[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



নিখোঁজ সুজিত দেবনাথ যেভাবে সাইফুল্লাহ ওজাকি


প্রকাশিত: July 15, 2016 , 11:23 pm | বিভাগ: এক্সক্লুসিভ,ক্রাইম এন্ড 'ল


Saifullah OZaki-2
খন্দকার রায়হান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে: ক্যাডেট কলেজ পড়ুয়া সুজিত দেবনাথকে নিয়ে তোলপাড় চলছে। কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়, এই আলোচনা চলছে গোয়েন্দা মহলেও। হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে নাম রাখেন সাইফুল্লাহ ওজাকি। কি তার আসল পরিচয়, কিভাবে নাম লেখালো জঙ্গি খাতায়, কার সহায়তায় এই পথে পা রাখলো এসব হিসাব নিকাশ চলছে তাকে নিয়ে। অনার্স পরীক্ষায় ঈর্ষনীয় ফলাফলের পর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনান তাকে একটি মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছিলেন। আর সেই তরুণ এখন পুলিশের খাতায় ওয়ানটেড।

গোয়েন্দারা তার ব্যাপারে ইতোমধ্যে নানান তথ্য তালাশ শুরু করেছেন। তারা বলছেন, সাইফুল্লাহ ওজাকি কি আসলেই সুজিত দেবনাথ? নাকি সাজানো নাম? এই বিষয়েও তদন্ত চলছে। সাইফুল্লাহ ওজাকি উত্তরা পশ্চিম থানার একটি মালার আসামী। মামলা নম্বর ২৩(৫) ২০১৫। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজ ১০ জনের মধ্যে সাইফুল্লা ওজাকিও আছেন। তার বিস্তারিত পরিচয় মিলেছে।

গুলশানের জঙ্গি হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ যে ১০ যুবকের তালিকা দেয়া হয়, এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনদপুর ইউনিয়রেন কড়ইবাড়ি গ্রামের সুজিত দেবনাথ ওরফে সাইফুল্লাহ ওজাকির নামও রয়েছে।

কে ওই সুজিত দেবনাথ:
এলাকাবাসী জানান, সুজিত দেবনাথই ধর্মন্তরিত হয়ে নাম রাখেন সাইফুল্লাহ। আর জাপানের রিটসো মেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার পর তার উপাদি দেয়া হয় ওজাকি হিসেবে। ওই ভার্সিটির গ্রাজুয়েটদের এই উপাধি দেয়া হয়।

এদিকে ছেলের নিখোঁজের খবরে শয্যাশায়ী তার পিতা জনার্ধন দেবনাথ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও করছেন কান্নাকাটি। যদিও ওজাকি হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলমান হয়েছেন। জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মেধাবী ওজাকি নিখোঁজ হলেন কিভাবে সেটি ভাবিয়ে তুলেছে তার পরিবারকে। পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিলো কমই।
জিনদপুর বাজার আর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা হচ্ছিল জনার্ধনের ছেলে সাইফুল্লাহ ওজাকিকে নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক প্রকাশিত এ তালিকায় সাইফুল্লাহ ওজাকির ছবি থাকার বিষয়টি মঙ্গলবার বিকালের পর জানতে পারেন জানার্ধন। এরপরই ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া গেছে শয্যাশায়ী।

আত্মীয় স্বজনরাও ছুটে এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে। জনার্ধনের প্রশ্ন তার ছেলে নিখোঁজ কিভাবে হয়েছে তার জানা নেই।  তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, নিখোঁজ কথাডা আইলো কি করে? সেতো জাপানে ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসারি করে। তাহলে কি জাপান নাই?

saifullah ojaki

তিনি বলেন কয়েক মাস আগে পুলিশ আসার পর তাকে ফোন করে আমি এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তখন সে আমাকে বলেছে এই অভিযোগ ঠিক নয়। তার বন্ধুরা হিংসাত্বক হয়ে তার অনিষ্ট করার জন্যে এই অভিযোগ এনেছে। আমার ধারনা আর্ন্তজাতিক কোনো সংস্থা তার ব্রেইন ওয়াশ করে থাকতে পারে।

বাবা জনার্ধন দেবনাথ জানান, ২০০৬ সালে সাইফুল্লাহ অনার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হওয়ার পর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমাকে জাপান নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি প্রায় ২২ দিন ছিলাম। বাংলাদেশে আসলে আমাদের  সঙ্গে দেখা করে  যেত। মাঝে মধ্যে ফোনে খোঁজ-খবর নিত। তবে গত ৬ মাস ধরে আর কোন খোঁজ-খবর নেয় না। আমি তার কাছে কিছু চাইতাম না। তার মাকে মাঝে মধ্যে টাকা পাঠাত। সে ভদ্র, শান্ত ও মেধাবী ছিল। সে কোন রকম সন্ত্রাসী কাজ করতে পারে না।

 

জনার্ধনের ৩ ছেলে মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সুজিত দেবনাথ (৩২)। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর নাম রাখেন সাইফুল্লাহ ওজাকি। কয়েক মাস আগে নবীনগর থানা পুলিশ তদন্ত করতে গেলে হতবাক হন তার বাবা জনার্ধন দেবনাথ। পুলিশ তাকে জানায় তার ছেলে জঙ্গিদের অর্থায়ন করে। ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলার আসামী। (মামলা নং ২৩,তারিখ:২৪/৫/১৫ ইং) পুলিশ তদন্তে যায়।

ওই থানা থেকে নবীনগর থানার ওসির কাছে পাঠানো অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়- ঘটনার সঙ্গে জড়িত পলাতক আসামী সুজিত চন্দ্র দেবনাথ, পিতা-জনার্দন দেবনাথ, গ্রাম কড়াই বাড়ি, ডাকঘর: জিনোদপুর। পরবর্তীতে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। তার নাম পরিবর্তন করে সাইফুল্লাহ ওজাকি নামধারণ করে। বর্তমানে সে জাপানে বসবাস করছে। সে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসে ও বিভিন্ন জংঙ্গী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রাখে। সে জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য।

এ বছরের ৪ জানুয়ারি ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদ নবীনগর থানায় পাঠানো হয়। এরপরই গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর নিখোঁজ হিসেবে তার নাম প্রকাশিত হয়।

Ritsumeikan_APU_Univ,_JapanCL

সুজিতের পড়াশুনা:
জনার্ধন দেবনাথের ৩ ছেলে মেয়ের মধ্যে সবার বড় সুজিত চন্দ্র দেবনাথ। পরিবারের সদস্যরা জানায়- সুজিত জিনদপুরের হুরুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। এরপর ভর্তি হয় ফতেহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে । সেখান থেকে সিলেট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয় সে। সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে সুজিত।

ওই দু’পরীক্ষায় মেধা তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেয় সে। এরপরই বৃত্তি নিয়ে জাপানে চলে যায় । সেখানকার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের মধ্যে দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে।  সুজিত ২০০১ সালে জাপান যাওয়ার পর সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

সুজিতের মামা শংকর দেবনাথ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, সাইফুল্লাহ খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। সে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে স্ট্যান্ড করে। পরে বৃত্তি পেয়ে জাপান চলে যায়। জাপান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে  জাপানের কিউতো ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে যোগদান করে। অনার্স পরীক্ষার ফলাফলের পর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনান তাকে একটি মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছিলেন। পরে সে একজন জাপানিকে বিয়ে  করে। তারপর  স্বামী-স্ত্রী দু’জনই মুসলমান হন। তাদের  তিন পুত্র ও এক কন্যা  সন্তান রয়েছে। তার পিতা একসময় এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন। গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় জিনদপুর বাজারে দোকান নিয়ে কাপড়ের ব্যবসা করছে। সাইফুল্লাহ ওজাকির একটি ছোট বোন রয়েছে। সে-ও মাস্টার্স করেছে। তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

baba

সেখানে যাওয়ার পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। সুজিতের পিতা জনার্দন দেবনাথ ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, তার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি অনেক পরে। ২০০৬ সালের দিকে।  তবে আমাদের আগে বাইরের মানুষ জানতে পেরেছে। তারা আমাকে প্রশ্ন করে সে ধর্মান্তরিত হয়েছে কিনা। তাছাড়া সে তখন দাড়িও রাখে। জানান একবছর আগে বাড়িতে এসেছিলো সুজিত। স্থানীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে আসে প্রথম। এরপর চেয়ারম্যানকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে। কিন্তু ১০/১৫ মিনিট পরেই আবার চলে যায়।

 

জনার্ধন জানান, এরপর মাস সাতেক আগে ছেলের সাথে তার কথা হয়। তখন সে খোজঁখবর নেয়। কিন্তু সে এখন কিভাবে নিখোঁজ অইলো তা বুঝতে পারছিনা। জনার্ধনের আরেক ছেলে অশিত দেবনাথ মারা যান ২০০৪ সালে। মেয়ে রীনা দেবনাথকে বিয়ে দিয়েছেন। সুজিতই ছিলো তার আশা ভরসা। সুজিতের ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় তার।

 

জনার্ধন আরও বলেন, আমার জীবনডা শেষ। কোন রকমে বাইচ্চা আছি। আশা-ভরসা বলতে কোন কিছু নেই। যদি তাড়াতাড়ি মরতে পারতাম। জনার্ধন জিনদপুর বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন।  স্থায়ী দোকান খোলার আগে বিভিন্ন হাটে ঘুরে ঘুরে কাপড় বিক্রি করতেন তিনি। ছেলে সুজিতের পড়াশুনার জন্যে তার শ্রমঘামের প্রশংসা আছে গ্রামে। সাইকেলে করে ছেলেকে নিয়ে যেতেন প্রাইভেটে। প্রাইভেট শেষ হলে আবার নিয়ে আসতেন। ছেলে ধর্মান্তরিত হয়ে দূরে সরে গেলে তার ভালোবাসা কমেনি ছেলের প্রতি। বলেন, সে ব্রিলিয়্যান্ট। ধর্মান্তরিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু জঙ্গিদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হয় না। কয়েক মাস আগে পুলিশ এসে এসব বলার পর হতবাক হয়েছিলাম। নিখোঁজের খবরে একই অবস্থা আমার।

 

জিনদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবাই তাকে আদর করতো। খুবই ভালো ছেলে ছিলো সে।

 

নবীনগর থানার ওসি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনে করা একটি মামলায় তার ব্যাপারে তদন্তের অনুরোধ এসেছিল। আমরা তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেই। এ ব্যাপারে তার আর কিছু জানা নেই।

 

রায়হান//ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৫ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এফঅার