[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



পুরনো দিনের গন্ধ


প্রকাশিত: March 23, 2016 , 10:57 pm | বিভাগ: আপডেট,আর্টস এন্ড লিটারেচার


45

 

 

 

 

 

 

 

প্রবীর বিকাশ সরকার:

লিটল ম্যাগ তথা ছোট কাগজের রাজধানী হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম স্বাধীনতার পর পর। আমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে (১৯৭৮-১৯৮৪) আমি দেখেছি লিটল ম্যাগাজিনের কী বিপ্লব ঘটেছিল সেখানে! বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, শহরের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আনাচেকানাচে নানা বর্ণের নানা নকশার প্রচ্ছদসম্বলিত বৈচিত্র্যময় লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো। ছড়ারই তো অনেক সংকলন প্রকাশিত হয়েছে! আমার কাছে মনে হতো যেন প্রতিদিনই একাধিক সাহিত্যের লিটল ম্যাগ চট্টগ্রামে বের হতো! কী ভালোই না লাগতো সেগুলো সংগ্রহ করে পড়তে! অভিভূত হতাম ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, বই ও ম্যাগাজিনের আলোচনা পাঠ করে! বহু লিটল ম্যাগ আমার সংগ্রহে ছিল যেগুলো জাপান প্রবাসী আসার আগে বিক্রি করে দিয়েছি। জানি না এখন তেমন করে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় কিনা চট্টগ্রামে।

জাপানে আসার পর অনেক ম্যাগাজিন বন্ধুরা ডাকযোগে পাঠিয়েছে সেগুলোর কিছু এখনো রয়েছে। এদের মধ্যে ‘কালধারা’–শিল্প সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকার একটি সংখ্যা এবারের আলোচ্য বিষয়। সংখ্যাটি কার্তিক ১৮০৩/নভেম্বর ১৯৯৬ সালের। কাগজটির সম্পাদনা পরিষদে রয়েছেন শাহ আলম নিপু, নিতাই সেন, আকাশ মাহমুদ এবং মোহীত উল আলম। প্রচ্ছদ এঁকেছেন স্বনামধন্য শিল্পী ও কবি খালিদ আহসান।

গল্পকার শাহ আলম নিপু ও কবি মোহীত উল আলমের অনেক লেখা পড়েছি, পড়েছি কবি নিতাই সেনেরও। ওই সময় চট্টগ্রামে প্রকাশিত সাহিত্য সংকলনে এদের লেখা প্রায়শ দেখা যেতো।

আলোচ্য সংখ্যাটির সম্পাদক কবি নিতাই সেন। তাঁকে নতুন করে পরিচিত করে দেবার প্রয়োজন নেই তিনি খুবই পরিচিত মুখ এবং কবিতায় ব্যাপক প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন।

কালধারা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ম্যাগানজিনটি কি মাসিক নাকি ত্রৈমাসিক কোথাও উল্লেখ নেই। তবে নিতাই সেন লিখিত অসাধারণ সম্পাদকীয়টি থেকে জানা যায় সংখ্যাটি মহান বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে জন্ম নিয়েছে। আবার স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পূর্তি রজত জয়ন্তী-সংখ্যাও বলা যেতে পারে। সে যাই হোক, অত্যন্ত ঋদ্ধ একটি সংখ্যাটি তা আর না বললেও চলে।

স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী উপলক্ষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রবল উত্থান নিয়ে ‘আসুন, ভালোবাসার অমোঘ অস্ত্রে শাণিত হই’ শীর্ষক বলিষ্ঠ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন এ.কে. শেরাম। কবি ও প্রবন্ধকার তপন বাগচী লিখেছেন ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা: উজ্জ্বল পঙক্তিমালা’ নামক কবিতার আলোচনা। সুখপাঠ্য রচনা। মন কেড়ে নেবার মতো ছোট্ট একটি নিবন্ধ ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে ‘পথ ও পথিক” লিখেছেন সেলিম আলফাজ। মো. আব্দুল আজিজ লিখেছেন ‘উত্তরাধিকারের ঋণ: গোপাল হালদার স্মরণে’ একটি অত্যন্ত মূল্যবান রচনা। ১৯০২ সালে বিক্রমপুরে জন্ম (মৃত্যু ১১৯৩) গোপাল হালদার শুধু একজন প্রভাবশালী কমিউনিস্টই ছিলেন না, ছিলেন স্বদেশি বিপ্লবী, সংস্কৃতিসেবী, গুণী সম্পাদক এবং সুসাহিত্যিক। জেনে অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো। সিলেটের কিংবদন্তিতুল্য ছড়াকার, কবি ও গীতিকার দিলওয়ারকে নিয়ে লিখেছেন এ.কে. শেরাম ‘কবি দিলওয়ার: জীবন ও কৃতি’–সংবেদশীল এই নিবন্ধে জানা গেল অনেক তথ্য এই কবি সম্পর্কে। তিনি যে একজন আন্তর্জাতিক কবি এটা মনে হয় অনেকেই জানে না। নিবন্ধের সঙ্গে যুক্ত তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন নিতাই সেন, ইশতিয়াক আলম ও এ. কে. শেরাম।

সুখ্যপাঠ্য কবিতা লিখেছেন তৌহিদ আহমেদ, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত (পশ্চিমবঙ্গ), রাণা চট্টোপাধ্যায় (পশ্চিমবঙ্গ), সুভদ্রা ভট্টাচার্য, কাজী রব, অরুণ দাশগুপ্ত, রেজাউল করিম চৌধুরী, মাহবুব হাসান, বিমল গুহ, মোহীত উল আলম, আকাশ মাহমুদ, সাথী দাশ, মুজিব মেহদী, মতিন বৈরাগী, সুজন হাজারী, নৃপেন্দ্র লাল দাশ, বিপ্লব বিজয় বিশ্বাস, আলী ইদ্রিস, মানস কুমার চিনি, জয়দুল হোসেন, অনিন্দ্য জসীম, নীলাঞ্জন বিদ্যুৎ, পাঁশু প্রাপণ, ফেরদৌস কাসেম, শেরাম নিরঞ্জন, মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন, মুকুল সেন, অরুণ সেন এবং সনাতন হামোম। ছড়া লিখেছেন বিপুর বড়ুয়া এবং প্রদীপ চৌধুরী।

ভালোলাগায় টইটুম্বুর তিনটি ছোট গল্প লিখেছেন মনি হায়দার / দৃশ্যপটের পোকা, কাজী সাইদুর রহমান রাজা / বৃত্তান্তর এবং যাযাবর মিন্টু / জলভূত।

তিনটি গ্রন্থের আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে কবি দিলওয়ার হোসেনের ‘কবিতার কবুতর’ আলোচনা করেছেন কবি অরুণ দাশগুপ্ত; কবি নিতাই সেনের ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ আলোচনা করেছেন কবি জয়দুল হোসেন এবং প্রবীর বিকাশ সরকারের ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ ছড়াগ্রন্থের আলোচনা করেছেন কবি নিতাই সেন।

43

আমার ছড়াগ্রন্থের আলোচনাটি এখানে তুলে দিলাম:

ছড়া নয় কথার বুলেট
নিতাই সেন

‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ জাপান প্রবাসী তরুণ ছড়াকার প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রথম ছড়ার বই। বইটির পেছনের কভারে সুন্দরভাবে ফুটে আছে প্রবীরের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। স্ত্রী নোরিকো মিয়াজাওয়াকে উৎসর্গীত এ মনোরম বইটি মানচিত্র পাবলিশার্স জাপান থেকে প্রকাশিত এবং বাংলাদেশ থেকে মুদ্রিত।

বইটিতে মোট ২৫টি ছড়া আছে। প্রত্যেকটি ছড়া স্বদেশপ্রেম, মানবমুক্তি, সাম্য ও স্বাধীনতার অম্লান-ভাস্কর্যশৈলীতে নির্মিত। দেশ ও কালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো ছড়া নয়, এগুলো বন্ধন মুক্তির বুলেট। নতুন প্রজন্মের ছড়াকার প্রবীরের ভেতর নির্জন দ্বীপের মতো জেগে আছে স্বদেশ-স্বাধীনতা এবং এর প্রধান স্থপতি শেখ মুজিবের স্বপ্নভরা ছবি। প্রবাসী হয়েও প্রগতির রক্তধারা প্রবীরের ভেতর প্রবাহিত। তাই তার ছড়াতে দেখতে পাই সত্যসন্ধানী দিব্যদৃষ্টি। প্রথম ছড়াতেই দেখতে পাই ইচ্ছে করে ভুলে থাকা অথবা বলা যায় ইচ্ছে করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা আমাদের সেই স্বাধীনতা ও স্বর্ণময় অর্জনের কথা। জাতির পিতাকে জাতির পিতা বলে স্বীকার করে নিতে আমাদের ভেতরে যে গ্লানিবোধ তার পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করে প্রবীর বলেন:

‘নিজের দেশে মিথ্যে বলো
অন্য দেশে পারবে না,
সত্য তোমায় বলতে হবে
বিশ্ববাসী ছাড়বে না।’ (জাতির পিতা)

জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা এভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন প্রবীর।

একাত্তরের খুনী, রাজাকার, ধাঁধা, ক্ষমা নেই প্রভৃতি ছড়াতেও ত্রিশ লক্ষ লোকের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। এগুলো ছড়া নয় রক্তের ঋণ স্বীকার।

এরকম সহজ সরল স্বীকারোক্তি আমাদের চেতনায় নতুন বিশ্বাসের জন্ম দেয় যখন প্রবীর অকপটে বলেন:

‘যুদ্ধ করে দেশ পেয়েছি
আমার দেশে পোদ্দারী,
সময় আছে জাগার আগে
গুটিয়ে নে তোর জোতদারী।’ (রাজাকার)

অত্যন্ত সময় ও ইতিহাস সচেতন প্রবীর। তাই তার ছড়াতে যেমন উঠে এসেছে মহামান্য এরশাদ, তেমনি উঠে এসেছে জাগতিক সময়ের সন্তান, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি, সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি এবং বাঙালী জীবনের বিবিধ টানাপোড়েন। বাঙালী, কলের পুতুল, ছাত্র, নয়া দালাল, উটকো, এই দেশে কারা ভালো, ফেমোক্র্যাসি, সৌখিন বেড়াল, ডাকাত গণতন্ত্রী, সন্ত্রাসী, মন্ত্রী ও আমলা, বাজেট, বাংলাদেশের রেল প্রভৃতি ছড়াগুলো এর উদাহরণ। উল্লেখযোগ্য লাইন হচ্ছে:

ক. ‘দেশ জনতা যাক না চুলায়
মুই তো আছি বেশ,
ডাবের জলে মুখ ধুই আর
গোলাপজলে কেশ।’ (কলের পুতুল)
খ. ‘সন্ত্রাসীরা অস্ত্র চালায়
চার খলিফার ছায়ায়,
বেতার টিভি বুঁদ হয়েছে
চাচীর রূপে মায়ায়।’ (ফেমোক্র্যাসি)
গ. পুলিশেরা প্রেমে পড়ে
সন্ত্রাসী ডাকাতের,
বস্তির মস্তান
টাকা পায় জাকাতের। (ঢাকার ছড়া)

প্রবীর রাজনীতি সচেতনও। সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা হালের ঘটনা নিয়ে লেখা সাহসী উচ্চারণ ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে।’ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সময়োপযোগী এ বক্তব্য:
‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে
দুই সতীনের ঝগড়া,
মধ্যিখানে বাঁদর নাচে
দাঁড়িয়ে হাসে ঠগরা।

বাঁদরগুলো আর কেহ নয়
দুই সতীনের চামচা,
টানাটানির মধ্যে পড়ে
খুলছে বরের গামছা।’ (উ.পি.বু.ঘা)

দু’একটি ছন্দপতন ঘটেছে কিছু কিছু ছড়ায় যা তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মার্জনীয়। সার্বিক বিচারে বইটি সরস, সুখপাঠ্য ও সমাজমনস্ক। ছাপা সুন্দর ও নির্ভুল। সৈয়দ এনায়েত হোসেনের প্রচ্ছদ এবং তারেক নাজিবের মনোরম অলংকরণে বইটি ছড়া সাহিত্যের জগতে নতুন সংযোজন। অফসেট পেপারে মাত্র পঁচিশ টাকা মূল্যের এ বইটি ছোট বড় সকলের ভালো লাগবে এবং সংগ্রহযোগ্য। এ বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

 

ঢাকা, ২৩ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএইচ