[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ফেসবুক ও রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র


প্রকাশিত: August 3, 2016 , 10:15 pm | বিভাগ: ফিচার


ফিরোজ আল হুসাইন: সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে রীতিমতো চলছে পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান, যুক্তি-তর্ক, অনুযোগ, অভিমান, ধন্যবাদ জ্ঞাপন, আবার কেউ কেউ মাঠে নেমেছেন সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকে।

এতে বাদ যাননি লেখক বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ব্লগার, অভিনেতা এমনকি খেটে খাওয়া দিনমজুরও।

এ প্রকল্পে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে নাকি গণমানুষের মুক্তির দ্বার উন্মোচিত হবে তা নিয়ে এ বিশেষ মাধ্যমটির দেয়ালে চলছে ইচ্ছেমতো কাদা ছুঁড়া-ছুঁড়ি। কেউ প্রতিবাদী হয়ে লিখেছেন ‘সুন্দরবনকে ধ্বংস করবেন না, তার চেয়ে আমাকে গুলি করুন’। আবার কেউ পক্ষ নিয়ে লিখেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে রামপালে পরিবেশ বান্ধব কয়লাভিত্তক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যুগপোযুগী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ধন্যবাদ’।
কারোর প্রতিবাদী ভাষা শুধুমাত্র একটি ব্যাঙ্গচিত্র! আবার কারোর ক্ষুরধার লেখনির বলিষ্ঠ অক্ষরগুলো প্রতিপক্ষের দেহে আঘাত করেছে বারংবার। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক জ্বরে ক্যাম্পাসলাইভও আক্রান্ত হলে ক্ষতি কি? চলুন দেখে নেয় কার প্রতিবাদের ভাষা কেমন ধারালো:

Rampal-6

সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না লেখেন:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমি আমার জন্মদাত্রী মা’এর নামে শপথ করে এবং সৃষ্টিকর্তাকে স্বাক্ষী রেখে বলছি- আমি বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের আদর্শে কখনোই বিশ্বাসী ছিলাম না, এখনও নই। বরং ঘোরতর বিরোধী। তাই আপনার সরকারের বিরোধীপক্ষের কোন অংশের কেউ মনে করার কোন কারণ নেই। আমি কারোর দ্বারা প্ররোচিতও নই। কথাগুলো এ জন্য বলছি যে, রামপালে গড়ে উঠতে যাওয়া পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাভিত্তক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যারা বিরোধীতা করছেন, তাদেরকে আপনার শত্রু মনে করার কোন কারণ নেই। বরং সেই সব দালাল সম্পর্কেই সতর্ক করিয়ে দিতে চাই, যারা আপনার মোসাহেবী করে সরকারকে ভুল পথে পরিচালিত করে সাধারন মানুেষর একটি বৃহত্তর গোষ্ঠিকে আপনার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।
দোহাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সুন্দরবনকে বাঁচতে দিন। রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে সেটি আপনার সরকারের জন্য কোন পরাজয় বলে মনে করার কোন কারণ নেই। একটা ভুল সিদ্ধান্ত শুধরে নেয়া যেতেই পারে। আর সেটিইতো গণমানুষের প্রতি সম্মান জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়।

অপি করিম করিম তাঁর স্ট্যাটাসে লেখেন:

মাননীয় সরকার, আমি – সৈয়দা তুহিন আরা করিম (অপি করিম) বাংলাদেশের নাগরিক – রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই প্রতিবাদ আমলে নিন।

 

Rampal-3
আসফাক নিপুন লেখেন:

সংবিধান এর অমুক তমুক অনুচ্ছেদ এর আলাপ দিয়া লাভ নাই। নিজেরে দেশের মালিক দাবী কইরাও লাভ নাই। দেশের মালিক আমি আপনি না। দেশের দশের মালিক একজনই। আপনারে আমারে খালি বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচের সময়
মালিকানা ধার দেয়া হয় কয়েক ঘন্টার জন্যে যেন আমরা একটু সুখটান দিতে পারি!

আপনি কে? কোন মহারথি হইছেন যে আপনারে উনার গুনতে হবে? আপনি কি মনে করেন গুলশান হামলায় বিদেশী না মইরা আমি আপনি স্বদেশী লোকজন মরলে কোন দাম পাইতেন? দুই পয়সার দামও পাইতেন না। এত তোড়জোর হাঁকডাক শুধু জাপানী আর ইটালিয়ান মরছে আর সেটা দেইখা বাকি দেশগুলা সরকাররে চাইপা ধরছে দেইখা। আবার নিজেরে দেশের মালিকও দাবী করেন আপনারা!!

বিদেশী হোন। উনারা বিদেশীদের কথা শুনেন। বিদেশীদের প্রেসকিপশন অনুযায়ী সুন্দরবন, টেংরাটিলা, রুপপুর, বাঁশখালি, গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, উত্তরা নিয়মিত টেষ্ট করান। শেয়ার বাজার, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিদেশীদের টাকা ডাকাতি হইলে কি হইত বুঝতেছেন? এত এত রেষ্টুরেন্ট উচ্ছেদ হইলে যদি বিদেশী বেকার হইত তাহলে কি হইত বুঝতেছেন? আপনের মিয়া সবুজ পাসপোর্ট। দেশে সবুজের কোন নাম নিশানা রাখা হইতেছে না আর আপনে আপনার পাসপোর্টের সবুজ নিয়া ফাল পাড়তেছেন!

লাইনে আসেন। বিদেশী হোন। বাংলাদেশ আপনার গ্যারান্টিড (বিএসটিআই এর সিল সহ)!
অভিনেতা নিলয় লেখেন:
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলাচিঠি:

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সুন্দরবনবিনাশী ও দেশধ্বংসী সকল চুক্তি বাতিল এবং বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ৭ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলাচিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি বিভিন্ন সময় বলেছেন,সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো ক্ষতি করবে না। আমরা আপনার অবগতির জন্য দেশ বিদেশের অভিজ্ঞতা এবং দেশে বিভিন্ন গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ নীচে পেশ করছি:

(১) কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে আর্সেনিক ও বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, বেরিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে।এর ফলে সুন্দরবনের পশুপাখি বৃক্ষ লতাপাতাসহ অসংখ্য প্রাণ এবং ইকো সিস্টেম ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।(২) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিষাক্ত সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের ফলে মানুষ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। (৩) সাড়ে চার বছর ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কালে আমদানি করা কয়লাসহ নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করার সময় বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নি:সরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নি:সরণ, ড্রেজিং ইত্যাদির মাধ্যমেও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে একমাথা থেকে আরেকমাথা পর্যন্ত পরিবহণ করার কারণে কয়লার জাহাজ থেকে নির্গত কঠিন ও তরল বর্জ্য, জাহাজের শব্দ, জাহাজ সৃষ্ট ঢেউ, সার্চ লাইটের আলো, কয়লা লোড আনলোডের ফলে সৃষ্ট দূষণ ইত্যাদিতে সুন্দরবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে।(৪) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কয়লা উঠানো নামানো, পরিবহণ ইত্যাদির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দদূষণ হবে। (৫) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত দূষিত পানি ও অন্যান্য কঠিন ও তরল বর্জ্য সুন্দরবনের পশুর নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর পানি দূষিত করে ফেলবে। যেসব নদী সুন্দরবনের প্রাণ সেগুলোর অবস্থা বুড়িগঙ্গার চাইতেও খারাপ হবে। ফলে সুন্দরবনকে বাঁচানো যাবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেই ভারতেরই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ‘ইআইএ গাইড লাইন, ২০১০’ এ স্পষ্ট বলা আছে- নগর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কি.মি সীমার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এড়িয়ে চলতে হবে। অর্থাৎ ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলে সুন্দরবনের ঘাড়ে যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে তা ভারতের আইনে অবৈধ। সেজন্য ভারতের সজাগ মানুষও ক্রমে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন।
১৪ কি.মি দূরত্বসীমা যে মোটেই নিরাপদ কোন দূরত্ব সীমা নয়, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলেও স্পষ্ট বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। পেকান বৃক্ষগুলো (একধরনের শক্ত বাদাম, কাজু বাদামের মতো) যখন একে একে মরতে শুরু করলো ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসেবে ফায়েত্তি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নি:সৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওক সহ বিভিন্ন জাতের গাছ আক্রান্ত হয়েছে, বহু পেকান বাগান ধ্বংস হয়েছে এবং এই ক্ষতিকর প্রভাব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এমনকি ৪৮ কিমি দূরেও পৌঁছে গেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার বিভিন্ন কর্মকর্তা বলছেন, রামপালে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না।
আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি,তাপীয় কর্মদক্ষতা বা ইফিসিয়েন্সি অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিন প্রকার: সাব ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল এবং আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল। সাব ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যায় সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, পারদ, সীসা, আর্সেনিক মিশ্রিত বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হয়। সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায় যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেই টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক- বিদ্যুৎ কেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবেই, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর চাইতেও সুন্দরবনের পশুর নদী আরও ভয়াবহ দূষণ ঘটবে, শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ সমীক্ষায় শুধু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকলে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে তার হিসেব করা হয়েছে, এর সাথে ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্র যুক্ত হলে কী প্রভাব পড়বে তার কোন হিসেব করা হয়নি। আর ওরিয়ন গ্রুপ তো পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়াই ২০০ একর জমি কিনে মাটি ভরাট করে ফেলেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
কোম্পানি ও মন্ত্রণালয়ের লোকজন প্রায়ই দাবি করেন যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনী ব্যবহার করা হবে, তাতে কোন দূষণ ঘটবে না। আর বছরে মাত্র ৩ মাস বাতাস উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না।

প্রথমত, চিমনীর উচ্চতা বাড়ালে দূষণকারী উপাদানের পরিমাণ কমে যায় না, বা দূষণ মহাশূণ্যে চলে যায় না। বাতাসের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে প্রবাহিত হয় এবং প্রবাহ দুর্বল থাকলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছের বাতাসই দূষিত করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, সরকারি পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ীই, তিন মাস নয়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চার মাস ধরে বাতাস উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্বে সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হবে। সুন্দরবনের বিপর্যয়ের জন্য এই চারমাসই যথেষ্ট। তাছাড়া ঘূর্ণি বাতাস ঝড় ইত্যাদি নানা কারণেই এই চারমাস ছাড়াও বছরের অন্য সময়েও বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হতে পারে।তৃতীয়ত, বাকি ৮ মাস ধরে বিষাক্ত বাতাস দক্ষিণ থেকে উত্তরে অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে খুলনা-বাগেরহাট শহরের দিকে প্রবাহিত হবে যা খুলনা-বাগেরহাটের জনবসতির জন্য বিপর্যয়কর হবে। কারণ খুলনা-বাগেরহাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপদসীমার মধ্যে পড়েছে।চতুর্থত, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ শুধু বায়ুবাহিত নয়, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানিদূষণ, শব্দদূষণ, ছাইয়ের দূষণ, কয়লা পরিবহণের কারণে দূষণ সারা বছর ধরেই ঘটবে যেগুলোর সঙ্গে বাতাসের দিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি অনেকবারই বলেছেন, বড়পুকুরিয়ার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তো কোন পরিবেশ দূষণ হচ্ছে না, তাহলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিবেশ দূষণ হবে কেন? আপনি কিছুদিন আগে এরকমও বলেছেন যে, কয়লা দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করা হয়, সুতরাং এখানে কীভাবে ক্ষতি হবে?
আপনার চারধারে অনেক ডিগ্রীধারী লোক থাকলেও তাঁরা আপনাকে যে ভুল তথ্য এবং ধারণা দিয়ে দেশি বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে তা এতেই পরিষ্কার হয়। বাস্তবে যে কেউ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে গেলেই দেখতে পাবেন পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ উদাহরণ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশের কৃষিজমি কয়লা দূষণে রীতিমত কালো রঙ ধারণ করেছে, মাটির নিচের পানির স্তর নেমে গেছে, ছাইয়ের পুকুরে গাদা করে রাখা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে, ফসল ও মাছ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।দ্বিতীয়ত, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনা সঠিক নয়। কারণ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছোট আকারের এবং বড়পুকুরিয়ার পাশে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বিশ্বঐতিহ্য বনাঞ্চল নেই। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট যার মধ্যে আবার কার্যত ১২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিটই কেবল চালু থাকে। অথচ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট যা বড়পুকুরিয়ার কার্যকর (১২৫ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১০ গুণেরও বেশি। ফলে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে তার দশগুণেরও বেশি ক্ষতি হবে।তৃতীয়ত, আপনার উপদেষ্টারা আপনাকে কাঠ কয়লা ও খনিজ কয়লার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেনি। তাদের হাতেই জিম্মি হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন, এটা আমাদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সরকার থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত ছাই বাতাসে ছড়াবে না এবং এই ছাই সিমেন্ট কারখানা, রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদি কাজে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা হবে।
‘কিছু উড়ন্ত ছাই’ বাতাসে মিশবে বলে স্বীকার করা হয়েছে খোদ ইআইএ রিপোর্টেই। আবার যে বিষাক্ত ছাই পরিবেশে মিশবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে সেই ছাই দিয়েই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করা হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এভাবে ছাই দিয়ে জমি ভরাট করা হলে ছাইয়ের মধ্যে থাকা আর্সেনিক, পারদ, সীসা ইত্যাদি বিষাক্ত ভারী ধাতু বৃষ্টির পানির সাথে মিশে, চুইয়ে মাটির নীচের এবং মাটির উপরের পানি দূষিত করবে যা সুন্দরবনকে বিপর্যস্ত করবে।
আর ছাইয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা মিথ্যা আশ্বাস ছাড়া আর কিছু না। কারণ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দৈনিক মাত্র ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্য ছাই উৎপাদিত হয়। এগুলো ছাই-এর পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে গাদা করে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চার বছরে ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৬১৩ টন ছাই পুকুরে জমা করে পুকুরের প্রায় পুরোটাই ভরে ফেলা হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যও পশুর নদীর একেবারে পাশে ১০০ একরের ছাইয়ের পুকুরের পরিকল্পনা করা হযেছে। অ্যাশ পন্ড বা ছাইয়ের পুকুরে গাদা করে ছাই বাতাসে উড়ে, ছাই-মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নিচে ও আশপাশের নদী ও জলাভূমিতে বিষাক্ত ভারি ধাতুর মারাত্মক দূষণ ঘটাবে।
ভারতে এনটিপিসির বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই কীভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পানি ও খাদ্য উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করছে তা সরেজমিনে দেখে এসেছেন জাতীয় কমিটির এক প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশ পানিপ্রধান ও উর্বর জমির দেশ বলে, আর আলোচ্য কেন্দ্রের পাশে সুন্দরবন আছে বলে এই ক্ষতির মাত্রা আরও বহুগুণ বেশি হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদী দিয়ে তো এমনিতেই অনেক জাহাজ চলাচল করছে। তাহলে কয়লা ভর্তি জাহাজ চলাচল করলে কী সমস্যা? তাছাড়া কয়লার জাহাজে পুরোপুরি ঢেকেই কয়লা পরিবহণ করা হবে, তাহলে পরিবেশ দূষণ হবে কীভাবে?
সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে বর্তমানে যে জাহাজ চলাচল করছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজ, কয়েকশো টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। সেগুলোর প্রভাবে ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের ক্ষতি হতে শুরু করেছে। এরমধ্যে কয়লা ও তেলবাহী এরকম জাহাজের একাধিক দুর্ঘটনায় অপরিমেয় দীর্ঘকালীন ক্ষতি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। এমনকি আপনিও এ পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার কথা বলেছেন। অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে: “সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চালু হওয়া নৌপথের কারণে পূর্ব সুন্দরবন প্রাণিশূন্য হতে শুরু করেছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫০টি বিশাল আকৃতির নৌযান বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এসব নৌযানের ঢেউ, ফেলে যাওয়া বর্জ্য তেল ও শব্দদূষণের কারণে বনের দুই পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বৃক্ষ, লতা, গুল্ম মরতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে বনের জীববৈচিত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে।”
সাধারণ নৌযান চলাচলের ফলেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে দুষণকারী কয়লাভর্তি বড় বড় জাহাজ চলাচল করলে কিংবা সেই কয়লাভর্তি জাহাজ যদি কখনো ডুবে যায় সুন্দরবনের কী অবস্থা হবে তা চিন্তাও ভীতিকর।আর কয়লা যতই ঢেকে পরিবহণ করা হোক কিংবা জাহাজের গতি যতই নিয়ন্ত্রণ করা হোক, তাতে জাহাজের কয়লাস্তুপ থেকে চুইয়ে পড়া কয়লা-ধোয়া বিষাক্ত পানি (বিলজ ওয়াটার), অ্যাংকরেজ পয়েন্টে কয়লা লোড-আনলোড করার সময় সৃষ্ট দূষণ, কয়লার গুড়া, জাহাজ-নিঃসৃত তেল-আবর্জনা, জাহাজ চলাচলের শব্দ, ঢেউ, বনের ভেতরে জাহাজের সার্চলাইটের তীব্র আলো, জাহাজের ইঞ্জিন থেকে নির্গত বিষাক্ত সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব দূর হয়ে যায় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি বলেছেন, কোম্পানির লোকজনও বলেছেন, অক্সফোর্ডসহ বিশে^র বিভিন্ন শহরে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে , সেগুলোতে কোনো ক্ষতি হয়না। এটাতে কেনো হবে?
প্রকৃত তথ্য হলো, অক্সফোর্ডে Didcot নামের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয় ১৯৭০ সালে যখন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ নিয়ে সচেতনতা আজকের পর্যায়ে ছিল না। কিন্তু কয়লা বিদ্যুতের দূষণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আন্দোলনের কারণে অক্সফোর্ডের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২০১৩ সালের মার্চ মাসে বন্ধ করে দেয়া হয়।অক্সফোর্ড ছাড়া যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলা হয় সেগুলোসম্পর্কেযে কেউ খোঁজ খবর করে দেখতে পারেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মানুষ ও প্রকৃতির উপর কী ধরণের প্রভাব ফেলছে।গত শতকের নব্বই দশকে নির্মিত থাইল্যান্ডের Mae Moh কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে হাজার হাজার মানুষ ফুসফুসের অসুখে ভুগেছে, চারপাশের কৃষি অঞ্চলে ফসলের ফলন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, জলাভূমিতে আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও ম্যাংগানিজ এর দূষণ ঘটেছে।ভিয়েতনামের Quang Ninh কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বন্যা ও জলোচ্ছাসের সময় বিপুল পরিমাণ কয়লা দিয়েন ভং নদীতে ভেসে গেছে, ব্যাপক নদী দূষণ ঘটেছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ আরো কিছু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য হা লং বে’ও মারাত্মক দূষণের শিকার হয়েছে। ছবিতে যেমনই দেখা যাক, তাইওয়ানের Taichung কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে দুনিয়ার অন্যতম দূষণকারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বলা হয়। এই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে তাইওয়ানের মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে বায়ু দূষণ এত বেড়েছে যে এক পর্যায়ে আন্দোলনের মুখে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে আর চারপাশের পানি ও বাতাস দূষিত হবে না, মানুষ ও প্রকৃতির দূষণ ঘটবে না- কারিগরী ভাবে এটা এখনও অসম্ভব। আশা করি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চকচকে ছবি দেখে আপনি বিভ্রান্ত হবেন না।

ইকরামুল ইসলাম  লেখেন:

ক্যাম্পাসলাইভের  ইকরামুল ইসলাম সল্প লেখা-পড়ার মানুষ হয়েও সুন্দরবন নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে জড়িয়ে পড়েন এক রাজনৈতিক দলের কর্মীর সাথে তুমূল স্ট্যাটাস চালাচালিতে। তিনি লেখেন ” রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হোক সেটি আমি চাই তবে সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়”।
এক নজরে সব ছবি:

Rampal Rampal-1 Rampal-2  Rampal-4 Rampal-5  Rampal-7 Rampal-8 Rampal-9 Rampal-1012

 

ঢাকা, ০৩ আগস্ট/(ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর