[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



রাতারগুল জলাভূমি : অবহেলিত এক পর্যটন সম্পদ


প্রকাশিত: July 4, 2016 , 12:09 pm | বিভাগ: আপডেট,গেস্ট কলাম


Md-Abdul-Hamid

মোঃ আব্দুল হামিদ : বছর দুয়েক আগে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে বাইরের বেশ কিছু মেহমান এসেছিলেন। শেষ অধিবেশন দুপুরের মধ্যে শেষ হওয়ায় প্রস্তাব করা হলো তাদের আশেপাশে কোথাও ঘুরে দেখানো যায় কি না। বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনা শেষে ঠিক হলো রাতারগুল যাবার। মালয়েশিয়ার একজন এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো তিনজন প্রফেসরকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। রাতারগুল জলাবন ঘুরে দেখার জন্য সেটা আদর্শ সময় ছিল না। তবে ভেবেছিলাম সমগ্র পৃথিবীতে থাকা মাত্র বাইশটি জলাবনের মধ্যে একটি তাদের ঘুরে দেখানো কম গৌরবের বিষয় না। তাছাড়া প্রত্যাশা ছিল বর্তমান অবস্থা দেখে তারা মোটামুটি ধারণা করতে পারবেন যে বর্ষা মৌসুমে এটি কতোটা সুন্দর হয়। কিন্তু সেখানে যাবার পরের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ বিব্রতকর!

বনের ভেতরে তখন পানি ছিল একেবারেই কম অথচ নৌকাগুলো অযৌক্তিক ভাড়া দাবী করছিল। তারা বুঝে মানুষ কষ্ট করে ঐপর্যন্ত গিয়েও শুধুমাত্র উচ্চ ভাড়ার কারণে বনের ভেতরটা না দেখে ফিরে আসবে না। অগত্যা গলাকাটা মূল্যেই আমরা সম্মত হলাম ঘন্টাখানেক ঘুরতে। কিন্তু নদী থেকে নৌকা খালে ঢুকতেই উৎকট ঝাঁঝালো গন্ধ এসে নাকে লাগতে শুরু করল। কিছুটা সামনে এগোতেই দেখলাম অসংখ্য ছোটমাছ মরে ভেসে আছে। সম্ভবত দু’একদিন আগে স্থানীয়রা বিষ দিয়ে খালের মাছ মেরেছে। ফলে বিষাক্ত পচা মাছ সারাদিন কড়া রোদে থাকায় কী যে ভয়ংকর দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছিল তা বলে বুঝানো মুশকিল।

ratargulপ্রফেসর সাহেবদের ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। ভদ্রতা দেখিয়ে উনারা আমাদের বলেননি যে- এই তোমাদের আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট! তবে মালয়েশিয়ান প্রফেসর বারবার বলছিলেন- আচ্ছা এটা রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য কোন কর্তৃপক্ষ নেই? এতো সম্ভাবনাময় পর্যটন সম্পদকে তোমরা অবহেলায় ফেলে রেখেছ কেন? আমাদের বলার কিছু ছিল না; শুধুমাত্র ভুল জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কারণে বারংবার ‘সরি’ বলা ছাড়া।

বন্ধু বা পরিচিতজন যারা রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে থাকে তারা ভাবে সিলেট শহরে পৌঁছতে পারলেই বুঝি ইচ্ছেমতো আকর্ষণীয় স্পটগুলো ঘুরে দেখা যাবে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে সিলেট প্রাকৃতিক সম্পদে ও সৌন্দর্যে ভরা ছোট্ট একটি অঞ্চল। তাছাড়া এখানকার রাস্তাঘাট অনেক উন্নত হবে, যে কোন স্থানে চলাচল স্বস্তিদায়ক হবে বলেই তারা ধারণা করে। কিন্তু বাস্তবতা কতো কঠিন তা কেবলমাত্র ভূক্তভোগীরাই জানে। সীমিত আয়ের ছোট এক পরিবার সিলেটে বেড়াতে এসে হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার, পর্যটন মোটেল এলাকা, বড়জোর জাফলং ঘুরেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এর বাইরে যে কোন পর্যটন গন্তব্যে যাতায়াত যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি ব্যয়বহুল। সম্প্রতি বড় কিছু স্পটের আশেপাশে হোটেল কিংবা রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেগুলোতে অবস্থান করলে দিনে একটির বেশি স্পট দেখা সম্ভব হয় না; অতিরিক্ত খরচের বিষয়তো আছেই।

সিলেট এমন একটি পর্যটন অঞ্চল যেখানে একমাত্র সমুদ্র ছাড়া সব ধরণের আকর্ষণীয় বস্তুই (বিখ্যাত মাজার, পাহাড়, নদী, বন, চা বাগান ইত্যাদি) রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে ভ্রমণপিপাসুদের উপযোগী করে উন্নয়ন এবং সংযুক্ত করার কার্যকর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। তাছাড়া গতানুগতিক চিন্তার মানুষেরা এ অঞ্চলে ঘুরার কথা ভাবলেই মাথায় আসে জাফলং, মাধবকুন্ডু জলপ্রপাত, কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের কথা। কিন্তু ইয়ং জেনারেশনের মতামত নিলে অনেক সময় সেরা দশের মধ্যেও এই স্পটগুলোর নাম আসে না! তারা বলে বিছানাকান্দি, রাতারগুল, হামহাম, পাংথুমাই, লালা খাল, মাধবপুর লেকসহ অসংখ্য নতুন স্পটের কথা।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পিকনিক বা ট্যুরের জন্য এ সকল স্থানকেই অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু একদিকে পুরাতন স্পটগুলো নানা পক্ষের শোষণ, আগ্রাসনে জৌলুস হারিয়েছে অপরদিকে নতুন স্পটগুলোর উন্নয়নে নেই তেমন কোন উদ্যোগ। ফলে অসংখ্য সম্ভাবনাময় স্পটও প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নতি করতে পারছে না। এ সকল স্পটে রিজার্ভ গাড়ী ছাড়া যাতায়াত মোটেই সম্ভব নয় যা অধিকাংশ ভ্রমণ পিপাসুর জন্য কষ্টসাধ্য। চিত্তাকর্ষক এবং অ্যামাজান বনের ক্ষুদ্র সংস্করণ রাতারগুল জলাবনও এই ধারার ব্যতিক্রম নয়।

প্রকৃতির অদ্ভুত দান, অনন্য সুন্দর, দুর্লভ জলাভূমি রাতারগুল ঘুরতে গত মাসে আবারো গেলাম সপরিবারে। ইতোমধ্যে এই অমূল্য পর্যটন সম্পদ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, ভ্রমণকারীর সংখ্যাও বেশ বেড়েছে। কিন্তু বিগত দুইটি বছরে উল্লেখ করার মতো কোন উন্নয়ন হয়নি। দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো বনের মাঝখানে ‘ওয়াচ টাওয়ার’টির সংস্থাপন যদিও সেখানে ওঠার আগে নৌকাওয়ালা সাবধান করে দিয়েছিল একসাথে বেশি মানুষ উঠলে সেটা নাকি কাঁপতে থাকে! আম্বরখানা থেকে সালুটিকর রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আমার স্ত্রী বলছিল- এই রাস্তায় চলাচল আমাদের জন্যই ভীষণ কষ্টসাধ্য, তাহলে বিদেশী পর্যটকদের অবস্থা কী হবে? বিশেষত কাঁচা রাস্তা এতো কর্দমাক্ত ছিল যে মাইক্রোবাস বেশ দূরে রেখে ভ্রমণকারীদের হেঁটে পোঁছাতে হয়েছে।

অপরদিকে, প্রাকৃতিক কারণেই সেখানে ঘনঘন এবং প্রবল বৃষ্টি হয় যা একবার শুরু হলে চলে দীর্ঘসময়। অথচ সেক্ষেত্রে আশ্রয় নেবার মতো ধারে কাছে কোন জায়গা নেই। মহিলা, ছোটবাচ্চা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বৃষ্টিতে ভেজা অনেক সময় হরিষে বিষাদে পরিণত হয়। প্রয়োজনে খাবার মতো কোন রেস্টুরেন্ট ধারেকাছে নেই। নৌকায় ঘুরাঘুরি করার সময় বখাটে ও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়লে সাহায্য পাবার কোন আশাও করা যায় না। নৌকাডুবির মতো ঘটনা আকস্মিক ঘটলে উদ্ধারে নেই কোন আয়োজন। অপ্রত্যাশিতভাবে আঘাত পেলে কিংবা দুর্ঘটনায় (যেমন-সাপ, জোঁক ও পোকামাকড়ের কামড়, পানিতে গা চুলকানো) প্রাথমিক চিকিৎসা পাবার মতোও কোন বন্দোবস্ত নেই। তাছাড়া নেই কোন স্যানিটেশন ব্যবস্থা যা মানুষের অপরিহার্য চাহিদা।

যারা গোসল করে তাদের কাপড় বদলানোর কোন ব্যবস্থা নেই। মহিলাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধারতো প্রশ্নই উঠে না। অথচ সেখানে ইজারাদার নাকি নৌকা ভাড়ার একটি বড় অংশ নিয়মিত পকেটে পুরছে। যেখানে বছরের পর বছর ন্যূনতম সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হচ্ছে না, সেখান থেকে টোল আদায় করা কতোটা যৌক্তিক?

ratargul-68

উন্নত দেশগুলোতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের কাজটি সরকারই করে থাকে। কিন্তু সেটার সমৃদ্ধি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় বেসরকারী খাতের থাকে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা। অর্থাৎ সরকারী ও বেসরকারী সংস্থাগুলো যৌথভাবে পর্যটন সম্ভাবনাময় অঞ্চলের উন্নয়ন ও পরিচালনার কাজ করে থাকে। আমাদের দেশেও এখাতের উন্নয়নে পিপিপি’র আওতায় কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এর অগ্রগতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। সেক্ষেত্রে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার পরে রাতারগুল স্পটের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্টদের (যেমন- প্রশাসন, বনবিভাগ, সড়ক পরিবহন মালিক, নৌকা মালিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজারাদার, গ্রামবাসী) প্রতিনিধি নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি করা যেতে পারে যার মাধ্যমে এই স্পটটির ভবিষ্যত উন্নয়ন পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তাবিধান, প্রচার ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যদি সুষ্ঠুভাবে সেটা করা সম্ভব হয় তবে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে তেমনি আগত পর্যটকদের জন্যও বিষয়টি হবে সুখকর। তবে সর্বপ্রথম এর সম্ভাবনা অনুধাবন করে ‘সংরক্ষিত অঞ্চল’ হিসাবে ঘোষণা করতে হবে।

একসময় শুধুমাত্র অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় কিংবা প্রকৃতিপ্রেমীরাই রাতারগুল যেত। এখন বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও সেখানে যাচ্ছে যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু। তাই ভ্রমণকারীরা সেখানে পৌঁছার পরে ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা, ফ্রেশ হওয়া, দুপুরের খাওয়া ইত্যাদি প্রয়োজন মেটাতে (হতে পারে পর্যটন মোটেলের তত্ত্বাবধানে) জরুরি ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা দরকার। যেখানে নৌকায় ওঠার পূর্বে এবং নৌকা থেকে নামার পরে প্রয়োজনীয় সকল সাপোর্ট পাওয়া যাবে। তাছাড়া কিছু সংখ্যক ট্যুরিস্ট পুলিশ দিয়ে সেখানে একটি স্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা দরকার। ছিনতাইয়ের ঘটনা কম ঘটলেও বখাটেদের উৎপাত লক্ষ্যণীয়। দূর থেকে ঘুরতে আসা মহিলাদের প্রতি বাজে কথা বলা, শীষ দেওয়া, সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে দেওয়ার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে বলে শোনা যায়। ফলে পুলিশ ক্যাম্প থাকলে বখাটেরা যেমন সাহস পাবে না তেমনি ভ্রমণকারীরা অধিকতর নিরাপদ বোধ করবে। পাশাপাশি নৌকা ভাড়ার ব্যাপারেও একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দুই বা তিনটি রুট ডেভলপ করে প্রত্যেকটির ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া অথবা প্রতি ঘন্টায় তারা কতোটাকা নিতে পারবে তার তালিকা টাঙ্গিয়ে দিতে হবে। কারণ সুযোগ বুঝে মাঝিরা পাঁচশ থেকে দুইহাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। এবিষয়ে বলার মতো কোন জায়গা না থাকায় ভ্রমণকারীরা অসন্তুষ্টি নিয়েও উচ্চভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছে।

ratargul-live

এই জলাবন সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে নানা কথা শোনা যায়। কিন্তু সমন্বিতভাবে ধারণা দেবার কোন ব্যবস্থাই নেই। কমপ্লেক্সের একটি অংশ তথ্যসমৃদ্ধ যাদুঘরের মতো করা যেতে পারে যেখানে জলাবনের নানাবিধ বনজ, জলজ, খনিজ ও প্রাণীসম্পদ সম্পর্কে তথ্যবহুল উপস্থাপনা থাকবে। এ সংক্রান্ত তথ্যাবলী পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেও ভ্রমণকারীদের কাছে বিক্রয় করা যেতে পারে যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহীদের জ্ঞান পিপাসা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের  (যেমন-বনবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, মৎস্য সম্পদ) শিক্ষার্থীরা বাস্তব জ্ঞানার্জনের জন্য এখানে আসতে উৎসাহী হবে যেমনটা যায় লাওয়াছড়া রেইন ফরেস্টে। তাছাড়া আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ততোটা সচেতন নই। বনের মধ্যে বর্জ্য  নিক্ষেপ, উচ্চশব্দে গান বাজানো, গাছে উঠে লাফালাফি করার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তাদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, প্রয়োজনে সেগুলো তদারকিরও ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়রা যেমন অজ্ঞতার কারণে বিষ দিয়ে মাছ মারে তেমনি শুকনো মৌসুমে বিরল প্রজাতির এই গাছগুলো কেটে নিয়ে যায় জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের জন্য। তাছাড়া যে কোন ধরণের অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হবে। নইলে প্রকৃতির এই অপূর্ব দান হারাবে তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, বিপন্ন হবে এর আশ্রয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীকূল, সর্বোপরি হারাবে এর পর্যটন সৌন্দর্য যেমনটা হয়েছে জাফলংয়ের ক্ষেত্রে। আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সচেষ্ট হবেন।

 

 

লেখক : মোঃ আব্দুল হামিদ
এসোসিয়েট প্রফেসর

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

ঢাকা, ০৪ জুলাই(ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন