[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধ: তুমি কতটুকু প্রস্তুত?


প্রকাশিত: June 30, 2016 , 5:13 pm | বিভাগ: স্টাডি


asik
মো. আশিকুর রহমান: সবে মাত্র এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। মন চাচ্ছে একটু প্রাণ খুলে ঘুরে বেড়াই, আনন্দে মেতে উঠি, বন্ধুদের সাথে আড্ডার আসর জমাই। কিন্তু সেই সুযোগ কি আছে? আবারও নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

হ্যাঁ, আপাতত আরেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পালা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নামক কঠিনতর প্রতিযোগিতামূলক বাঁধা অতিক্রমের যুদ্ধ, জীবনের সকল ‘এইম ইন লাইফ’ নামক রচনায় লেখা স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপদান করার মেধাযুদ্ধ! কিন্তু এই যুদ্ধ জয়ে কতটুকু প্রস্তুত তুমি?

এইচএসসি পরীক্ষা শেষের পর হতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সময়টুকুতে কি করা উচিৎ, কিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিৎ?- প্রশ্নটি উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফল কেমন হবে, সেই ধারণা মাথায় রেখেই আমাদের সামনের এই সংক্ষিপ্ত সময়টাকে কাজে লাগানো উচিৎ। আমরা যদি ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক বিভাগ কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হয়ে থাকি, তাহলে আমাদের পরিকল্পনাগ্রহন একেবারেই সহজ ও সংক্ষিপ্ত; কারণ- আমাদেরকে যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে।

আর আমরা যদি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হই- তাহলে বাস্তবসম্মত ও যুগোপযুগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এইচএসসি’তে খুব ভালো জিপিএ পাওয়ার সম্বাবনা না থাকলে কিংবা এসএসসি’তে সর্বোচ্চ জিপিএ না থাকলে বুয়েট/মেডিকেলের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে লক্ষ্য স্থির করাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।

ঢাবিসহ বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির নূন্যতম যোগ্যতা সম্পর্কে সম্যক ধারণাপোষণ একজন উচ্চশিক্ষা আকাঙ্ক্ষী শিক্ষার্থীকে তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ অর্জনে সর্বাধিক সহযোগিতা করবে। কারণ- এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল যে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ভয় পাবার কিছু নেই, বিষয়টা কিন্তু এমন নয় যে হাজার হাজার জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়িতে আপনি ৫ পয়েন্টের চেয়ে কম পেয়েছেন বলে ভালো কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিকতে পারবেন না।

প্রথম থেকে পরিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন, যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ শ্রম দিতে না পারলে ভর্তিযুদ্ধে উত্তীর্ণ হবার স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটার সম্বাবনাই বেশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময়ই বিশ্বাস করি- ‘অনেক শক্তিমান হার মেনে যায়, হার মানে বহু দ্রুতগামী; জীবন যুদ্ধে তারাই জিতবে, ভাববে যারা জিতবই আমি’!

এইচএসসি পরীক্ষা পরবর্তী গত কিছু দিনের মধ্যেই হয়ত স্বপ্ন পুরণে কোচিং সেন্টার কিংবা প্রিয় শিক্ষকের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে পড়ালেখা শুরু করে দিয়েছ। যারা এখনো চিন্তিত- কোচিং করব কি করব না ভেবে; তাদের জন্য শুধু এতটুকুই বলব- ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো তোমাদের বিগত ১২ বছরের শিক্ষাজীবনে তুমি কতটুকু শিখতে পেরেছো তার মূল্যায়ন মাপকাঠি। প্রশ্নগুলোর প্যাটার্ন স্কুল কলেজ পরীক্ষার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মৌলিক বিষয়ের উপর যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলেও স্কুল কলেজ পরীক্ষায় এ+ পাওয়া সম্ভব, কিন্তু ভর্তি যুদ্ধে কোনোভাবেই ভালো করা সম্ভব নয়। পাঠ্যবইগুলোর মৌলিক বিষয়গুলোতে খুঁটিনাটি জানা থাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী অতিক্রম করা এবং পরবর্তী উচ্চ শিক্ষার জন্য অত্যধিক গুরুত্ববহ।

ভর্তি পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে যদি অনুধাবন করতে পারো- অন্য কারো সহযোগিতা কিংবা গাইডলাইন ব্যতিত পাঠ্য বইয়ের সকল তথ্য সমূহ সতর্কতার সাথে এবং নিয়মিত অধ্যয়ন করে যেতে পারবে। বিগত সময়ে ভর্তি পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো দেখে যদি নিশ্চিত হতে পারো – বাসায় পড়ালেখা করার মধ্য দিয়ে নিজে নিজেই ভালো কিছু করা সম্ভব, তাহলে কোচিং এর কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যথায় আমার পরামর্শ- কোচিং কিংবা গাইডলাইন গ্রহণে তাদেরকেই সিলেক্ট কর, যারা সেবার মধ্য দিয়ে তোমাকে চান্স পাইয়ে দিতে সকল ধরনের সহযোগিতা করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

নাম কিংবা বিজ্ঞাপন দেখে একটি ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহন তোমার সারাজীবনের জন্য কান্না বয়ে আনবে। যেখানেই ভর্তি (কোচিং) হই, আমাদের মনে রাখতে হবে- উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার জন্য যে জ্ঞান বা তথ্য আমাদের জানা দরকার তা যেন আমরা তাঁদের কাছ থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে আদায় করে নেই; যতক্ষন না আদায় করতে পারি- ততক্ষণ যেন আন্তরিকভাবে লেগে থাকি। মনে রাখতে হবে- কোচিং সেন্টারগুলো আমাকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেবে না, আমার নিজের যোগ্যতা দিয়েই আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি করে নিতে হবে। কোচিং সেন্টার কিংবা ব্যক্তি গাইডলাইন আমাকে শুধু এতটুকুই ধারণা দেবে যে কীভাবে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়া যায়, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির পদ্ধতি কেমন। পড়াশোনা করতে হবে আমাদের নিজেকেই, কেউ পরীক্ষায় পাস করিয়ে চান্স পাইয়ে দেবে না।

নিয়মিত ভাবে পড়ালেখার জন্য একটা সুনির্দিষ্ট রুটিন করতে পারো, যেখানে বিগত সময়ে কম অধ্যয়ন করা বিষয়গুলো, এইচএসসি’তে বাদ দেয়া অধ্যায়গুলো কিংবা কম বুঝা ম্যাথগুলোকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটিতে রেখে অন্য বিষয়গুলোর (বিভাগ সম্পর্কিত) নিয়মিত অধ্যয়নের পরিকল্পনা রাখা যেতে পারে। তাছাড়া যেহেতু সাধারণ জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, সুতরাং জানার আগ্রহ থেকে নিয়মিত অধ্যয়ন এবং নিজেকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে সমসাময়িক জ্ঞান অর্জনের বিষয়টা অত্যান্ত চর্চানির্ভর।

তাছাড়া, বর্তমানে ইংরেজিতে ভালো করা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। ইচ্ছে করলেই ইংরেজিকে বাদ দিয়ে কোনো পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব নয়। উদাহরনস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো ভালো বিষয়ে পড়ার জন্য ইংরেজিতে ভালো নম্বর পাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ইংরেজি ব্যাকরণে কঠোর প্রস্তুতি, নিয়মিত ইংরেজি পত্রিকা পড়া, ব্যাকরণের জন্য অনেক বই না দেখে একটা বই অনুসরণ করা, প্রতিদিন ইংরেজি ব্যাকরণের চর্চা করার মধ্য দিয়ে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা সম্ভব বলে মনে করি। বাংলা ব্যাকরণের জন্য নবম ও দশম শ্রেণির বোর্ডের বই এবং বাংলা মূলবইটা খুঁটিনাটি অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই। কেননা মূলবই থেকে অনেক প্রশ্ন থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, সরাসরি কবিতা/গল্পের লাইন তুলে দিয়ে প্রশ্ন করা হয়।

গ্রুপভিত্তিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বিগত ১০-১৫ বছরের প্রশ্নগুলো বেশি বেশি করে অনুশীলন করা দরকার। বিজ্ঞানের ছাত্রদের যেমন পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র, অধ্যায়ভিত্তিক রাশিমালা; রসায়নের পর্যায় সারণি, রাসায়নিক বিক্রিয়া, জৈব যৌগ কিংবা জীববিজ্ঞানের মানবদেহসহ বিগত ভর্তি পরীক্ষায় বেশি বেশি প্রশ্ন কমনপড়া অধ্যায়সমূহকে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার তেমনি ব্যবসায় শিক্ষা এবং মানবিকের শিক্ষার্থীদেরও গ্রুপ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নির্ধারণ করে বেশি বেশি অনুশীলন করা। নিয়মিত ঘড়ির কাঁটা ধরে বাসায় নিজে নিজে ভর্তি পরীক্ষার অনুরূপ পরীক্ষা দেওয়া, কঠিনতর কিংবা কম বোধগম্য বিষয়গুলো বার বার অনুশীলন করা এবং খাতায় লিখা, গনিতসহ সকল বিষয়ের সকল সূত্র গুলো নিজ থেকে বার বার চর্চা করা প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় সফলকাম হতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

একটা প্রিয় অনুসরণীয় লাইন স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- তোমাদের পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবকরা যারা বরাবরই তোমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত থাকেন, তোমরা কি দেখতে চাও না তোমার অভিভাবকের সেই অনাবিল খুশির মুহূর্ত, যখন তোমার স্বপ্ন বিনির্মাণের প্রথম ধাপে তুমি প্রথমবারেরমতো সফল হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধের বৈতরণী পার হবে, সেই মুহূর্তে তাঁরা কতখানি আনন্দিত হন, কতোখানি আবেগাপ্লুত হন… এবং সেই আনন্দঘন মুহূর্তের একমাত্র উপলক্ষ্য শুধুই তুমি! আর যদি সেই আনন্দঘন মুহূর্ত উৎযাপনে বদ্ধপরিকর হও, তাহলে তোমাদের একটাই কাজ- ‘লড়তে হবে আরেকবার!!’

সর্বশেষ, উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী প্রিয় শিক্ষার্থী, ফলাফল নিয়ে চিন্তা না করে বই নিয়ে বসে পড়ো। কেননা সময় নষ্ট করা মানে নিজের জীবন নষ্ট করা। মনে রাখতে হবে- দু-চার ঘণ্টা অনুশীলন করেই সফল হওয়া যায় না, একরাত পড়ালেখা করেই ভালভাবে পাশ করা যায় না, দিনে এক ঘন্টা সময় না দিয়েই প্রত্যেকটা সাবজেক্টের খুঁটিনাটি বুঝে ফেলা যায় না, সারা বছর ফাঁকিবাজি করেও ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া যায় না।

তবে হতাশার সমুদ্রে ডুবে প্রতিযোগিতামূলক জীবন সংসার থেকে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। বরং হারতে হারতে জয়ের তীব্র আকাংখা নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর অধ্যবসায় এবং ধৈর্যের পরাকাষ্ঠ দেখিয়ে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকার ইচ্ছা নিয়ে নামতে পারলে কিছু একটা হবার সম্ভাবনা থাকবেই।

এপিজে আবদুল কালামের সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- ‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখাটা স্বপ্ন নয়, বরং স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করাই হলো স্বপ্ন’। ভর্তি বৈতরণী অতিক্রম করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একাগ্রচিত্তে কাজ শুরু করে দিন, দেখা হবে বিজয়ে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, এরিস্টটল ইউনিভার্সিটি অব থেসালনিকি, গ্রীস।

ঢাকা, ৩০ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এফআর