[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা


প্রকাশিত: June 27, 2016 , 6:02 am | বিভাগ: আপডেট,গেস্ট কলাম


sayeed

সাঈদ আহসান খালিদ : বাংলাদেশে কেউ এডভোকেট হতে গেলে এলএল.বি. ডিগ্রি নিতে হয়, অত:পর এডভোকেটশিপ পরীক্ষায় পাশ করে নিবন্ধিত হতে হয়। একজন নিবন্ধিত এডভোকেটের পেশাগত আচরণ ও শৃঙ্খলা তদারক করার জন্য আছে ‘Bangladesh Bar Council’ যেটি কোন এডভোকেটের পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের প্রমাণ পেলে Bangladesh Legal Practitioner’s and Bar Council Order, 1972 এর আওতায় সেই আইনজীবীর আইন প্র্যাকটিসের লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতার অধিকার রাখে।

কেউ ডাক্তার বা ডেন্টিস্ট হতে চাইলে তাকে যথাক্রমে এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রি নিতে হয়, অত:পর ‘Bangladesh Medical & Dental Council (BM&DC)’ এর অধীনে তাকে নিবন্ধিত হতে হয় যেটি এই ডাক্তার ও ডেন্টিস্টদের পেশাগত আচরণ মান ও শৃঙ্খলা তদারক করে। সংশোধিত মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ এর ধারা-২৩ অনুযায়ী কোন নিবন্ধিত মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক নির্ধারিত পেশাগত আচরণ বা নীতিমালার কোন বিধান লংঘনের কারনে দোষী সাব্যস্ত হলে কাউন্সিল তার নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন।

কেউ ফার্মাসিস্ট হতে চাইলে তাকে ফার্মাসি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিতে হয় এবং ‘Pharmacy Council of Bangladesh’ এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হয়- এটিই বাংলাদেশের ফার্মাসিস্টদের পেশাগত মান ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। Pharmacy Ordinance, 1976 এর ধারা ৩০(৩) অনুযায়ী কোন ফার্মাসিস্ট যদি এই আইনের বিধান লংঘন করে তার জেল- জরিমানার বিধান পর্যন্ত করা আছে।

কেউ বিসিএস ক্যাডার বা জুডিসিয়াল অফিসার হতে চাইলে তাকে স্নাতক ডিগ্রি নিতে হয়, অত:পর বিসিএস/জুডিসিয়ারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেশাজীবন শুরু করতে হয়। এই সরকারি কর্মজীবীদের পেশাগত আচরণ ও শৃঙ্খলার জন্যও আছে সুনির্দিষ্ট আইন- ‘সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি, ১৯৭৯’ এবং ‘সরকারি কর্মচারীদের (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫’ যার আওতায় দোষী প্রমাণিত হলে এই পেশাজীবীদের চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা দেওয়া আছে।

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক স্পেশালাইজড সব পেশাতেই পেশাজীবন শুরু করার জন্য সেই বিষয়ের উপরে স্নাতক ডিগ্রি দরকার হয়। অত:পর পেশা শুরু করার পরেও সেই সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী তার পেশাগত মান, আচরণ ও শৃঙ্খলা মেনে চলছেন কিনা তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ নজরদারি করেন এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তির বিধান কার্যকর হয়।

কিন্তু ‘সাংবাদিকতা’ হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র পেশা যেটিতে পেশাজীবন শুরু করার জন্য সেই বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিতো দূরের কথা- স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর্যন্ত আবশ্যকতা নাই! ক্লাস এইট পাশ না করেও বাংলাদেশে মহাক্ষমতাধর ‘সাংবাদিক’ হয়ে যাওয়া যায় বিশেষত অনলাইন নিউজ পোর্টালের বদৌলতে। যদিও বর্তমানে প্রায় সব পাবলিক ও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ’ খোলা হয়েছে এবং এই বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার্থীরা ঠিকই বেরোচ্ছে।

যে কেউ যেমন এদেশে পেশায় সাংবাদিক হতে পারে তেমনি যে কেউ এদেশে নিউজ পেপার, নিউজ এজেন্সি, অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে প্রাইভেট নিউজ চ্যানেল খুলে ফেলতে পারে– যোগ্যতা আর মানদণ্ডের বালাই নাই।

ফলাফল- হলুদ সাংবাদিকতায় দেশ ছেয়ে গেছে। এই সাংবাদিক ভেকধারী সাংঘাতিক ভন্ডদের নিজেদের তো বটেই- যে মিডিয়ার তারা প্রতিনিধি সেই অনলাইন মিডিয়ার বেশিরভাগেরই কোন নিবন্ধন নাই- তাদের পেশার মান আর শৃঙ্খলা তদারকের কেউ নাই- সব রকম জবাবদিহিতার তারা ঊর্ধ্বে! ফলশ্রুতিতে- এসব নিউজ পোর্টালগুলো এখন বানোয়াট, চটকদার, চরিত্রহননকারী, ভুয়া ও ভিত্তিহীন খবর তৈরি ও ছড়ানোর আড়ৎ এ পরিণত হয়েছে। এদের প্রচারিত খবর নাটক- সিনেমার চেয়ে বেশি বৈ কম নাটকীয় ও চটুল নয়। কোন নিউজের বিষয়বস্তু বা ভিকটিম যদি যদি ‘নারী’ হয় তাহলে অবধারিতভাবে সেই ঘটনার ফলোআপ এ এই সাংঘাতিক সাংবাদিকেরা ‘পরকীয়া’ ও ‘অবৈধ সম্পর্ক’ এর মশলা মিশিয়ে নানান অশ্লীল ও মানহানিকর চিত্রনাট্য তৈরি করবে, করেই যাচ্ছে প্রতিদিন, কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, শাস্তি নাই।

তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের আচরণবিধি নির্ধারণ ও প্রয়োগের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ আছে- ‘Bangladesh Press Council’ কিন্তু সেখানে পূর্বোল্লিখিত অন্যান্য পেশার কাউন্সিলের মতো এই পেশায় যোগদানের ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারন করা হয়নি।

Press Council Act, 1974 এর ১১(বি) ধারা অনুযায়ী সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধির ০৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-

“গুজব ও অসমর্থিত প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে সেগুলোকে চিহ্নিত করা এবং যদি এসব প্রকাশ করা অনুচিৎ বিবেচিত হয় তবে সেগুলি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা”

০৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘যে সকল সংবাদের বিষয়বস্ত অসাধু ও ভিত্তিহীন অথবা যেগুলোর প্রকাশনায় বিশ্বাস ভংগের আশংকা আছে সে সকল সংবাদ প্রকাশ না করা।”

১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “জনগণকে আকর্ষণ করে অথচ জনস্বার্থ পরিপন্থী চাঞ্চল্যকর মুখরোচক কাহিনীর মাধ্যমে পত্রিকা কাটতির স্বার্থে রুচিহীন সংবাদ এবং অনুরূপ ছবি পরিবেশন করা যাবে না”

কিন্তু হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে, এই আইন বা নিষেধাজ্ঞা না মানলে জেল-জরিমানা তো দূরের কথা, সাংবাদিকতার নিবন্ধন বাতিল করারই কোন ব্যবস্থা নাই। এখানে শাস্তি বলতে বোঝায় তিরস্কার, নিন্দা ও সতর্কবাণী!

এই শিক্ষাগত যোগ্যতাহীন, রুচিহীন, জবাবদিহিতাহীন, দায়হীন, মিথ্যুক, ভন্ড, হলুদ সাংবাদিকদের প্রতিহত করতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, প্রেস কাউন্সিল আইনকে সংশোধন ও যুগোপযোগী করে সাংবাদিক পেশাজীবীদের কে সুপারভাইজ ও রেগুলেট করার ব্যবস্থা নিতে হবে- এই দায় ও কর্তব্য তো আম জনতার আছেই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। মনে রাখা উচিত-

‘চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না ‘।

লেখক : লেকচারার,
আইন বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ২৭ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন