[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



নজরুল: ও তাঁর প্রেম বিরহ


প্রকাশিত: August 9, 2016 , 5:29 pm | বিভাগ: ফিচার


nazrul3
মুস্তাক মুহাম্মদ: “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর অন্য হাতে রণ-তূর্য”, (বিদ্রোহী)। এ কথা একমাত্র নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) বলতে পারে। কাজী নজরুল ইসলাম মূলত প্রেমের কবি। তিনি প্রেম দিয়ে জগতটি দেখেছেন। কিন্তু তিনি জগতের কাছ থেকে প্রতিদানে প্রেম খুব কমই পেয়েছেন। বিরহ যন্ত্রণায় তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র-হয়েছেন বিদ্রোহী। তবু তাঁর প্রেমিক সত্ত্বাটি কখনো বিসর্জন দেননি, বরঞ্চ তা ঝালিয়ে আরো খাঁটি প্রেমিক হয়েছেন। গভীর প্রেমের সাগরের মাঝি স্বরূপ প্রেমকে বার বার তুলে এনেছেন তাঁর কবিতার পঙ্তিতে।

মানব মনে কখন প্রেম আসে তা মানুষ জানে না। আর জানে না বলেই প্রেমের জন্য অপেক্ষা করে। শাশ্বত প্রেমের পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে প্রেমের জন্য। তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে বসন্তের জন্য অপেক্ষা করে-কখন প্রেমের ফুল ফুটবে এবং সেই ফুলের সুবাসে সুবাসিত হবে পৃথিবী। সেই অজানা পথিকের জন্য কবি প্রেমের পসরা সাজিয়ে অপেক্ষায় আছেন। সেই আকাক্সক্ষায় লিখেছেন-
“বলিলে,- অজানা বন্ধু, তুমি কি গো সেই,/জ্বালি দীপ গাঁথি মালা যার আশাতেই/কূলে বসে একাকিনী যুগ যুগ ধরি?/নেমে এসে বন্ধু মোর ঘাটে বাঁধ তরী” (তুমি মোরে ভুলিয়াছঃ চক্রবাক)

যুগ যুগ ধরে অপেক্ষার পর কাঙ্খিত প্রেমের স্বর্গ থেকে কেনো এক মানবীর মাধ্যমে ধরা দেয়। প্রেমের নানা কেলি-ছলা-কলা, মান-অভিমান সুখের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু মানসী যদি দূরে চলে যায়। শাশ্বত প্রেম তখন আরও গভীর ও খাঁটি হয়। জগতে যা কিছু সুন্দর তা খুবই ক্ষণস্থায়ী। যে হৃদয় বেশি মহৎ তার কষ্টটাও বেশি। পৃথিবীতে যত বড় বড় প্রেম দেখা গেছে তাদের কারোরই মিলন হয় নি। বিরহ বড় প্রেমের পরিণতি। বিরহ ব্যথা শুধু খাঁটি প্রেমিককে ব্যথা দেয় না প্রেমকে আরও গভীর ও দৃঢ় করে। প্রেমকে গভীরতা দান করে। যে প্রেম একবার আসে তা কখনো যায় না- দিন দিন তা আরও গভীর হয়। এমন কি প্রেমিকা যদি দূরেও সরে যায়। তবু প্রেমের সেই জিয়ন কাঠির স্পর্শে প্রেম আরও উজ্জ্বলতা ধারণ করে। যা দূরের প্রেমিকা নাও জানতে পারে। এই অমোঘ সত্যটি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় পাই এভাবে-
“তুমি মোরে ভুলিয়াছ, তাই সত্য হোক!/নিশি-শেষে নিভে গেছে দীপালী-আলোক!/ সুন্দর কঠিন তুমি পরশ,/তোমার পরশ লভি, হইনু সুন্দর-/-তুমি তাহা জানিলে না!/…সত্য হোক প্রিয়া/দীপালি জ্বলিয়া ছিল-গিয়াছে-গিয়াছে নিভিয়া!” (তুমি মোরে ভুলিয়াছ ঃ চক্রবাক)

বিরহ বেদনা প্রেমকে খাঁটি করে। সেই বেদনার মধ্যেও প্রেমিক তার হারানো প্রিয়াকে খোঁজে। প্রিয়াকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়। চারদিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে প্রিয়াকে খোঁজে। বুকে আশা রাখে তার প্রিয়া এই অন্ধকার ভেদ করে একদিন সোনালী সকালে প্রেমের ডালি সাজিয়ে আসবে। উল্লেখঃ কবি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন কবির পৃষ্ঠপোষক ও প্রকাশক আকবর আলী খানের ভাগিনী নার্গিসকে কিন্তু বাসর রাতেই তিনি পালিয়ে যান। পরবর্তীতে নার্গিস তার ভুল বুঝতে পেরে নজরুলকে চিঠি দিয়েছিল। ততোদিন কবির প্রেম ছিল কিন্তু নার্গিসকে গ্রহণ করার সামাজিক-মানসিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তাই বিরহকাতর কবি লিখেছেন-
“এই বেদনার নিশীথ-তমসা-তীরে/বিরহী চক্রবাক খুঁজে খুঁজে ফিরে/কোথায় প্রভাতের সূর্যদয়ের সাথে/ডাকে সাথী আর মিলন মোহনাতে।” (চক্রবাক ঃ চক্রবাক)

বিরহ কাতর হয়েও সামাজিক দায়বদ্ধতার কাছে মাথা নত করে মেনে নিতে হয় সব নিয়ম-কানুন। তখন অনিচ্ছা সত্তে¡ও প্রেমিক সত্ত¡াকে দমিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। মানুষের এই দ্বৈত সত্ত¡ার মাঝেও প্রেম টিকে থাকে। যদিও প্রেমিকাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ঘরণী করতে হয়। তখন খুন করতে হয় প্রেমিক সত্ত্বাকে। একদিকে প্রেমিক সত্ত্বার মৃত্যুর বেদনা অপর দিকে নতুন করে সংসার করার জন্য বিয়ের উৎসব শুরু হয়। অথবা এ জগতে প্রেমকে স্বার্থক করতে পারলেও পরকালে কবি প্রেমিকাকে পাওয়ার আশা ব্যক্ত করে লিখেছেন-
“কে জানিত হায় মরণের মাঝে/এমন বিয়ের নহবত্ বাজে!/নব-জীবনের বাসর-দুয়ারে কবে ‘প্রিয়া’ ‘বধূ’ হবে-/সেই সুখে, প্রিয় সাজিয়েছি বর মৃত্যুর উৎসবে! (সাজিয়েছি বর মৃত্যুর উৎসবে ঃ চক্রবাক)

প্রেম অর্ন্তনিহিত ব্যাপার। প্রেমের ক্ষেত্রে বস্তুবাদ সম্পূর্ণ নিরর্থক। বস্তুবাদে যে চোখে প্রিয়া হিংসা দেখে প্রেমের ক্ষেত্রে সেই চোখে অভিমান দেখা যায়। চোখের আড়ালে থাকে গভীর অনুরাগ। এই অনুরাগ শুধুমাত্র অন্তর দিয়েই উপলব্ধি করা যায়, অন্য কিছু দিয়ে তা সম্ভব নয়। মুনীর চৌধুরীর উক্তিটি এ ক্ষেত্রে প্রনিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন- “অন্তরে অমৃত না থাকলে মুখ দিয়ে এত গরল উগলে দিতে পারত না।” (রক্তাক্ত প্রান্তর)। প্রেম বস্তুগত ধারণা বাইরে বিমূর্ত বিষয়। প্রেমিকের চোখে প্রিয়া যদিও হিংসা দেখে কিন্তু অন্তরে তার গভীর ভালোবাসা লুকানো থাকে। অভিমানে প্রিয়া দূরে চলে গেলেও সেই ব্যথা প্রেমিক হৃদয় কখনো ভোলে না। যদিও প্রেমিকা তা বোঝে না। কিন্তু শাশ্বত প্রেম আরও গভীর হয়। কাজী নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেছেন-
“হিংসাই শুধু দেখেছ এ চোখে? দেখ নাই আর কিছু?/সম্মুখে শুধু রহিলে তাকায়ে, চেয়ে’ দেখিলে না পিছু!/সম্মুখ হতে আঘাত হানিয়া চ’লে গেল যে- পথিক/তার আঘাতেরই ব্যথা বুকে ধ’রে জাগো আজো অনিমিখ্”/তুমি বুঝিলে না, হায়,/কত অভিমানে বুকের বন্ধু ব্যথা হেনে চলে যায়।” (হিংসাতুর ঃ চক্রবাক)

কবি স্রষ্টা। একটি কবিতা রচনা করতে গেলে তার পেছনে অনেক বেদনা থাকে। কারণ “কবির বেদনা দগ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্মভূমি।” কিন্তু পাঠকরা শুধু কবিতার রস আস্বাদন করে। তারা দেখে না রচয়িতার বেদনার দিক। কবি বেদনায় জ্বলে জ্বলে রচনা করে কবিতা। কিন্তু পাঠক ভাবে বেখেয়ালী-আত্মভোলা কবি সুখ কল্পনায় রচনা করে কবিতা। বীণার তার আঘাতে খুব দ্রæত কেঁপে একসময় সুমধুর সুর সৃষ্টি করে-আমাদের মুগ্ধ করে। এই সুমধুর সুর সৃষ্টি করার পেছনে শিল্পী বা ইতিহাস অগোচরেই থেকে যায়। কবির বেদনা-আমাদের আনন্দের উৎস হলেও আমরা বেমালুম ভুলে যাই কবিও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। তাঁরও মানবিক অনুভূতি আছে। কবির প্রিয়া তাঁর (কবি) চোখে শুধু হিংসা দেখেছে কিন্তু গোপনে যে অশ্রæ ফেলেছেন তার খবর সে (প্রিয়া) রাখেনি। কবি সেই কথাই প্রিয়ার কাছে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন এভাবে-
“কবির কবিতা সে শুধু খেয়াল? তুমি বুঝিবে না, রাণী,/কত জ্বাল দিলে উনুনের জলে ফোটে বুদ্বুদ-বাণী!/ তুমি কি বুঝিবে, কত ক্ষত হ’য়ে বেণুর বুকের হাড়ে/সুর ওঠে, হায় কত ব্যথা কাঁদে সুর-বাঁধা বীণা-তারে/সেদিন কবিই কেঁদেছিল শুধু? মানুষ কাঁদেনি সাথে?/হিংসাই শুধু দেখেছ, দেখনি অশ্রæ নয়ন-পাতে?” (হিংসাতুর ঃ চক্রবাক)

প্রেম অন্তরের ব্যাপার। প্রেমিক প্রিয়ার হৃদয়ে ঢোকার জন্য অনেক কিছু করে। কিন্তু তার বিনিময় আর দশজন সাধারণ মানুষের মত যদি প্রিয়া প্রশংসা করে দায় সারে তাহলে প্রেমিকের ক্ষেদ থাকে। প্রেমিকের সবচেষ্টা সেদিন সার্থক হবে যেদিন প্রিয় হৃদয়ে স্থান পাবে। তাই কবি প্রিয়র কাছে দাবী করেছেন- যদি কোনদিন হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারি তাহলে জানিয়ো। এভাবে সারাজীবন প্রিয় হৃদয়ের মণিকোঠায় থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন কবি নিচের পঙ্তির মাধ্যমে-
“ভোলো মোর গান, কি হবে লইয়া এইটুকু পরিচয়,/আমি শুধু তব কণ্ঠের হার, হৃদয়ের কেহ নয়!/জানায়ো আমারে, যদি আসে দিন, এইটুকু শুধু যাচি-/কণ্ঠ পারায়ে হয়েছি তোমার হৃদয়ের কাছাকাছি।” (গানের আড়ালে ঃ চক্রবাক)

ভালোবাসা একবার হলে তা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। হয়তো ক্ষণিক সময় মান-অভিমানের দোলাচালে দূরে থাকা যায়। কিন্তু প্রিয় যদি প্রেমের দাবী নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়ে বলে-আমি তোমাকে ভালোবাসি তাহলে কোন প্রেমিক/প্রেমিকার সাধ্য নেই তা পাশ কাটিয়ে যায়। তখন মিলন মোহনায় মেতে উঠতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না পৃথিবীর কোন শক্তি। মুহূর্ত ভেঙে পড়ে এতদিনে গড়া হিমালয়প্রতিম অভিমান। পৃথিবীর সব কিছু তুচ্ছজ্ঞান করে প্রেমকে সার্থক করাই প্রেমী হৃদয়ের ধর্ম। এছাড়া বাঙালী নারী-প্রেমিকারা প্রিয়র একটি কথায় বুকের সব অভিমান ভুলতে পারঙ্গম। ভুলে যায় তিলে তিলে গড়া পাহাড়সম অভিমান। সেই কথাই কবি লিখেছেন এভাবে-
“সিন্ধুর বুকে লুকাইলি মুখ এমনি নিবিড় ক’রে/এমন করিয়া হারাইলি তুই আপনারে চিরতরে-/যে দিক তাকাই নাই তুই নাই! তোর বন্ধুর বাহু/প্রসিয়াছে তোরে বুকের পাঁজরে ক্ষুদাতুর কাল রাহু!/…………./একটি চুমায় মিটে গেল তোর সব সাধ সব তৃষ্ণা,/ছিন্ন লতার মতন মুরছি পড়িলি হারায়ে দিশা!/- একটি চুমার লাগি’/এতদিন ধ’রে এত পথ বেয়ে এলি কিরে হতভাগী?” (মিলন-মোহনায় ঃ চক্রবাক)

মানুষ সব সময় এক জায়গায় থাকে না। একসময় যা অতি প্রয়োজনীয় ছিল কালের ব্যবধানে তা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। প্রেমিক-প্রেমিকার যদিও ছাড়াছাড়ি হয় তবু প্রেম থাকে। যদি কখনো অবসর পাওয়া যায় তখনই সেই মুখ স্মৃতি মনে পড়ে। আবার কখনো সেই পুরনো জায়গাগুলোতে যাওয়া যায় তখন পুরনো স্মৃতিগুলো সুখ স্মৃতি হিসেবে দেখা দেয়। এবং মুখে হাসি ফুটে উঠে। পুনর্বার মিলনের কথা কবি লিখেছেন-
“খেলিতে আসি নি বন্ধু, এসেছি এবার/দেখিতে তোমার রূপ বিরহ-বিথার।” (শীতের সিন্ধু ঃ চক্রবাক)

মরার পর মানুষের দেহ মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু প্রকৃতি আগের মতই থেকে যাবে। আবার হয়তো কেউ এসে জায়গা দখল করবে। কর্ণফুলী নদীর ¯্রােত থাকবে কিন্তু কবি থাকবেন না। আবার যার বিরহে এ গান গাচ্ছেন সেই গানের প্রেরণা বুলবুলও থাকবে না। কিন্তু কর্ণফুলীর দু’কূল হয়তো ভাঙবে- ¯্রােত থেকে যাবে। তাই কর্ণফুলী তথা প্রকৃতির সাথে মিশে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন কবি এভাবে-
“তোমার জলের লিখনে লিখিনু আমার গোপন ব্যথা!/ভয় নাই, নিমেষে মুছিয়া যাইবে এ জল-লেখা,/তুমি জল-হেথা দাগ কেটে কভু থাকে না কিছুরি রেখা/…………/বাহিয়া চলিবে তব পথে তুমি বাজাইয়া কিঙ্কিনী,/শুধু লীলাভরে তেমনি হয়তো ভাঙিয়া চলিবে কূল,/তুমি র’বে, শুধু র’বে না ক’ আর এ গানের বুলবুল।” (কর্ণফুলী ঃ চক্রবাক)

প্রেমের জন্য জগৎ। জীবন প্রেমময়। এই প্রেমকে সার্থক করার জন্য প্রিয়র আপ্রাণ প্রচেষ্টা থাকে। তবু কখনো কখনো প্রেম অধরা থেকে যায়। কখনো বাস্তবতার বিরহ-অনলে প্রেমিক পোড়ে। কিন্তু সব সময় প্রিয়র শুভ কামনা করে। এমনকি নিজের জীবনের বিনিময়ও যদি প্রিয়র মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারে, তার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে খাঁটি প্রেমিক কখনো পিছ পা হয় না। প্রেমিক তার সমস্ত কিছু প্রিয়র কাছে দিয়ে দেয়। প্রিয়কে সব কিছু দিয়ে দাতা প্রেমিক। প্রিয়াকে ধনী করে। দীনহীন হয়ে শুধুমাত্র প্রেমকে পাথেয় করে জীবন কাটাতে পারে খাঁটি প্রেমিক। সেই প্রেমের কথা লিখেছেন প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম এভাবে-
“আপনারে ছলিয়াছি, তোমারে ছলি নি কোনোদিন/ আমি যাই, তোমারে আমার ব্যথা দিয়ে গেনু ঋণ।” (স্তব্দ রাত ঃ চক্রবাক)

প্রেমের জন্য প্রেমিক সবকিছু ত্যাগ করেছে। কিন্তু যার জন্য এই ত্যাগ-কর্ম সেই প্রেমিকা যদি এই ত্যাগ কর্মকে অবমূল্যায়ণ করে তাহলে প্রেমিকের ব্যথার শেষ থাকে না। বহু কষ্টে সংগ্রহিত ফুলে যে মালা গাঁথা হয় তা যদি পরানোর আগে শুকিয়ে যায় তাহলে কষ্টের অন্ত থাকে না। এই কষ্টে জীবন নাশের আশঙ্কা থাকে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমের যন্ত্রণায় কাতর প্রেমিকের পৃথিবী তখন নিরর্থক হয় এবং জীবনের মানে ফুরিয়ে যায়। কবি লিখেছেন-
“সে-ই শুধু জানিল না, যার তরে এত মালা গাঁথা,/জলে-ভরা আঁখি তোর, ঘুমে-ভরা তার আঁখি-পাতা।/কে জানে কাটিবে কি না আজিকার অন্ধ এ নিশীথ,/হয়ত হবে না গাওয়া কা’ল তোর আধ-গাওয়া গীতি,” (স্তব্দ রাত ঃ চক্রবাক)

প্রিয় যখন দূরে থাকে প্রিয়াকে সব সময় মনে হয়। প্রেমিক সব সময় চায় প্রেমিকার কাছে থাকতে কিন্তু জীবন-জীবিকার সন্ধানে কখনো দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। বর্ষার দিনে প্রিয়াকে বেশি মনে পড়ে। কাছে পাওয়ার আকুতি প্রবল হয়। কিন্তু কিছু করার থাকে না। শুধু নিরবে দু’চোখের অশ্রæ ঝরে। আর মুখ দিয়ে চাপা কষ্টের হা-হুতাশ বের হয়। সেই বাণীর সার্থক চিত্র দেখতে পাই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। তিনি লিখেছেন-
“আমার বেদনা আজি রূপ ধরি’ শত গীত-সুরে/নিখিল বিরহী-কণ্ঠে-বিরহিনী-তব তরে ঝরে!/এ-পারে ও-পারে মোরা, নাই নাই কূল!/তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দিই ফুল!” (তোমারে পড়িছে মনে ঃ চক্রবাক)

ভালোবাসায় হারানোর ভয় থাকে। থাকে সমাজের রোপিত কলঙ্কের ভয়। কিন্তু সব ভয়-বাঁধাকে জয় করে প্রিয় স্বপ্ন দেখে বিচিত্র রঙে-ফুলে সাজায় প্রিয়াকে খাঁটি প্রেমকে সার্থক করার জন্য সমস্ত অপরাধ নিজে কাঁধে তুলে নেয় প্রেমিক। তবুও পেতে চায় প্রেয়সীকে। শত অপরাধে অপরাধী হয়েও প্রেমের গান গায় প্রেমিক। কবি লিখেছেন-
“প্রিয়, মোর প্রিয়, মোরই অপরাধ,/কেন জেগেছিল এত আশা সাধ!/ যত ভালোবাসা, তত পরমাদ,/কেন ছুঁইলাম ফুল-শাখা!/অপরাধ শুধু মনে থাক।” (অপরাধ শুধু মনে থাক ঃ চক্রবাক)

প্রেমে ব্যাকুল প্রেমিক সব কিছু প্রিয়ার জন্য করে। তার সমস্ত গান প্রিয়াকে ঘিরে। শুধু প্রেমিকার মন পাওয়ার জন্য শত চেষ্টা। পদ্মফুল তুলতে গেলে যেমন কাঁটার আঘাত সহ্য করতে হয়, তেমনি প্রেমিক হৃদয়ের যন্ত্রণা। তা একমাত্র প্রেমিকাই বুঝতে পারে। কবি লিখেছেন-
“ফুলের বুকে দোলে কাঁটার অভিমানের মালা,/আমার কাঁটার ঘায়ে বোঝ আমার বুকের জ্বালা?” (নদী পারের মেয়ে ঃ চক্রবাক)

প্রেমের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম অনন্য। প্রেমের শাশ্বত-সত্য-সুন্দর রূপটি তিনি ধরতে পেরেছিলেন। প্রেমের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন কিন্তু প্রেম অধরা থেকে গেছে। বিরহ অনলে পুড়ে পুড়ে তিনি হয়েছেন খাঁটি। প্রেম থেকে তীব্র বঞ্চনার শিকার হয়ে যুবক নজরুল হয়েছিলেন বিদ্রোহী। বিদ্রোহী হয়েছিলেন মূলত প্রেমিকার বিরহে কিন্তু তিনি ভালোবেসেছিলেন অসহায়-পীড়িত-বঞ্চিত মানুষদের। তার এই ভালোবাসা বিশ্বজনীন রূপ ধারণ করেছিল। ফ্রয়ডী বা প্লাটোনিক ভালোবাসার উর্দ্ধে তিনি বিশ্বপ্রেমিক হয়েছিলেন। সেই প্রেমের মহত্বে-জৌলুসে তিনি আমাদের মাঝে সব সময় বিচরণ করেন।

 

ঢাকা, ০৯ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম