[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষক সঞ্জিত চক্রবর্তীর স্বপ্ন


প্রকাশিত: June 13, 2016 , 10:58 pm | বিভাগ: ইন্টারভিউ


shonjib-2

মামুন চৌধুরী: সঞ্জিত চক্রবর্তী। একটি নাম। একটি আন্দোলন। তবে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটি একটি শিক্ষার আন্দোলন। যা দুনিয়াজুড়ে হচ্ছে। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েই তিনি আলোচনায় এসেছেন। স্থান করে নিয়েছেন দেশ-পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও।  তার বয়স আটষট্রি (৬৮)।

তার চোখের আলো না থাকলেও মনেরশক্তি প্রবল। বর্তমানে তিনি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের গঙ্গানগর গ্রামের বাসিন্দা। তাকে সকলেই এ এলাকায় শিক্ষক হিসেবে চেনে। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা সুধীর চক্রবর্তীর পুত্র সঞ্জিত চোখের আলো নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রোগে আক্রান্ত হয়ে সেই কিশোর বয়সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। তাই তার লেখাপড়া আটকে যায় নবম শ্রেণিতেই।

অর্থাভাবে চিকিৎসা না হওয়ায় এসএসসি পরীক্ষার আগেই তিনি চোখের আলো হারিয়ে ফেলেন। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে বলেও কারোর ওপর নির্ভরশীল হতে চাননি তিনি। সাহসে ভর করেই পথ চলেছেন। বয়স হয়েছে। তারপরও তিনি থেমে থাকেন নি।

জীবনের চাকা থামতে দেননি। তিনি গ্রামের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিচ্ছেন। সকাল-বিকাল বই, খাতা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে কোমল মতি শিশুদের তার বাড়ির উঠোনে মাদুরে বসে পড়তে দেখা যায়। তাদের নিরলস পাঠদান করছেন সঞ্জিত চক্রবর্তী। পাঠকদের জন্য এই মহান শিক্ষকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতার চৌম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনি কেমন আছেন?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : তেমন ভালো নেই। অন্ধ হয়ে কি করে ভালো থাকা, তারপর আবার বয়স হয়েছে। কোন সময় যে পরপারে চলে যাব।

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনি কীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারালেন, আর কেমন করে শিক্ষকতার এই মহান কাজে এলেন?

সঞ্জিত চক্রবর্তী : মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের এক  মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। শ্রীমঙ্গল আহিদ উল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে আমার চোখে সমস্যা দেখা দেয়। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলেও আমি অংশগ্রহণ করতে পারেনি। টাকার অভাবে আমার চোখের উন্নত চিকিৎসা হয়নি। এতে আমি অন্ধ হয়ে যাই।

এক সময় বেড়াতে আসি মামার বাড়ি গঙ্গানগরে। এ সময় মামা আমাকে বলেন সঞ্জিত তোর মামাতো ভাই সমীরণ চক্রবর্তী শঙ্কুকে লেখাপাড়ায় সহায়তা কর। আমি মুখে মুখে বলে তাকে সহায়তা করলাম। সেও আমার শেখানো তথ্য শ্রবণ করে ভালো রেজাল্ট করল। সেই থেকে অন্ধ হয়েও আমি শিশু থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেওয়া শুরু করলাম। শিক্ষার্থীরাও ভালো ফলাফল অর্জন করতে শুরু করল। আমি আর বাড়ি ফিরে যাইনি। মামার বাড়িতে ঘর করে স্থায়ীভাবে বসবাস করি।

ক্যাম্পাসলাইভ : কত দিন ধরে পড়াচ্ছেন? শিক্ষার্থী সংখ্যা কত?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : ১৯৮০ সাল থেকে ৩৫ বছর ধরে ৫ হাজারের ওপরে শিক্ষার্থীকে আমি পড়িয়েছি, এখনো পড়াচ্ছি। আরও পড়াবো।

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনার অন্ধ জীবনে বেশি কার সহায়তা পেয়েছেন?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : অন্ধ জীবনে আমার সংসারে এসেছে শুক্লা চক্রবর্তী। আমাকে স্বামী হিসাবে মেনে নিয়েছে। তিনি আমাকে বেশি সহায়তা করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে গর্ববোধ হয় আমার। কারণ আমি অন্ধ। তিনি আমাকে মেনে নিয়ে সংসার করলেন। শুরু থেকে বিরামহীন ভাবে সার্বিক সহায়তা করছেন। আমাদের দুই মেয়ে বিয়ে হয়ে স্বামীর সংসারে রয়েছে। এভাবে সুখেই কেটে গেছে আমার ৪৫ বছর।

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনি কীভাবে সংসার পরিচালনা করছেন?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : আমার কোনো জমি জমা নেই। আর ছেলেও নেই। কঠোর পরিশ্রম করে রোজগার করা আমারপক্ষে সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা আমাকে মাসিক যা দিচ্ছে তাই দিয়ে ডালভাত খেয়ে বেঁচে আছি। আমার শিক্ষার্থীরা কেউ ওসি হয়েছে, কেউ প্রবাসে, আবার কেউ সেনাবাহিনীতে, এভাবে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে রয়েছে। এটাও আমার একটা বড় পাওয়া। আর ডাল ভাতই আমাকে ভালো রাখছে। এর চেয়ে ভালো খাবার খেতে চাই না।

ক্যাম্পাসলাইভ : ছাত্র পড়াতে আপনার কি সমস্যা হচ্ছে?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : সমস্যা তো কিছু হচ্ছেই। বলতে চাই না। যদিও টাকার অভাবে আজও স্কুল ঘর নির্মাণ করতে না পারায় বাড়ির উঠোনে মাদুরে বসিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেও রোদ-বৃষ্টিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে আমার শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ জনের ওপরে। তাদের বসতে কষ্ট হচ্ছে।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনি শিক্ষার্থীদের কীভাবে পাঠদান করান?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : স্ত্রী শুক্লা সময় হলেই আঙিনায় বিছিয়ে রাখেন মাদুর। সবাই এসে বই নিয়ে বসে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি হাজির হই। শুরু হয়ে যায় লেখাপড়া। শিক্ষার্থীরা বই পড়াতে মগ্ন। আর আমি বসে মুখে মুখে তাদের পাঠ দিয়ে থাকি। এ দৃশ্য দেখে যে কারোর অবাক লাগছে। কিন্তু সত্যি সত্যি আমি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক শেখাচ্ছি। আর শিক্ষার্থীরাও মনোযোগ সহকারে এসব শ্রবণ করছে। সকালে ও বিকেলে স্কুল সময়ের আগে-পরে এদের পড়াই।

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনার চোখের ব্যাপারে এখন ডাক্তার কী বলছে?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : ডাক্তার আমার চোখ পরীক্ষা করে দেখে বলেছেন, চোখের রেটিনা শুকিয়ে গেছে। এখন আর ভালো হওয়া সম্ভব নয়। তারপরও মোটা অঙ্কের টাকায় চিকিৎসা করালে ফল ভালোআসতে পারে। যাই হোক আমার অত টাকা নেই।  তবে মন ও মেধা অন্ধ হয়নি। আমি ঘরে বসে না থেকে বাড়িতে নিজ উদ্যোগে স্কুল চালু করে শিশুদের পাঠদান করাচ্ছি। এতে আমি ভালো আছি। প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমে আমি এ স্কুল পরিচালনা করছি। দারিদ্র্যের কারণে স্কুলঘর নির্মাণ করতে পারছি না। একটি স্কুলঘর হলে আমি আরো স্বাচ্ছন্দ্যে শিক্ষার আলো ছড়াতে পারতাম।

ক্যাম্পাসলাইভ : স্থানীয় সমাজসেবকরা আপনাকে কেমন চোখে দেখেন?
সঞ্জিত চক্রবর্তী : স্থানীয় মেম্বার হেলাল আহমেদ আমাকে শ্রদ্ধা আর মায়া করেন। তিনি এলাকায় বলে বেড়ান, সঞ্জিত দাদা একজন মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান আমজাদ আলীও বলেন, দাদার তুলনা হয় না। আমাদের সঞ্জিত দাদা অতিকষ্টের মধ্যেও এলাকার সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছেন। তার (আমার) ঋণ নাকি শোধহবার নয়। বাদ দেওয়া যাবে না উপজেলা শিক্ষা অফিসকেও। তারাও আমাকে ভালোবাসে। এজন্য বলে থাকেন, এমন ব্যক্তি রয়েছেন আমাদের জানা ছিল না।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনার শেষ ইচ্ছা সম্পর্কে কিছু বলুন?

সঞ্জিত চক্রবর্তী : আমার শেষ ইচ্ছা একটি স্কুলঘর নির্মাণ। এখানেই আমার যেন মরণ হয়। আমার ইচ্ছা কে পূরণ করবে? আমার ইচ্ছাটা সত্যি কঠিন। তিনি বলেন আমি এই টুকু দাবী সমাজের একজন মানুষ হিসেবেই করেছি। এর বাইরে কোন আর ইচ্ছা নেই। কেউ যদি এগিয়ে আসে তবে খুশি হব। কে আসবে অথবা আসবেনা আমি জানিনা।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

সঞ্জিত চক্রবর্তী: ক্যাম্পাসলাইভকেও ধন্যবাদ।

 

ঢাকা// ১৩ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) // এফআর