[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



তিন কাঠা জমির ওপরে স্বপ্ন দেখা যায়


প্রকাশিত: August 12, 2016 , 6:59 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট


Brac

শেখ নোমান পারভেজ: ইদানিংকালে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু মানুষের একটি কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে, সেটা হল পাবলিক এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন।

সর্বোপরি বিষয়টা এখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিকতার থেকে বেশী হেয়প্রতিপন্নমূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা সামগ্রিক ভাবে সুখকরতো নয়ই বরং অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোন সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা সৃষ্টির কারণও হতে পারে।

সম্প্রতি গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার ঘটনাসহ দেশব্যাপী বেশকিছু নাশকতামূলক হামলায় যেসকল তরুণদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিচয় হিসেবে পাওয়া যায়, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাতে করে স্বাভাবিক ভাবেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যবেক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে, কিন্তু কোনভাবেই জেনারালাইজ করে বলে দেয়া যায় না যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই জঙ্গি তৈরির কারখানা কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন এমন ৬৩-৬৫ শতাংশ কিংবা তারও বেশি শিক্ষার্থীই পড়ছেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শুধুমাত্র গুটিকয়েক বিপথগামী শিক্ষার্থীদের জন্য কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।

আবার আমি এটাও বলতে চাচ্ছি না সমস্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুণগত দিক থেকে সমৃদ্ধ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যেমন মানের পার্থক্য আছে তেমন আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে। কোনভাবেই দেশের সবগুলি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমানভাবে মান বজায় রাখতে পারেনি, পারার কথাও না।

এটা অস্বীকার্য নয় যে, কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার নামে ব্যাবসা করছে ঠিক একই ভাবে এটিও অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে, শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে যথেষ্ট ভালো পড়াশুনা হয় এবং ভালো ফলাফল অর্জন করতে হলে তাঁদের যথেষ্ট শ্রম দিতে হয়। ফলাফল স্বরূপ এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অনেক ছাত্রছাত্রী দেশে এবং বিদেশে সমান সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতির পাশাপাশি রয়েছে “নাসা” এর সম্মাননা এবং মহাকাশ নিয়ে গবেষণা এবং বিভিন্ন অর্জনের সুখ্যাতি। তারপরেও এই মান নিয়ন্ত্রণ কিংবা শিক্ষার নামে সার্টিফিকেট ব্যাবসা এবং অন্যান্য বিষয়াবলী তা অন্য আলাপ, এবং এই ব্যাবসা করার সুযোগ কে দিচ্ছে? বা সুযোগ পেলেও আইন থাকার পর এর কার্যকারিতা কোথায়? এই ব্যাপারগুলো অনেক প্রশ্নবিদ্ধ, যা মোটামুটি সবাই জানেও বুঝে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের আজকাল প্রাইভেট এবং পাবলিক ছাত্র বা ছাত্রী এই যে বিভাজন এটা কতখানিক যৌক্তিক?

সেদিন দেশের প্রবীণ বুদ্ধিজীবী প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ব্যাবস্থাকে মাদ্রাসার সঙ্গে তুলনা করে বক্তব্য দিয়েছেন, সাথে সাথে এই মত প্রকাশ করেছেন যে, এই দুটি শিক্ষা ব্যবস্থার কোনটিতে মাতৃভাষার চর্চা সেভাবে নেই। যার ফলে আমাদের সংস্কৃতির চর্চা সেখানে হয় না এবং ছেলেমেয়েরা এক ধরনের বিছিন্নতায় ভুগে।

তারপর পরই আমার পছন্দের লেখক আনিসুল হক স্যার প্রথম আলোয় এক রম্য রচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি যেভাবে মনোভাব ব্যাক্ত করেছেন তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। প্রাইভেট-পাবলিক নিয়ে এই রকম কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়িতে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে নিয়ে সস্তা তামাশা হয়তো তাদেরমতো বয়োজ্যেষ্ঠদের থেকে আশানুরূপ নয়। বরং তাঁদের মত প্রবীণ, অভিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষদের কাছে থেকে মতামত বা উপদেশ আসতে পারতো কিভাবে পাবলিক/জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এতো বিশাল ক্যাম্পাসগুলোতে সকল ছাত্রের ভর্তি নিশ্চিত করা যায়, বা কি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চান্স না পেলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে পড়ার জন্য মনোভাব তৈরি করা যায়।

অথবা যারা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই পড়তে ইচ্ছুক, কি করে তাদের জন্য যারা সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে একটা করে মুক্ত উদ্যান কিংবা টিএসসি বানানো যায় অথবা ওই রকম শিক্ষা ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি সকলে চলমান এই সমস্যার কারণ দর্শানো কিংবা তা নিয়ে কার্যকরী আলোচনা বরাবরই এড়িয়ে যান।

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম স্যারের বক্তব্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতার পিছনে কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, মাতৃভাষা চর্চ্চা না-করা; ইতিহাস না-পড়া বা না-জানা; সামাজিক-সংস্কৃতির শিক্ষা না থাকা। এর ফলে তরুনরা মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। স্যারের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি সাংস্কৃতিক অসংযোগের কারণে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া এবং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসতর্কতার কারণ, এই যুক্তিগুলো যাচাইয়ের থেকে বেশী মেনে নেয়া কঠিন কেননা বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলপাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি ক্রেডিট কোর্স হিসেবে বাংলা, সোশাল সায়েন্স, বাংলাদেশ স্ট্যাডিজ, ভ্যালু অ্যান্ড ইথিকস, হিউম্যানিটি, নৃবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের উপর বাধ্যতামূলক কোর্স করানো হয়। যাতে করে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক শিক্ষা পায়।

পাশাপাশি যে বয়সে ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করে, সে বয়সে সে যে উপরুন্ত শিক্ষাগুলো পায়নি এই বক্তব্য ও তো মেনে নেয়া সহজ নয়। আর যদি এই বয়সেও ওই শিক্ষাগুলো সমাজ কিংবা পরিবার থেকে না পেয়ে থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়, চার বছর্‌ প্রতিটি বিষয়ে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিক্ষা দিয়ে পরিপূর্ণ এবং আদর্শ মানুষ এই বক্তব্যও কি মেনে নেয়া কঠিন নয়?

বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী এসে জড়ো হয়, তাঁর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই বিভিন্নতা বেশি কারণ এখানে শহরে বেড়ে ওঠা বিত্তশালী পরিবারের ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীর সাথে রয়েছে বিভিন্ন এলাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের মূলধারার বাংলা মাধ্যম থেকে আসা শিক্ষার্থী। এই বিভিন্নতা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে কিন্তু সেখানে হল কেন্দ্রিক আবাসন এবং মেলামেশার অনেক প্রতুলতার জন্য ভ্যারাইটি ঠিক টিকে থাকতে পারে না। আর জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেসকল উপকারগত কারণে একজন জঙ্গি বান্ধব শিক্ষক একজন বিভিন্নতায় ভোগা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে পারেন ঠিক একই ভাবে একজন জঙ্গিবান্ধব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তা করতে পারেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অ্যাকসেস অতি সহজ বিধেয় এখানে শিক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা যায়, একটি বাধা যেটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করে সেটা হল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনীতি বান্ধব আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা নয়। কিন্তু এই বিষয়গুলোকে আলোকপাত না করে, যে ই চলমান সংকট নিরসন নিয়ে লিখছেন তারা বার বারই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিছু একপেশে দোষ দিয়ে যাচ্ছেন।

যাতে করে এই সমালোচনা তো যৌক্তিক হচ্ছে না বটেই, বরং যে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পড়ছেন তাঁদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের সাথে সংযোগ স্থাপনে বাঁধার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর বোঝা যায় এতে করে খারাপ বৈ ভালো কোন ফলাফল বয়ে নিয়ে আসা সম্ভব নয়।

কালচারাল কনফ্লিক্ট কিংবা সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ নেই এমন সমাজ কিংবা রাষ্ট্র আদৌ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবশ্যই মূল্যবোধ তৈরিতে অন্যতম ভূমিকা রাখলেও আদৌ কি এটা বলে দেয়া যায় যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যে কোন মানুষের একমাত্র মূল্যবোধ তৈরি করে? এটা কি নিশ্চিত করা যায় যে, সমাজ থেকে কোন কোন ব্যক্তি বা তরুণ মূল্যবোধ হারায় না? কিন্তু যেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের জের ধরে এই ধারার সকল শিক্ষার্থীদের অনুৎসাহিত কিংবা অসন্মানিত করা হচ্ছে, এই তারাই কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি “নো ভ্যাট অন এডুকেশন” নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলো। এবং সফলতাও বয়ে নিয়ে এসেছিলো, যা বেসরকারি কিংবা পাবলিক সকল শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয়।

আনিসুল হক স্যারের রম্যরসে তিনকাঠা জায়গায় স্যার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেন সেই রকম একটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের “ন্যানো স্যাটেলাইট” তৈরিতে কিংবা চন্দ্রবোট তৈরিতে যেই দেশপ্রেম কিংবা দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখেছি তাতে নিঃসন্দেহে বলা যার যে মুক্ত উদ্যান উদার মানুষ হওয়ার প্রভাবক হিসেবে কাজ করলেও তা মুখ্য নয়। নয়তো উদার প্রান্তরসমৃদ্ধ ক্যাম্পাসগুলোতে যুগের পর যুগ মৌলবাদী রাজনীতি টিকে থাকতো না।

তাহলে বোঝাই যায় সমালোচনার মাধ্যমে সকল দোষের দোষী হিসেবে আঙ্গুল শুধু নন্দঘোষের দিকে তোলাটা বিবেচিত কাজ নয়। প্রশাসনের সঠিক নজরদারিতে, উদারমনা শিক্ষক নিয়োগে পাশাপাশি অতিরিক্ত পাঠ্যক্রম শিক্ষায় বেশী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে যেকোন বিভিন্নতা কিংবা রম্যরস কাটিয়ে তিনকাঠা যায়গার উপরই স্বপ্ন দেখা যায়।

 

লেখক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, স্কুল অব ‌’ল’ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১২ আগস্ট(ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এফআর