[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার প্রাপ্তরা কি মেধাবী?


প্রকাশিত: August 22, 2016 , 11:19 pm | বিভাগ: গেস্ট কলাম


study
ইসমত পারভীন রুনু: তরুণ প্রজন্মের জীবন, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আজ যেন বিসিএস পরীক্ষার আবর্তেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জীবনের এই রূঢ় বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের ক্রমশ অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোকে উপভোগ করতেও পারছেন না, কারণ বছর বছর ধরে এ পরীক্ষার জন্যই সময় বরাদ্দ রাখছেন তারা। বিসিএসকে ঘিরেই যেন তাদের ধ্যান-জ্ঞান সবকিছু।

 

বর্তমান সময়ে মেধাবী বলতে আমরা বুঝি, যে শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন, সেই সাথে কর্মক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডার হয়ে চাকরি জীবন শুরু করেছেন। কিছু ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা যায় মাঝে মাঝে। শুধুমাত্র বিসিএস ক্যাডার হলেও তিনি মেধাবীর সংজ্ঞায় পড়বেন। অনার্স বা মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জনে ৪ এর স্কেলে ২.৫ কিংবা ৩ এর কম হলেও ক্ষতি নেই। বিসিএস ক্যাডার হয়ে তিনিতো তাঁর মেধার প্রমাণ দিয়েছেন।

 

একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কেউ ক্যাডার, কেউবা নন-ক্যাডার (১ম শ্রেণি), আবার কেউবা নন-ক্যাডার (২য় শ্রেণি)। কারো ভাগ্যে আবার কিছুই নেই। এ কেমন বৈষম্য? আমি এ বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ নই। একজন অভিভাবক হিসেবে কেবলমাত্র আমার অনুভূতি প্রকাশ করছি। যদিও বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সুপারিশ ক্যাডার বা নন-ক্যাডার (১ম শ্রেণি) পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ ছিল। বিসিএস পরীক্ষায় মোট পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থীর পরিসংখ্যান নাইবা উল্লেখ করলাম। যোগ্যতা অনুযায়ী সব পেশাই সম্মানের। যদিও ছেলেমেয়েরা বিসিএস এর প্রতি অতিমাত্রায় দুর্বল।

 

নির্ধারিত কোটা পদ্ধতির অনুসরণ করতে গিয়ে আমাদের সন্তানদের লালিত স্বপ্ন সফলতার মুখ দেখতে পায় না। এক্ষেত্রে নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিজে, তাদের বাবা-মা, আপনজনেরাই শুধু সে পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছেন। এ মুহূর্তে সন্তানদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অভিভাবক হিসেবে আমরা অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছি। নন-ক্যাডারপ্রাপ্ত আমাদের সন্তানেরা যে কোন পেশাতেই ভাল করবে সে বিশ্বাস আমাদের আছে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাদের বাসনা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। লক্ষ্য একটাই তাদের, বিসিএস ক্যাডার হতেই হবে, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার যোগ্যতাও তাদের রয়েছে। সমস্যাটা এখানেই।

 

বিসিএস পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থীকে ১৩০০ বা ১৫০০ নম্বরের (প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক মিলিয়ে) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। বিসিএস-এর সাতকাহন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক বিস্তারিত লিখেছেন কয়েকদিন আগে। চাকরির পরীক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস বর্জনের পাশাপাশি নিজ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এতে করে শিক্ষা-গবেষণা সর্বোপরি উচ্চ শিক্ষার মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে দারুণভাবে। যা কারুরই কাম্য নয়।

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী কয়েকদিন আগে এক ‘সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর’ অনুষ্ঠানে হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “দেশের লাইব্রেরিগুলোতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে বিসিএস-এর প্রস্তুতি ও ক্লাসের পড়ার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়”। বিষয়টা অবশ্যই দুঃখজনক। সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে কত দূরে চলে যাচ্ছে আমাদের সন্তানেরা! আর প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সমস্যাতো রয়েছেই। এত কোটার ভিড়ে নাহয় আরও কোটা যুক্ত হোক। এক সন্তান কোটা, সরকারি কর্মকর্তার পোষ্য কোটা। সেই সাথে নন-ক্যাডার প্রাপ্তদের চাকরির নিশ্চয়তা (অবশ্যই ১ম শ্রেণি)।

 

সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলিও আজ শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন প্রভাব বিস্তার করে না। জিপিএ-৫ অর্জনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে কিছুটা হলেও নম্বরের সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু সে সুবিধা চাকরির ক্ষেত্রে নয় কেন? নিজেদের সার্বিক প্রস্তুতি, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ, ভালো রেজাল্ট- এসবের ভিত্তিতে ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়। তাদের এ চাওয়া অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

 

দেশের উন্নয়নে সকল সেক্টরেই মেধাবীদের প্রয়োজন। পেশার প্রতি শ্রদ্ধা, সততা, একনিষ্ঠতা, অধ্যাবসায় থাকলে যে কোন পেশাতেই ভাল করার সুযোগ আছে। অনেক মেধাবীরা ইতঃপূর্বে প্রশাসন ও শিক্ষা ক্যাডার ছেড়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছেন। এ ভাবনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

 

৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন-ক্যাডারপ্রাপ্তরা বন্ধুদের জন্য মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ১ বছর ধরে আন্দোলন ও মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি করে প্রমাণ করেছেন নন-ক্যাডারপ্রাপ্তরাও মেধাবী। সমর্থ্য হয়েছেন পিএসসির সুপারিশ অর্জন করতে। যদিও বন্ধুদের চাকরির নিশ্চয়তা পেলেও কেউ কেউ নিজেরাই বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের এ সহমর্মিতাকে আমরা সম্মান জানাই। ৩৪তম বিসিএস উত্তীর্ণ নন-ক্যাডারপ্রাপ্তদের আন্দোলনে অভিভাবক হিসেবে আমাদেরও সমর্থন ছিল। আপনাদের এ মহানুভবতায় আমরা গর্বিত। সেজন্য অভিভাবকদের পক্ষ থেকে জানাই অভিনন্দনসহ কৃতজ্ঞতা। নন-ক্যাডারপ্রাপ্ত বন্ধুদের চেষ্টা ও আন্দোলনের ফসল হিসেবে কিছু মেধাবী ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হল। তবে সবার কর্মসংস্থান হলে আরও বেশি আনন্দিত হতাম। মেধাবীদের কর্মসংস্থানের জন্য রাষ্ট্রের তথা পিএসসির উদ্যোগকেও আমরা স্বাগত জানাই। আশা করছি একইভাবে ৩৫তম বিসিএস-এ নন-ক্যাডারপ্রাপ্তদের সকলেই ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে চাকরি পাবেন। আন্দোলনকারী নন-ক্যাডারপ্রাপ্তদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-

”পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলই দাও
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”

 

অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতা, বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানোর মাঝে যে আনন্দ, তা অনেক সময় মেধাকেও হার মানায়। আমাদের নতুন প্রজন্ম মেধায়, বিদ্যা-বুদ্ধিতে, চিন্তা-চেতনায়, আদর্শে, শিষ্ঠাচার-শৃংখলায় প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, অভিভাবক হিসেবে এতটুকুই আমাদের চাওয়া। প্রকৃত মেধাকে কাজে লাগাতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমানভাবে ভূমিকা রাখতে হবে।

 

লেখিকাঃ সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সিলেট।

 

ঢাকা, ২২ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম