[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



প্রকৃতির আশ্চর্য সৃষ্টি ‘বগা লেক’


প্রকাশিত: March 15, 2016 , 9:47 pm | বিভাগ: আপডেট,ট্যুরিজম এন্ড এনভায়রনমেন্ট


জাকির হোসেন: বাংলাদেশ  যে কত সুন্দর সেটা বান্দরবান না গেলে হয়ত বোঝা কঠিন হবে। তবে যারা বান্দরবানের নীলাচল, মেঘলা আর নীলগিরি ভ্রমন করেই মনে করেন বান্দরবানের সব সৌন্দর্য দেখে ফেলেছেন তাদের বলছি, বান্দরবানের আরও ভিতরে যে কত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেটা শুধু গেলেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

প্রকৃতি তার আজব খেয়ালে বানিয়েছে এই “বগা লেক বা বগা কানাই হ্রদ” যা বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলায় অবস্থিত।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ ফিট বা ৬১০ মিটার উপরে আবদ্ধ এই লেকের আয়তন ১৫ একর। এই লেকের গড় গভীরতা ১২৫ ফিট এবং দৃশমান কোন পানির উৎস নেই।

আরও অনেক নিচে অনেক ঝরনাতে পানি না থাকলেও প্রকৃতি কি এক অজানা কারনে এই পাহাড়ের চূড়ায় বছরভরা টলটলে পানিতে ভরপুর করে রাখে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই লেকে যাওয়ার রাস্তা খুব সহজতর নয়। বম (বাংলাদেশি উপজাতি) ভাষায় বগা হল ড্রাগন বা এই জাতিও প্রাণী। আর তার নাম থেকেই এসেছে বগা লেকের নাম।

স্থানীয় বম উপকথা অনুযায়ী এখানে পাহাড়ের গুহায় কোন এক কালে একটা ড্রাগন বাস করত, এবং মাঝেমধ্যে বাচ্চা বা গবাদিপশু হারিয়ে যেতো।এলাকার কিছু সাহসী পুরুষ এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পায় পাহাড়ের গুহায় দৈত্যাকৃতির ওই ড্রাগন। সবাই মিলে লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ করে মেরে ফেলে আর কেটে ভাগ করে নেয় খাওয়ার জন্য।

পাড়ার সবাইকে সেই মাংস বিলিয়ে দিলেও এক বুড়ি আর তার নাতনী খায়নি সেই মাংস। তারা স্বপ্ন দেখে যেন ওই মাংস তারা না খায় আর চলে যায় ওই পাড়া ছেড়ে। পরদিন সকালে তারা চলে যায় আর সাথে সাথেই পুরা বম পাড়াটা হারিয়ে যায় এক বিরাটকার এক লেকের মাঝে।  সেই সূত্র ধরেই এই লেকের নাম হয়ে যায় বগা লেক বা বগা কানাই হ্রদ।

একটা সেমিস্টার ফানাল পরীক্ষা শেষ মানেই নতুন কোন ট্যুরের পরিকল্পনা শুরু। আর তারই ধারাবাহিতায় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ৬ বন্ধু মিলে শুরুকরি বান্দরবান অভিযাত্রা। হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯ এ ফেব্রুয়ারি রওনা দেই বান্দরবান এর পথে আশা একটাই নির্মল প্রকৃতিতে নিজেদের হারিয়ে ফেলা।

বান্দরবান পৌঁছে পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারি সারাদিনে ‘মেঘলা’ আর ‘নিলাচল’ পর্যটন কেন্দ্র দেখে শেষ করতেই রাতের কাল আধাঁর এসে আমাদের যাত্রাপথকে থামিয়ে দেয় বান্দরবান তুলা উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউসে।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে খুব ভোরে বান্দরবান থেকে রওনা দেই রুমার উদ্দেশ্য। যখন বান্দরবান শহরতলী পার হচ্ছিলাম সেই সময়ে পাহাড়ি আর বাঙালিদের অপূর্ব মিলনমেলায় শহিদ মিনারে ফুল দেয়ার দৃশ্যপট যেন আজও অমলিন হয়ে আছে স্মৃতির পাতায়।

বান্দরবান থেকে শুরু হয় পাহাড়ি পথে বাস জার্নি। এক পাশে পাহাড়ি রাস্তা আর অন্য পাশে নিচু খাদ, এ যেন এক মায়াময় আর ভয়াবহ পরিবেশ।

বাস চলছে আর মনে হচ্ছে দুরের মেঘ আর পাহাড় গুলো আমাদের সাথে সঙ্গ দিচ্ছে।  কখনো বাস উঁচু পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে আবার কখনো উঁচু থেকে নিচে। জীবনের অন্যতম সুন্দর বাস জার্নি ছিল এটি। বাসে বসে যে মায়াবী সৌন্দর্যরূপ দেখেছিলাম তা লেখার মত ভাষা আমার জানা নেই।

ইচ্ছে হয়েছিল ওই পাহাড়ের পাশে একটা ঘর বানিয়ে কাটিয়ে দেই বাকিটা জীবন। যাত্রাপথে দেখতে পেয়েছিলাম জলপ্রপাতসহ নাম না জানা ডজন খানেক ঝরনা।

বসন্তের শুরুতে হওয়াতে অনেক ঝরনাতে পানি ছিল না। ইতিমধ্যে কয়েকবার দেখা হয়েছে বান্দরবানের চিরযৌবনা নদী সাঙ্গুর সাথে।

পাহাড়ি এই সাঙ্গু নদীর আঁকাবাঁকা বয়েচলা আপনাকে নিয়ে যাবে অকৃত্রিম আনন্দঘন এক জগতে। এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যরূপ দেখতে দেখতে রুমা বাজারে পৌঁছেছিলাম ১১ টায়।

রুমা বাজার বেশ ছিমছাম যেখানে বাঙালি আর উপজাতি মিলেমিশে ব্যবসা আর বসবাস করে। দুপুরের খাওয়া শেষ করে একজন গাইড নিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে নিজেদের নাম, ফোন নম্বর লিখে চাঁন্দের গাড়িতে শুরু হয় বগা লেক দর্শনের দ্বিতীয় ধাপের যাত্রারম্ভ।

চাঁন্দের গাড়ি সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। দেখতে অনেকটা পিকাপের মত, তবে গায়ে হাতির শক্তি। রুমা থেকে কমলা বাজার (বগা লেকের নিচে পাহাড়ের সমতলে অবস্থিত) পর্যন্ত শুধু মাত্র শুকনোর সময় চাঁন্দের গাড়ি চলে।

চাঁন্দের গাড়ি হচ্ছে জীবন্ত রোলার কোস্টর, আপনার হার্ট দুর্বল হলে এই ২৯ কিলোমিটার আপনার হেটে যাওয়া শ্রেয়। যখন নিচ থেকে পাহাড়ের উপরে খুব দ্রুততর সাথে উঠতে থাকে তখন সবাই পিছনে হেলে জানে পানি না থাকার উপক্রম হয়েছিল।

আবার যখন উচু কোন পাহাড় থেকে তর-তর করে নেমে যায়, তখন সবাই একে অন্যের গায়ের উপর পড়ার উপক্রম। সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর রোমান্সকর পাহাড় চড়ার অভিজ্ঞতা পাবেন আপনি।

আমরা কমলা বাজার পৌঁছায় দুপুর ৩ টার দিকে। এখান থেকে বগা লেকে যেতে হবে পুরোটাই হেটে। আমাদের গাইড সিয়াম থান বম এর সাথে রওনা হলাম পাহাড়ি বুনো পথে।

কমলা বাজার থেকে প্রায় ১০০০ ফুট হাটা পায়ে উপরে উঠতে গিয়ে যে কারো ঘাম ঝরতে বাধ্য। আমরা ৬ জন জুয়েল, ইমরান, ফখরুল, হুমায়ুন, কামরুল এবং জাকির। কমলা বাজার থেকে কেনা লাঠিতে ভর দিয়ে যখন পাহাড়ের একটা চূড়ায় এসে পৌঁছালাম।

তখন বগা লেক আমাদের সামনে হাজির এক বিশালত্ব নিয়ে, পথের সব ক্লান্তি দূর করে এর অনাবিল আনন্দে ভরে উঠেছিল মন। সিয়াম দিদি (স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ি) আমাদের থাকার জন্য একটি ঘর খুলে দিল, যেটা ছিল বগা লেকের ঠিক পাড়ে অনেকটা ভিতরের দিকে।

ঠিক আবাসিক হোটেল বলা চলে না, ঢালাও বিছানা ঘুমাতে হয় সবাইকে। পরদিন দুরন্তপনা ছেলেদের মত ঝপিয়ে পড়েছিলাম বগালেকের স্বচ্ছ পানিতে আর জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম সমগ্র দিনেরশ্রম।

সে দিন ছিল পূর্ণিমার ঠিক আগের রাত, তাই বগা লেকে জ্যোৎস্না বিলাসিতা করতে ভুল হয়নি। এতক্ষণে রাতের খাবার তৈরি শেষ করেছেন সিয়াম দিদি।

রাতে পাহাড়িদের জুমের চালের ভাত, পাহাড়ি জাতীয় খাবার পেপে, ডিম, সবজি আর ডাল সাথে ঝরনাধারার বিশুদ্ধ পানি। রাতে বগালেক থেকে বয়ে আশা বাতাস, বগালেকের গল্পগুজব শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে তলিয়ে গিয়েছিলাম।

কিভাবে যাবেনঃ
দু’ভাবে আপনি বগা লেক যেতে পারেন। তবে যে ভাবেই যান না কেন আপনাকে রুমা বাজার যেতে হবে।  রুমা বাজার পর্যন্ত বান্দরবান শহর থেকে বাস অথবা চাঁন্দের গাড়িতে যেতে হবে।

বান্দরবান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস থাকে সকাল ৭ টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত,  ভাড়া ১০০ টাকা।  চাঁন্দের গাড়ি আপনাকে রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে হবে, ভাড়া কম বেশি ৩০০০ থেকে ৫০০০ হাজার।

রুমা থেকে প্রয়োজনীয় বাজার করে নিতে পারেন। ভাড়া ২০০০ এবং ২৫০০ টাকা। ১৫ থেকে ২০ জন যেতে পারবেন। আর অ্যাডভেঞ্চার করতে চাইলে এই ২৯ কিলোমিটার পথ হেটেই পাড়ি দিতে পারেন। বগা লেকে থাকতে হলে আপনাকে জন প্রতি দিনে ১০০ টাকা দিতে হবে।

যে খাবার আপনি খান না কেন তা প্রতি বেলা ১০০ টাকার কম নয়। তবে রুমা থেকে সাথে আনা খাবার ও রান্না করে খাওয়ার সুবিধা পাবেন। তবে খেয়াল রাখবেন সেটি যেন উটকো ঝামেলার কারণ না হয়ে যায়।

 

ঢাকা //১৫ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএইচবি