[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে বাংলা ভাষার চর্চা


প্রকাশিত: February 21, 2016 , 10:20 am | বিভাগ: অপিনিয়ন,গেস্ট কলাম


শেখ আব্দুল্লাহ-আল-নকী: ভাষা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা মানবসমাজে ব্যাপক পরিসরে ক্রিয়াশীল থাকে। সংস্কৃতিকে বহন করে একটি সমাজ বিকশিত হয়, আর সংস্কৃতি অভিব্যাক্ত হয়ে থাকে একটি ভাষার মাধ্যমে। আর যে ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার অন্তরের গহীনে লুকিয়ে থাকা ভাবনাগুলো অত্যন্ত সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে, যে ভাষার মাধ্যমে ভাবনাজগতে একধরনের সঞ্চারণ সৃষ্টি হয় এবং যে ভাষার মাধ্যমে হৃদয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সাচ্ছ্যন্দ প্রবাহিত হয়, তা হল পরম মমতাময়ী মাতৃভাষা।

আমরা বাঙ্গালী হচ্ছি পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য সর্বচ্চো আত্নত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় রুপ দিয়েছি। তাই বিশ্ব ইতিহাসে জায়গা করে নেয়া ১৯৫২ এর ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালিকে এনে দেয় এক বিশেষ মর্যাদার।  প্রথমে  ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে এই ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয় যা কালক্রমে স্বাধীনতার আন্দোলন ও সংগ্রামে রুপ নেয়।

ইতিহাসের অগ্রসরতায় সৃষ্ট জাতীয়তাবোধের এই দ্বায়বদ্ধতা থেকে একটি প্রশ্ন বারবার আবর্তিত হয় যে, বর্তমানে এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা আমাদের ভাষাকে কতটুকু স্বকীয়তার সাথে চর্চা করছি?এই প্রশ্নের উত্তর খুজলে হয়ত বাস্তবতায় বাংলা ভাষার চর্চায় এক ধরনের দৈন্যতা পরিলক্ষিত হবে। বিশ্বায়নের সাথে একীভূত হওয়া মন্দ নয়, তবে বিশ্বায়নের প্রভাবে যদি আমার স্বকীয়তা বিনষ্ট হয়, তাহলে তা আত্নপরিচয়ের জায়গাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বর্তমানে যদি আমরা আমাদের সাথে নিত্যদিনকার মিডিয়া সংযোগের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখবো যে- অধিকাংশ সময় আমরা বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা ভিনদেশী ভাষার নাটক, সিনেমা ও সঙ্গীত উপভোগের মধ্যে নিমজ্জিত। এর কারন দুইটি:  প্রথমত- আমরা বাংলা ভাষার বিনোদন সংস্কৃতিতে দর্শকদের জন্য কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারছি না; দ্বিতীয়ত- আমাদের মানসজগতে জাতীয়তাবোধের ক্ষয়সাধন হচ্ছে। প্রথম সমস্যাটি মানসম্পন্ন সৃষ্টিকর্মের অভাবের সাথে জড়িত থাকলেও এর সমাধানে একটু সুনজর দিলে সমস্যাটির ইতি ঘটানো সম্ভব। তবে, দ্বিতীয় সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয় কারন এর সাথে জাতির মনন ও ভাবনার বিষয়টি সম্পৃক্ত রয়েছে।

আর এফএম রেডিওর অনুষ্ঠানগুলোর কথা শুনলে মনে হবে যেন বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত শব্দ ভান্ডারের অভাব রয়েছে এবং বাংলা ভাষা যেন বিলুপ্তপ্রায়। তবে  সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এইসব অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রনের জন্য সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আর এফএম রেডিওর ন্যায় বাংলা ও ইংরেজির সমন্বয়ে বাংলিশ ভাষার চর্চা পরিলক্ষিত হয় বর্তমান সময়ের আধুনিক তরুন-তরুণীর মাঝে।

বর্তমান যুবসমাজের স্বকীয়তাবিহীন ভাষাচর্চার জন্য শুধু মিডিয়াকে দোষারোপ করলে ভুল হবে কারন এর সাথে জড়িত রয়েছে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার চর্চা। তাই ছাত্রদেরকে জ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে একটি বড় সময় ব্যয় করতে হয় ভিনদেশী ইংরেজি ভাষায়। ফলে একেই সাথে ছাত্রদের দুইটি ভাষায় অগ্রসর হতে হয়। অথচ জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, চীন এবং তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে  শিক্ষণের মাধ্যম হিসেবে নিজ মাতৃভাষার ব্যবহার হয়ে থাকে।

বিশ্বায়নের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ইংরেজির চর্চা বা একাধিক ভাষা রপ্তকরন দোষের কিছু নয়। কিন্তু সমস্যাটি দাড়ায় যখন এক ধরনের অনীহা ও হীনমন্যতার উপলব্ধি থেকে এই ধরনের অনুশীলন করা হয়ে থাকে। তবে এর পাশাপাশি এটি ধ্রুব সত্য যে এদেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন শাস্ত্রের সকল শব্দের বা পদের অর্থ এখনও বাংলায় রুপ দেয়া হয়নি। তার মানে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন শাস্ত্রীয় জ্ঞানের প্রয়োজনে বাংলা ভাষার পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে।

অন্যদিকে, এদেশের দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসরত মানুষগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাব বিনিময়ে বাংলা ভাষার  কথ্য চর্চায় তাদের মমত্ববোধের ঘাটতি না থাকলেও লিখিত চর্চায় তাদের মধ্যে একধরনের দৈনতার ভাব ফুটে উঠে। তবে এর জন্য তাদেরকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই, কারন যেখানে দারিদ্র্যের কষ্টাঘাতে জীবন জর্জরিত, তখন বাংলা ভাষায় লেখার রপ্তকরন অত্যন্ত গৌণ হয়ে দাড়ায়। তবে এর জন্য শিক্ষাকে প্রান্তিক পর্যায়ে শিশু ও বয়স্কদের দৌড়গড়ায় পৌঁছে দেয়া  প্রয়োজন। তাহলে হয়ত ভাষার সার্থকতা অর্জিত হবে।

সর্বোপরি, বাংলা ভাষার সার্বজনীনতা ও এর সুনির্দিষ্ট মান বজায় রাখার জন্য একটি ব্যাপকতর ও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন যা ভাষাকে স্বকীয় ভাবধারায় প্রবাহিত করবে। নয়তো বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলা ভাষা একটি সংকর ভাষায় রুপ নেবে। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট দ্বায়বদ্ধতার জায়গাটি।

 

শেখ আব্দুল্লাহ-আল-নকী : শিক্ষার্থী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।