[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সময় গেলে সাধন হবে না…!


প্রকাশিত: August 8, 2016 , 1:17 am | বিভাগ: আপডেট,গেস্ট কলাম


Md-Abdul-Hamid

মো: আব্দুল হামিদ : ক্যারিয়ারে ঈর্ষণীয় সাফল্যের রহস্য কি- শচীন টেন্ডুলকারের কাছে জানতে চাওয়া হলে বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকে প্রতিটা ম্যাচে আউট হওয়ার পরে তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতাম জীবনে ওভাবে আর কখনো আউট হবো না। এভাবেই ভুলের সংখ্যা কমতে থাকে আর আমি সফলতা পেতে থাকি। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও এভাবে সারাটা জীবন তিনি পেশাগত উন্নয়নে সচেষ্ট থেকেছেন।

একই শিক্ষা অন্যভাবে পাওয়া যায় ‘ভাগ মিলকা ভাগ’ সিনেমায়। বাস্তব কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত মুভিটিতে একদিকে দেখানো হয়েছে মানুষের এই ক্ষুদ্র জীবনে ‘সময়’ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে দৃঢ় প্রত্যয় আর কঠোর পরিশ্রম কীভাবে সফলতাকে হাতের মুঠোয় এনে দেয় তাও নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা প্রত্যেকেই জীবনে সফল হতে চাই, উল্লেখযোগ্য কিছু করতে চাই। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা ও কঠোর শ্রম বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হই না। ফলে আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতেই বেলা বয়ে যায়, জীবনে কাংখিত সফলতা আর আসে না।

হাইস্কুলে ‘সময়ের মূল্য’ রচনাটি সবাই পড়েছি, পরীক্ষার খাতায় লিখে হয়তো অনেকেই ভালো নম্বরও পেয়েছে। কিন্তু ওগুলো পড়া হয়েছে নিতান্তই পরীক্ষা পাসের জন্য, শিক্ষাগুলো বাস্তবজীবনে প্রয়োগের জন্য নয়! তাইতো এতো গুরুত্বপূর্ণ সময় হেলায় নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের বিকার থাকে না। যখন ব্রেনের প্রখরতা কমে যাবে, শরীর কথা শুনতে চাইবে না, নির্ধারিত কোন কাজ থাকবে না, কেউ কাছে এসে বসবে না…তখন হিসাবে মেলাতে গিয়ে দেখব জীবনে কতোটা সময় অকাজে-কুকাজে ব্যয় হয়েছে। তখন ‘আবার যদি সুযোগ পেতাম’ বলে শত আফসোস করলেও বড় নিষ্ঠুর এই সময় ফিরে তাকাবে না! যেমন অনেকেই ভাবেন- ইস্, আবার যদি স্কুলজীবন ফিরে পেতাম; সব কিছু ঠিকঠাক করে জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতাম! সত্যি কি তাই? খুব সম্ভবত ‘না’ কারণ যারা বদলায় তারা শচীনের মতো প্রতিটি ধাপে নিজেকে বদলায়।

প্রাণ কোম্পানী কিংবা কেএফসি’র প্রতিষ্ঠাতার জীবন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। জীবন একটাই; ভুল-ঠিক যাই হোক এক পথে দু’বার চলার সুযোগ থাকে না। তাই ভাবতে হবে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য পথ ও প্রয়োজনীয় গতি ঠিক আছে কি না। এর কোথাও ঘাটতি হলে সময় আপন গতিতে চলে যাবে; মনের বাসনা পূরণ হবে না।

বাংলাদেশে একজন মানুষ সাধারণত বাঁচে কতো বছর? তার মধ্যে সত্যিকার অর্থে পরিশ্রম করার সামর্থ্য থাকে কতোটুকু সময়? পাশাপাশি অপরিহার্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে (ঘুম, খাওয়া, গোসল, রূপচর্চা, যানজটে আটকে থাকা ইত্যাদি) বাবদ ব্যয় হয় কতোটা সময়? তাহলে সত্যিকার কিছু করার মতো কতোটুকু সময় আমরা পাই? একটু সহজ করে বলি- একজন মানুষ যদি ৭০ বছর বাঁচে তাহলে প্রথম বছর দশের কিছু বুঝার মতো ক্ষমতা থাকে না আর শেষ দশ বছর রোগ-শোক-একাকীত্ব তাকে ঘায়েল করে রাখে। ফলে ৫০ বছর সময় থাকে নিজেকে গড়ে তোলা ও অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কিছু করার। তন্মধ্যে এক তৃতীয়াংশ ঘুম, এক তৃতীয়াংশ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে চলে যায়। ফলে সত্যিকার কাজ করার মতো (ওয়ার্কিং আওয়ার) থাকে সর্বোচ্চ ২০ বছর! যদিও কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহদের মতো ব্যতিক্রমদের কথা আলাদা।

আমাদের মতো সাধারণদের তিলে তিলে গড়ে উঠেই একটা কিছু করতে হয়; যার জন্য দরকার নিরলস শ্রম এবং একাগ্রতা। বলা হয়, মানুষ পৃথিবীতে যা কিছু ব্যয় করে তার মধ্যে সবচেয়ে দামী হলো ‘সময়’। মিলিয়ন ডলারের বিনিময়েও যদি স্টিভ জবসকে আর কিছুটা সময় দেওয়া যেত, তিনি অকাতরে সেটা বিলিয়ে দিতেন। কিন্তু তা হয়নি কারণ মানুষের জীবনে সময় খুব দুর্লভ ও দুস্প্রাপ্য বস্তু।

আধুনিককালে মানুষের এই অমূল্য সম্পদে ভাগ বসাচ্ছে নানা প্রযুক্তিপণ্য। তথাকথিত সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো (বিশেষত ফেসবুক) যাদের অন্যতম। কেউ যদি দিনে দুইঘন্টা সময়ও এগুলোর পেছনে ব্যয় করে তবে মাসে নীট আড়াইদিন, বছরে একমাস সময় হারিয়ে যায়। তাহলে বিশ বছর সক্রিয় সময়ের মধ্যে অন্ত:ত দুইটি ওয়ার্কিং বছর (দশ ভাগের এক ভাগ সময়) ব্যয় হয় কিন্তু বিনিময়ে অর্জনটা কী? কেউ সারাজীবন শ্রম দিয়ে একটা বই লিখলেও সেটা জ্ঞানের জগতে বড় অবদান হতে পারে। কিন্তু একলক্ষ স্ট্যাটাসও (যার প্রতিটির পেছনে অনেক মেধা ও শ্রম ব্যয় হয়) কী তার ক্যারিয়ারে কোন ভ্যালু অ্যাড করবে? আর যারা শুধু অন্যদের লেখা লাইক দেয় ও কমেন্ট করে তারাতো কোন হিসাবেই পড়ে না। তাহলে কিসের পেছনে ব্যয় হচ্ছে আমাদের মতো গরীব একটা দেশের যুবশক্তির কোটি কোটি শ্রমঘন্টা? সম্ভবত খুব শীঘ্রই ধুমপানের মতো কর্মক্ষেত্রে ‘ফেসবুক নিষিদ্ধ’ ও

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ফেসবুকমুক্ত ক্যাম্পাস’ স্টিকার লাগাতে হবে! মাদকের ছোবলের ছেয়েও ভয়াবহ হচ্ছে এর আগ্রাসন। লক্ষ লক্ষ কিশোর-তরুণ-যুবকের অমূল্য সময়, মেধা, মনযোগ কেড়ে নিচ্ছে এই সর্বনাশা পণ্যটি। মা-বাবা কিংবা শিক্ষককে ফাঁকি দিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করায় সাময়িক তৃপ্তি পেলেও আসলে তারা নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছে। যখন বুঝতে পারবে তখন শোধরানোর সময় থাকবে না- এটাই বাস্তবতা।

যারা আড্ডায়, ফেসবুকের দেয়ালে সবকিছু বদলে দিতে সক্রিয় হয় সর্বপ্রথম দরকার তাদের নিজেদের বদলানো। জীবন সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত এক উপহার; অমূল্য এই সম্পদের সত্যিকারের ‘অর্থ’ থাকা দরকার। আকাশ-পাতাল ভেবে (বাস্তবে কিছুই না করে) কোন লাভ নেই; নির্দিষ্ট সময় শেষে সরে যেতে হবে নির্ধারিত এই মঞ্চ থেকে। তাই প্রথমে নিজের অবস্থান, সামর্থ্য সম্পর্কে নির্মোহ বিশ্লেষণ করে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিজেকে কতোটুকু দক্ষ ও যোগ্য করার সুযোগ আছে সেটা ঠিক করতে হবে। তারপরে যতো ছোটই হোক কাজ শুরু করতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চেষ্টাই জীবনকে বদলে দেয়, মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে। অর্থপূর্ণ জীবন গড়তে কাজ করার কোন বিকল্প নাই। একটা কিছু করতে হবে…তা যতোই ছোট হোক। ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান তার ‘দুই মুসাফির’ গল্পে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন মানুষের কর্ম কীভাবে মূল্যায়িত হয় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। হাতের নাগালে এতো সুযোগ থাকার পরেও যদি হেলায় হেলায় দিন পার করি, সময় আমাদের ক্ষমা করবে না।

অনেকেই ভাবে জীবনে যদি একাত্তর পেতাম; মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জীবন ধন্য করতাম। কথা সত্য, কিন্তু মানব সভ্যতার ক্রম বিকাশের ধারায় আমরা যে পর্যায়েই থাকি না কেন অবদান রাখার যথেষ্ঠ সুযোগ থাকে। আমাদের জীবদ্দশায় বায়ান্ন বা একাত্তর পাইনি বলে কী দেশ ও মানবতার জন্য কাজ করার পথ বন্ধ হয়ে গেছে? অবশ্যই না। অগণিত মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্রের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য পাওনা থেকে। বছরে আড়াই মিলিয়নের বেশি মানুষ উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া অশান্তির কারণে। এই বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে অবদান রাখা কী কম গৌরবের? ব্যক্তি, সমাজ, স্বদেশ সর্বোপরি মানবতার কল্যাণে যদি একটি ক্ষেত্রেও অবদান রাখা যায় তবে কী তা অনেক মর্যাদাপূর্ণ হবে না? তাই শুধু চিন্তা বা পরিকল্পনা নয়, কাজ শুরু করতে হবে। প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনযোগী হওয়া যার প্রথম ধাপ হতে পারে।

আমাদের বন্ধু মামুন খান চিশতী বলত তার স্কুলের এক স্যার বলেছিলেন জীবনে তুই রিকশাওয়ালা হলেও ঐ এলাকার সেরা রিকশাওয়ালা হতে হবে। আড্ডার ফাঁকে মাঝেমধ্যেই আমাদের সেটা স্মরণ করিয়ে দিত। হয়তো সেই শিক্ষাই তাকে এইচএসসিতে আমাদের ব্যাচে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে মানবিক শাখায় ফার্স্ট স্ট্যান্ড করতে সাহায্য করেছিল। পেশাগত জীবনেও দক্ষ পুলিশ অফিসার হিসাবে তার ধারা বজায় রেখেছে। তাই নিজের শাখায় বা কর্মক্ষেত্রে ভালো করার বিষয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সচেষ্ট থাকাই সফলতার মূলসূত্র। চিন্তাকে অনেক দিকে প্রসারিত করে ফেললে শেষে কোনটাতেই মনযোগী হওয়া যায় না এবং চুড়ান্ত সফলতা অধরাই রয়ে যায়। শুধুমাত্র সফল ব্যক্তিদের উক্তিতে লাইক বা শেয়ার দিলেই জীবনে সফলতা আসবে না যতোক্ষণ না মিলকা সিংয়ের মতো নিবিষ্ট মনে নিজের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করা যাবে। ফেসবুকের মতো উপাদান ক্ষণিকের বিনোদনের জন্য ঠিক আছে কিন্তু পড়ালেখা, চাকরি, পরীক্ষার প্রস্তুতি সবকিছুর মধ্যে যদি ওটা ঢুকে পড়ে, তবে ধ্বংসের জন্য সেটাই যথেষ্ঠ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর অধ্যায় হলো প্রথম কয়েকটা মাস। একদিকে প্রিয়জনদের ছেড়ে আসার কষ্ট অন্যদিকে অপরিচিত জায়গায় থাকে না আন্তরিকভাবে মেশার মতো কেউ। কিন্তু মাস ছয়েক যেতেই সহপাঠীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, বন্ধুর সংখ্যাও থাকে ক্রমবর্ধমান। ডিপার্টমেন্টসহ পুরো ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে প্রিয় এবং গর্বের জায়গা। ক্রমেই বাড়তে থাকে ইনভল্ভমেন্টের আওতা ও গভীরতা। ফলে সময় কীভাবে কেটে যায় তা বুঝাই যায় না। সেদিন সেকেন্ড সেমিস্টারে ওঠা ছেলে বা মেয়েটা হঠাৎ আবিস্কার করে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে। বহমান নদীর মতো সময় নীরবে চলে গেছে বহুদূর। সামনে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত কিন্তু পাথেয় তেমন কিছুই সংগ্রহ করা হয় নি। তখন শত চেষ্টা করেই এই ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকে না। তাই সময় থাকতে…সাধু হও সাবধান।

লেখক : মোঃ আব্দুল হামিদ
এসোসিয়েট প্রফেসর
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ঢাকা, ০৮ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন