[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



আবুল বাশার: বহুমাত্রিক সফল মানুষ


প্রকাশিত: February 29, 2016 , 10:22 pm | বিভাগ: আপডেট,গেস্ট কলাম


মিজান সরকার: সিকদার আবুল বাশার নানামাত্রিক-বর্ণিল লেখক, গবেষক, অঙ্কনশিল্পী এবং খ্যাতনামা প্রকাশক। উপর্যুক্ত বিষয়সমূহে তার সৃজনশীল অবদান কেবল দেশ জুড়ে নয়, দেশের বাইরেও। এ পর্যন্ত তিনি একচল্লিশটি গ্রন্থের প্রণেতা। ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের উপর গ্রন্থ প্রকাশে তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘গতিধারা’ই অগ্রবর্তী।

এত অধিকসংখ্যক গুণ ও মানসম্পন্ন বইয়ের প্রকাশক বাংলাদেশে কমই আছে। এটা দেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি বাঙালির প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, পরিচিতি, অনুপুঙ্খভাবে তুলে ধরার অকুণ্ঠ হৃদয়নিষ্ঠা তাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে এবং বসিয়েছে এক বিশেষ আসনে। কাজের গুণ ও মানের নিদর্শনসরূপ ইতোমধ্যেই তিনি পেয়েছেন বেশকিছু পুরস্কার।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর অনুরাগ, ইতিহাস গবেষণায় সত্যানুসন্ধান, অপার শ্রমনিষ্ঠা তাকে দূর সীমানা পেরোতে প্রেরণা যুগিয়েছে। অশেষ শ্রমলব্ধতায় তার এ অর্জন। তিন দশকের চেতনায় মোড়ানো, শক্ত হাতে হাল ধরা একজন অমিতপ্রাণ দেশপ্রমিক গভীর ভিতরে যিনি দেশ গড়ার মানসে লড়ে চলেছেন অবিরাম।

তার এই নিরেট কর্মযজ্ঞে কেবল তিনি নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা-ই করেননি, গোটা বাঙালি জাতিকে সামনে এগিয়ে নেবার দুর্মর প্রয়াশ চালিয়েছেন এবং তার সফলতা আসলে সেখানেই।

একজন সুনিপুণ জাতশিল্পীর কাজ কেবল সমাজ ও মানুষ পর্যবেক্ষণ করা নয়। বরং কালোত্তীর্ণ শিল্পী বিদ্যমান বাস্তবতার গভীরদেশে প্রবেশ করে উন্মোচন করেন নতুন সমস্যা ও সম্পর্ক, বিনির্মাণ করেন নতুন প্রতিরূপ, যা আমাদের সমাজব্যবস্থাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সুতরাং সচেতনভাবে দ্বিধাহীনভাবে তাকে প্রবেশ করতে হয় নেপথ্যের গভীরে। নির্দিষ্ট সামাজিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতায় তাকে সাড়া দিতে হয়, তা-নাহলে সেটা হয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ততা দ্বারা সীমাবদ্ধ, কালোত্তীর্ণ হয় না কখনো। সে হিসাবে আমাদের আলোচ্য শিল্পী সিকদার আবুল বাশার শত ভাগের প্রায় সর্বাংশেই সফলতা অর্জন করেছে, তার সৃষ্টিকর্ম ও সাধনায়। গবেষক-লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী ও সফল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘গতিধারা’র স্বত্বাধিকারী হিসেবে তার অভিজ্ঞতাও বাস্তবতায়।

উল্লি­খিত সবকটি মাধ্যমেই তিনি সফল সিদ্ধহস্ত-সব্যসাচী। চলন-বলন, বেশভূষা, আলাপচারিতায় একেবারেই সাধারণ অনাড়ম্বর। তাকে দেখলে আর তার সাধারণত্ব বোঝার বাকি থাকে না, অথচ ভেতরে ভেতরে মনন-মানসে কী অতল-অপার গভীরে তার অবস্থান। গায়ে পড়ে কিংবা দায়ে ঠেকেও কখনো কোনো কিছু করার মনোবৃত্তি তার মধ্যে দেখিনি।

একবার বাংলা একাডেমির বইমেলায় তার সাথে আলাপ পরিচয় ঘটেছিল বন্ধু কবি-লেখক বিলু কবীরের মাধ্যমে। অনেকেই একত্রিত হয়ে আড্ডার খুব মচ্ছব হয়েছিল। আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, লেখক প্রফেসর আমিরুল আলম খান। আমার ক’খানা কবিতার বই ও সাহিত্য একাডেমি, কুষ্টিয়ার ‘গদ্যমঙ্গল’ গতিধারা থেকে প্রকাশের সুবাদে তার সাথে আমার হৃদ্য বেড়েছিল।

ইতিহাসচর্চা পৃথিবীর সবকালে অত্যন্ত জরুরি এবং অবিচ্ছেদ্য, যার পাঠ চিরদিন অস্তিত্বের প্রশ্নে। যে ইতিহাস হচ্ছে জাতির সুপ্ত শক্তির বিশাল এক উৎস বা আধার। কিন্তু পরিতাপের বিষয় শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাসচর্চা এবং পাঠ কোনো এক অদৃশ্য কারণে বরাবরই বাধা-বিঘ্নের সম্মুখীন। আর এমনি একটা খেলো অবস্থার প্রভাব এসে পড়ছে সমাজে। ফলশ্রুতিতে বিপ্লবী-বিদ্রোহী হয়ে উঠছে সমাজের অগ্রসর চিন্তাচেতনায় দীপ্ত একটি শ্রেণি।

উদাহরণসরূপ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদার-মুৎসুদ্দীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ফকির-সন্ন্যাসী, শ্রমিক-কৃষক, বিভিন্ন জাতিসত্তার বিদ্রোহ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ঐতিহ্য জনগণের মুক্তির সংগ্রামে শক্তি ও অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস।

ইতিহাসই আজ আমাদের সামনে হাজির করেছে আমাদের কালের মহত্তম কর্তব্যকে। এই কর্তব্য পালনে সংঘবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে হবে লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও নানান শ্রেণি ও কর্ম পেশার মানুষকে। যেটা এখন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

একজন সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে সিকদার আবুল বাশার অনেকটা নিভৃতে এবং প্রায় একাকী ‘গতিধারা’ প্রকাশনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নানান বিষয়ের অনেক ইতিহাসগ্রন্থ প্রকাশের মতো গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফলশ্রুতিতে নতুন করে ব্যাপক ইতিহাস পাঠের এবং জানার আগ্রহ সৃষ্টি করে জাতিকে ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহী করার চেষ্টায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন।

বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের চারপাশের ঘটনাবলী এগুচ্ছে এক উল­ম্ফনের মধ্য দিয়ে। পরিবর্তনের এক চরম তাগিদ সমগ্র বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। মুক্তিকামী মানুষ আছে অন্বেষণ প্রতীক্ষায়। নতুন সকালের সাম্য-সমতার পথ বেয়েই বিকাশের লক্ষ্যে মানুষ পৌঁছাতে পারে ইতিহাসের এক নতুন পথের মোহনায়।

এতসব কাজ কোনো একটি গোষ্ঠীর একার নয়, সংস্কৃতিসেবী, লেখক, গবেষক, শিল্পী, সাধক এবং ভাবের জগতের লোকেরাই মূল্যবান-মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। মহত্তম এই কর্মপালনে আমাদের সকল সৃজনশীল ক্ষমতাকে আজ কাজে লাগাতে হবে। ‘গতিধারা’র স্বত্বাধিকারী, লেখক, গবেষক, সংস্কৃতিসেবী সিকদার আবুল বাশার অনেক বছর ধরে এই কর্মটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে আসছেন তার বিবিধ-বিচিত্রধর্মী প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে।

দেশের হারিয়ে যাওয়া জনপদের প্রাচীন ইতিহাস, চৌষট্টি জেলার মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কথা-উপকথা অনুসন্ধান ও প্রকাশের এক বিরল প্রয়াস তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। যাকে একটি চলমান উপযোগী বিধিসম্মত প্রক্রিয়া ও আন্দোলন-বিপ্লব হিসেবে মেনে নিতেই হয়। তার এ আন্দোলনে শরিক হয়েছেন সারা দেশের অসংখ্য লেখক, গবেষক, কবি, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, সংবেদনশীল পাঠক ও মুক্তিকামী মানুষ।

কেবল সারা দেশ নয়, পৃথিবীজুড়ে তার এ প্রয়াস-প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হয়েছেন অনেক বিদগ্ধ জন, দেশপ্রেমিক, আপোসহীন সংগ্রামী জনতা ও সুধীজন, যারা সিকদার আবুল বাশারকে নেতৃত্বের মহান জায়গাটিতে দাঁড় করিয়েছেন এ বিষয়ে কারো দ্বিমত পোষণের সুযোগ একেবারেই কম।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় বেশ কিছুকালযাবৎ অস্থির আতঙ্ক ও ভয়ঙ্কর ক্রূরতা যখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে উঠেছে। তখন শাসক শ্রেণিও নানাভাবে এ বিষয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে মহাবিপর্যয় ডেকে আনছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা, যা সমাজ ও রাষ্ট্রে সৃষ্টি করছে সংকট ও উন্মাদনা। অশিক্ষিত অনক্ষর কুসংস্কারাচ্ছন্ন শ্রেণি, এমনকি লেখাপড়া জানা মানুষও ধর্মের এই নতুন মাত্রায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে অদৃষ্টবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

এই যখন অবস্থা, তখন এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আজ সমানে দুটো পথ স্পষ্টভাবে খোলা। প্রথমটি, রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথ, আর দ্বিতীয়টি, সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের। সমাজমানসের সুস্থতা ও বিকাশের জন্যে রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম কোনো অংশেই ছোট নয়। বরং সাংস্কৃতিক লড়াই রাজনৈতিক লড়াইয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন পুরোধা হিসেবে আমরা সিকদার আবুল বাশারকে নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আজ পঁয়তাল্লি­শ বছর পূর্ণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কী, কেন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা, পর্যালোচনা, গবেষণা, মূল্যায়ন, মর্যাদা কোনোটিই এ জাতি পূর্ণাঙ্গরূপে করেনি। মোক্ষম এ কর্তব্যকর্মটি করলে আজ আমরা অনেক সমস্যারই সমাধান পেয়ে যেতাম। তার কারণ এ জাতির কী আছে, কী নেই প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার চেতনা আলোকবর্তিকার মতো উজ্জ্বল হয়ে পথ দেখায়।

সিকদার আবুল বাশারের ইতিহাস খোঁজার মনোবৃত্তি এবং তা লিপিবদ্ধ ও প্রকাশে তার প্রতিষ্ঠান ‘গতিধারা’ একটুও সরে আসেনি। সুদীর্ঘ অনেক বছরের শ্রমনিষ্ঠ্য কর্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে অসীম সাহস, অশেষ কৌতূহল ও উদ্দীপনায় কর্তব্যজ্ঞানে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্যের যতটুকু সম্ভব সবার কাছে পৌঁছে দেবার একটা দুর্মর-দুঃসাধ্য-দুরুহতর চেষ্টা করে চলেছেন।

কারণ তার এই সাহস, শক্তি, সাধ্য-সাধনা, প্রতীতি তিনি এই মুক্তিযুদ্ধ থেকেই পেয়েছেন, পেয়েছেন মুক্তিযদ্ধের প্রতি অপরিসীম অনুরাগ ও ভালোবাসা থেকে। আসলে যুদ্ধ অনন্ত, শেষ হয় না কখনো। পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন যুগে আমরা যে যুদ্ধ-বিশ্বযুদ্ধের খবর জানি, তা থেকে যত হারিয়ে গেছে পাওয়া গেছে তারচে’ বেশি।

এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই সিকাদর আবুল বাশারের মহৎ জীবন ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি যা মনের ভিতর লালন করেন, তারই প্রকাশ তার বিশাল কর্মের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তিনিই সিকদার আবুল বাশার যিনি মুক্তিযুদ্ধউত্তর পড়ে থাকা ভঙ্গুর-বিভৎস দেশটিকে অপার অন্তরঙ্গ মমতায় গড়ে তুলতে কিছুতেই পরাভব না মানা সৈনিক। মনন-মানসে তার প্রাণান্ত কর্মসূচি অদ্যাবধি অব্যাহত রেখেছেন।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক। অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, গাংনী ডিগ্রি কলেজ, মেহেরপুর।

 

ঢাকা, ২৯ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এএইচ