[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা : কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর


প্রকাশিত: June 27, 2016 , 12:49 pm | বিভাগ: আপডেট,ফরেন ক্যাম্পাস


australia
লাইভ প্রতিবেদক : অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার মান এখন আকাশছোঁয়া। শিক্ষাব্যবস্থা ও মানের দিক দিয়ে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার স্থান। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য সে দেশে পা রাখেন। আর তাদের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরাও নেহাত কম নয়। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটির অবস্থান অস্ট্রেলিয়ায়। এ ছাড়া সারা অস্ট্রেলিয়ায় ৪১টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ এক হাজার ১০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। যেখান থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে পারবেন পড়ুয়ারা। পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আছে শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়া সরকার প্রতিবছর ২৫ কোটি ডলার পর্যন্ত শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকে। আর এসব সুবিধা ছাড়াও ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে একটি ভালো চাকরি সুযোগ তো থাকেই।

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ বেতারের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক তারেক জহিরুল হক। মেধাবী ছাত্র তারেক জহিরুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৫ সালে ২৪তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে পাবলিক সার্ভিসে যোগ দেন। ২০১৪ সালে তিনি অস্ট্রেলীয় সরকারের শিক্ষাবৃত্তি ‘অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড স্কলারশিপ’ নিয়ে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে। সেখান থেকে ‘পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ে আকর্ষণীয় রেজাল্ট নিয়ে মাস্টার্স শেষ করে সম্প্রতি দেশে ফিরে পুনরায় চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।

তাঁর দীর্ঘ দুই বছরের শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাসহ অস্ট্রেলিয়ার পড়াশোনার খুঁটিনাটি বিষয় শেয়ার করেছেন তিনি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম সারিতে রাখে কেন?

উত্তর : উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে পছন্দের প্রথম তালিকায় থাকার কারণ অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ও মান। বর্তমানে শিক্ষার মানের দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের চেয়ে অস্ট্রেলিয়া কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। বিশ্বের সেরা ১০০টির মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় আছে সাতটি।

আর আমি বলব বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া উত্তর আমেরিকার দেশগুলো যেমন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার থেকে তুলনামূলক সহজ হয়। যেমন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য জিম্যাট, জিআরই বা স্যাটে ভালো স্কোর লাগে, যা আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটু কঠিন। অপরদিকে ভালো রেজাল্ট এবং আইইএলটিএসে ভালো স্কোর থাকলেই অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া যায়। আইইএলটিএস তুলনামূলক সহজ হওয়ায় আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়াকেই বেশি পছন্দ করেন।

আর একটা ব্যাপার হলো আমাদের দেশ থেকে যারা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার জন্য যায় তাদের বেশির ভাগই পড়া শেষে সেখানে চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চান। অস্ট্রেলিয়ায় পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট (পিআর) পাওয়া অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। এটাকেও একটা বড় কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।
tarek-johirul
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা পদ্ধতি কেমন এবং এ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

উত্তর : আস্ট্রেলিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন, ইউনিভার্সিটি অব সিডনি, ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস, মোনাশ ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা যে কতটা উন্নত ও বিশ্বমানের তা বোঝা যায়। যেমন, আমি তো ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করলাম। সেখানের অভিজ্ঞতার আলোকেই বলি। অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা গবেষণাধর্মী। গবেষণার ওপরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশি জোর দিয়ে থাকে। আর এ গবেষণাগুলো শুধু জার্নাল বা নিবন্ধ বের করার উদ্দেশ্যেই করা হয় না। এগুলো অ্যাপ্লাইড বা ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টাও করা হয়, যা একটা অনেক বড় বিষয়। আর গবেষণার জন্য সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকেও সাহায্য পেয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

আরেকটি বিষয় হলো, সেখানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরিগুলো অনেক সমৃদ্ধ। তাদের আর্কাইভের বই ছাড়াও লাইব্রেরিতে অনলাইনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সব লাইব্রেরির বই পড়তে পারবেন আপনি। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাঁর পড়াশোনা ও গবেষণার সুবিধার্থে বিশ্বের নামিদামি জার্নাল ও পত্রপত্রিকাগুলোতেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবাধে গমন করতে পারেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এটাই কিন্তু মূল বিষয়।

এরপর শিক্ষকদের শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে বলি। তারা কিন্তু মোটেই আমাদের দেশের পদ্ধতিতে পড়ান না। বলতে গেলে তারা শিক্ষকের থেকে সঞ্চালকের ভূমিকা বেশি পালন করেন। ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের দেশের টকশোর মতো। টকশোতে যেমন একাধিক লোকের মধ্যে আলোচনা হয়, আর একজন তাদের সঞ্চালনা করে, তেমনি ওখানের শিক্ষকরা ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেন। শিক্ষক সঞ্চালকের মতো ছাত্রদের গ্রুপগুলোর মধ্যে থেকে পাঠ্য বিষয়টি বের করে আনার চেষ্টা করেন। শেষে তিনি মূল বিষয়টি আলোচনা করেন এবং তাঁর মতামত শোনান। মূলত ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগের মাধ্যমে পড়াশোনা হয়ে থাকে।

এরপর আসে পরীক্ষা পদ্ধতি। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে সাধারণত ভিন্ন ভিন্নভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয়। যেমন আমি মাস্টার্সে যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছি, তাতে কিন্তু কোনো লিখিত পরীক্ষা ছিল না। আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে হতো। আর ছিল নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন)। তবে অনার্স লেভেলে লিখিত ও মৌখিকভাবেও পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। বলতে গেলে এতকিছু করার পর একজন শিক্ষার্থীর তার বিষয়ের ওপরে জানার আর কিছুই বাকি থাকে না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশসহ বিশ্ব চাকরির বাজারে অস্ট্রেলীয় ডিগ্রির মান কেমন?

উত্তর : অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব দেশেই জনপ্রিয়। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়লেই তো শুধু হবে না। ভালো চাকরি পেতে হলে একটা ভালো বিষয়ে পড়াশোনা করা আর ভালো রেজাল্ট করাটাও জরুরি। এগুলো থাকলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশেই ভালো চাকরি পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন : উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইলে কী কী পদক্ষেপ অনুসরণ করতে হবে?

উত্তর : আমাদের দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা সাধারণত অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া যান। এ ছাড়া পিএইচডি করার জন্যেও অনেকে যান। যাঁরা উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া যেতে চান, তাঁরা দুই ভাবে সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করতে পারবেন। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ এজেন্টের মাধ্যমে অথবা সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে। প্রথমেই বলি এজেন্টের কথা। এজেন্টের মাধ্যমে করলে অ্যাপ্লিকেশন থেকে শুরু করে অফার লেটার পাওয়া পর্যন্ত সব কাজ তারাই করে দেবে। এ ক্ষেত্রে তারা কিছু সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে। আর নিজে আবেদন করতে হলে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। ফরম পূরণের সময় আইএলটিসের স্কোরসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে। এসব তথ্য যাচাই করে তারা শিক্ষার্থীকে যোগ্য মনে করলে ই-মেইলের মাধ্যমে একটি অফার লেটার পাঠায়। অফার লেটারে শিক্ষার্থীর পছন্দের কোর্স সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে। তখন ফিরতি ই-মেইলেই মাধ্যমে অফার লেটার গ্রহণের সম্মতি জানাতে হয়। এরপর  প্রথম সেমিস্টারের কোর্স ফি জমা দেওয়ার জন্য আনুমানিক দুই থেকে তিন মাস সময় পাওয়া যায়। কোর্স ফি জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার খরচ কেমন?

উত্তর : খরচটা আসলে নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, কোর্সের বিষয় ও মেয়াদের ওপরে। যেমন কোনো শিক্ষার্থী যদি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনার্স পড়তে চান, তাহলে প্রতি ছয় মাসের সেমিস্টারে তাঁকে দিতে হবে ১৬ হাজার থেকে ২২ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলারের মতো। মধ্যম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই খরচটা আসে মোটামুটি ১২ থেকে ১৬ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান একটু নিচের দিকে, সেগুলোতে খরচ হতে পারে আট থেকে ১২ হাজার ডলার। তবে আগেই বলেছি, কোর্সের বিষয় ও মেয়াদের ওপরে খরচের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।

প্রশ্ন : আপনি তো শিক্ষাবৃত্তির আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছেন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাবৃত্তি সম্পর্কে কিছু বলেন।

উত্তর : আমি ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড স্কলারশিপ’ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে যাই। এটি মূলত অস্ট্রেলিয়া সরকারের শিক্ষাবৃত্তি। বাংলাদেশ থেকে শুধু সরকারি কর্মকর্তা, আইসিডিডিআরবি গবেষক ও ব্র্যাক কর্মকর্তাদের মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার জন্য এ বৃত্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপজাতিদের জন্যেও কোটা থাকে। এই বৃত্তির জন্য আবেদনপত্র সাধারণত প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়। আবেদনকারীদের মধ্যে থেকে যারা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের বৃত্তির সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে।

অন্যান্য সরকারি বৃত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল পোস্টগ্রাজুয়েট স্কলারশিপ, অস্ট্রেলিয়া এপিইসি ওম্যান ইন রিসার্চ ফেলোশিপ, এনডেভর পোস্টগ্রাজুয়েট স্কলারশিপ ইত্যাদি। সব বৃত্তিতে মোটামুটি একই পদ্ধতিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রতিবছরই সরকারি বৃত্তিগুলোর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।

এ ছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্বভাবে বৃত্তি দেয়। বিশ্ববিদ্যালগুলোর ওয়েবসাইটে এসব বৃত্তির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সেখানে দেওয়া নিয়মানুযায়ী বৃত্তিগুলোতে আবেদন করা যায়।

বৃত্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার একটা সুবিধা হলো এটি শিক্ষার খরচ থেকে শুরু করে থাকা, খাওয়া সব খরচ বহন করে। এমনকি শিক্ষার্থীর পরিবারের খরচও দেওয়া হয় বৃত্তি থেকে। যেমন আমি অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছ থেকে দুই বছরে টিউশন ফি ও বসবাসের খরচ বাবদ প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার বৃত্তি পেয়েছিলাম। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ওপরে ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে পারেন।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুবিধা কতটুকু?

উত্তর : যাঁরা শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে যান তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার তেমন প্রয়োজন হয় না। তবে যাঁরা নিজ অর্থায়নে যান, তাঁদের অনেকেই পার্টটাইম কাজ করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ দিয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়া সরকার। শিক্ষার্থীরা এ সময়ে পিৎজা হাট, ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। একটু চেষ্টা করলেই এই কাজগুলো পাওয়া যায়।

প্রশ্ন : উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ কেমন?

উত্তর : মজার একটা বিষয় হলো আমাদের দেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে যায় তাদের অনেকেরই লক্ষ্য থাকে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট (পিআর) নিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। বলতে গেলে এই সংখ্যাটাই বেশি থাকে। তো পিআর পাওয়ার জন্য কমপক্ষে দুই বছর অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে হবে। তারপর পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দুই বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এগুলো থাকলে আইইএলটিএস দিয়ে যদি নির্ধারিত স্কোর তোলা যায়, তাহলে পিআরের জন্য আবেদন করা যাবে। আবেদনের পর সব কাগজপত্র যদি ঠিক থাকে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত স্কোর পেলেই আপনি পিআর পাবেন। আর পিআর পাওয়ার তিন বছর পর অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। পিআর পেতে কারো একটু বেশি সময় লাগে, আবার কেউ একেবারে কম সময়েই পেয়ে যান। তবে সময় বেশি লাগলেও সবাই একসময় বুঝে যান কোনো পদ্ধতিতে পিআর পাওয়া যাবে। ফলে মোটামুটি সবাই পিআর পেয়েই যান। সবাই এখানে একটা বিষয় বলে রাখা জরুরি। যেকোনো বিষয়ে পড়লেই কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় পিআর পাওয়া যায় না। সেখানে যেসব বিষয়ের চাহিদা বেশি, যেমন-অ্যাকাউন্টিং, আইটি, শেফ কোর্স, নার্সিং কোর্স এগুলোতে পড়লে পিআর পাওয়া সহজ হয়। তাই যাঁরা পড়াশোনার পর অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যেতে চান, তাঁদের এ বিষয়টা মাথায় রাখা উচিত।

প্রশ্ন : একটা নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতির মধ্যে গিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হন?

উত্তর : বিদেশে যাওয়া, সেখানে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে। এই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার ফলে যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়, তা বিদেশভীতি কাটাতে একটা প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। সমস্যা যেটুকু সৃষ্টি হয়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের দক্ষতার অভাবে। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, পার্টটাইম চাকরি খোঁজা তাই একটু কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে যাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যান, তাঁরা থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকেই করে যান। আর এখন অস্ট্রেলিয়াতে কিন্তু প্রচুর বাঙালি বসবাস করেন। তাঁদের কাছ থেকেও এ ব্যাপারে সাহায্য পাওয়া যায়।

অনেকেরই আবার একটা ধারণা আছে যে অস্ট্রেলীয়রা বর্ণবাদী। আমি কিন্তু এই সমস্যাটা অনুভব করিনি। বাংলাদেশ থেকে গিয়ে যাঁরা অস্ট্রেলিয়ার নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করেন, তাঁদেরক অস্ট্রেলীয়রা বরং সম্মান করে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার অনেক শিক্ষার্থীরাই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান না।

আর অস্ট্রেলিয়ার শহরগুলোতে চীন, ভারত, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের এত মানুষ বসবাস করে যে, পাবলিক বাসগুলোতে উঠলে অস্ট্রেলীয় পাওয়া যায় হাতে গোনা কয়েকজন। একটা দেশে যখন অনেক জাতির মানুষ বসবাস করে, সেখানে বর্ণবাদের মতো ধারণাগুলো আর থাকে না। হ্যাঁ, ওখানে  কারো কারো মধ্যে যে এই গোঁড়ামিগুলো একেবারেই নেই তা বলা যাবে না। তবে তারা এগুলো প্রকাশ করে না।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কতটুকু সহনীয়?

উত্তর : অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার ছয়টি স্টেটের আবহাওয়াতে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া যায়। যেমন উত্তর অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। আবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরা, এডেলেইডে তাপমাত্রা মোটামুটি একই রকম থাকে। এখানে গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ২০ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মকাল সাধারণত দুই থেকে তিন মাস স্থায়ী হয়। এর মধ্যে এক সপ্তাহের মতো তাপমাত্রা বেশি থাকে। তখন গড় তাপমাত্রা উঠে যায় ৩৬ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বাকি সময় শীতকাল। শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে আট থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব মেলবোর্নের আবহাওয়া সম্পর্কে আগামভাবে কিছুই বলা যায় না। সারা দিনে কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম, আবার কখনো কখনো হঠাৎ বৃষ্টিও শুরু হয়ে যায়। তাই হয়তো অস্ট্রেলীয়রা মেলবোর্নের আবহাওয়াকে মেয়েদের মনের সঙ্গে তুলনা করে। সবশেষে বলতে গেলে অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা বাংলাদেশিদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর কী কী পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

উত্তর : যাঁরা আস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান, তাঁদের অবশ্যই আগে থেকে কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে। যেহেতু অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে গেলে আইইএলটিএসে ভালো স্কোর লাগে, তাই ভালো স্কোর নিয়ে আইইএলটিএস সম্পন্ন করতে হবে। এখানে মনে রাখা উচিত যে আইইএলটিএসের মেয়াদ কিন্তু দুই বছর থাকে। তাই শিক্ষার্থীদের এই সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির চেষ্টা করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাসনদগুলো যদি বাংলায় থাকে তবে সেগুলো অবশ্যই ইংরেজিতে অনুবাদ করে নেবেন। কারণ অস্ট্রেলিয়ায় আবেদন করার সময় সব শিক্ষাসনদ ইংরেজিতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া বিদেশে ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট ও প্রস্তুত রাখতে হবে। সবশেষে যাওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়ায় যদি কেউ পরিচিত থাকে তাহলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ ও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন : সবশেষে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া যেতে চান তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

উত্তর : যারা অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যেতে চান বা সেখানে পড়াশোনা করছেন তাদেরকে বলব, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে অবশ্যই মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনা করতে হবে। নিজ অর্থায়নে গেলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই তার পড়াশোনা ও বসবাসের খরচটা পার্টটাইম কাজের মাধ্যমে তোলার চেষ্টা করেন। তাই পার্টটাইম কাজ বা অন্যান্য ব্যস্ততায় পড়াশোনার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করা, কাজ করা, মূলত পরিশ্রম করার মানসিকতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে হবে। আর পরিশ্রমের ফলাফল তো সব সময় ভালোই আসে।

এরপর যারা পড়াশোনার শেষ করে সেখানে থেকে যান, তাদের বিষয় নির্বাচনের ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। অনেককেই দেখেছি অস্ট্রেলিয়া গিয়ে বিষয় পরিবর্তন করতে। কারণ বাংলাদেশ থেকে তাঁরা যে বিষয় নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন, তার চাহিদা অস্ট্রেলিয়ার চাকরির বাজারে ও পিআর পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কম। তাই এ ব্যাপারে আগে থেকেই সচেতন হওয়া উচিত।

[কার্টেসি : এনটিভি]

ঢাকা, ২৭ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন