[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



শোলাকিয়ার বন্দুকধারী তানিমের যে কথা জানা হয়নি


প্রকাশিত: July 14, 2016 , 4:07 am | বিভাগ: এক্সক্লুসিভ,কলেজ,খবর,ঢাকার ক্যাম্পাস


 

22483_b5

আজহার মাহমুদ: জাহিদুল হক। ওরফে তানিম। হালে সমালোচিত। বর্বর, বিপথগামি ও উচ্চাভিলাসি। শোলাকিয়া মিশনের অন্যতম হোতা। সমাজের বোঝা এবং কুলাঙ্গারও বটে। তার স্বপ্ন ছিল দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো। বিভিন্ন ভাষা শেখা। ৩/৪টি ভাষা শেখাও হয়েছিল। কিশোরগঞ্জ থেকে স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় সরকারী তিতুমীর কলেজে। ইংলিশে অনার্স করেছে তানিম। পরে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে অপতৎপরতায়। নাম লেখায় নিষিদ্ধ জঙ্গি গ্রুপে।

যে ভাবে জঙ্গি খাতায় তানিম:
জাহিদুল হক তানিমের ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার কলেজের বন্ধুরা জানায়, তার আসা যাওয়া ছিল ব্যতিক্রম। সে সাধারণত কম কথা বলেতো। আমরাও তার সঙ্গে তেমন কোন কথা বলতাম না। কিন্তু গতিবিধি ছিল অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। আমরা তার মিশনটা বুঝতে পারি নাই।
সে নিয়মিত ফেসবুক ব্যববহার করতো। খুবই আ্যাক্টিভ ছিল। তার স্ট্যাটাস ছিল অন্যরকম। গোয়েন্দাসূত্র জানায়, তার ফেসবুক ২০১৩ এর শেষের দিকে বন্ধ করে দেয়। তবে তার নিজ নামের এই এফবি আইডির টাইমলাইনে ২০১৩ সালের আগস্টের পর আর কোনো স্ট্যাটাস দেখা যায়নি। পরবর্তীতে সে কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করে ফেসবুকে সক্রিয় ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে । সূত্র আরও জানায়, তার স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে তদন্ত চলছে। সে সময় কার কার সঙ্গে সে বেশী কথা বলতো, কাকে বেশী ম্যাসেজ ও এসএমএস করতো এসবও খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা।

 

এদিকে সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন, জাহিদুল হক তানিমের ফেসবুকে আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশ, ইসরাইল ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের উগ্রবাদীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সন্ধান মিলেছে। সে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের পেজে লাইক দিত। সেখানে তার নিজের মতামত তুলে ধরতো। এই সুযোগেই জঙ্গিরা তাকে টার্গেট করে। নিয়মিত চলতো তাদের সাথে চ্যাটিং। টুইট। হোয়াটসআপে আলাপন। এভাবেই জঙ্গিদের নজরে পড়ে যায় সে।

অন্যদিকে শোলাকিয়া মিশনে জাহিদুল হক তানিম অংশ নিয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের সময় সে ঘটনাস্থলের একটি বাসায় ঢুকে পড়ে। সেখানে পোশাক বদল করে আত্মগোপনেরও চেষ্টা করে। সে সময়েই তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তাকে আটক করে।

এ সময় বাসার ভেতর থেকে ফ্রিজের পেছনে লুকিয়ে রাখা জাহিদুল হক তানিমের ব্যবহৃত গাঢ় সবুজ রংয়ের পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা, রক্তমাখা টুপি ও পাগড়ি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়।

রিমান্ডে তথ্য দিচ্ছে তানিম:
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, রিমান্ডে নানান ধরনের নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে তানিম। বলেছে, কিভাবে ও কেন সে এই বন্দুকধারীদের জালে বন্দি হয়েছিল। তবে তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে যাচাই বাচাই করা হচ্ছে। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জাহিদুলের জড়িত হওয়ার ব্যাপারে নানান যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জাহিদুল হক তানিম শোলাকিয়ায় হামলার পরিকল্পনায় কবে থেকে যুক্ত হয়েছিল, সেটি তদন্ত দলের পক্ষ থেকে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। হামলায় তার কি ভূমিকা ছিল সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সে অন্য কোথাও কোনো সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল কিনা, সে বিষয়টিও তদন্তে স্থান পাচ্ছে।

রিমান্ড সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, তানিমের সঙ্গে নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, এআইইউবিসহ গুলশান-বনানীর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ৪/৫ জনের নাম স্বীকার করলেও অন্যদের কথা কিছূ বলতে চাচ্ছেনা বলেও জানাগেছে।

সে আরও জানায়, আবির, নিবরাস, হাসনাত করিম, রোহানসহ অন্তত ৪/৫ জনের সাথে তার কথা হতো। ই-মেইলে যোগাযোগ হতো। তবে কোন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি হচ্ছেনা তানিম। তানিমরা বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ছাড়াও বিভিন্ন লোকদের ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো।

শোলাকিয়া হামলা : গ্রেপ্তার তানিম ১০ দিনের রিমান্ডে

এর আগে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি জাহিদুল হক ওরফে তানিম (২৪) কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গত রবিবার রাতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে আসামিকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুস সালাম খানের আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে বিচারকের খাস কামরায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুর্শেদ জামান আসামি তানিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

শুনানি শেষে বিচারক ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ ছাড়াও র‌্যাব হেফাজতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গুলিতে আহত চিকিৎসাধীন অন্য আসামি শফিউল ইসলাম ওরফে শরিফুল ইসলাম ওরফে আবু মুকাত্বিলকে সুস্থ হওয়ার পর দ্রুত আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুর্শেদ জামান।

সূত্রটি আরো জানায়, শোলাকিয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ঘটনাস্থল ও শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক পাঁচজনকে সোমবার বিকেলে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে বন্দুকযুদ্ধের এক পর্যায়ে ওই এলাকা থেকে আটক শোলাকিয়া গোহাটা এলাকার সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মোশারফ হোসেনের ছেলে মামুনুর রশিদ (২৭), শহরতলির বয়লা এলাকার আব্দুল হাইয়ের ছেলে সানাউল্লাহ (৩০), বাজিতপুরের পিরিজপুর এলাকার কাঠুরিয়া সামছুদ্দিনের ছেলে ভৈরব কলেজের ছাত্র সোহেল (১৯), ভৈরবের পঞ্চবটি এলাকার মৃত আবদুল জলিলের ছেলে তারা মিয়া ও শহরের তারাপাশা এলাকার মৃত মাহবুবুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম হাসিবকে অন্য মামলায় সোমবার বিকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
বাসায় তল্লাশি:
এদিকে জাহিদুল হক তানিমের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে দুটি স্মার্টফোন এবং কিছু সিডি ও ডিস্ক জব্দ করেছে পুলিশ। জব্দ করা দুটি স্মার্ট ফোনের মধ্যে একটি জাহিদুল হক তানিমের ব্যবহৃত পুরনো স্মার্টফোন এবং অন্যটি তার ভাই আকাইদের ব্যবহৃত স্মার্টফোন বলে জানিয়েছেন জাহিদুলের বাবা মো. আবদুস সাত্তার চান মিয়া। তিনি জানান, সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ এসে এই দুটি স্মার্টফোন নিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, তদন্তের কাজে এগুলো প্রয়োজন। পরে এসে তারা ফেরত দিয়ে যাবেন। এছাড়া, বুধবার দুপুরে পুনরায় এসে বাসা তল্লাশি করে পুলিশ। তখন বাসায় পুরুষ কেউ ছিলো না। তার ছেলে আকাইদের স্ত্রী মুক্তা আক্তার ও দাদি শাশুড়ি হাওয়াল নেছা ছিলেন। ঘরের ওয়্যারড্রোব ও অন্যান্য জিনিসপত্রে তল্লাশি চালিয়ে কিছু সিডি ও ডিস্ক নিয়ে যায়।
পাসপোর্ট রহস্য:
তানিমের ব্যাপারে জানা যায় সে কয়েক দফা দেশের বাইরে গেছে। তার পাসপোর্টে বেশ কয়েকটি দেশের ভিসাও লাগানো রয়েছে। তবে কোন কোন দেশের তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ বলেছে, রিমান্ডে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে জাহিদুল এমন তথ্য দেয়ার পর পাসপোর্টটি উদ্ধারে মাঠে নেমেছেন তারা।
পাসপোর্টের খোঁজে জাহিদুলদের বাসায় তল্লাশিও চালানো হয়েছে। তার পাসপোর্টটি কার মাধ্যমে করা হয়েছিল, কে সহায়তা করেছে তাও জানতে চেয়েছে পুলিশ। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা অন্য একটি সূত্র বলেছেন, জাহিদুল কখনও দেশের বাইরে গিয়েছে কিনা সেটি তারা এখনও নিশ্চিত নন। তার পাসপোর্ট পাওয়া গেলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কে ওই তানিম:
জাহিদুল হক তানিমের পিতার নাম মো. আবদুস সাত্তার চান মিয়া। তাদের বাসা কিশোগঞ্জের তারাপাশা এলাকায়। ২০০৬ সালে কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিম তারাপাশা এলাকার বাসাসংলগ্ন আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। ২০০৮ সালে শহরের ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকার সরকারী তিতুমীর কলেজে ইংরেজি বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়।
কিন্তু অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার সময় সে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ওই সময় সে এডমিট কার্ড হারিয়ে ফেলায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি বলে পরিবারকে জানায়। ছোট থেকেই সে ছিল উচ্চাভিলাসি। বিভিন্ন দেশে ভ্রমন ও ভাষা শেখা ছিল তার নেশা। সে থেকেই তানিম ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান ও জাপানিসহ বেশ কয়েকটি ভাষা শিখে ফেলে।
চাকুরী:
২০১৩ সালে রাজধানীর পল্টন এলাকার ফুজি ইন্টারন্যাশনালে জাহিদুল চাকরি নেয়। সেখানে চাকরি করার সময় সে জাপানিসহ দু’য়েকটি বিদেশি ভাষা শিখে। বছরখানেক চাকরি করার পর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তার চাকরি চলে যায় জানিয়েছেন তার বড় ভাই আকাইদ হক।
হামলা:
গত ৭ জুলাই ঈদের দিন জঙ্গিদের হামলাস্থলের চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী পাকুন্দিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ সামসুদ্দীন বাদী হয়ে ১০ জুলাই সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী) ৬(২)/৮/৯/১০//১২/১৩ ধারায় কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা (নং ১৪) দায়ের করেন।
শোলাকিয়ার মামলায় বন্দুকযুদ্ধের পর র‌্যাবের হাতে আটক দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার শরীফুল ইসলামকে প্রধান ও জাহিদুল হক তানিমকে দ্বিতীয় আসামি করে আরো কিছু অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীকে আসামি করা হয়। সেদিন বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলেই সন্দেহভাজন বন্দুকধারী ঢাকার বসুন্ধরা এলাকার আবীর রহমান (২৩) নামে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।

যা উদ্ধার হয়েছে:
ঘটনাস্থল থেকে দুটি জাপানি পিস্তল, একটি পরিত্যক্ত অবিস্ফোরিত গ্রেনেড, দুটি চাপাতি ও দুটি চাইনিজ কুড়ালসহ কিছু কাপড়, গামছা ও টুপি উদ্ধার করা হয়।
এদিন চেকপোস্টে জঙ্গিদের চাপাতির হামলায় দুই পুলিশ কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপু ও আনসারুল হক এবং সন্ত্রাসীদের গুলিতে স্থানীয় গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিক নিজ বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
ওই মামলার ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ওসি মীর মোশারফ হোসেন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার সত্যতা যাচাই করাসহ এসবের ভিত্তিতে অভিযান চলছে। তিনি মামলার তদন্তের স্বার্থে কী ধরণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বলতে রাজি হননি। তিনি আরও বলেন, সে রিমান্ডে কয়েক দফায় যে সব তথ্য দিয়েছে তা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করবে না পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

 

ঢাকা, ১৪ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম