[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সাতক্ষীরায় প্রাক-প্রাথমিকের ৫ কোটি টাকা হরিলুট


প্রকাশিত: July 26, 2016 , 9:04 pm | বিভাগ: আপডেট,এক্সক্লুসিভ,ক্রাইম এন্ড 'ল


primary

আব্দুর রহমান, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা জেলার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় স্লিপ ও প্রাক-প্রাথমিকে বরাদ্দকৃত প্রায় ৫ কোটি টাকা হরিলুট করার অভিযোগ উঠছে। দু’একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এসব টাকার সঠিক ব্যবহার করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ভুয়া বিল ভাউচার করে টাকা আত্মসাৎ করে নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ আরো অনেকে কমিশনের ভিত্তিতে টাকা ভাগাভাগি করাই যেন রীতিতে পরিনত হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে জেলার শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এমনটিই দাবি সাতক্ষীরাবাসীর।

জেলার সাত উপজেলা অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা বিভাগ মিলে প্রতিষ্ঠান রয়েছে এক হাজার একশ একাত্তরটি। এর মধ্যে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক হাজার ৭৭ টি প্রতিষ্ঠানকে এবং প্রাক-প্রাথমিকের আওতায় পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক হাজার ৮৬ টি প্রতিষ্ঠানকে। স্লিপ প্রকল্প ও প্রাক-প্রাথমিকে জেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও জেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্র মেরামোতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা করে।

এসব অফিস সূত্রে জানা যায়, বরাদ্দকৃত এসব টাকা ক্রয়কৃত মালামালের তালিকা বিদ্যালয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু জেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে কোনো প্রকার তালিকা দেখা যায়নি। তারা খোড়া যুক্তিকে কারন হিসেবে উল্লেখ করছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে কথা বলে তারা জানান, বরাদ্দকৃত এ টাকার সবটাই তাদের হাতে আসে না। এরমধ্যে একটি বড় অংশ সরকারি ভ্যাট বাবদ কর্তণ করা হয়।

এছাড়াও অফিস খরচ তো আছেই। অফিস খরচ জানতে চাইলে তারা বলেন, স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকার থেকে ৭০০ টাকা, প্রাক-প্রাথমিকের টাকা থেকে ৩০০টাকা এবং ক্ষুদ্র মেরামতে ৫০০ টাকা করে টিও স্যারকে দিতে হয়। এছাড়া অন্যান্য খরচ তো আছেই। তবে, উপজেলা ভিত্তিক এ টাকা কম-বেশি করে দিতে হচ্ছে।

সাম্প্রতি টাকা দেয়া নিয়ে সদর উপেজলায় প্রধান শিক্ষদের সাথে কথা কাটা- কাটি হলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাক আহমেদ তাদের টাকা ফেরত দেন।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানাযায়, এ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দুইশটি। এর মধ্যে পৌর এলাকায় অবস্থিত ৩৩টি এবং ইউনিয়নে অবস্থিত ১৬৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানে স্লিপ প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা এবং প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে এ উপজেলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯০ লাখ টাকা। যার মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৮০ লাখ এবং প্রাক-প্রাথমিকে ১০ লাখ টাকা।

কলারোয়া উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১২৭ টি। যার মধ্যে পৌর রয়েছে ৬ টি এবং ইউনিয়নে রয়েছে ১২১ টি প্রতিষ্ঠান। এ উপজেলার স্লিপ এবং প্রাক-প্রাথমিকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৫০ লাখ ৮০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকে ৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

তালা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ২১০টি। যার মধ্যে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দুইশ ১০টি বিদ্যালয়কে এবং প্রাক-প্রাথমিকে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দুইশ ছয়টি বিদ্যালয়কে।

এ দুই প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৮৪ লাখ এবং প্রাক প্রাথমিকে ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
আশাশুনিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দুইশ ৩৪ টি। যার মধ্যে থেকে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে একশ ৫০ টি বিদ্যালয়কে এবং প্রাক-প্রাথমিকে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে একশ ৬৩ টি বিদ্যালয়কে।

আশাশুনিতে দুই প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৬৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৬০ লাখ এবং প্রাক প্রাথমিকে ৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। তবে, এ উপজেলায় উক্ত টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে উতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছে উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা।

দেবহাটা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬০ টি। এসব বিদ্যালয়ে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৯ টি বিদ্যালয়কে এবং প্রাক-প্রাথমিকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৯টি বিদ্যালয়কে। এ উপজেলায় স্লিপ প্রকল্প এবং প্রাক প্রাথমিকে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যার মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ২৩ লাখ ৬০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকে ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।

কালিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১৪৭ টি। এসব বিদ্যালয়ে স্লিপ প্রকল্পে ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৩৮ টি বিদ্যালয়কে এবং প্রাক-প্রাথমিকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৩৮ টি বিদ্যালয়কে। কালিগঞ্জ উপজেলায় দুই প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৬২ লাখ ১০ হাজার টাকা। যারমধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৫৫ লাখ ২০ হাজার এবং প্রাক প্রাথমিকে ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

শ্যামনগর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৯৩টি। এরমধ্যে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৯৩ টি বিদ্যালয়কে এবং প্রাক-প্রাথমিকে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠানকে। এ উপজেলার দুই প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। যার মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৭৭ লাখ ২০ হাজার এবং প্রাক প্রাথমিকে ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিউর রহমান বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। বিগত বছরে কি কাজ হয়েছে তা বলতে পারব না। তবে বর্তমান বছরের কাজ এখানো শেষ করা হয়নি। কিছু ঝামেলা আছে তা মিটিয়ে কাজ করব।

শ্যামনগর হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই বলেন, যে টাকা পেয়েছি তা দিয়ে বেশ কিছু মালামাল ক্রয় করা হয়েছে। বাকি টাকার মালামাল ক্রয় করা হবে।

সদর উপজেলার খড়িয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালান কমিটির সভাপতি পরিমল মন্ডল বলেন, টাকা পেয়েছি। টাকা দিয়ে কাজ করার জন্য প্রাধান শিক্ষককে বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু তিনি নানা অজুহাতে কাজ করছেন না। তবে তিনি খুব শিঘ্রই এ টাকা কাজ করা হবে বলে জানান।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, এ বিষয়ে আমরা তৎপর আছি। যাতে উক্ত বরাদ্দকৃত টাকার সঠিক ব্যবহার করা যায়।

দেবহাটা উপজেলা শিক্ষা অফিসার দেবাশীষ সিংহ বলেন, জুনের আগে কাগজে কলমে কাজ শেষ করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা একটু ভিন্ন আছে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনো শতভাগ কাজ শেষ করা হয়নি। যারা শেষ করেনি তারা দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করবে। তবে যদি কোন প্রতিষ্ঠান কাজ না করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাক আহমেদ বলেন, জুনের আগে কাজ শেষে করে বিল ভাউচার জমা দিয়েছে। তবে যদি কেউ সে মোতাবেক কাজ না করে তাহলে বিষয় খোজ খবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তবে, তিনি অফিসে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে অন্য বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফ হোসেন বলেন, কিছু কিছু বরাদ্দের সাথে জেলা অফিসের কোন যোগাযোগ থাকে না। সে কারণে অনেক বিষয়ে আমরা কিছু করতে পারি না। তবে যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সেগুলো খোঁজ নিয়ে সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

ঢাকা, ২৬ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর