[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



জঙ্গিবাদ ও আমাদের দায়বদ্ধতা


প্রকাশিত: July 22, 2016 , 8:07 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


MD

এম এন করিম: জঙ্গি শব্দটি আজ পুরো বিশ্বে একটি বহুল নিন্দিত শব্দ। আর বাংলাদেশের অপরাধ জগতে গত ১ জুলাই থেকে সর্বোচ্চ ব্যবহৃত শব্দ। এর কারণ, দেশে দুটি ঘটনা নিয়ে। বিচার জগতে জঙ্গিদের বিচার চাইলেও, জঙ্গি শব্দের উপর করা হচ্ছে চরম অবিচার।

জঙ্গি শব্দের জঙ্গ একটি ফার্সি শব্দ। উর্দুতেও এর প্রচুর ব্যবহার আছে। উর্দু আর ফার্সিতে শব্দটা লড়াই বা যুদ্ধ অর্থে ব্যবহার হয়। জঙ্গ অর্থ যুদ্ধ আর জঙ্গি মানে যোদ্ধা, লড়াকু। যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধকে উর্দু ফার্সিতে জঙ্গে আজাদি বলা হয়, আর স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের বাংলায় মুক্তিযোদ্ধা বলে আর উর্দু ফার্সিতে বলে জঙ্গিয়ে আজাদি।

ফার্সি আর উর্দুতে জঙ্গি একটি সম্মানিত শব্দ। যারা অন্যায় অত্যাচার আর জুলুম নির্যাতনের বিপক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করে তাদের সম্মানের চোখে দেখা হবে সেটাই স্বাভাবিক। যেমন ’৭১ সালে যারা আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিলেন তারা আমাদের কাছে অত্যন্ত সম্মানের পাত্র। আমাদের গৌরব। তারা বাংলায় মুক্তিযোদ্ধা আর উর্দু ফার্সিতে জঙ্গি। এই অর্থে জঙ্গি একটি সম্মানিত শব্দ।

তুরস্কের জঙ্গি রাজবংশের শেষ শাসক, বায়তুল মুকাদ্দাসের পুনরুদ্ধারের স্বপ্নদ্রষ্টা, ন্যায়পরায়ণ শাসক নূর উদ্দিন জঙ্গিকে এখনও মুসলমানরা সম্মানের চোখেই দেখেন। কারণ যেভাবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অন্যায়ের বিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিলেন তিনিও অন্যায়ের বিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিলেন।

কিন্তু আজকাল কিছু মিডিয়া আর সুশীলরা এই শব্দটার অর্থবিকৃতি করে এমনভাবে খারাপ অর্থে ব্যবহার করছে যে এই শব্দটি শুনলে এখন মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যায়। ভয়ে মানুষ আঁতকে উঠে। জঘন্য ধরনের খারাপ কিছু লোক বলেই মনে হয় এই শব্দটার অর্থ, যারা নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, বোমাবাজি করে বা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে। এরকম কিছু বোঝাতে এখন জঙ্গি শব্দটা
ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের অনুসারী কেউ যদি ছোটখাটো অপরাধও করেতাদেরকে জঙ্গি হিসেবে প্রচার করার জন্য মিডিয়াতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অথচ এইসব অপকর্ম যারা করে তাদেরকে বাংলায় সন্ত্রাসী বলা
হয়। বাংলা ভাষায় উর্দু ফার্সি আরবি শব্দের ব্যবহারে যারা খুব অসন্তুষ্ট হন সেই তারাই এই বিশেষ একটি জায়গায় এসে উর্দু আর ফার্সির প্রচার প্রসারের জন্য জান কোরবান করে দিচ্ছেন। আর উর্দু ফার্সিতে যেভাবে জঙ্গি শব্দটা ভালো অর্থে ব্যবহার হয়, এরা সেই ভালো অর্থের বিপরীতে জঘন্য খারাপ অর্থে শব্দটাকে ব্যবহার করছেন।

এখানে যেমন শব্দের অর্থ বিকৃত করা হচ্ছে তেমনি বাংলার পরিবর্তে উর্দু ফার্সির জন্য জান কোরবান করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? হয়তো কেউ বলতে পারেন, একটি শব্দ আগে
এক অর্থে ব্যবহার হতো এখন অন্য অর্থে ব্যবহার হচ্ছে এতে দোষের কিছু নেই। জঙ্গি
শব্দটা আগে যোদ্ধা বুঝাতে ব্যবহার হলেও এখন সন্ত্রাসী বুঝাতে ব্যবহার হতেই পারে। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, এখন জঙ্গি অর্থ যদি সন্ত্রাসী হয়, তাহলে যারা রাম দা আর পিস্তল নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, পুলিশের সামনেই যারা বিপক্ষের মানুষের ওপর গুলি করছে, যাদের অত্যাচারে দেশের সাধারণ জনগণ
আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তাদেরকে সন্ত্রাসী অর্থে জঙ্গি বলা হচ্ছে না কেন? যেসব আলেম ওলামা জীবনে কোনোদিন অস্ত্র হাতে ধরেননি, যারা সমাজে শান্ত, শিষ্ট মানুষ হিসেবে
পরিচিত তাদেরকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জঙ্গি অপবাদ দেয়া হচ্ছে কেন?

আমাদের দেশে জঙ্গির অভিষেক নতুন নয়, ২০০৪ সালে এর যাত্রা। এর বিশাল রুপ নেয় বর্তমান সরকারের আমলে এসে। জঙ্গিকে করা হয় হাতের নাগালের বাইরের জিনিস। রাবির শিক্ষক হত্যা, তনু হত্যা, ব্লগার হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যার পর আইএসের ওয়েভ সাইটের বিবৃতির উপর নির্ভর করে পরবর্তি পদক্ষেপ কি হবে। গত ঘটনাগুলোতে মনে হয়েছে যেন, আইএসের বিবৃতি পেলেই প্রশাসন বা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব কর্তব্য শেষ। আমার কথা মিথ্যা হলে আজও কেন বের হয়নি? ব্লগার হত্যার, প্রকাশক হত্যার, রাবি হত্যার, তনু হত্যার, রিতু হত্যার মুল হোতা।

রিতু হত্যার পর চলল আরেক দৃশ্যপট। দেয়া হল সাঁড়াশী অভিযান সপ্তাহব্যাপী। ধরা হল অনেককে। কিন্তু, তারা ছিল বিরোধী দলের নেতাকর্মী। এতে কথা এসেছে, কিছু পুলিশের সুযোগ হয়েছে ঈদের আগে আটক বাণিজ্য করে অন্তত ঈদের বোনাসের বোনাস পেতে। আরো হয়রানিতে পড়েছে নিরীহ মানবসমাজ। যারা জঙ্গি বা বিরোধী দলের তালিকায়ও পড়ে না।

গত ১ জুলাই থেকে ঘটনা মোড় নিল অন্যদিকে। দেশের প্রশাসন, এমপি, মন্ত্রী ও আরো বড় ব্যক্তিরা নামল বক্তব্য প্রতিযোগিতায়। আর বিভিন্ন সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন নামল জঙ্গি বিরোধী সভা সমাবেশ ও মানব বন্ধনে। কেউ করছে আবেগে আর কেউ করছে বাধ্য হয়ে ফর্মালিটি রক্ষার্থে তনু হত্যারমতো।
আর মিড়িয়াগুলোও ফলাও করে প্রচার করছে তাদের বক্তব্য মিছিল- মিটিং। কেউ বলছে পরিবারকে সচেতন হতে, কেউ বলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে, আবার কেউ বলছে জনগণকে।

আবার র‍্যাবও ঘোষণা করেছে বড় মাপের পুরস্কার। আর ইসলামী ফাউণ্ডেশন নিয়ন্ত্রণ করছে মসজিদের খুতবা। তার মানে কি বুঝাচ্ছে? মসজিদের খুতবা শুনে জঙ্গি হচ্ছে। এ ধর্মীয় মৌলিক শিক্ষায় বাধা দিয়ে চরমপন্থি দমন করা যাবে না, বরং তৈরী করা যাবে মাত্র। কারণ কথায় আছে , অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়। আমার মনে হয়, এতো কিছু না করে জঙ্গি ধরার ইচ্ছা থাকলে ধরুন নিরবে নিভৃতে। ঢাকঢোল পিটিয়ে চোর তাড়ানো যায় কিন্তু, মাছিও ধরা যায় না।

লেখক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

ঢাকা, ২২ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর