[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



হেডফোন, বিপত্তি যত কানের


প্রকাশিত: May 27, 2016 , 10:39 pm | বিভাগ: ইয়াং স্টাইল


870810b1-e734-4f5c-ab16-69e860412897

লাইভ প্রতিবেদক: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি ছবির নাম ‘শব্দ’। যেখানে ফোলি-শিল্পী তারেকর দেখা গিয়েছিল এক অদ্ভুত সমস্যা। স্টুডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ তৈরির শৈল্পিক নেশায় ডুবে সে সাধারণ মানুষের কথায় মনযোগ দিতে পারতো না। তার কান শুধু শব্দ শুনতো। হেডফোন ছাড়া মানুষের কণ্ঠস্বর তার মাথায় পৌঁছতো না।

অভিনয় হলেও বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই শুধুমাত্র লাইফস্টাইলের কারণেই এই জাতীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হাতে মুঠোফোন, কানে হেডফোন। আর যদি হয় স্মার্টফোন সঙ্গে ইন্টারনেট। বিশ্ব বন্ধি একটি ‘যন্ত্রে’।

সুরের প্রতি আগ্রহ নেই এমন মানুষ খুবই নগণ্য। তবে সুরের মাঝে ডুবে থাকতে গিয়েই যত বিপত্তি।

বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা (হু)র তথ্য মতে, বিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি যুবক-যুবতী শ্রবণক্ষমতা হারানোর দোরগোড়ায় রয়েছে। সৌজন্যে, ব্যক্তিগত অডিও গ্যাজেটের লাগামহীন ব্যবহার।

মধ্যম ও বেশি আয়ের দেশগুলোতে চালানো জরিপ বিশ্লেষণ করে ‘হু’-এর আশঙ্কা, ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ৫০ শতাংশ বিপদজনক শব্দসীমার মধ্যে আছে। কলকাতার ছবিও কিন্তু এই ভয়েরই আভাস দিচ্ছে।

ইএনটি বিশেষজ্ঞ অরুণাভ সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘দীর্ঘ সময় ধরে ইয়ারফোন লাগিয়ে রাখার জন্যই ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের কানের সমস্যা বাড়ছে। আর তা থেকে অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও।’’ কানে টিউমারের সংখ্যাও বাড়ছে। অন্যান্য কারণের সঙ্গে ইয়ারফোন বা হেডফোনে খুব জোরে গান শোনা এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

নাইটক্লাবের একটানা নিচু ফ্রিকোয়েন্সিতে ‘বুম বুম’ আওয়াজ নিয়মিত শুনলেও সমস্যা হয়, বলছিলেন ইএনটি বিশেষজ্ঞ দীপঙ্কর দত্ত। ঝিঁ ঝিঁ পোকার মতো একটা গুনগুন শব্দ তখন কানে বাজতে থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় একে বলে ‘টিনিটাস।’ সম্প্রতি বলিউডের ছবি ‘সাউন্ডট্র্যাকে’ও এই সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে সুরের মাঝে ডুবে থাকার আগ্রহ এত বেশি কেনো?
বলছিলেন মনোবিদ প্রশান্ত রায়,  ‘‘ভালোলাগা থেকে শুরু হলেও গান শোনার অভ্যাসটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে নেশায়।’’

মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘আমরা পাবলিক স্পেসেও নিজের জন্য একটা কমফর্ট জোন খুঁজে নিতে চেষ্টা করি। চারপাশের মানুষজনের প্রতি যে উদাসীনতা এখন দেখা যায়, ইয়ারফোনে মগ্ন থাকা কিছুটা সেই প্রবণতারই লক্ষণ।”

ট্রেনে-বাসে বই বা ম্যাগাজিন পড়ার মধ্যে মন ও মস্তিষ্কের যে সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে, ইয়ারফোনে গান শোনার মধ্যে তা নেই।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রামের মতে, এর পিছনে আত্মকেন্দ্রিকতা তো আছেই। আবার শব্দদূষণের হাত থেকে বাঁচতেও অনেকে বেছে নিচ্ছেন এই পথ। একটা বড় অংশের কাছে আবার ব্যক্তিগত বা কর্মক্ষেত্রের ‘একঘেয়েমি’ থেকে হাঁফ ছাড়ার উপায় হল এই ইয়ারফোন। কিন্তু এক পর্যায়ে মানষিক শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে বলে আশংকা করছেন চিকিৎসকরা। এক অদ্ভুত উদাসীনতা ভুলিয়ে দিচ্ছে মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের স্বাভাবিক অভ্যাস।

মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ফ্রিসটার্প গবেষণায় দেখাচ্ছেন, এই প্রজন্মের ‘ইয়ারফোন অবসেশন’ থেকে দুটি সমস্যার জন্ম হতে পারে। ‘লার্নেড ডেফনেস’ বা অভ্যাসগত বধিরতা আর ‘জেনারেশনাল অ্যামনেশিয়া’ বা প্রজন্মগত স্মৃতিভ্রংশতা। কান কেবল এক ধরনের শব্দ শুনতে শুনতে হারিয়ে ফেলতে পারে তার সহজাত ক্ষমতা।

এমনিতেই এই প্রজন্মের প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব খুব বেশি। তাই নির্জন স্থানে গিয়েও পাখির ডাক, ঝর্নার শব্দ কানে হয়তো পৌঁছবে না। ইয়ারফোন সব সময় লাগিয়ে রাখার ফলে কান পেতে শব্দ শোনার ক্ষমতা হয়তো হারিয়ে ফেলবে তারা।

শুধু নতুন প্রজন্মকে দায়িভার দিয়ে দিলেই চলছে না কেনোনা প্রবীণরাও কোনো অংশে পিছিয়ে আছে তা নয়। যার প্রমাণ মেলে বাস, ট্রেন, রাস্তা-ঘাটে। এই অবসেশনের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে তথ্য প্রযুক্তিরই সাহায্য নিতে বলছেন চিকিৎসকেরা।

বিভিন্ন স্মার্টফোন অ্যাপের সাহায্যে নজর রাখা যেতে পারে শব্দ বিপদসীমা ছাড়িয়েছে কি না। ‘নয়েজ ক্যানসেলিং’ ইয়ারফোন ব্যবহার করাই অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন ডাক্তাররা। এতে বাইরের শব্দকে হটানোর জন্য শব্দ বাড়ানোর সুযোগ থাকে না।

 

ঢাকা, ২৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম//এএইচ