[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



এক জীবন এক ইতিহাস


প্রকাশিত: May 23, 2016 , 6:32 pm | বিভাগ: আপডেট,আর্টস এন্ড লিটারেচার


Noorjahan+begum-live

লাইভ প্রতিবেদক: পত্রিকার নাম ‘বেগম’। সম্পাদকের নাম নূরজাহান বেগম। এক জীবন এক ইতিহাস।

নূরজাহান বেগম বাস্তব থেকে স্মৃতির জগতে যাত্রা শুরু করেছেন। মানুষের ভালবাসা, শ্রদ্ধায় তিনি ভেসেছেন। যদিও পাওয়া না পাওয়ার হিসাব তার ছিল না। স্বপ্নাবিষ্ট পথিকের সে হিসাব থাকেও না। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বলতে একমাত্র রোকেয়া পদকই পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সরকার প্রতি বছরই স্বাধীনতা ও একুশে পদক দিচ্ছে। ৯১ বছরের জীবদ্দশায় নূরজাহান বেগম রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ দুটি পদক পাওয়ার ‘যোগ্য’ হয়ে উঠতে পারেননি। মৃত্যুর পর যে তিনি স্বাধীনতা ও একুশে পদকের ‘যোগ্য’ হয়ে উঠবেন না- আমাদের সংস্কৃতির দিকে তাকিয়ে সে বিষয়টি কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

নূরজাহান বেগম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ছিল ‘নূরী’। খেলার সাথীরা ডাকত ‘মালেকা’, চাচীরা ডাকতেন ‘নুরুননেছা’। স্কুলে ভর্তি করার সময় বাবা নাম রাখেন নুরুন্নাহার। একবার তার নানি কলকাতায় ওয়েলেসলি স্ট্রিটে বেড়াতে এলে নূরীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে নাতনীর নাম রাখেন ‘নূরজাহান বেগম’।

নূরজাহান বেগমের বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ছিলেন প্রখ্যাত ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মা ফাতেমা খাতুন ছিলেন গৃহিনী।

ছোটবেলায় পারিবারিকভাবেই নূরজাহান বেগম আলোর স্পর্শে এসেছিলেন। মুসলমানদের জন্য বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য পরিষদ ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’ প্রতিষ্ঠা করেন তার বাবা নাসিরউদ্দিন। পরে নাসিরউদ্দিন কলকাতা থেকে ১৯১৮ সালে বাংলার প্রথম আধুনিক সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সওগাত’ প্রকাশ করেন।

নূরজাহান বেগমের শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়িতে মা, মামা, দাদী, নানীর সঙ্গে। বাবা থাকতেন কলকাতায় ১১ নং ওয়েলেসলি স্ট্রিটের একটি দোতলা বাড়িতে। দোতলার একদিকে ছিল সওগাত পত্রিকার অফিস। নাসিরউদ্দিন স্ত্রী ও কন্যাকে ১৯২৯ সালে কলকাতায় নিয়ে আসেন।

সওগাত পত্রিকা অফিসে নিয়মিত সাহিত্য মজলিস বসত যেখানে যোগ দিতেন কাজী নজরুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, হাবীবুল্লাহ বাহার, ইব্রাহীম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ৷ এই সাহিত্য মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন নূরজাহান।

নূরজাহানকে প্রথমে কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। পরে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন বেলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। পঞ্চম শ্রেণিতে আবার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হন।

১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক (ম্যাট্রিকুলেশন) পাশ করেন। এরপর আইএ ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। তিনি লেডি ব্রেবোর্ন থেকে ১৯৪৪ সালে আইএ পাশ করে বিএ-তে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৬ সালে বিএ পাস করেন।

স্কুল ও কলেজ জীবনে নূরজাহান বেগম বিভিন্ন সামাজিক, সংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। নূরজাহান বেগমের পছন্দের খেলা ছিল ব্যান্ডমিন্টন।

লেখাপড়া শেষ করা আগেই বাবার ‘সওগাত’ অফিসে বসতের নূরজাহান। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯২৭ সালে মাসিক সওগাতে ‘জানানা মহল’ নামে প্রথম মহিলাদের জন্য একটি বিভাগ চালু করেন। কিন্তু মেয়েদের এগিয়ে না আসার কারণে বছরে একটি সওগাতের নারী সংখ্যা বের করার সিদ্ধান্ত নেন। নাসিরউদ্দীনের উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ‘বেগম’ এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি। মূল্য ছিল চার আনা। প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল বেগম রোকেয়ার ছবি।

এর কার্যালয় ছিল কলকাতার ১২ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিটের বাড়িতে। ‘বেগম’ এর প্রধান সম্পাদক হন বেগম সুফিয়া কামাল, নূরজাহান বেগম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে নূরজাহান বেগমই এর সার্বিক দেখাশুনা করতেন। ‘বেগম’ পত্রিকায় মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল- নারী জাগরণ, কুসংস্কার বিলোপ, গ্রামে-গঞ্জের নির্যাতিত মহিলাদের চিত্র, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জীবনবোধ থেকে লেখা চিঠি এবং মণীষীদের জ্ঞানগর্ভ বাণী। ১৯৪৭ সালেই সম্পাদকের দায়িত্ব নেন নূরজাহান।

নারী জাগরণ, নতুন লেখক সৃষ্টি, সাহিত্য ও সৃজনশীলতায় নারীকে উৎসাহী করতে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ‘বেগম’ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছিলেন নূরজাহান বেগম। যদিও অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল বারবার।

প্রথম দিকে ‘বেগম’ এর প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশ করতে নূরজাহান বেগমকে খুবই পরিশ্রম করতে হয়। লেখিকার সংখ্যা ছিল কম। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লেখা, ছবি সংগ্রহ করতেন। এদিকে পত্রিকায় মহিলাদের ছবি তোলা এবং ছাপাতেও ছিল অনেক ঝামেলা।

অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন নূরজাহান বেগম। একটি হিন্দু পরিবারের সঙ্গে বাড়ি ও প্রেস বিনিময় করেন। সে অনুযায়ী পুরনো ঢাকার পাটুয়াটুলীতে (লয়াল স্ট্রিট) প্রেস স্থাপন ও শরৎগুপ্ত রোডের একটি বাড়িতে বসবাসের জন্য উঠেন তারা। এখনও পাটুয়াটুলীর সেই প্রেস থেকে ‘বেগম’ প্রকাশিত হয়।

পত্রিকা প্রকাশ সহজ করতে ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বেগম ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রেসিডেন্ট হন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, সেক্রেটারি হন নূরজাহান বেগম এবং বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন এর অন্যতম উপদেষ্টা। নানা অসুবিধার কারণে ১৯৭০ সালে ক্লাবটি বন্ধ হয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সঙ্গে ১৯৫২ সালে বিয়ে হয় নূরজাহান বেগমের। ১৯৯৯ সালে মারা যান দাদাভাই। নূরজাহান বেগমের দু’মেয়ে- ফ্লোরা নাসরিন খান ও রিনা ইয়াসমিন আহমদ।

নূরজাহান বেগম একটি দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছি। আশা করছি, আমি যখন থাকব না, আমার দুই মেয়ে তখন আমার ইচ্ছা পূরণ করবে। বেগম পত্রিকার প্রকাশ তারা অব্যাহত রাখবে।’

তিনি এখন নেই, সোমবার (২৩ মে) সকালে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু স্বপ্ন তো অনিঃশেষ। বেগম আর নূরজাহান বেগম। যেন এক জীবন এক ইতিহাস।

ঢাকা// ২৩ মে, (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এএইচবি