[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



মাস্টার্স পড়বেন নাকি পড়বেন না?


প্রকাশিত: June 24, 2016 , 12:58 pm | বিভাগ: আপডেট,স্টাডি


khalid-cu

সাঈদ আহসান খালিদ : চার বছরের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ করতে না করতেই শিক্ষার্থীদের মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। শুধু প্রশ্নেই সেটি সীমাবদ্ধ থাকেনা- তাতে যুক্ত হয় ধোয়াঁশা, ভ্রান্তি, শংকা এবং সিদ্ধান্তহীনতাও। অনার্স জীবন শেষ করার পরপর এই কনফিউশনের উদ্ভবের কারণ ও ফলাফল দুটোই

বহুমাত্রিক :

১) একসময় বাংলাদেশে অনার্স ছিল ৩ বছরের, সাথে ১ বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি অর্থাৎ, ৩+১ = মোট ০৪ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষা নিয়েই সরাসরি চাকুরিতে ঢুকা যেতো। পরবর্তীতে বিশ্বের বেশিরভাগ অন্যান্য দেশের সাথে মিল রেখে আমাদের অনার্স ডিগ্রিকে চার বছর করা হলো, সাথে এই অনার্স ডিগ্রিকেই চাকুরিতে প্রবেশের জন্য সরকারিভাবে চূড়ান্ত বা টার্মিনাল ডিগ্রি ঘোষনা করা হলো। অর্থাৎ, মাস্টার্স সহ চার বছর পড়াশোনা করে সবাই আগে যেভাবে কাজ কর্মে ঢুকে পড়তো তেমনি এখন সবাই চার বছরের অনার্স ডিগ্রি নিয়ে কর্ম জীবনে ঢুকে যাবে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মাস্টার্স করার কোনো প্রয়োজন হবে না।

যারা শিক্ষক বা গবেষক হতে চাইবে মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি নেবে শুধু তারাই এই নিয়মই বিশ্বের অন্য দেশে অনুসৃত হয়, একই নিয়ম বাংলাদেশেও চালু করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই চার বছর মেয়াদি অনার্সের শুরু।

২) বিসিএসসহ সরকারি সকল প্রথম শ্রেণির চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই চার বছরের অনার্সকে চূড়ান্ত ডিগ্রি হিসেবে স্বীকার করা হলো। এখনো মাস্টার্স ডিগ্রি ছাড়াই বিসিএস ক্যাডার হিসেবে জয়েন করা যায়, মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ডিগ্রিই ডাক্তার হিসেবে পেশা শুরু করার চূড়ান্ত ডিগ্রি, ইঞ্জিনিয়ারিং এও তাই। আইনজীবী বা জুড়িশিয়াল অফিসার হওয়ার জন্যও এলএল.বি. ডিগ্রি যথেষ্ট- মাস্টার্স নিষ্প্রয়োজন। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই অনেক শিক্ষার্থী মাস্টার্স করার আগ্রহ হারায়- চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু সেরের উপরে সোয়া সের- বাস্তবতার উপরে চরম বাস্তবতা আছে।

৩) বিসিএস, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইনপেশা কিংবা জুড়িশিয়ারি– এই কয়টি হাইলি স্পেশালাইজড চাকরি কিংবা বিষয় ব্যতীত বাংলাদেশের বাকি সমস্ত সেক্টরের চাকরির বিজ্ঞাপনে বর্তমানে ন্যুনতম যোগ্যতা হিসেবে মাস্টার্স ডিগ্রি চায় এবং এখনো মাস্টার্স ডিগ্রিই চূড়ান্ত বা টার্মিনাল ডিগ্রি রয়ে গেছে যদিও তাতে শিক্ষার বয়স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪+১ = ০৫ বছর! অর্থাৎ, চার বছরের অনার্স সত্বেও মাস্টার্সের আবশ্যকতা ফুরালোনা।

৪) মাস্টার্সের এই আবেদন না ফুরানোর অন্যতম কারন চাকরি বাজারে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীর সংখাধিক্য ও সহজপ্রাপ্যতা। কেরানিগিরি তো বটেই পিয়নের চাকুরির আবেদনেও এখন মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের শত শত সিভি জমা পড়ে! মাস্টার্স ডিগ্রিওয়ালা থাকতে কে শুধু অনার্স পাশ আবেদনকারীকে নিয়োগ দেবে?

আবার এই মাস্টার্স ডিগ্রিওয়ালার সংখাধিক্য ও সহজপ্রাপ্তির কারন : সরকারি- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই দেশের আনাচে কানাচে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে সকল বিষয়েই মাস্টার্স কোর্স খোলা। শত শত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ যেখানে স্নাতক পর্যায়েই শিক্ষা-কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নেই তারাও স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স খুলে বসেছে- কারন ওই যে চাকুরির বিজ্ঞাপনপ্রসূত মাস্টার্সের বাজারি চাহিদা। শুধু চাকুরির ক্ষেত্রেই কেন? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ মাস্টার্স ফলনের কারনে এখন বাংলার ঘরে ঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী মেয়ে। মাস্টার্স পাশ মেয়েরা কোন দু:খে তাদের চেয়ে কম ডিগ্রিধারী শুধু অনার্স পাশ ছেলে বিয়ে করতে চাইবে? তাই বিয়ে করতে চাও- মাস্টার্স ডিগ্রি নাও!

৫) অনার্স ডিগ্রি নিয়ে কেউ চাকরিতে প্রবেশ করলেও তাঁর প্রমোশন আটকে থাকে বা বিলম্বিত হয় মাস্টার্স ডিগ্রির অভাবে। মাস্টার্স ডিগ্রি না থাকে মানে এখানে শিক্ষাগত অসম্পূর্ণতা। চাকরির এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) এ মাস্টার্সের অভাব প্রভাব ফেলে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থেকে অনেকে বঞ্চিত হয়, ক্যারিয়ার গ্রোথ থমকে যায়।

৬) উফশী (উচ্চ ফলনশীল) মাস্টার্স এখন রেগুলার প্রোগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে ইভেনিং মাস্টার্স প্রোগ্রামে সংক্রমিত হয়েছে। সেখানে বাণিজ্য এবং আর্থিক লাভের ব্যাপার স্যাপার আছে। এই প্রোগ্রাম যারা চালায় তাদের দরকার টাকা আর শিক্ষার্থীদের দরকার মাস্টার্সের সার্টিফিকেট। ফলাফল- বেসরকারি ইউনিভার্সিটি তো বটেই প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন জমজমাট অজস্র ইভেনিং মাস্টার্স প্রোগ্রাম। যার এক বিষয়ে ইতোমধ্যে একটা মাস্টার্স আছে- সেও একটা ইভেনিং মাস্টার্স নিয়ে নিচ্ছে।

কারণ বহুমাত্রিক : কারো করা প্রথম মাস্টার্সের হয়তো বাজারে চাহিদা নাই- সে বাজার চাহিদা সম্পন্ন মাস্টার্স বা এমবিএ তে ভর্তি হচ্ছে, কারো আবার অনার্স বা মাস্টার্স শেষ করা নিজের ইউনিভার্সিটিরই বাজার চাহিদা নাই- তাই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি মাস্টার্স করে জাতে উঠতে চায়। মোদ্দাকথা- বাংলাদেশে মাস্টার্স ডিগ্রি এখন হটকেক- লাগবেই- ইজ্জাত কা সওয়াল! ইজ্জত বাঁচানো ও মাস্টার্স বেচে টাকা বানানো প্রতিষ্ঠানেরও তাই অভাব পড়ছেনা, মাশাল্লা।

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী মাস্টার্স পর্যায়ে লেখাপড়া করছে। এর মধ্যে ৩২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড- বাংলাদেশ এখানে এক ও অদ্বিতীয়!

৭) মাস্টার্সের এই মহোৎসবে শিক্ষার্থীদের বা জাতির আদতে কী ফায়দা? চার বছরের অনার্স দিয়ে যে ছেলে বা মেয়েটি চাকুরিতে প্রবেশ করার কথা তাঁর এখন ক্ষেত্রভেদে এক থেকে দুই বছর বেশি সময় লাগছে শিক্ষাজীবন শেষ করতে। বাড়তি সময়ের সাথে খরচ হচ্ছে বাড়তি কাড়ি কাড়ি টাকা। একজন মানুষের কাছে একবছর, দুই বছর অনেক দীর্ঘসময়। আমরা অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন থেকে অবিবেচকের মত এই সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছি। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ছেলে-মেয়েরা যত তাড়াতাড়ি লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনের ঢুকে যাবে, তাদের জন্য সেটা ততই মঙ্গল কিন্তু আমরা কিছুতেই সেটি হতে দিচ্ছিনা- সবাইকে মাস্টার্সের রেইসে নামিয়ে দিয়েছি! সময়, অর্থ, তরুণ শ্রমের কী নিদারুণ নিরর্থক জাতীয় অপচয়!

৮) এই বিষয়টি যাদের দেখার কথা আশার কথা হচ্ছে সেই ইউজিসির নজরে বিষয়টি এসেছে। ২০১৪ সালে মাস্টার্স প্রোগ্রাম সীমিত করার প্রস্তাব করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। শিক্ষক ও গবেষণা ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে অনার্স ডিগ্রিই চূড়ান্ত এবং মাস্টার্স শুধুমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে চালু রাখার প্রস্তাবনা ছিল তাতে। এই প্রস্তাব কে স্বাগত জানাই কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে সেই প্রস্তাব আজো বাস্তবায়ন হয়নি। আরো যেসব বিষয় প্রস্তাব করা যায় তা হলো নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সব চাকুরির আবেদনে অনার্স ডিগ্রিকেই বাধ্যতামূলক করে দেয়া, অনার্সকেই প্রাতিষ্ঠানিক চূড়ান্ত ডিগ্রি ঘোষনা করা এবং তা মানতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে আইনগতভাবে বাধ্য করা, মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য চাকরিতে আলাদা কোন রিওয়ার্ড না রাখা, মাস্টার্স না থাকলে কোন বঞ্চনা না হওয়া, চাকরিরত অবস্থায় কেউ মাস্টার্স করলে সেই সময়কালটি চাকরিতে যোগ না করা ইত্যাদি।

৯) তবে যেহেতু এসব সুপারিশ বা প্রস্তাবনা উচ্চ শিক্ষার নীতি নির্ধারকদের বিষয় এবং এখনো অমীমাংসিত তাই এই সময়ে মাস্টার্স ডিগ্রি ড্রপ দেওয়াটা বা মাস্টার্সে পাঠে অবহেলা করা বোকামি ও অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হবে। মাস্টার্স না থাকলে ক্যারিয়ারের সুযোগ ও সম্ভাবনা খুব সংকুচিত হয়ে যাবে। কারনগুলো আগেই বলেছি।

১০) অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখি বিশেষ করে আইনের শিক্ষার্থীদের যারা মাস্টার্স করেনা অথবা করলেও খুব অবহেলা ও দায়সারাভাবে করে। অনেকেই অনার্স ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষা শেষ করার সাথে সাথেই চাকুরির পরীক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে নিবিড় মনযোগী ও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে- ফলাফল মাস্টার্স পরীক্ষায় রেজাল্ট আশানুরূপ হয়না। এটি চরম বোকামি ও ভুল সিদ্ধান্ত। কারন বিসিএস- এডভোকেটশিপ- জুড়িশিয়ারি পরীক্ষা ছাড়া আইন সংশ্লিষ্ট ও আইনের বাইরের সব পেশার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মাস্টার্সের রেজাল্ট বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনার্স চার বছরের পরিশ্রমের ফল কিন্তু মাস্টার্স মাত্র এক বছর। তাই সব মনযোগ মাস্টার্সে নিবদ্ধ করে এই একটি বছর ভালভাবে ক্লাস ও পড়াশোনা করলে খুব সহজেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব। মাস্টার্সের একটি চমৎকার রেজাল্ট অসংখ্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, অন্যদের সাথে তোমার পার্থক্য গড়ে দেবে, ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেবে। এই এক বছরের রেজাল্ট তোমার সারাজীবনের সঙ্গী হবে- এটিকে অবহেলা নয়।

যখন অনার্স শেষ করছো তখন তোমার বয়স মাত্র ২২/২৩ বছর। ৩০/৩২ বছর পর্যন্ত তুমি সরকারি চাকরির আবেদন করতে পারবে। তারমানে আরো বহুবার তুমি এসব চাকুরিতে আবেদনের সুযোগ পাবে। অনার্স পাশ করে খুব খেটেখুটে পড়লেও যে তোমার

বিসিএস/জুড়িশিয়ারি হবেই- এর ন্যূনতম গ্যারান্টি নাই কিন্তু মাস্টার্সে ভালো করার সুযোগ জীবনে এই একবারই পাবে। একই শ্রম এক বছর মাস্টার্সে দিলে ফল হাতেনাতে মিলবে- গ্যারান্টিড।

তাই অনার্স শেষে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে আবেদনের যোগ্যতা লাভ করলেও সমস্ত প্রলোভন কে এক বছরের জন্য সামলে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে মাস্টার্সে ভালো ফল করাই বুদ্ধিমানের কাজ- যদ্দিন পর্যন্ত মাস্টার্সের আবশ্যিকতা বহাল থাকবে।

এই এক বছরের সাময়িক ক্ষতি আখেরে সারাজীবনের জন্য বিশাল লাভ বয়ে আনবে।

শুভকামনা।
=============
সাঈদ আহসান খালিদ
লেকচারার, আইন বিভাগ, চবি।

ঢাকা, ২৪ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন