[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



নিখোঁজ ব্যারিস্টার সিফাতের নানা কাহিনী, জঙ্গি নাকি অন্য কিছু!


প্রকাশিত: August 4, 2016 , 10:55 pm | বিভাগ: এক্সক্লুসিভ


sifat3

মৃদুল ব্যানার্জি, বগুড়া: কখনোবা কানে দুল। হাতে ব্রেসলেট। আবার কখনো গিটার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে দাবড়ে বেড়ানো তরুণ। আধুনিকতার সাজে সজ্জিত থাকতো হর-হামেশা। মাঝে মাঝে চুল বড় করে মেয়েদের মতো মাথায় বেনি করতো। আভিজাত্যের কমতি ছিলনা তার। পড়া শুনা বিদেশে, ইংলিশ মিডিয়ামে। অর্জন করেছেন ব্যারিস্টারি ডিগ্রি।
তবুও কেন যেন এক নি:সঙ্গতা তাকে বিলীন করে দিল। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে পরিবর্তন হলো তার। অবশেষে নিখোঁজ হলো স্ত্রী ও ১৮ মাসের শিশু কন্যাকে নিয়ে। সে আর কেউ নন। তার পুরো নাম এ কে এম তাকিউর রহমান। আদর করে সবাই তাকে সিফাত বলেই ডাকতো।

তাকে নিয়ে বগুড়ায় তোলপাড় চলছে। কোথায় আছে, কিভাবে আছে, কি করছে, কাদের সঙ্গে আছে, কোন বিপথগামীদের সঙ্গি হয়নি তো? এমন হাজারো প্রশ্ন এখন তার পরিবারে। প্রতিবেশীরাও একই কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন সিফাতের আত্মীয় স্বজনরা। বিলেতে পড়ুয়া সিফাত এখন কোথায়? এ নিয়ে রহস্যের দানা ক্রমেই বাড়ছে।

সিফাতের বাবা আব্দুল খালেক কান্না ভেজা কন্ঠে ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, জানিনা আমার ছেলে কোখায় আছে কেমন আছে? মাদকের ছোবল থেকে দূরে রাখতে ছেলেকে বিদেশে পড়িয়েছিলাম। ব্যারিস্টার বানিয়েছি। কিন্তু এখন কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার আদরের ছেলে, নাতি ও বৌ মার কোন সন্ধান পাচ্ছিনা। আমি বেচেঁ থেকেও মরে আছি।

পুলিশ ও সিফাতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সিফাত তার স্ত্রী রিজিতা রাইলা ইকবাল ও ১৮ মাসের শিশুসন্তান রোমাইশা বিনতে তাকিকে নিয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বগুড়া সদর থানায় হাজির হয়ে নিখোঁজ সিফাতের বাবা আব্দুল খালেক ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, ২০১৫ সালের ৯ জুন ঢাকার কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি। কিন্তু পুলিশ ও গোয়েন্দারা তার কোন সন্ধান দিতে পারেনি।
ওই ডায়েরিতে বলা হয়, আমার ছেলে এ কে এম তাকিউর রহমান সপরিবারে ঢাকার বশির উদ্দিন রোড ১৪ লেক সার্কাস, ফ্লাট ৮/বি, বসবাস করা অবস্থায় ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল ছেলে বউ রিজিতা রাইলা ও আমার নাতনি ১৮ মাসের রোমাইশাকে নিয়ে ওমরা হজের কথা বলে চলে যায়। তারপর আর দেশে ফিরে আসেনি।

বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ‘১৫ মাস ধরে নিখোঁজের বিষয়টি জানতে পেরে গতকাল বুধবার বাসায় গিয়ে পরিবারের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ‘ওমরাহ পালন করতে গিয়ে সন্দেহজনকভাবে নিখোঁজের বিষয়টি এত দিন চাপা পড়েছিল। তবে গুলশান হামলার পরে নিখোঁজদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকিউরের বিষয়টি বের হয়ে আসে। তাঁর অবস্থান এবং নিখোঁজ রহস্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনে সৌদি সরকার বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার সহায়তা নেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হবে।’

 

বগুড়া শহরের কালিতলার বাসিন্দা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, কালিতলা এলাকা ছিল মাদকের আড্ডা। ছেলে মাদকে জড়িয়ে যাবে সেই ভয়ে তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভারতের শিলিগুড়ি মাউন হারমান মিশনারি স্কুলে ভর্তি করি।

তারপর সেখান থেকে একই এলাকার রগভেলী স্কুলে ‘ও’ লেভেলে ভর্তি করি। ‘ও’ লেভেল পাস করে ২০০৬ সালে ঢাকার লন্ডন কলেজ অব লিগাল স্টাডিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘এ’ লেভেলে ভর্তি করে দেই। সেখান থেকে পাস করার পর যুক্তরাজ্যে ক্যান্টি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়তে যায়। এরপর ২০১০ সালে বার এট ল’ পাস করার পর দেশে ফেরে। পরে ঢাকার কলাবাগানে বাসা ভাড়া নিয়ে আইন ব্যবসা শুরু করে। পাশাপাশি বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিল।

আবদুল খালেক আরো জানান, ভারত থেকে পড়ালেখা করে আসার পর এবং দেশে পড়ালেখা করা অবস্থায় শিফাত একজন স্মার্ট ছেলের মতো ঘোরাফেরা করতো। কখনোবা কানে দুল লাগিয়ে গিটার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। মাঝে মাঝে চুল বড় করে মেয়েদের মতো মাথায় বেনি করতো। এসব বিষয়ে ধমকিয়ে নামাজ পড়ার কথা বললেও নামাজ পড়তো না। কিন্তু যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করার শেষ দিকে তার আচার-আচারণের কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। বার এট ল’ করার আগে দাড়ি রাখে। ২০১১ সালে দেশে ফেরার পর নামাজ-রোজা নিয়মিত করতে থাকে।

তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করা অবস্থায় সিলেটের এক ইমামের মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। ওই ইমামের ছেলে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিফাতের সঙ্গে পড়াশুনা করতো।

takiurrahman_7745

সিফাতের বাবা আরো জানান, ওমরা হজে যাওয়ার আগে তার শ্বশুর চট্টগ্রামের কর্নেল (অব.) ইকবাল দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে আসার পর তাকে হজে যাওয়ার কথা বললেও শিফাত তা না শুনে আগেই হজে চলে যায়। আমিও (আব্দুল খালেক) তাকে পরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু সিফাত জানায়, কম খরচে আমাদের সার্কেলের সঙ্গে হজে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা নেই।

হজে যাওয়ার পর ওই বছরের ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। শিফাত জানায়, ২২ এপ্রিল দেশে ফিরবো। তারপর আর ফিরে আসেনি। তিন মাস পর হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলে। শুধু জানায়, ভালো আছি। কোথায় আছে তা বলেনি।

তার কয়েক মাস পর শিফাতের শ্যালক সাদমানের সঙ্গে সিফাতের কথা হয়। সিফাত তখন তাকে জানিয়েছিল তুরস্কে আছে। সিফাতের বাবা আব্দুুল খালেকের ধারণা সিফাত বিপথে গিয়ে তুরস্ক কিংবা সিরিয়ায় অবস্থান করছে।

সিফাতের এক নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিফাত ইয়ো ইয়ো স্টাইলে ছেলে হলেও যুক্তরাজ্য থেকে পড়ালেখা শেষ করে এসে সে বলতো অনেক কিছুই তো দেখলাম। অনেক কিছুই করলাম। এখন পরকালের জন্য কিছু করি। তাই নামাজ-রোজা করছি।

সিফাতের নানা আইয়ুব উদদ্দৌলা বেনু ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, ছোটবেলা থেকে শিফাত দেশের বাইরে পড়ালেখা করতে গিয়ে বাবা-মার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। বাবা-মার প্রতি পারিবারিক যে বন্ধন থাকে তা থেকে সে ছিল বঞ্চিত।

জীবনের বেশিটা সময় ছিল একাকী। যখন সে বুঝতে শিখলো তখন তার বাবা-মার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সব কিছু মিলেই শিফাতের কিশোর ও শৈশব জীবনে একটা বড় ধরনের ভালোবাসার ঘাটতি ছিল। এ কারণে সে বিপথে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, পারিবারিক বন্ধন, বাবা-মায়ের আদর আর বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সিফাত আজ বিপথগামি নাকি বেঁচে নেই আমরা জানিনা।

তবে একজন আত্মীয় জানান, সিফাত পারিবারিক অশান্তি থেকে মুক্তি পেতেই বিদেশে পারি জমিয়েছেন। সিফাতের মা ও বাবার বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি হতাশ হয়ে যান। মা -বাবা কাউকেই তিনি বুঝাতে পারছিলেন না। বড় হয়ে বিদেশী ডিগ্রী নেয়ার পর মা-বাবার বিচ্ছেদ ছিল তার কাছে অনেক কষ্টের। মেনে নিতে পারছিলেন না। ওই হতাশা থেকেই দেশের প্রতি তার অনিহা জন্ম নেয়। পরে গোপনে তারা দেশ ত্যাগ করে বিদেশে চলে গেছেন।

 

 

ঢাকা, ০৪ আগষ্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম