[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



গায়ক সফি সন্ত্রাসী, জঙ্গি


প্রকাশিত: July 30, 2016 , 9:14 pm | বিভাগ: আপডেট,এক্সক্লুসিভ


shafi 3333
সৌভিক ঘোষ, ভারত: সে ছিল ২০০৫-এর কথা। ছেলেটা গান গাইত প্রাণ ভরে। সুরেলা গলা, গিটারে পাকা হাত। ভক্ত ছিল মান্না দে, শচিন কত্তা, এ আর রহমান, মৌসুমি ভৌমিক, বাংলাদেশের অর্ণবের। ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই চিনত তাকে। মেয়েরা পটাপট প্রেমে পড়ত লাজুক গায়কের।
ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ২২ জন নৃশংস হত্যালীলার বলি হওয়ার চার দিন পর। ইন্টারনেটে ‘বাংলায় খিলাফাহর বীরদের প্রতি’ (টু দ্য নাইটস অফ দ্য খিলাফা ইন বেঙ্গল) নামে হাড়হিম করা একটা ভিডিও। ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্যাকপ্যাক কাঁধে একটা ছেলে স্পষ্ট বাংলা আর চোস্ত ইংরেজিতে বাংলাদেশকে বলছে, তোমরা কখনওই এ জিহাদকে বন্ধ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সারা দুনিয়ার বুকে খিলাফত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়… তোমরা বাংলাদেশে যা দেখেছ তা একটা ঝলক ছাড়া কিছুই নয়। যত দিন না আমরা জয়ী হব, তত দিন এটা চলতেই থাকবে…’

ফেসবুকের সৌজন্যে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ভিডিয়োটা। মুখটা যেন চেনা চেনা। হ্যাঁ, ওই ছেলেটাই তো, ওই যে গান গাইত!
শুধু মুখটাই চেনা, মানুষটা আর নয়।

হ্যাঁ, ২০০৫-এর গানপাগল যুবকই ১১ বছর পেরিয়ে আজকের জিগির তোলা সন্ত্রাসবাদী। নাম, তাহমিদ রহমান সফি। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের উপর নজরদার সংস্থা ‘সাইট’-এর সন্দেহ, ভিডিয়োটা তোলা একেবারে সিরিয়ার রাকায়। আইএসের মূল ঘাঁটিতে!

ঘরের ছেলে জঙ্গি হলে…

কোন বিপন্নতা থেকে এত বদলে গেল গায়ক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সফি?

safi

গুলশানের আততায়ী নিব্রাস, রোহন, খাইরুল, শফিকুলদের দিশেহারা পরিবারের মতো এ প্রশ্ন এখন বছর তিরিশের তাহমিদের আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধবদেরও। পুলিশ আর গোয়েন্দা দপ্তরের চাপে মুখ বন্ধ তাঁদের। সঙ্গে সামাজিক ভয়, ঘরের ছেলে জঙ্গি হলে যা হয়। তবু চেপে রাখা যাচ্ছে না বিস্ময়। নাম প্রকাশ না-করার কাতর শর্তে আত্মীয়-বন্ধুদের প্রশ্ন, ২০০৬ সালে গানের প্রতিযোগিতা ক্লোজ আপ ১-এ প্রথম ১৫-য় ঠাঁই পেয়েছিল যে ছেলেটা, শ্রোতাদের মন ছুঁয়েছিল ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গেয়ে, সেই ছেলে আজ মানুষ মারার জয়গান গায়? মৌসুমি ভৌমিক ব্র্যাক-এ অনুষ্ঠান করতে আসায় যে সফি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়রকে মেসেজ পাঠাত ‘দিদি, আজ মৌসুমিদির গানের সময় তুমি অবশ্যই ক্যাম্পাসে থাকবা কিন্তু’ বলে, সে ধর্মবিদ্বেষের বিষ উগরোয়?

আল-কায়দায় নাম লেখাবি…
মিলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না তো আরও কত কিছু।
ছাত্রজীবনে কবেই বা ধর্মপ্রাণ ছিল সফি? ঢাকার নটোরডেম কলেজ থেকে বিজনেস স্টাডিজ পাশ করে ২০০৫-এ ব্র্যাকে ভর্তি হয় ছেলেটা। ফুল স্কলারশিপ নিয়ে পড়ত বিবিএ। বন্ধুদের বর্ণনা অনুযায়ী, যেমন স্মার্ট, তেমনই সুভদ্র ব্যবহার ছিল সফির।

রবিউল আর রেফুলের (নাম পরিবর্তিত) সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল সবচেয়ে বেশি। রবিউল ছিল ধর্মপ্রাণ নমাজি। নিজে ধর্মের চৌকাঠ মাড়ানো দূরের কথা, সফি বরং তখন রবিউলের পিছনে লাগত, ‘তুই তো বড় হয়ে হুজুর হবি, সাম্প্রদায়িক শিক্ষা দিবি, আল-কায়দায় নাম লেখাবি, লোক মারবি! ‘সফি গোঁফ-দাড়ি রাখত না বলে রবিউল তাকে পাল্টা মজা করে ডাকতেন ‘মাকুন্দা’। রবিউল বুঝে উঠতে পারেন না, কী করে সেই সফির জীবন এমন ধ্বংসের পথে চলে গেল।
নায়ক যখন আল-অওলাকি
তবে একটু আঁচ পেয়েছিলেন সফির বন্ধুরা।

সেটা ২০১০-১১ সাল। প্রেমিকার সঙ্গে তখন সদ্য বিচ্ছেদ হয়েছে সফির। তার আগে বছর চারেক টেলিকম সংস্থা গ্রামীণফোনে কাজ করা হয়ে গেছে তার। নাম লিখিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ কোর্সেও। কিন্তু সম্পর্ক ভাঙার পর বন্ধুবান্ধবদের ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটানো শুরু করে সফি। রেফুল জানাচ্ছেন, এই সময়ে সফি আল-কায়দার প্রচারক আনোয়ার আল-অওলাকির ভিডিয়ো দেখতে শুরু করে মন দিয়ে।
ঢাকার কাছে কালাচাঁদপুরে শিখত আরবিও। ২০১১-য় আল-অওলাকি যখন ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হানায় মারা যান, তখন রাগে ফেটে পড়েছিল সফি। বন্ধুকে একটা সময় হাতের তালুর মতো চেনা রবিউলও বুঝতে পেরেছিলেন, অনেক বদলে গেছে সফি।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিও না…
কেমন সেই বদল? যেমন এক বান্ধবী ফেসবুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোয় সফি তাঁকে লিখেছিল, ‘আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিও না। কোরাণে বারণ আছে। তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে আজ থেকে আনফ্রেন্ড করলাম৷ ২০১২-য় গ্রামীণফোনের চাকরিটাও ছেড়ে দেয় সফি। দিন কাটত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল আর কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে। আর তখন থেকেই বন্ধুদের থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যায় সে। ২০১৩ সাল থেকে আরও প্রকট হয়ে ওঠে সেই প্রবণতা।

অথচ সফি কোনও দিন চাকরি করতে চায়নি। সে চেয়েছিল গায়ক হতে। রেফুল আর রবিউল দু’জনেই জানাচ্ছেন, ব্র্যাক থেকে পাশ করে বেরোনোর পরে এই প্রোডিউসার, সেই মিউজিক অ্যারেঞ্জারের দোরে দোরে প্রায় মাথা কুটে মরেছিল সফি। কপালে শিকে ছেঁড়েনি তার, কেউ তাকে সুযোগ দেয়নি। সফির গানপাগল, রোম্যান্টিক জীবনে সেই প্রথম বড় ধাক্কা।
মতের অমিল হলে প্রবল রাগ।

যেমন ধাক্কা তার বাবার মৃত্যুও। সম্পন্ন পরিবারের ছেলেটির বাবা সফিউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের আমলা, একটা সময় স্বরাষ্ট্রসচিব, পরে নির্বাচন কমিশনারও (২০০০-০৫)। সফিউর মারা যান ২০১৪-র ১৮ আগষ্ট। মা, দুই ভাই এবং এক বোন থাকা সত্ত্বেও বাবাই ছিলেন সফির সব। স্বপ্নের অপমৃত্যু, প্রেমিকার বিরহ আর বাবার প্রয়াণ সফিকে ঠেলে দেয় খাদের বিপজ্জনক কিনারায়।
গোয়েন্দাদের সন্দেহ, সম্ভবত তার এই ব্যক্তিগত সঙ্কটের সুযোগেই থাবা মেরে ঢুকে পড়েছিল আইএস-এর মগজধোলাইয়ের কারবারিরা। আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল সফির মধ্যে। বন্ধুরা জানাচ্ছেন, কোনও কিছুতে মতের অমিল হলে প্রবল রেগে উঠত সে। কোনও কিছুকে পাওয়ার বাসনাও তার ছিল প্রায় আগ্রাসী স্তরে।

এই সঙ্কট কি আঁচ করতে পারেনি রহমান পরিবার? আদতে ঢাকার বারিধারার বাসিন্দা হলেও ২০১২-য় রহমান পরিবার চলে আসে নিকুঞ্জ এলাকায়। জায়গাটা পড়ে খিলখেত থানার আওতায়। সেখানকার পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সফির পরিবার আর মুখ খুলতে চায় না সংবাদমাধ্যমের সামনে।

তবে থানা সূত্রে খবর, সফির দাদা শাহরুখ পুলিশকে জানিয়েছেন, ২০১৫-র ফেব্রুয়ারিতে সাইমা নামে একটি মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করে সফি। আরবি ক্লাসেই সাইমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার।

২৩ এপ্রিল ‘দিন দশেকের জন্য মালয়েশিয়ায় হনিমুনে যাচ্ছি’ বলে বেরিয়ে পড়ে সে। কয়েক দিন পর বাড়িতে ফোন করে জানায়, সে আর তার বৌ দিব্যি আছে। কিন্তু ১৫ দিন পরেও ভাই দেশে না-ফেরায় উদ্বিগ্ন শাহরুখ শরণাপন্ন হন ট্র্যাভেল এজেন্টের, যে এজেন্ট বুকিং করে দিয়েছিলেন সফির বিদেশযাত্রার।

মালয়েশিয়া বলে তুরস্কে হানিমুন

কী জানতে পেরেছিলেন শাহরুখ?

তার আদরের ভাইটা তো মালয়েশিয়ায় যায়নি, গেছে তুরস্কে! এর পর সফি বাড়িতে মেসেজ করত মাঝেসাঝে। ফোন খুব কম। শুধু মা নাশেতা জেরিনের ফোনের জবাবে একবার বলেছিল, তারা একটা ঘরে থাকে, নিজেদের খাবার নিজেরা রাঁধে, মেঝেতে ঘুমোয়। পেট চলছে কী করে? সফির জবাব ছিল, আমাদের তো বেশি কিছুর দরকার নেই! কেন সে তুরস্কে গেল, কী করছে – ঘরের ছেলের কাছ থেকে তার কোনও সদুত্তর পায়নি রহমান পরিবার।

তবে এ বছরের ৩১ মে কন্যাসন্তান জন্মানোর পর সফি নিজেই বাড়িতে ফোন করে দিয়েছিল সুখবরটা। সেই শেষ যোগাযোগ। ৬ই জুলাইয়ের ভিডিয়ো দেখে রহমান পরিবার বুঝতে পারে, তাদের আদরের ছেলে এখন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। সন্ত্রাসের চক্রী। সফির সঙ্গেই ওই ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে আরও দু’জনকে। একজনের মুখ ঢাকা, একজনের খোলা। বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রে খবর,
প্রথম জনের নাম তওসিফ হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রাক্তন ছাত্র। দ্বিতীয় জনের নাম তুষার, সে সম্ভবত বাংলাদেশি মডেল নাইলনা নাইমের প্রাক্তন স্বামী তুষার। এখনও সবিস্তারে জানা যায়নি এদের সন্ত্রাসের খাতায় নাম লেখানোর বিশদ কাহিনি।

কিন্তু বলা যায় না, তার পিছনেও হয়তো লুকিয়ে কোনও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। অমলকান্তিরা যে রোদ্দুর হতে না-পারলে জঙ্গি হয়ে যেতে পারে, তাহমিদ রহমান সফিই তো তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ!

 

 

ঢাকা, ৩০ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এএম