[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



আজব ভর্তি পরীক্ষার হল, পিনপতন নীরবতা


প্রকাশিত: August 9, 2016 , 10:45 am | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট


exam-live

আশির আহমেদ : গত তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দায়িত্ব পালন করে আসছি। ভর্তি পরীক্ষার হল পরিদর্শকের দায়িত্ব। কি যে আজিব নিয়ম কানুন রে ভাই! ছাত্রদের যেমন টেনশন, আমাদেরও তেমন।

কিন্তু শুনে খুশি হবেন যে, নকল করার বা ধরা পড়ার হার
প্রশ্ন পত্র ফাঁসের হার সবই শূন্যের কাছাকাছি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তি কমিশনকে নির্দেশ দেয়া আছে প্রত্যেক ছাত্র যেন পরীক্ষার হলে সমান সুযোগ পায়। এই সমান সুযোগ বলতে কি বোঝায় আর তা কিভাবে পালন করা হয় তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কমিশন একটি গাইডবই তৈরি করেছেন। ২২০ পৃষ্ঠার। সাথে ১০০টি FAQ। প্রতি বছর একটু আধটু আপডেট হয়।

এই গাইড বইটি হল অনেকটা কমপ্লিট কোড অব এক্সাম হল। কোন সিচুয়েশনে একজন পরিদর্শক কি করবেন সব কিছু লেখা। কোন সিচুয়েশন বাদ নেই। এই গাইড বই কি একদিনে তৈরি সম্ভব, ৫০ বছর বললেও আমি অবিশ্বাস করবোনা।

কয়েকটা উদাহরণ দেই।

(১) পরীক্ষার হলে কোন ছাত্র কথা বলতে পারবেনা। আমরা সবাই বোবা, আমাদেরই বোবার রাজত্বে
বলে কি? তাইলে টয়লেটে যেতে চাইলে করবে টা কি? প্রশ্নপত্র বুঝতে না পারলে স্যার কে ডাক দেবে কি করে?

(২) পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে চেয়ারে বসবে, পরিদর্শকের অনুমতি ছাড়া সামান্য একটু উপুড় হতে পারবেনা। বলে কি? টেবিল থেকে পেন্সিল, রাবার পড়ে গেলে উপুড় না হয়ে তুলবে কিভাবে? চুম্বক দিয়ে ?
উত্তর খুব সিম্পল। ছাত্র শুধু একটা হাত তুলবে। বাকি কাজ পরিদর্শকের। পরিদর্শক গিয়ে পেন্সিল তুলে দেবে।
একটা হলে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রের জন্য তিনজন পরিদর্শক থাকেন। দুজন ভেতরে একজন বাইরে। ভেতরের পরিদর্শকদ্বয় সবসময় হলের কোনাকুনি দিকে অবস্থান নেবেন। পরিদর্শকরা চোখ ঘোরাবেন Z এর মত করে। এভাবে চোখ ঘোরালে নাকি ৩ সেকেন্ডেরও কম সময়ে ছাত্রের কোন সন্দেহজনক এক্টিভিটি চোখের নজরে আসে। ছাত্র হাত তোলামাত্র পরিদর্শক একটা কুইজ টাইপের ফরম নিয়ে দৌড়ে যাবেন।

ফরমে
(ক) টয়লেটে যেতে চাই

(খ) বমি বমি লাগছে

(গ) পাশের ছাত্রটি পা কাঁপাচ্ছে

(ঘ) টেবিল থেকে পেন্সিল পড়ে গেছে – এই ধরনের বিরাট একটি লিস্ট থাকে।

ছাত্র ফরমের সঠিক স্থানটিতে টিক চিহ্ন দেবে।

ধরুন সে (ক) এর স্থানে টিক চিহ্ন দিল। পরিদর্শক তখন তার রোল নম্বর, টয়লেটে যাবার সময় লিপিবদ্ধ করে হলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিদর্শকের হাতে হস্তান্তর করবেন। বাইরের পরিদর্শক টয়লেটের দরজা পর্যন্ত যাবেন। ফিরে আসার সময়টুকু ফরমে লিপিবদ্ধ করে হলে প্রবেশ করাবেন। এই তথ্য চলে যাবে হেড কোয়ার্টারে। পরীক্ষা শেষে পরিসংখ্যান দেবেন – আজ নকল শূন্য, প্রশ্নে ভুল শূন্য, অনুপস্থিত ১০, দেরি শূন্য , টয়লেট ৩।

সারা হল পিন ড্রপ সাইলেন্ট থাকে। পরিদর্শকরা কি ধরনের জুতা পড়বেন তা নিয়েও গাইডলাইন আছে। যেসব জুতা পড়ে হাঁটলে আওয়াজ হয়, সেই সব জুতা পড়া নিষেধ। বোঝেন অবস্থা।

(৩) পরীক্ষার সময়কাল সব ছাত্রের জন্য এক হবে।
৯০ মিনিটের পরীক্ষা ৯০ মিনিট ১ সেকেন্ড বা ৮৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়না কিন্তু জাপানের পরীক্ষার হল অশুদ্ধ হয়। কারণ আরেক হলের কোন ছাত্র ১ সেকেন্ড বেশি সময় পেয়ে গেলে সুযোগে অসমতা আসবে।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১ ঘণ্টা আগে পরিদর্শকগণ মেইন হলে একত্রিত হন। এক অভিনব পদ্ধতিতে সবার ঘড়ি সেকেন্ড লেভেলে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়। জাপানের ফুকুশিমার এক পাহাড়ের ওপরে রেডিও কন্ট্রোলড একটা টাইম স্টেশন আছে। কিউসুতেও আছে। এখান থেকে সারা দেশের লোকাল টাইম কন্ট্রোল করা হয়। আমাদের দেশে টেলিভিশন, রেডিওতে সংবাদ শুরু হবার ১০ সেকেন্ড আগে টুত, টুত করে সেকেন্ড লেভেলে যে একটা আওয়াজ হয়, অনেকটা ওরকম। মেইন হলে একটা রেডিও ট্রান্সিভার থাকে। সেটা থেকে সবার ঘড়ির সময় মিলিয়ে দেয়া হয়।

প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র, চেকলিস্ট ইত্যাদি একধরনের কাপড়ের ঝুলিতে করে ৩ জন পরিদর্শক হলে ঢোকেন পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৩০ মিনিট আগে।

ছাত্ররা বইপত্র, খাতা, পেন্সিল, টিস্যু পেপার ছাড়াও চোখের ওষুধ, নাকের ওষুধ, মন্দিরের তাবিজ, কত আজব আজব জিনিস নিয়ে যে হলে হাজির হয়!

এই দেশে কিছু কিছু মন্দির আছে, ঈশ্বর আছে যারা শিক্ষার সাথে জড়িত। অনেক ছাত্র পরীক্ষার আগে সেসব মন্দিরে গিয়ে দোয়া ও তাবিজ নিয়ে আসে। আমাদের ফুকুওকা শহরে দাজাইফু তেন্মাঙ্গু নামের এক মন্দির আছে। এটা নাকি উচ্চ শিক্ষার তাবিজের জন্য বিখ্যাত। বছরে ২০ লাখ লোক তাবিজ নিতে আসেন।

১০ মিনিট পর প্রধান পরিদর্শক গাইড বই অনুযায়ী বিভিন্ন ঘোষণা পড়তে শুরু করেন। অনেকটা আমাদের গ্রামের শুক্রবারের মসজিদের খুতবার মত। গাইড বই এর বাইরে কোন কথা আমরা বলতে পারিনা। একটা শব্দের বিভিন্ন অর্থ থাকতে পারে। অন্য হলের ছাত্ররা ও যেন একই ঘোষণা পান, এই জন্য এই ব্যবস্থা।

গত বছর আমার হলে একটা বধির টাইপের ছেলে ছিল। তার জন্য আরেকজন আলাদা একজন পরিদর্শক নিযুক্ত করা হল। প্রধান পরিদর্শক যখন কোন ঘোষণা দেন তার একটা লিখিত কাগজ নিয়ে এই পরিদর্শক বধির ছেলেটির সামনে ধরেন। ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেয় সে একমত।

প্রথম ঘোষণাটি হল টেবিলের ওপর কি কি রাখতে পারবে তা স্মরণ করিয়ে দেয়া। বাকি জিনিস সব টেবিলের নিচে রাখতে হবে। একটা নির্ধারিত সময় পর, আবার বলবে – এই হলো শেষ ঘোষণা। এখন থেকে যদি টেবিলের ওপর অন্য কিছু পাওয়া যায়, তা হলে ইলিগ্যাল এক্টিভিটি হিসাবে গণ্য হবে। বই খাতাপত্র সব নিজের ব্যাগে টেবিলের নিচে রাখতে হবে। পরীক্ষা চলাকালীন হাত পা এই ব্যাগে লাগলে নকল করা হিসাবে গণ্য হবে। তাই পরিদর্শকের অনুমতি ছাড়া উপুড় হওয়া যাবেনা।

১৯৮৮ সালের কথা। আমি বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য সিলেট থেকে ঢাকা এলাম। ট্রেনে বসে পড়ার জন্য দুই পেজের একটা কাগজে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, অঙ্কের প্রধান সূত্রগুলো ছোট ছোট করে লিখে নিয়ে এলাম। বেশ পড়াশোনা হল। তারপর কাগজখানা ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে রেখে দিলাম। পরদিন একই প্যান্ট পড়ে হলে ঢুকলাম। ঘণ্টা খানেক পরীক্ষা দেয়ার পর হঠাৎ কাগজ খানার উপস্থিতি টের পেলাম। আমার আর কলম এগুচ্ছে না। কাগজ খানা বিষ ফোঁড়ার মত আটকে আছে।

আমি কেন কম্পিউটার বিভাগে চান্স পাইনি তার কারণ হিসাবে আমি সব সময়ই এই কাহিনি বলে বুঝিয়ে দেই যে আমি আসলে ছাত্র হিসাবে ওই শ্রেণিরই ছিলাম।

জাপানের কথায় আসি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১০ মিনিট আগে বিলি করে দেয়া হয়। পরিদর্শকের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই কাগজ গুলোতে সামান্য হাত লাগলে তা নকল হিসাবে ধরা হবে। আমি ছাত্রদের চেহারা দেখতে থাকি। ইফতার সামনে রেখে ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত খাবারে হাত দেয়া যাবেনা – দৃশ্যটা অনেকটা ঐরকম।

সহকারী পরিদর্শক হিসেবে আমার আরেকটি দায়িত্ব হল টাইম কিপিং। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১০ সেকেন্ড আগে আমি প্রধান পরিদর্শকের সামনে দাঁড়াই। সেকেন্ডের তালে তালে প্রথম দশ আঙ্গুল দেখাই, তারপর নয়, আট, এভাবে ১ দেখানোর সাথে সাথে পরিদর্শক মিলিটারির মত হুঙ্কার দেন। পরীক্ষা – শুরু !!

পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে একবার রিমাইন্ডার দেয়া হয়। তারপর পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ সেকেন্ড আগে আমি আবার কাউন্ট ডাউন করি- প্রধান পরিদর্শক হুঙ্কার দেন। পরীক্ষা – শেষ!!

এই হুঙ্কার শোনা মাত্র ছাত্ররা উত্তরপত্র ভাঁজ করবে। হাতে পেন্সিল কলম কিছুই রাখতে পারবে না। হুঙ্কার শোনার পর হাতে কিছু পাওয়া মানে নকল হিসাবে গণ্য হওয়া।
এইসব নিয়ম কানুন ছাত্র শিক্ষকদের আগে থেকেই ট্রেনিং দেয়া হয়। নকল আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখতে পারার কারণটা হল এই গাইড বই আর তা ফলো করার অভ্যাস।

কিছু ট্রিভিয়া দেই (জেনে লাভ নেই, না জানলেও ক্ষতি নেই)

(১) জাপানে ছাত্ররা পরীক্ষায় পেন্সিল ব্যবহার করে। কলম ব্যবহার নিষেধ। রাবার দিয়ে মুছার পর যে সামান্য ময়লা বের হয় এগুলো আবার টিস্যু পেপার দিয়ে চিমটি করে ধরে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। হলরুম ময়লা করবে না।

(২) ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পাড়ায় পাড়ায় কোচিং সেন্টার আছে। বিরাট ব্যবসা। কোচিং সেন্টার গুলোর বছরে আয় ৯৬০০মিলিয়ন ডলার। আমাদের বাংলাদেশের বাৎসরিক বাজেটের ৫ ভাগের একভাগের সমান। কোচিং সেন্টারগুলোতে কলেজের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক পড়াতে পারেন না।

(৩) সারাদেশে একই দিনে একই সময়ে একই বিষয়ে পরীক্ষা হয়। জানুয়ারি মাসের তৃতীয় শনি ও রবি বার।

(৪) ছাত্র শিক্ষক সবাইকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিলম্ব করলে সেই দায় সরকারের। আপনি নিজে গাড়ি নিয়ে এলেন, জ্যামে আটকা পড়লেন – এই বিলম্বের জন্য দায়ী আপনি নিজে।

(৫) পরীক্ষা হলে ছাত্র আর পরিদর্শক ছাড়া আর কারো প্রবেশাধিকার নেই। আপনি অভিভাবক হোন, দেশের মন্ত্রী ম্যাজিস্ট্রেট আর ভাইস চ্যান্সেলরই হোন।

(৬) পরীক্ষার সময়কাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন ছাত্র বের হতে পারবেনা। আগে পরীক্ষা শেষ হলেও না। অনেক ছাত্র হলে ঘুম দেয়। ঘুমানোতে বাধা নেই।
এবারের ভর্তি পরীক্ষা আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং আবারো আমি পরিদর্শক। নয়টা পাঁচটা দাঁড়িয়ে থাকবো। পরীক্ষা চলাকালীন আমাদের বসার অনুমতি নেই।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভুঁড়ি দোলানোর একটা ব্যায়াম আবিষ্কার করেছি। সাউন্ডলেস দোলন। দেখি এতে ভুঁড়ি কিছুটা কমে কিনা। ছাত্ররাতো আর নকল ফকল করে না, এতো আইন-কানুনের সীমাবদ্ধতায় সময় কাটানোর আর ভালো উপায় কি?

আশির আহমেদ
এসোসিয়েট প্রফেসর
কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

ঢাকা, ০৯ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন