামরিকতন্ত্রের জবরদখলে অথবা কথিত সুশীল সমাজের মুখোশে গণমানুষ বরাবরই হয়েছে উপেক্ষিত। সিকদার আবুল বাশার বলছেন, শাসকশ্রেণির এই বহুবর্ণিল মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার জন্য প্রথম প্রয়োজন জনগণের ইতিহাস, রাজা-রাজরার ইতিহাস নয়। এবং এ কথাও ঠিক যে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টি। দলবাজি না করে একবার ভাবুনতো, একাত্তরের চেতনা কি কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, নাকি এটা জনগণের চেতনা? শেষপর্যন্ত ইতিহাস লিখবে কারা? শাসকশ্রেণি, নাকি জনগণ?

আমরা কি এভাবে ভাবতে পারি, আদতে স্বাধীনতা অথবা মুক্তিসংগ্রাম অথবা দেশপ্রেম অথবা যুদ্ধাপরাধ অথবা রাষ্ট্রদ্রোহী এগুলো সবই এখন রাজনৈতিক অস্ত্র। জনগণকে বোকা বানিয়ে আওয়ামী-বিএনপি-জাপা-সিভিল-কর্পো-মিলি-স্বৈর শাসকশ্রেণি যে রাজনীতি করে চলেছেন তা বুঝে ওঠার মতো জনগণের এখনে, বোধোদয় হয়নি। ফলে সমঝোতার প্রশ্নে রাজাকাররা এদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায় এবং শাসকশ্রেণিতে উন্নীত হয়। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে দাবি করি, তারা কি স্বীকার করি, মুক্তিযুদ্ধ কোনো একটা বিশেষ স্থির বিষয় নয়, এটি একটি চলমান লড়াই? আমরা কি বুঝতে পারি আমাদের শাসকগোষ্ঠী বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আহাক্সক্ষার সাথে বেইমানি করে চলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এই ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে বিবিধ রাজনৈতিক অভিধায়। আজকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সার কথা, রাজনীতি যাদের ব্যবসা, দেশপ্রেমকে যারা ব্যবসার পুঁজি বিবেচনা করে অথবা মুক্তিযুদ্ধকে যারা উদ্দেশ্য সিদ্ধির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সেইসব গোষ্ঠীর বিপরীতে ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যাওয়া। সেইসব শাসকগোষ্ঠীর বিপরীতে লড়াই চালিয়ে যাওয়া, যে শাসকশ্রেণি ক্ষমতার স্বার্থে স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষের শক্তিকে একাকার করে দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? সিকদার আবুল বাশার মনে করেন, কোনো প্রকার বাকোয়াজি নয়, অসভ্য রাজনীতি নয় বরং প্রয়োজন সঠিক এবং যথাযথভাবে জনগণের ইতিহাস প্রণয়ন। হ্যাঁ জনগণের ইতিহাস। এর মাধ্যমেই বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিপরীতে জনগণের মর্যাদা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ-রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। সেই লক্ষ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। আজকের মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একাত্তরের এবং আজকের হানাদার-রাজাকারদের চিনতে পারা। একাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের জীবন, মর্যাদা, মানবাধিকার এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং তা রক্ষার লড়াইয়ে যারা হানাদারি-রাজাকারি করে আসছে তাদেরকে চিনতে পারা ও প্রতিরোধ করতে পারা।

স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রের রেখা নয়, শুধু দেশের নাম পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রনীতি ও সমাজনীতিতে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার অভিধা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সাম্প্রদায়িক ও সাম্রাজ্যবাদি নিপীড়নের অধীনে স্বাধীনতার অর্থ ধোকাবাজি-ধান্ধাবাজি। এই ধান্ধাবাজি রুখতে হলে প্রয়োজন আইনগত ভিত্তি। সেইসাথে রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-দর্শনভিত্তিক চর্চা। ঔপনিবেশিক উগ্র জাতীয়তাবাদ-বর্ণবাদ-ধর্মবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গড়ে ওঠেনি। অথচ দুঃখজনক হলেও বাস্তবসত্য আমাদেরকে আজ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি তথা যুদ্ধাপরাধী ও উগ্র জাতীয়তাবাদের এর বিপরীতে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এই চলমান লড়াইয়ের অর্থ মুক্তিযুদ্ধ। এই লড়াইয়ের আর কোনো বিকল্প নেই, বিকল্পের অর্থ দাসত্ব। আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র চায় জনগণের দাসত্ব। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি অর্জন হঠাৎ সম্ভব নয়, মুক্তির পথ ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ক্রিয়াশীল। এই ক্রিয়াশীলতার চালিকাশক্তি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, এই ক্রিয়াশীলতার দায়ভার আমাদের।

এই দায়ভারের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আমরা উপলব্ধি করছি পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা ইতোমধ্যেই নতুন প্রজন্মকে ধোকা দিতে সক্ষম হয়েছে, ফলে এখনও নতুন প্রজন্মের একটি অংশ বিভ্রান্ত। তারা বিভ্রান্ত বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়, ঐতিহ্য আর ইতিহাস বিষয়ে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী? এই মহার্ঘ্য প্রশ্নের অপেক্ষায় সময় অপচয় না করে সিকদার আবুল বাশার প্রতিনিয়ত করণীয় বিষয়াদির রূপরেখা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। যখন মুক্তিযুদ্ধের জাগরণে বাংলাদেশ প্রকম্পিত, তখন তার বয়স পাঁচ। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, বালকের ভেতর দানা বাঁধতে থাকে দেশ-জাতি-মুক্তিযুদ্ধ বিষয়াদি, বুঝতে পারে তাকে লিখতে হবে। সাক্ষাৎকারে তাকে বলতে শুনি, ‘আমি বুঝতে পারি আমি বড় হয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখবো কিন্তু লিখতে গিয়ে আমি প্রকাশকের দায়িত্বে চলে গেছি। …একজন মানুষের জীবনে খুব বেশি টাকার দরকার হয় না, টাকা একজন রেখে যায় আরেকজন ভোগ করে। …একজন মানুষের ৩টি ভালো কাজ করা দরকার; প্রথম কাজ তার যোগ্য সন্তান তৈরি করা, দ্বিতীয় কাজ একটি ভালো বই লিখে যেতে হবে; তৃতীয় কাজ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে অন্তত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার যেখান থেকে মানুষ সেবা পায় সেখানে। …ছোটবেলা থেকেই দুষ্টু প্রকৃতির মানুষ ছিলাম আমি। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতাম। স্কুলে শিক্ষকের ছবি আঁকা দেখেই ছবি আঁকায় আগ্রহ। বাবাও এ বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। …ঢাকাতে পড়ালেখা করতে এসে চারুকলাতে ভর্তি হই। এক সময় হাশেম খান আমাকে ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ দেন। …পর্যায়ক্রমে আমি বুঝতে পারি বই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।’

বৃক্ষরোপণ বলতে সিকদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরি, হাসপাতাল বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে চেয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠান থেকে মানবসমাজ সেবা এবং জ্ঞান উভয় পেতে থাকবে। সিকদার তার কর্মপ্রেরণার পেছনে তার পূর্বপুরুষদের অবদানের কথা স্মরণ করে উচ্চারণ করেন, ‘সেই মুঘল আমল থেকে আমাদের বংশীয় মর্যাদা দৃষ্টান্তমূলক। দাদা তাহসিন উদ্দীন শিকদার, চাচা ছাবেদ আলি শিকদার, চাচাতো ভাই এম ফজলুর রহমানসহ অনেকে সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ ছিলেন, যারা সমাজ তথা দেশের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ কিন্তু প্রচারবিমুখ।’ সিকদার আবুল বাশার তার সফলতার পেছনে দেশের বরেণ্য ইতিহাসবিদ এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষকের স্বতঃস্ফূর্ত অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের মতো বুদ্ধিজীবীর সহযোগিতা না পেলে এত অল্প সময়ে এমন কঠিন কাজ সম্ভব হতো না বলে মনে করেন, পাশাপাশি তিনি মনে করেন, ‘দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য যে দায় নিয়েছি তাতে সরকারি আনুকুল্যের আশা করি না, তবে সরকার যাতে বিভিন্ন পাঠাগার ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো মানের বই ক্রয় করেন, আমাদের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রকাশিত গ্রন্থ অধিক হারে ক্রয় করেন তা আশা করছি। ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই ক্রয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও এগিয়ে আসা উচিত।’

সিকদার জানেন, বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের রক্তমূল্যে অর্জিত মানবিক সম্পদ। অথচ যারা চায় না আমরা আমাদের সংগ্রামী ইতিহাস নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই, আমাদের লড়াইয়ের ইতিহাস যাদের ঈর্ষার কারণ, তারা আমাদের ইতিহাস মুছে ফেলার কাজে লিপ্ত। আর আমরা জানি, যথার্থ ইতিহাসকে স্বীকার করে নেবার যোগ্যতা না থাকলে দানা বাঁধে মৌলবাদ। নিষ্ঠুর-নির্মম ও জীবনবিমুখ অন্ধ প্রতিক্রিয়াই মৌলবাদ; প্রগতিশীলবিমুখতা অথবা বিজ্ঞানবিমুখতার নাম মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার নাম মৌলবাদ, বর্ণবাদের নাম মৌলবাদ। সাম্রাজ্যবাদী চেতনা এই মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয় শাসকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষার তাগিদে। এখন প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকা কী হতে পারে?

জনগণ ইতিহাসবিমুখ, সৃজনশীলতাবিমুখ, ঐতিহ্যবিমুখ অথবা শিল্পকলাবিমুখ হলে মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বি-মানবিকীকরণকৌশল বুঝে উঠতে অক্ষম। সুতরাং প্রথম প্রয়োজন ইতিহাস-ঐতিহ্য আশ্রয়ি জেনারেশন তৈরি করা। এই জেনারেশন গঠনের কাজে যারা সবরকম ভণ্ডামিকে অস্বীকার করে ব্যক্তিস্বার্থের খোলস ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে এসেছেন, তাদের মধ্যে সিকদার আবুল বাশারের কর্মপদক্ষেপকে নিয়ে আমাদেরকে আজ নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

সিকদার আমাদের বন্ধু। বন্ধু কীভাবে? মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তিনি আমাদের বন্ধু, মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে স্বাধীন মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সৃজনশীলতার প্রশ্নে তিনি আমাদের বন্ধু। তিনি আমাদের বন্ধু নিজেকে প্রকাশ করার প্রশ্নে। এমন কি তিনি আমাদের বন্ধু আমার ব্যক্তিগত অনুরাগের প্রশ্নে। তার প্রতি আমার অনুরাগ তার শিল্পী মানসের কারণে। সিকদার আবুল বাশার একজন লেখক, গবেষক, চিত্রশিল্পী, সর্বোপরি ভালো মানুষ; পরিষ্কার মানুষ, দেশপ্রেমিক। সিকদার দেশ আর দেশের মানুষ নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন। তারপরও বলতে হবে সিকদার রাজনীতিবিদ নন, রাজনীতিবিদদের নোংরা মুখোশকে সিকদার ঘৃণা করেন।

মানুষের মুখ আর মুখোশের পার্থক্য বেশ ভালোভাবেই শনাক্ত করতে সক্ষম সিকদার আবুল বাশার। ফলে সঙ্গত কারণেই ধান্ধাবাজ মুখ আর মুখোশ তার কাছে ভিড়তে পারে না। ধান্ধাবাজ রাজনীতিবিদদের মতো কেনাবেচায় বিশ্বাসী লেখক-শিল্পী নামধারী মুখোশ থেকে তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার পৃথক রেখেছেন আজও। তার মূলমন্ত্র সত্যিকারের পরিশ্রম, যে পরিশ্রম উদ্দেশ্যহীন নয়, যে পরিশ্রম শুধু স্বপ্ন দেখায় না বরং স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার পথ দেখায়। সুতরাং তাকে পিছে ফিরে তাকাতে হয় না, অতীত এখন তার কাছে ফলপ্রসূ ইতিহাস। ইতিহাস এখন ‘গতি’; এই ইতিহাসের গতিপথ ধরেই এখন ‘গতিধারা’। এই ‘গতিধারা’ নিয়ে আমি আমার বইয়ের ভূমিকায় বেশ লিখেছিলাম, ‘গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে গতিধারার রুচিশীল এবং সৃজনশীল মানুষ সিকদার আবুল বাশার, যার কর্মপরিকল্পনা ও স্পষ্টবাদিতা আমাকে আকৃষ্ট করেছে, তাকে আপাতধন্যবাদ জানিয়ে বিব্রত করতে চাই না।’

সত্যিকার অর্থেই বাশার নিজকর্মের স্বীকৃতির জন্য কাঙাল নন, ফলে তাকে ধন্যবাদ জানানো পক্ষান্তরে নিজেকেই বিব্রত করা। কেন না তথাকথিত ভদ্রতার মুখোশে তাকে মিথ্যে বাহবা দেয়া সম্ভব নয়। কেন না তিনি নিজের বিষয়ে পরিষ্কার জানেন কতটুকু তার প্রাপ্য। কাজেই তোষামোদির প্রশ্রয় তার কাছে নেই। বাশারের মতে তাহলে তো একজন আমলার সাথে তার কোনো পার্থক্য থাকলো না, একজন রাজনীতিবিদের সাথে তো তার কোনো পার্থক্য থাকলো না। এ অবস্থায় সিকদার আবুল বাশারকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে র‌্যাঁবোকে মনে পড়ছে। মনে পড়ছে এই কারণে র‌্যাঁবোর মতো বাশারের ভাবনাচক্ষুতে আবিষ্কার করা সম্ভব, ‘আমি দেখতে পাই ডুবে যাওয়া সূর্য আতঙ্কে বর্ণহীন।’ র্যাঁবোর মতো সিকদারও আতঙ্কগ্রস্ত। সুতরাং সিকদার আবুল বাশার জাতিকে বর্ণহীন ডুবন্ত সূর্যকে পিছে ফেলে বর্ণময় উদীয়মান সূর্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দিতে ইচ্ছুক। তিনি র‌্যাঁবোর মতো বলতে চান, ‘আমি স্বপ্নে দেখতে পাই অচেনা প্রাণশক্তির কম্পন।’ এই প্রাণশক্তি প্রসঙ্গে সিকদারকে নিয়ে ভাবতে হলে আমাদেরকে স্মরণ করতে হচ্ছে হিকি-র কথা।

বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণযাগ্য নাম জেমস অগাস্টাস হিকি। এক্ষেত্রে হিকির নামটি স্মরণযোগ্য হওয়ার কারণ প্রথমত, তিনি ছিলেন বাংলাদেশে মুদ্রিত সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ এর সম্পাদক। দ্বিতীয়ত, সত্য প্রকাশের দুঃসাহস, স্পষ্টবাদিতা, ন্যায়নিষ্ঠা, গোষ্ঠী-স্বার্থ পরিহার বিবিধ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন তিনি। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির নীতি ও শাসনপদ্ধতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসংখ্যবার সংবাদ প্রকাশ করেছেন তিনি এবং এই স্পষ্টবাদিতার জন্য তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছে। প্রকাশনার জগতে এ রকম দৃঢ়চেতা মানুষের নাম যদিও হিকি-র নামের পাশাপাশি উচ্চারণ করা সময়ের বিবেচনায় যৌক্তিক নয়, তবে তার পরও বাস্তবসম্মত কারণে বলতে হচ্ছে, সিকদার আবুল বাশার প্রকাশনা শিল্পে হিকি অপেক্ষা অনেক এগিয়ে আছেন।

প্রকাশনার জন্য সিকদার আবুল বাশারকে জেল খাটতে হয়নি সত্য কিন্তু সত্যকথা প্রকাশ করার কারণে তাকে মামলা-মোকাদ্দমা মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তা সত্তে¡ও স্পষ্টবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠার সমন্বয়ে তিনি প্রকাশ করে চলেছেন অজস্র গ্রন্থ। যার অধিকাংশই প্রকাশ করার জন্য দরকার দুঃসাহস এবং অবশ্যই সৎ সাহস। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে তথ্যবহুল গ্রন্থ তিনি একের পর এক প্রকাশ করে চলেছেন, তাতে তার যোদ্ধা মানসিকতার স্ফূরণ ঘটেছে। বলাই বাহুল্য এই সাহসিকতা সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা তিনি বংশক্রমেই রক্তে ধারণ করে আছেন।

রুচি এবং শিল্প সমান্তরাল, সমান্তরাল না হলে তা বাণিজ্যিক। বাণিজ্য অর্থ কেনাবেচা, কেনাবেচা অর্থ দাস কেনাবেচা, নারী কেনাবেচা, দেশ কেনাবেচা। নন্দনতত্ত¡ এই প্রকারের কেনাবেচা সমর্থন করে না। বিষয়টি সিকদার বেশ ভালোভাবেই জানেন। কাজেই সিকদার গতির সাথে ধারাক্রম যুক্ত করলেও নিজেকে নিজের আদর্শকে রেখেছেন তার সমান্তরালে। এই সমান্তরাল পথ চলায় শিল্পকে তিনি আদর্শ হিসেবে পূঁজি করে অগ্রসর হয়েছেন। ফলে সিকদার এবং ‘গতিধারা’ এখন সমান্তরাল। রেললাইনের মতই তা সমান্তরাল ধারায় গতিপ্রাপ্ত। এই গতির মধ্য দিয়ে তার প্রকাশনায় স্থান লাভ করেছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাতত্ত¡, লোকসাহিত্য, প্রাচীন ও ধ্রুপদী সাহিত্য, অভিধান ও নন্দনতত্ত । বাশার এ জাতীয় বিষয় বিবেচনা করতে লেখকের নাম-যশকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেননি, করেছেন লেখার বিষয় ও প্রকরণকে।

এখানেই অপরাপর প্রকাশক থেকে তার পার্থক্য। এটা সম্ভব হয়েছে তার শিক্ষা, গবেষণাধর্মী চেতনা ও শিল্পবীক্ষার কারণে। আরো একটি বিষয় এক্ষেত্রে বিবেচ্য, তাহলো তিনি নিজের চেতনার কাছে থেকেছেন সৎ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতদের মতো দাম্ভিকতা নিয়ে নিজেকে অহঙ্কারের চোরাবালিতে অন্ধ করে ফেলেননি। সুতরাং তিনি প্রকৃত লেখকদের মর্মযাতনা উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি খুঁজে বের করেন পাঠকের চোখের আড়ালে প্রায় হারিয়ে যাওয়া, অথবা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া অপঠিত লেখকদের। তিনি হুমায়ূন আহমেদের মতো ব্যবসাসফল লেখকদের পেছনে মুনাফালোভে ছুটাছুটি না করে প্রযতের সাথে আবিষ্কার করেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদের মতো লেখকদের। সুতরাং সঙ্গত কারণেই তার হাত দিয়ে একে একে প্রকাশ পেতে থাকে, লৌকিক জ্ঞানকোষ, নদীকোষ অথবা হাজার বছরের গম্ভীরা, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস, অথবা জাঁ পল সার্ত’এর রোডস্ টু ফ্রিডম অথবা তার নিজের অনূদিত এইচ. বেভারেজ বিসিএস. লিখিত দি ডিস্ট্রিক্ট অব বাকেরগঞ্জ (ইটস হিস্টরি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস)।

এ কথা ঠিক যে, রাজনীতির ডামাডোলে জেমস অগাস্টাস হিকির মতো সিকদার আবুল বাশারকে জেল খাটতে হয়নি কিন্তু স্পষ্টবাদিতা ও ন্যায়নিষ্টতার শৃঙ্খলে প্রকাশনার যে রোডম্যাপ তিনি সূচিত করে চলেছেন সেক্ষেত্রে একটি বিষয় আজ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, তাহলো, প্রকাশনাশিল্পে বাজার-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মুনাফাখোরদের বিপরীতে সিকদার আবুল বাশার বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরে যেভাবে এগিয়ে চলেছেন, বাংলাদেশে আর কোনো প্রকাশককে এমনটা করতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ আর সবার মতো ব্যবসা করা তার উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য সুচিন্তিত রূপরেখা প্রণয়ন করা এবং তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া। ফলে সঙ্গত কারণেই ব্যবসাদারদের স্থান নেই ‘গতিধারা’তে। ‘গতিধারা’তে অলেখক, রান্নাঘর-আশ্রয়ী লেখক অথবা ‘নবজাতকের এক হাজার একটি ইসলামি নাম’ শিরোনামে ছাপা পুস্তক অথবা সাত-সতেরো, জোকস টাইপের বই-পত্রের জায়গা নেই। যদিও এতে মুনাফা প্রচুর, যেমন মুনাফা পাওয়া যায় রাশি রাশি নোট বই ছেপে। বাংলাবাজার এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগেও দেদারসে পয়সা লুটছে এইসব ফুটপাতভিত্তিক বই-পত্র ছেপে। অবশ্যই সিকদার আবুল বাশার এ জাতীয় ফটকাবাজি থেকে আদর্শগতভাবে তথা কার্যক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পৃথক এবং বিবেকবান প্রকাশক। সত্যিকার অর্থেই এ কথা বলা সম্ভব, ‘গতিধারা’ মেধা ও বিজ্ঞানের যুক্তিতে বিশ্বাসী। কুসংস্কারের আশ্রয়-প্রশ্রয় অন্তত ‘গতিধারা’তে নেই। ফলে ‘গতিধারা’ খোয়াবনামা-ফালনামা জাতীয় পুস্তক অথবা ছেবলামো মার্কা কবিতা-উপন্যাস ছেপে সুড়সুড়ি তৈরি করাকে অনৈতিক ও সমাজবিরোধী মনে করে। সুতরাং প্রকাশনাশিল্পের এহেন অনৈতিক অরাজকতার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে ‘গতিধারা’ প্রকাশ করে চলেছে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সুগ্রন্থিত ও সুলিখিত অসাম্প্রদায়িক-ধর্মবর্ণনিরপেক্ষ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ।

ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, যিনি আমাকে নাজেহাল করেন মূলত বাশারের কারণে, সেই রাজাভাই ‘গতিধারা’ প্রকাশিত ইতিহাস গ্রন্থের ফ্ল্যাপে লিখেছিলেন, ‘নিজেকে বিশেষভাবে জানা বা আবিষ্কারের সাধনায় আবহমানকাল থেকেই সমাজ সচেতন মানুষ সচেষ্ট রয়েছে। তাই, আত্মপরিচয় খোঁজার জন্য মানুষ প্রতিনিয়তই শিকড়ের সন্ধান করেন। সেই উৎস সন্ধানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ তথা একটি জাতির নানামাত্রিক উত্থান-পতনের ইতিহাস আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়। আর এজন্যই ইতিহাস যে-কোনো জাতির দর্পণ ও অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। নিজেদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের মাধ্যমেই বর্তমানের ভিতকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে হয় এবং সেই ভিত্তির ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যৎপ্রজন্ম।’ এ অর্থে বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আজকে একটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি তা হলো, বাঙালি ও বাংলাদেশের যথাযথ ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা। কু-বিশ্বাস ও কু-ইতিহাস থেকে জাতিকে মুক্ত করা। এই মুক্ত করার মুক্তিযুদ্ধে সিকদার আবুল বাশার ক্রিয়াশীল। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব কি ‘গতিধারা’র একার? কোনো মুক্তিযুদ্ধ কি কোনো জাতির জীবনে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? অথবা মুক্তিযুদ্ধ কি কোনো একক ব্যক্তির অধীনে থাকা বা ফলপ্রসূ হওয়া সম্ভব? না, সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যই হলো স্বাধীনতার শর্তে এবং স্বাধীনতাউত্তর একটি জাতির জাতিগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহ্যভিত্তিক ধারাবাহিক লড়াই, যে লড়াই আমজনতার পক্ষে আবহমানকাল ধরে গতিশীল থাকে। সে অর্থে আজ ‘গতিধারা’র সাথে বাঙালি জাতির একাত্ম হওয়ার সময় সমাগত। আর সততার প্রশ্নে, বিবেক-বোধ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নিজনিজ অবস্থান থেকে একাত্ম হতে পারলে সত্যিকারঅর্থেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত মুক্তিযুদ্ধের ফসল ঘরে তুলতে পারবো। অজ্ঞ জাতির কোনো মুক্তি নেই, তাদের জন্য কোনো মুক্তিযুদ্ধ নেই। ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সংস্কৃতিবোধহীন অজ্ঞ জাতির জন্য স্বাধীনতা অর্থহীন, সেই অর্থহীন স্বাধীনতা জন্ম দেয় শুধুই বঞ্চনার ইতিহাস, যদিও সেই বঞ্চনার ইতিহাস কেউ লেখেন না, কেন না অজ্ঞ জাতির ইতিহাস রচিত হয় শাসক ও শোসক শ্রেণির হাতে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি ‘গতিধারা’ একে একে দীর্ঘ সময় নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ইতিহাস সংগ্রহ করে চলেছে। আর এ কথা ঠিক যে সঠিক ইতিহাস তখনই তৈরি হয় যখন প্রতিটি অঞ্চলের প্রত্যন্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়। তখন পাওয়া সম্ভব একটি জাতির প্রকৃত ও সামগ্রিক ইতিহাস তথা একটি জাতির যথাযথ পরিচয়। আমরা দেখেছি এ পর্যন্ত সভ্যতার ইতিহাসে কেন্দ্রীভূত ইতিহাস রচিত হয়েছে। অধুনা বিবেচনায় এ ধরনের ইতিহাস সর্বাংশে সঠিক নয়। সেখানে রাজা-মহারাজা আর যুদ্ধ-বিগ্রহকে হাইলাইট করা হয় মাত্র। তা কখনো জনগণের ইতিহাস হতে পারে না। এই প্রকৃত সত্য ‘গতিধারা’ বহু আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আর উপলব্ধি করতে পেরেছিল বিধায় সিকদার আবুল বাশার অগ্রসর হয়েছেন। হ্যাঁ বাধা আছে অনেক, প্রথমত অর্থনৈতিক বাধা, দ্বিতীয়ত, মুনাফাখোরদের ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও মধ্যবিত্ত পারিবারিক জীবনের দোলাচল-প্রবৃত্তি। সার্বিক অর্থে এগুলি সবই বৃহৎ পরিমাপের কোনো অলাভজনক কাজের জন্য অনেক বড় বাধা। সমাজের যে কোনো শিক্ষিত-অশিক্ষিত হিসেবি বাস্তববাদি মানুষ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে নির্বোধের পাগলামি জ্ঞানে হই-হুল্লোড় করে সমাজ থেকে এ ধরনের পাগলকে উৎখাত করার অপদায়িত্বে দল বেঁধে এগিয়ে আসবেন এটাই স্বাভাবিক। সিকদার আবুল বাশারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে, বিশেষ করে তাঁর কাজকে রুদ্ধ করে রাখতে পারেনি।

আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহের কারণ জানতে চাইলে বাশার বলেন, ‘আজ থেকে কয়েক যুগ বা শতাব্দী আগে যখন বিভিন্ন ইতিহাসের বই লেখা হয়েছে, সেই একই সময় অনেকেই হয়তো গল্প-উপন্যাস-কবিতা লিখেছেন, বই আকারে সেসব প্রকাশিতও হয়েছিল। কিন্তু অনেক বছর পেরিয়ে এসে কেউ কি সেইসব সৃজনশীল সাহিত্যের কথা মনে রেখেছেন? রাখেন নি। অথচ পাঠক এখনো ইতিহাস-ঐতিহ্যের বইগুলো খোঁজেন। কারণ মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই অতীতটা জানতে চায়। এই চাওয়াটা চিরন্তন। আমি যখন ইতিহাস-ঐতিহ্যের বইয়ের দুস্প্রাপ্যতা উপলব্ধি করলাম, তখনি এই দিকে মনোনিবেশ করি। কারণ শেকড় দুর্বল হলে গাছ দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না। আমি তাই জাতির শেকড়সন্ধানে নেমেছি।’

সিকদার আবুল বাশার কর্মপ্রাণ, সৃজনশীল মানুষ। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তার প্রকাশনা সংস্থায় বসে একমনে কাজ করেন। কী করেন, সেই বর্ণনার চেয়ে কী করেন না সেই তালিকা তৈরি করাটাই বোধহয় সহজ। তাকে কাজ করে যেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর কাজ বলতে শুধু প্রচ্ছদ অঙ্কন নয়, শুধু গবেষণা নয়, শুধু বই প্রকাশ বা বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মলাটবন্দি করা নয়, বরং এই কাজের যাতে একটি প্রায়োগিক দিক ক্রিয়াশীল থাকে সেজন্য এই ব্যক্তি প্রতিনিয়ত প্রয়োগকৌশল অনুসন্ধান করে চলেছেন, আর এই অনুসন্ধান বাস্তবঅর্থে হাতে কলমে। সুতরাং সিকদার মানুষের কাছে যাচ্ছেন, সংযুক্ত হচ্ছেন সমাজসেবামূলক নানাবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে, সংযুক্ত থাকছেন বর্তমান প্রজন্মকে সচেতন করে তোলার চেষ্টায় ইতিহাস-ঐহিত্যভিত্তিক লোকসমাগমের সাথে। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও লোকজ মেলায় আবুল বাশার সশরীর উপস্থিত থেকে নিজের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনামূলক মতামতও উপস্থাপন করছেন। মঞ্চে প্রচলিত তেলবাজিমার্কা বক্তৃতাকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উচ্চারণ করেন, মঞ্চ নয় জনগণের মাঝে নেমে এসে তাদের ভেতরের মানুষকে খুঁজে বেড় করে দেখুন আসলে বাঙালি বলতে কী বোঝায়, বাংলাদেশের ইতিহাস বলতে আসলে কী বোঝায়। আমি তার সাথে একই মঞ্চে বসেছি, তার বিনয় দেখেছি, নিজেও অহঙ্কারী নন এবং অহঙ্কারী মানুষকে তিনি এড়িয়ে চলেন।

সোনারগাঁও-এ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন আয়োজিত লোকজ উৎসবে তার সাথে আমি যোগ দিয়ে একজন ভিন্ন সিকদার আবুল বাশারকে আবিষ্কার করেছি। সিকদার পরিহাস করে বলে থাকেন, আরে ভাই এই দেশে নিজের ঢোল নিজে না পেটালে কেউ আপনার কথা বলবে না, সবাই কোনো না কোনো মতলবে আছে। আমি তার হাস্যরসের ভেতর তার ভেতরের মানুষটাকে দেখতে পেয়ে আশ্চর্য হয়েছি, কী টগবগে স্বপ্নের ভেতর কী এক সত্য আর কষ্ট লুকিয়ে রয়েছে। আসলে সিকদার বলতে চেয়েছেন, আসুন না আমরা সবাই সবার ভেতরের সুকুমার মানুষটাকে টেনে বের করে দেখাই, তা না হলে মানুষের চোখে তো শুধু আপনার খারাপটাই ধরা পড়বে। সিকদার স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন এবং স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। সিকদারের সাথে একান্তে আলাপচারিতায় আমি তাকে আবারও আবিষ্কার করি আরো একটু ভিন্নভাবে। সিকদার বলতে থাকেন, এক জীবনে কত টাকা দরকার, পুত্রের ব্যবস্থা হয়ে যাবে, এই জীবনের সমস্ত সম্পদ আমি ট্রাস্টিবোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশনা শিল্পের জন্য রেখে যাব, এখান থেকে শিল্পী লেখক আর সমাজসেবকদের সম্মানিত করা হবে, পুরস্কার দেওয়া হবে। আমি তাকিয়ে থাকি সিকদারের দিকে আর ভাবতে থাকি, এই কর্পোরেট লাইফে এখনো এমন স্বপ্নপাগল মানুষ আছে! না শুধু স্বপ্নপাগল নয় বরং সেই ট্রাস্টিবোর্ডের বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে, অফিস হয়েছে, আমাদের মতো দূর-দূরান্ত থেকে যেসব লেখক-শিল্পী ‘গতিধারা’য় যাবেন তাদের রিফ্রেশম্যান্টের জন্য কী করা উচিত সেই ঔচিত্যবোধ নিয়েও সিকদার তার পরিকল্পনার কথা বলতে থাকেন। ঢাকায় গিয়ে দেখি একজন কাজপাগল মানুষ সিকদার তার পরিকল্পনার অবকাঠামো বাস্তবায়ন করে চলেছেন নান্দনিক মমত্ববোধের অনিবার্য তাগিদে।

সিকদার আবুল বাশার গ্রাম ভালোবাসেন। আসলে বাশারের কবি হওয়ার কথা ছিল। সিকদার একজন কবি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর অপুর মতো সিকদার আবুল বাশার একজন কবি, একজন দার্শনিক। প্রকৃতি ও মানুষের ভেতর যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে সেই সম্পর্কের ভাষা সিকদার তার বোধ দিয়ে ধারণ করেন। সিকদার ছুটে যান তার ছেলেবেলায়, তার গ্রামে। অথচ আমরা আমাদের ছেলেবেলা পিছে ফেলে আসি। সিকদার তার অতীতকে পরিত্যাগ করে পিছে ফেলে আসেন না, সিকদার তার ছেলেবেলাকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন আজও। ফলে তিনি ছুটে যান তার ছেলেবেলায়, তিনি ছুটে যান তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, খেলার মাঠে, হাটে-বাজারে, খালে-বিলে, নদীতে অথবা ঘুড়িকাটা আকাশে। সিকদার পরম মমতায় তার সবটুকু অতীত, পিতামহের অতীত, প্রপিতামহের অতীত আর বর্তমানের গৌরবকে ধারণ করে আছেন তার বুকে। শুধু ধারণ করেই থেমে থাকেন না শিকদার, ঐ যে বলছিলাম সিকদার শুধু স্বপ্ন দেখেন না বরং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয় আর বর্তমানকে স্বপ্ন দেখাতে শেখান। কীভাবে? সিকদার দেখিয়ে দেন আগামী দিনের পথ চলার রূপরেখা, অর্থাৎ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবার প্রক্রিয়া তৈরি করে দেন সিকদার। সুতরাং সিকদার তার অতীত, তার পিতামহ-প্রপিতামহকে, তার যে পূর্বপুরুষ, যে পূর্বপুরুষ নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌলার বংশে কর্মরত ছিল, সিরাজের পতনের পর তার যে পূর্বপুরুষ অভিবাসী হয়েছিল বরিশালের তারুলিতে, সেই পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত ধারণ করেছে যথাযথ নির্ভরযোগ্য লেখনীর মাধ্যমে। সিকদার ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশ করেছে ‘শিকদার বাড়ির ইতিকথা’।

এই যে ইতিহাসচেতনা, নিজেকে আবিষ্কার করার চেতনা, এই চেতনা বর্তমানকে পথ দেখায়, তাকিয়ে দেখ তুমি কে? কী তোমার পরিচয়, কোথায় তোমার গৌরব, কেমন তোমার মনুষত্ব! এই মনুষত্ব, এই মমত্ববোধ আর মানবিক মানুষটির জন্য আমার যতো ভালোলাগা। আমি তাকিয়ে থাকি তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে চোখে। বাংলাদেশ আর বাঙালির স্বপ্ন নিয়ে চোখে। আর প্রতিনিয়তই বুঝতে থাকি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও আমার করার আছে অনেক। সিকদার আমাকে বুঝতে শিখিয়েছেন, ভাবতে শিখিয়েছেন, আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও শেখাবেন। আমার বিশ্বাস সিকদার দীর্ঘজীবী হবেন। বর্তমানে তার বয়স আটচলি­শ, আরও পঞ্চাশ বছর বাঁচলেও সিকদারের নশ্বর দেহ নয়, বরং সিকদারের স্বপ্ন-বাস্তবকর্মকাণ্ডই একদিন হয়ে উঠবে অবিনশ্বর।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কবি
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।