[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত দ্বিতীয় বিপ্লব


প্রকাশিত: August 14, 2016 , 11:00 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


BCL

মাহমুদ-উল-ইসলাম জয় : আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান এ দুটো যমজ শব্দ। একটা আরেকটার পরিপূরক এবং দুটো মিলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল-প্রজ্জ্বল এক অচিন্তিত পূর্ব-কালান্তরের সূচনা করেছে।’ আসলেই ক্ষমা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা – মানুষের মনের এ তিন মহৎ গুণের অনুশীলনে মুজিব নামটিই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল একটি প্রতিষ্ঠানে। সে প্রতিষ্ঠানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বঙ্গবন্ধু, তারপর জাতির পিতা। গোটা বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো শিরোনাম করেছিল,

‘মুজিব শব্দটি একটি জাদু।’
‘মুজিব একটি অলৌকিক নাম।’

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা অনেক শক্ত। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বিপদশংকুল। এতো কথা আছে যে কোনটা বাদ দেব আর কোনটা রাখব বুঝতে পারছিলাম না। তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লব? হ্যাঁ, আমি বাকশালের কথাই বলছি। কথাটা শুনেই নাক কুঁচকাই আমরা, ঠিক তো? আগে তো জানুন, বুঝুন। তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নেবেন। বাকশাল নিয়ে লেখা কতটা স্পর্শকাতর সেটা সবাই জানেন।

এক কথায় বাকশাল কি, কেন বা এর কতটুকু ভালোমন্দ তা এক বাক্যে বিচার করা সম্ভব নয়। তার আগে সে সময়ের রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হবে। কিছু রাজনৈতিক দল তোতাপাখির বুলি আওড়ায় যে, বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলেন। আমি বলবো এটা অযোক্তিক আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিছক রাজনৈতিক বিরোধমূলক বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়। হ্যাঁ, শুধু বলবো না, ব্যাখ্যাও করবো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ শূন্য থেকে না বরং ঋণাত্মক অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু। জাতির পিতার সাথে জাতীয় চার নেতাসহ দেশের হাল ধরলেন।

যুদ্ধের সময় যারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল তাদের মধ্যে চীনা বিপ্লবে বিশ্বাসী কিছু বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক চেতনাধারী ছিল। ’৭২ এ কিছু রাজাকারদের কাছেও অস্ত্র ছিল। বঙ্গবন্ধু সবাইকে অস্ত্র জমা দিতে বললেও তারা অস্ত্র জমা দেয়নি, বরং বিভিন্ন গ্রামে বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে লুটপাট শুরু করছিল।

১৯৬৬ এর ছয়দফা অনুযায়ী জাতীয় রক্ষীবাহিনী গড়ে তোলা হল। রক্ষীবাহিনীর কাজ ছিল ওই বিদ্রোহীদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার সহ দেশের সার্বিক অবস্থা শান্ত রাখা। কিন্তু শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রক্ষীবাহিনী গঠিত হলে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তারা ক্ষুদ্ধ হয়ে অপপ্রচার চালায়। জলপাই রংয়ের পোষাক পড়ার কারণে বিদ্রোহী চীনা সমাজতন্ত্রীরা প্রচার চালাল ওই রক্ষীবাহিনীতে সব ভারতের লোক।

রক্ষীবাহিনীকে কিছু অস্ত্র দেয়া হলে সেনাবাহিনীর ভেতর গুজব ছড়ালো সেনাবাহিনীর বিকল্প বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে রক্ষীবাহিনীকে। যুদ্ধের পর যেখানে দেশ গড়তে সবার সাহায্য দরকার সেখানে ক্ষমতা আর প্রমোশন নিয়ে মাতামাতি শেখ সাহেবকে বিরক্ত করে তোলে।

এলিট শ্রেণির লোকদের কথা ছিল একটাই সবাই মিলে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি, এবার আমার প্রাপ্য আমাকে দাও। আমি কেন অবহেলিত? শুরু হয়ে গেল ইঁদুর দৌড়। চাই-চাই-চাই! গাড়ী চাই, বাড়ী চাই, টাকা চাই, চাকুরি চাই, চাকুরিওয়ালদের প্রমোশন চাই। চাওয়ার লোক বেশী, দেয়ার লোক কম।

এই প্রমোশন নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতর ক্ষোভ পঞ্জীভূত হয়। সেনাবাহিনীতে সাধারণ ভাবে দু’ভাগ ছিল, এক যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন আর যারা পাকিস্থান থেকে প্রত্যাগত অফিসার। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের শেখ সাহেব দু’বছরের সিনিয়রিটি দিলেন এতে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি তাদের ভেতর ক্ষোভ জমে।

আবার মুক্তিযোদ্ধা সেনাদের তিনটি ইউনিট ছিল শফিউল্লাহর ‘S’ Force, জিয়াউর রহমানের ‘Z’ Force আর খালেদ মোশাররফের ‘K’ Force. এঁদের মধ্যে আবার সেনাপ্রধান হওয়া নিয়ে রেষ ছিল। শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করা হয়, কিন্তু জিয়াউর রহমান কিছুদিনের সিনিয়র ছিলেন। জিয়াউর রহমান ভাবতেন তার সাথে অন্যায় করা হল।

আবার জিয়াউর রহমানের ভয় ছিল এর পরে খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করা হতে পারে। নতুন স্বাধীন দেশ গড়ার প্রয়াসের বিন্দুমাত্র দেখা যাচ্ছে না সেনাবাহিনীর মধ্যে। বরং পদ-পদবিই তাদের কাছে মুখ্য ছিল।

মেজর ডালিমকে খুব স্নেহ করতেন শেখ সাহেব। ১৯৭৫ এ এক বিয়ের পার্টিতে উপস্থিত নবদম্পতি মেজর ডালিম ও তার স্ত্রী। গাজীর ছেলে ডালিমকে অপমান করলে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে ডালিম কর্তৃক গাজীর ছেলেকে চপেটাঘাত এর পর গাজীর ছেলের দল জোর করে ডালিমকে ধরে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। ডালিমের বন্ধু মেজর নূর এসে উদ্ধার, এর পর শেখ সাহেব মিমাংসা করে দেবার পরেও গাজীর বাসায় ভাংচুর লুটপাট। তারপর সেনাবাহিনী থেকে বহিস্কার হবার পরেও শেখ সাহেবের নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করেছে অথচ ডালিম জাত চিনিয়েছে ১৫ আগষ্টে।

এবার স্বাধীন বাংলার রাজনৈতিক দল জাসদ এবং কমিউনিষ্ট পার্টি বাংলার স্বাধীনতা অস্বীকার করল। তারা প্রকাশ্যে মুজিব সরকারকে উচ্ছেদ করবার জন্য আন্দোলন ও সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলল। সাথে ছিল সর্বহারা ও নকশালের আদলে গড়া গেরিলারা। একটাই ইচ্ছে তাদের ক্ষমতায় যেতে হবে, গদিতে বসতে হবে। তারা নানা রকম অপপ্রচারে লিপ্ত হলো, বাংলাদেশ নাকি ভারতের গোলামি করছে। অথচ শেখ সাহেব ভারতীর সৈন্য বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিলেন দৃঢ়তার সাথে। হঠাৎ করে অবাঞ্চিত মুসলিম লীগ তাদের চাঁদ-তারা খচিত পতাকা পরিবর্তন করে নতুন উদ্দ্যমে অপপ্রচারে লিপ্ত হল। কিন্তু শেখ সাহেব এদের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং বার তাদের শুধরে নেবার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, সময় দিয়েছেন।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো মানুষও অনশন মিছিল করলেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনী সেদিন ভাসানীকে গ্রেফতার করতে চাইলে শেখ সাহেব দৃঢ় কন্ঠে বলেন ‘ভাসানীকে অবরুদ্ধ করে রাখার জন্য শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম করেনি।’ বরং সেদিন মিছিল করতে করতে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়ালে, রক্ষীবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় তাকে সেলুট করে ভেতরে সম্মানের সাথে ভেতরে নিয়ে যেতে। তারপর ঘরে বসিয়ে পেঁপে আর স্যান্ডুইচ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় ভাসানীকে। শেখ সাহেবের উদারতার এমন প্রমাণ লক্ষ লক্ষ আছে।

এবার আসি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে। যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখনকার অপপ্রচার।
গুজব ছড়াল ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায় না। তাই মুজিবনগর সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। কমিউনিষ্ট পার্টি ও মুজাফফর ন্যাপকে ক্ষমতার অংশ ও নেতৃত্ব গ্রহণ করতে না দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মুজিব সরকারকে সাহায্য ও সমর্থন দেবে না। ইয়াহিয়া খান এখন শেখ মুজিবকে জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় কিন্তু তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার লোভে পাকিস্তানের সাথে মিটমাট করতে চায় না। আরো কত কি! এগুলো মোস্তাক, তাহেরউদ্দীন ঠাকুর, মাহবুবুল আলী, শাহ মোয়াজ্জেম সহ আরো কিছু মীরজাফর-রাজবল্লভদের মাধ্যমে সুকৌশলে প্রচার করা হয়। এতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিভেদ সংশয় দেখা দেয়। তবু জাতীয় চার নেতার শক্ত হাতের নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ষড়যন্ত্রের যে বীজ বপন করা হয় ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট সেই বিষবৃক্ষের নীল ছোবলে আবারো লন্ড-ভন্ড হয়ে যায় বাংলাদেশ। ’৭০ এ জয় বাংলা পত্রিকায় ততকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাক ভারত বাংলাদেশকে কেন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে না এই মর্মে একটি লিখা পাঠান, অথচ মোস্তাক সহ সবাই জানতেন সমস্যাটা কোথায়। এর প্রতিবাদ করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এর প্রেক্ষিতেই তাজউদ্দীন আহমদকে ভারতের চর আখ্যা দেয়া হয়!

বিশ্বব্যাংকসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপে শেখ সাহেব বাধ্য হন ৭৪ এ তাজউদ্দীনকে মন্ত্রীসভা থেকে সরিয়ে দিতে। আবারো মোস্তাকদের কানভারি ও সীমাহীন ষড়যন্ত্রের শিকার হন তাজউদ্দীন। তারা বিশ্বাস করতো তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবের নিঃস্বার্থ বন্ধু। এই দু’জন এক সাথে থাকলে কোন ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তানকে প্রশংসা করলেন দেশদ্রোহী সন্ত্রাস কঠোর হাতে দমনের জন্য, এতে করে গণহত্যায় সমর্থন দেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এনজিও ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থী শিবিরে খাদ্য সহায়তায় নেমে যান, বলা হয় মানবতার কথা।

এবার ’৭১ এর পরে কথায় আসি। দেশের ভেতর কিছুই নেই, ক্ষুধা আর দারিদ্র এবং বাস্থানহীনদের আহাজারিতে দেশ ভরে গেছে। ত্রাণ দরকার, বৈদেশিক সাহায্য দরকার একে ’৭১ এ পাক-ভারত যুদ্ধে ভারতের অর্থনীতিতেও ভাঙন, তারপরও ভারত যা দিয়েছে তা দিয়ে কিছুই হবে না। অন্যান্য রাষ্ট্রের সহায়তা পেতে হলে তাদের সমর্থন দরকার, জাতিসংঘের সদস্যপদ দরকার। শেখ সাহেব তাই ব্যস্ত হয়ে গেলেন, বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের লক্ষে।

দুবছরে ১২১টি দেশের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন আদায় করলেন। জাতিসংঘে গেলেন, ওআইসি সম্মেলনে গেলেন। অনেক কন্ডিশন – কেউ বলে মুসলিম প্রজাতন্ত্রের কথা, কেউ বলে ভারত-সোভিয়েত বিমুখতার কথা তো কেউ আবার কমিউনিজমের কথা। তবু তিনি কারো কথা মানলেন না। তিনি বললেন কারো সাথে শত্রুতা নয়, কোন বিশেষ জোট নয় সবার সাথে বন্ধুত্ব থাকবে বাংলাদেশের। জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিলেন। বললেন যে, এই বিশ্ববাসী দু’ভাগে বিভক্ত – শোষিত আর শাসিত। তিনি শোষিতের পক্ষে। এই ভাষণে ক্ষুব্ধ হয় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো। ফিদেল কাষ্ট্রো সেদিন শেখ সাহেবকে বলেছিলেন আপনার এই ভাষণের পর একটি বুলেট আপনাকে তাড়া করে বেড়াবে।

‘A bullet is chasing after you, my friend’ এই কথাটিই সত্য হয়েছিল।

আবদুল গাফফার চৌধুরী সেই সময় চিলির সদ্য নিহত প্রেসিডেন্ট আলেন্দের পত্নী মিসেস আলেন্দ এর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ‘ইতিহাসের রক্তপলাশ’ বইটিতেও ভারতে নেয়া এই সাক্ষাৎকারের উল্লেখ আছে।

মিসেস আলেন্দ বলছিলেন, এসব সি.আই.এ (যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা) এর সেট প্যাটার্ন। কোন পপুলার সরকারকে ওরা ধ্বংস করার জন্য প্রথমে ওই দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে দেয়। নানা গোলমাল শুরু করে। শ্রমিক ধর্মঘট উস্কে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। জনমতকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের দিকে নেয়। প্রথমে ভাব দেখায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এসব। তারপর ধীরে ধীরে মিলিটারিদের ভেতর থেকে কাউকে বসিয়ে ফ্যাসিষ্ট সরকার গঠন করা হয়। যেমনটা কঙ্গোতে লুমুম্বাকে সরিয়ে মবুতুকে, ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে সরিয়ে সুথর্তোকে তেমনি চিলিতে আলেন্দেকে সরিয়ে পিনোচেকে বসানো হয়েছে। এরপর মিসেস আলেন্দ শেখ সাহেবের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন।

এতে করেই বোঝা যায় সেই সময়ে গণতান্ত্রিক কোন সরকারকে দেশের উন্নয়নে বাধা দেয়াই ছিল আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি।

এর পর আমেরিকা এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে সহায়তার আশ্বাস দিল, ত্রাণ ভর্তি জাহাজ বাংলার মাটির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। শেখ সাহেব কিছুটা স্বস্তি পেলেন, ভাবলেন তার বাঙালিদের অনাহার ঘুচাতে পারবেন।কিন্তু জাহাজগুলো আকস্মিক ভাবে উলটোপথে যাত্রা করল আর মুজিবকে জানানো হল তিনি সমাজতান্ত্রিক কিউবার কাছে কিছু পাট বিক্রি করেছিলেন। তাই আমেরিকা কোন সাহায্য পাঠাবে না। চমকে উঠলেন তিনি, তিনি বুঝলেন তার সাথে এটা ষড়যন্ত্র হল। আর এর মাঝে জাসদ আর ন্যাপ অপপ্রচার চালাচ্ছেই। ১৯৪৭ এ তাদের অগ্রজরা স্লোগান দিত ,
” লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়, ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় “।

এবার এই স্লোগানে কথা গুলোই বিভিন্ন ভাবে অসহায় বাঙালিদের বোঝাতে লাগল। পাকিস্তান ও ভুট্টো লেলিনবাদীদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। কমিউনিষ্ট পার্টির একাংশের নেতা আব্দুল হক ’৭১ এর পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেন।

১৯৭৪ এর ১৬ ডিসেম্বর তিনি ভুট্টোকে ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করে চিঠি লিখেন। তিনি আরো লিখেন, ‘পুতুল মুজিবচক্র এখন জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তার অস্ত্র, ওয়ারলেস এবং অর্থ চাই।’

ভুট্টো তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেন। ভুট্টোর আরেক এজেন্ট আবদুল মালেক, তিনি ভুট্টোকে লিখেন ‘বাংলার ৬৫ মিলিয়ন মুসলমান তাদের মুক্তির জন্য, আপনার দিকনির্দেশনা লাভের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।’

দেশে-বিদেশে যখন অপশক্তিরা ভর করছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপর, খুবলে খেতে চাইছে সার্বভৌমত্ব, খামচে ধরতে চাইছে বাংলার লাল সবুজের পতাকা তখনও শেখ সাহেব সাহস হারান নি।

সাংবাদিক স্বাধীনতার বিপরীতে টাকাকেই বড় করে দেখেছিলেন। এমন টালমাটাল অস্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে আর কালক্ষেপণ করেননি। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন তার সরকারকে হটিয়ে আবার প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শকুনেরা ক্ষমতায় বসতে চায়। সারাজীবন তিনি যে সাম্প্রদায়িকতা আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আবার বাংলার মানুষকে কুক্ষিগত করে রাখা হবে। তিনি এই ৪ বছর দেখলেন তথাকথিত গণতন্ত্রের ফ্রিস্টাইল। এ দিয়ে বাংলার মানুষের কোন উন্নতি বা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। তাই তিনি ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি সাময়িকভাবে বাকশাল কায়েম করেন।

তিনি সংসদে বাকশালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাষণও দিয়েছিলেন। এর কিছু অংশ আপনাদের জানতেই হবে। তিনি বলেন,

“একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বাধীনতা পেলাম…….. সম্পদ বলতে কোন পদার্থ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান, দুঃখের বিষয়, একটা পয়সা পর্যন্ত দিল না। ফরেন এক্সচেঞ্জ আমাদের ছিল না। গোল্ড রিজার্ভ আমাদের ছিল না।…….. জিনিসের দাম বেড়ে গেল। ড্রাউট হল, সাউথ এশিয়ায় বন্যা হল। সাড়ে সাতকোটি লোক। দুশো বছরের গোলামী।……….. এই সুযোগে, যারা আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী ছিল, নিজেদের একটা কেস করা যায় কিনা ফিকির খুজতে লাগল। কাজ করবো না, ফাকি দেব। অফিসে যাব না, ফাকি দেব। ফ্রিস্টাইল। দেশের শত্রুরা এঞ্জয়িং ফুল লিবার্টি। বিদেশীরা আসেন এখানে, তাদের গোপনে দু-বোতল মদ খাইয়ে দেশের বিরুদ্ধে ব্রিফ করে দেওয়া হয়। আমরা কিন্তু চেষ্টা করলাম। ঠিক আছে, আচ্ছা করো, আচ্ছা বলো। আচ্ছা দল গড়ো, আচ্ছা লেখো, আচ্ছা বক্তৃতা করো বাধা নেই। ফ্রিহ্যান্ড। কিন্তু দেখতে পেলাম কি?…………………….. যখন প্রচলিত গণতান্ত্রিক পন্থায় এগুতে শুরু করলাম, বিদেশী চক্র এদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।তারা এদেশের স্বাধীনতা বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করল, ফ্রিস্টাইল শুরু হয়ে গেল…………….. যারা নিঃস্বার্থ ভাবে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিবাহিনীর ছেলে তাদের হত্যা করা হল। এত অস্ত্র উদ্ধার করি, তবু অস্ত্র শেষ হয় না। গণতন্ত্রের সুযোগে রাজনীতির নামে হাইজ্যাক, রাজনীতির নামে ডাকাতি শুরু হল। রাজনীতির নামে ফ্রি স্টাইল শুরু হল। তাই এ রাজনীতি চাই না, এ গণতন্ত্র আমার মানুষ চায় না।

আমি চাই শোষিতের গণতন্ত্র, শোষকের নয়।……………”
এটা গেল বাকশাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা ।

এখন যারা বাকশালকে ফ্যাসিষ্ট বলেন তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন শেখ সাহেব কি অবৈধ্যভাবে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন? তিনি ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন, এবং বাকশাল গঠনের অধ্যাদেশ সংসদে পাশ হয়েছিল। সুতরাং এটি ছিল পুরোপুরি বৈধ। বাকশাল কখনোই জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় নি। বাকশালে যোগদান বাধ্যতামূলক করাও হয়নি। প্রশাসনিক সার্ভিসের অন্যতম প্রবীণ সদস্য কফিলউদ্দিন মাহমুদ প্রকাশ্যে বাকশালে যোগদিতে অস্বীকৃতি জানালেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অপরদিকে জিয়া স্বেচ্ছায় এসেছিলেন বাকশালে যোগ দিতে।

যাই হোক এবার মূল উদ্দেশ্যগুলো দেখা যাক :

(১) সরকার পরিচালনায় আওয়ামী লীগের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ করানোর মধ্যে দিয়ে জাতীয় একতা সৃষ্টি।

(২) সেসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীনের অভূতপূর্ব ও দ্রুত আর্থসামাজিক উন্নয়ন দেখে সে পদ্ধতি অবলম্বন করা।

(৩) দ্রুত আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায় পার হওয়ার পর স্বল্পকালীন কার্যক্রম হিসেবে একক দল থেকে বহুদলে বিভক্তি হবার পরীধি রেখে সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় বিধান রাখা হয়। এক কথায় একক রাজনৈতিক দল গঠন ও পরিচালনা চিরায়ত নয়, ক্রান্তিকালীন রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে শুরুতেই স্বীকৃত।

(৪) অন্তর্বর্তীকালীন সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উৎপাদন বৃত্তে বিভাজিত গ্রামাঞ্চলকে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ধারক ও বাহক হিসেবে প্রযুক্তকরন। স্বাধীনতার সুফলকে ঘরে ঘরে পৌছে দেয়া। দেশের উন্নয়নে অধিকতর সঞ্চয় আহরণ ও তার লাভজনক বিনিয়োগে রুপান্তর। উৎসরিত লাভ ও সুফল মোটাদাগে কৃষক,শ্রমিক, পেশাজীবি ও সেবা শ্রমিকের কাছে পৌছানো।

(৫) পাকিস্তান প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী সদ্য গঠিত সামরিক বাহিনী ওই সমর সব পর্যায়ে শৃঙখলাবদ্ধ ছিল বলা চলে না। সেই প্রেক্ষিতে তাদেরকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পাঠাতনে স্থান দেয়ার উদ্দেশ্যে বাকশালে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেন।

স্বৈরতান্ত্রিকতাকে পরিহার করে সকলে মিলে দেশ গঠনে সামরিক বাহিনী জনযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জনগনের সাথে দেশ গড়ায় অংশগ্রহণ করা সুযোগ প্রদান।

বঙ্গবন্ধু মূলত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে সামনে রেখে বাকশাল বা দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী দিয়েছিলেন। সর্বদলীয়, সর্বশ্রেণি ও সর্বস্তরের তথা বিভিন্ন পেশাভিত্তিক জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও একক রাজনৈতিক মঞ্চের নামই বাকশাল। চিরলাঞ্ছিত, চিরবঞ্চিত, চির ভাগ্যাহত, চির দুঃখী, চির দরিদ্র, চির শোষিত, অধিকারহারা মেহনতি মানুষের মুক্তির আরেক নাম বাকশাল। এতে রয়েছে একটি বৈপ্লবিক, আর্থসামাজিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও দিকদর্শন।

অপরদিকে, ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বর্তমান প্রচলিত বহুদলীয় গণতন্ত্রে কেবলমাত্র ধনী শ্রেণিরাই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছে। যিনি পার্টিকে যতো বেশি ডোনেট করতে পারেন এবং নির্বাচনী ব্যয় বহন করার সামর্থ্য যার যতো বেশি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন যাওয়াও তার জন্য তত নিশ্চিত।

ফলে গুলশান, বনানী, বারিধারা প্রভৃতি অভিজাত এলাকায় বসবাসরত ধনী ব্যক্তিরাই সাধারণত মনোনয়নপত্র পেয়ে থাকেন। যারা সুখে দুঃখে সার্বক্ষণিকভাবে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত এবং গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন কেবলমাত্র অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণেই তারা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন । ফলে পার্লামেন্ট হয় মূলত ধনী শ্রেণির প্রতিনিধিদের প্রতিষ্ঠান। এর ফল হিসেবে শহরে বসবাসরত ঐ সব ধনীরা গ্রামে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হলেও সহজাত কারণে তারা তাদের নিজেদের শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। এজন্যই দেখা যায় কৃষকের ব্যবহার্য কৃষি পণ্যে আমদানীর উপর শুল্ক-ভ্যাট বেশী থাকলেও ফ্রিজ, টেলিভিশন, প্রাইভেট কারের উপর কর ধার্য হয় কম । সংসদে যখন তারা রাস্তাঘাটের সমস্যা বলেন তখন তারা নিজ নির্বাচনী এলাকা গ্রামাঞ্চলের কথা ভুলে গিয়ে গুলশান বনানীর কথাই তুলে ধরেন। ফলে অনুন্নত ও অনগ্রসর থেকে যায় পল্লী। অবহেলিত থাকে কৃষক শ্রমিক- এ দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ।

শতশত বছরের ঘুনে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন থেকে গণপ্রতিনিধিত্বশীল প্রশাসনে উত্তোরণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। বিচার ব্যবস্থায়ও চেয়েছিলেন দ্রুত ও গণমূখী।

প্রথমে আমি প্রশাসনিক বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো । আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেখা যায় প্রধান সমস্যা দীর্ঘসূত্রতা। লাল ফিতার ফাইলে নোটগুলো এমনভাবে আবদ্ধ থাকে যার ফলে আলোর মুখ সহজে দেখতে পারে না । বুলেট মেরেও এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে সরানো যায় না। এমন একটি গতানুগতিক, জগাখিঁচুড়ী, নড়বড়ে, অথর্ব ও গণবিরোধী প্রশাসন দিয়ে জনগণের সার্বিক কল্যাণ সম্ভব নয়।

বঙ্গবন্ধু তাই প্রশাসনিক কাঠামো বিন্যাস প্রসঙ্গে বললেন, ………. “সেকশন অফিসার, ডিপুটি সেক্রেটারি, এডিশনাল সেক্রেটারি, মন্ত্রী হয়ে তারপর আসে আমার কাছে। এসবের কোন প্রয়োজন নেই। সোজাসুজি কাম চালান।” নতুন প্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ইডেন বিল্ডিং (সেক্রেটারীয়েট) বা গণভবনের মধ্যে আমি শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা আটকে রাখতে চাই না। আমি আস্তে আস্তে জেলা, থানা ও গ্রাম পর্যায়ে এটা পৌছে দিতে চাই যাতে জনগণ সরাসরি তাদের সুযোগ সুবিধা পায়। …………. সোজাসুজি কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে জেলায় আমরা কানেকশন রাখতে চাই। তেমনি সরাসরি জেলার সাথে থানার, থানার সাথে গ্রামের কানেকশন রাখতে হবে। …….. ষাটটি সাবডিভিশন হবে ষাটটি জেলা। প্রত্যেক জেলার জন্য একজন গভর্নর থাকবেন। সেখানে ডিষ্ট্রিক ম্যাজিষ্ট্রেট থাকবেন, দলের প্রতিনিধিগণ থাকবেন, সংসদ সদস্যরা থাকবেন, সরকারি কর্মচারী থাকবেন। এদের নিয়ে একটি করে অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ কাউন্সিল থাকবে এবং গভর্নর স্থানীয়ভাবে শাসন ব্যবস্থা চালাবেন। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ডাইরেক্ট কন্ট্রোল এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ কাউন্সিল থাকবে যারা ডিষ্ট্রিক্ট এ্যাডমিনিষ্ট্রেশন পরিচালনা করবে। এভাবে শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীয়করণ করা হবে।”
শাসন ব্যবস্থার এই ব্যাপক গণতন্ত্রায়নের অর্থ হলো জনগণ নিজেই নিজেকে শাসন করবে। নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করবে। তারাই তাদের শাসক ও ভাগ্য নিয়ন্তা- আমলারা নয়।

প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় কবি যেমন খোদোক্তি করে বলেছেন, “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে” বঙ্গবন্ধুও এর স্বরূপ আরো বিশ্লেশণ করতে গিয়ে বললেন, “বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লাহর মর্জি যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে সেই মামলা লাগে বিশ বছর। আমি যদি উকিল হই আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে সেই কেস দিয়ে যাই। ঐ মামলা ফয়সালা হয় না। আর যদি ক্রিমিন্যাল কেস হয় তিন বছরের আগে শেষ হয় না। এই বিচার ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়তে হবে। থানায় ট্রাইব্যুনাল করার চেষ্টা করছি। সেখানে মানুষ যাতে দ্রুততম বিচার পায় সে ব্যবস্থা করছি।”

বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থায় বিচারকদের বিব্রত ও চাকরি হারাবার ভয় থাকে। এর কারণ এই যে, বর্তমান বিচার ব্যবস্থা প্রশাসনের দখলে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রশাসন মূলত
ক্ষমতাসীন পার্টির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আর নির্বাহী প্রশাসনের অধীনে যদি বিচার বিভাগ থাকে তাহলে বিচার কখনও নিরপেক্ষ হতে পারে না। বিচারক সবসময় নির্বাহী প্রশাসনের নির্দেশ পালনে ত্রস্ত থাকেন। এতে বিচার হয় একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। এ জাতীয় বিচার প্রহসনমূলক বৈ কিছুই নয়, যা প্রকৃতপক্ষে অবিচারেরই নামান্তর।

সেজন্য বঙ্গবন্ধু বললেন, “বিচার ব্যবস্থা হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন।” বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং প্রশাসন ও রাজনীতিমুক্ত রাখার জন্য তিনি আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মুলনীতি ২২নং ধারায় বলে দিলেন, “ রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবে।” এ প্রসঙ্গে বাকশাল গঠনতন্ত্রের ১০ উপধারায় বলা হয়েছে, “ আদালতে বিচারকার্যে নিযুক্ত কোন কর্মচারী বা বিচারক আদৌ জাতীয় দলের সদস্য পদপ্রার্থী হইতে পারিবেন না।”

এইভাবে সুষ্ঠু, গতিশীল, নিরপেক্ষ, দ্রুত গতিসম্পন্ন ও বিকেন্দ্রীক বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচারকে নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যেই প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে সংস্কার করার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। “দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন” এই নীতির ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু প্রচলিত বিচার বিভাগকে পুনর্গঠিত করে স্বাধীন সার্বভৌম ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার যাবতীয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন।

বাকশালের ফলে জাতীয় প্রয়োজনে জনগণের ভেতর একতা,ভাতৃত্ব,সহমর্মিতা, পারষ্পরিক সম্প্রীতি; সহনশীলতা, সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সূদৃঢ় হতো ফলে সাম্রাজ্যবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিবিপ্লবীচক্র ও শোষকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র কার্যকর হতে পারত না।

১৯৭৫ এর পটপরিবর্তনের ফলে ৫ ডজন রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয়েছে। ২ জন কোটিপতির জায়গায় হাজার কোটিপতি পরিবারের আবির্ভাব হয়েছে।

অপরদিকে মেহনতি শ্রমজীবী কৃষক শ্রমিক সাধারণ জনগণ ৯৫ ভাগ মানুষ এই রাজনৈতিক আর্থসামাজিক ব্যাবস্থার দাবা খেলায় অনৈক্য ও বিশৃংখলার আবরতে হাবুডুবু খাচ্ছে।

শোষনভিত্তিক ভূমিব্যাবস্থাপনার ফলে বাংলায় জোতদার ও ভুস্বামী পরিবারের জন্ম। এদের কাছে ছোট ছোট কৃষক জিম্মি থেকেছে চিরকাল। একসময় তারাও ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হচ্ছে। বাকশালের গ্রাম সমবায় প্রকল্প চালু হলে সমবায় এলাকার সকল জমি সমবায়ের ওপর ন্যাস্ত থাকত। এ পদ্ধতিতে বর্গাচাষ প্রথা উঠে যেত। সকল সাবালক কৃষক_কৃষাণী সমবায়ের সদস্য হতে পারতেন। কৃষির মতো করে শিল্পোউৎপাদন, বাণিজ্যিক উৎপাদন সহ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যাবস্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে শ্রমিক-মালিকদের অংশগ্রহণ ও তাদের ন্যায় সংগত পারিশ্রমিক ও লভ্যাংশ প্রদানের নিশ্চয়তা বিধানের ব্যবস্থা থাকত।

এভাবেই বাংলাদেশ একটি শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ে উঠত। সে বাংলায় লাভবান হত সাধারণ মানুষ, আর ক্ষতিগ্রস্থ হত লোভী, অমানুষ, রক্তচোষা জোকের মানসিকতার এলিট ক্লাস, আর ক্ষতিগ্রস্থ হত আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ।

তাই ১৫ আগষ্ট এর কাক ডাকা ভোরে মসজিদে মুয়াজ্জিন যখন বলছেন “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” ঠিক তখন কিছু নির্বোধ কাপুরুষ পাগল বিদ্রোহী সেনা যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, পাকিস্তানের ইচ্ছা পূরণ আর জয় বাংলাকে ধূলিস্যাৎ করতে এগিয়ে গেল। তবে, এটি দেরিতে হলেও প্রমাণিত যে জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিবের শক্তি অনেক অনেক গুণ বেশি।

তাইতো,
জয় বাংলার সাথে জয় বঙ্গবন্ধু একসূত্রে গাথা।
বাংলাদেশ মানে মুজিব, মুজিব মানেই বাংলাদেশ।

 

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঢাকা, ১৪ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর