[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



স্কুলছাত্রী চুমকি হত্যাকান্ডের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা


প্রকাশিত: August 28, 2016 , 9:19 pm | বিভাগ: ক্যাম্পাস,রংপুরের ক্যাম্পাস,স্কুল


rangpur-photo

 

চঞ্চল মাহমুদ: শিশুছাত্রী চুমকি ধর্ষন ও হত্যাকান্ড নিয়ে এসব কি হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর শিশু চুমকি ধর্ষন ও হত্যাকান্ড আপোষ করতে পরিবারের ওপর প্রভাবশালীদের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। নিরাপত্বাহীনতায় ভুগছে তার পুরো পরিবার। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। মামলার এজহারভুক্ত আসামী কাজের মেয়ে ধলি মাইকেও গ্রেফতার আগ্রহ দেখাচ্ছে না পুলিশ। রংপুরের পীরগঞ্জে রামনাথপুরের চুমকির পরিবার এখন হুমকির মুখে।

চুমকির পিতা শাহজাহান আলী জানান, এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর একমাস পার হলেও এজহারভূক্ত আসামী কাজের মেয়ে ধলি মাইকে এখনও গ্রেফতার করে নি পুলিশ। উল্টো সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে এসেছে ৭ লাখ টাকা নেও, দুই বিঘা জমি নেও। নিয়ে মামলা তুলে নেও। যা হবার তা হয়ে গেছে। ছেলেটার জীবন নস্ট করে কি লাভ।
তিনি জানান, শুধু তাই নয় আইয়ুব আলী, হাসান মাস্টারসহ অনেকেই বলে বেড়াচ্ছে, আমি নাকি টাকা ও জমি নিয়ে আপোষ করেছি। রিয়াদের জ্যাঠা বাদশা মিয়া প্রকাশ্যে সবার কাছে বলে বেড়াচ্ছেন, এই কয়দিনেই ২০ লাখ খরচ হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি রিয়াদকে আমরা বাড়ি আনবো। তার পর তোদের দেখে নিবো। অন্য মেয়েদের সামলে রাখিস।
নিজের বুকের ধন হারানো এই পিতা বলেন, মেয়েটিকে ধর্ষন করেছে করুক। তার পরও যদি মেয়েটাকে মেরে না ফেলতো। বাঁচিয়ে রাখতো। তাও তো মেয়েটাকে দেখতে পেতাম। ওরা মেয়েটিকে বাঁিচয়ে রাখলো না। ছোট একটি বাজার করা ব্যাগের মধ্যে আমার মেয়েকে হাড়গোগ ভেঙ্গে পুতে রাখলো।
আর আমাকেই ওরা এখন আপোষ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। না করলে ভালো হবে না বলে হুমকি দিচ্ছে। অন্য বাচ্চাদেরও একই পরিনতি হবে বলে বেড়াচ্ছে। আমার জীবন থাকতে আমি আপোষ করবো না। আমাকে যা করে করুক। আমি চাই, ধর্ষক ও হত্যাকারী রিয়াদ ও ধলির ফাসি। এর বাইরে আমি কোন বিচার মানবো না।

চোখের সামনে নাড়িছেড়া ধন শিশু তানজিলার ইয়াসমিন চুমকির ধর্ষন রক্তপাত এবং ব্যাগবন্দি করে লাশ দেখেছেন মা সুফিয়া বেগম । সেই দৃশ্য প্রতি মুহূর্তেই চোখে ভাসে তার। ডুকরে ডুকরে কেঁদে কেঁদে এই জনম দুখিনী মা জানালেন, হত্যা করার পর ওরা আমার মেয়েকে হাড়গোড়ভেঙ্গে একটা বাজার করা ব্যাগের মধ্যে ঢুকালো।

একটু মায়াও হলো না ওদের। মেরে ফেলার পর লাশটা অন্তত ভালো রাখতে পারতো। তাও রাখলো না। এখন ওরাই উল্টা আমাদের চাপ দিচ্ছে আপোষ করার জন্য। আমি নিজ চোখে দেখতে চাই রিয়াদ ও তার সহযোগিদের ফাঁসি।

চুমকির জ্যাঠা সাজা মিয়া জানান, কাজের মেয়ে ধলি আর রোকসানা ওদের হেফাজতেই আছে। রিয়াদের পরিবারই ওদের লুকিয়ে রেখেছে। গ্রামবাসি রিয়াদের ফাঁসির দাবিতে পীরগঞ্জে মানববন্ধন এবং বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার করেছে। এতে নাকি রিয়াদের পরিবারের সম্মান গেছে। তারা নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। বিষয়টি আমরা ওসিকে জানিয়েছি। কিন্তু তিনি কোন আমলে নিচ্ছেন না। ধলি মাইকে গ্রেফতারে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ওরা আওয়ামীলীগ করে। আওয়ামীলীগের পাওয়ার দেখায়। আমরাও তো আওয়ামীলীগ করি। আজীবন আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছি। আওয়ামীলীগের ক্ষমতা দিয়ে কি সব থেকে পার পাওয়া যায়।

চুমকির চাচা মিজানুর রহমান জানান, আমার ভাতিজিকে যেভাবে ধর্ষন ও হত্যা করা হয়েছে, সেটা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকাররাও সেভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় নি। এখন ওরা আওয়ামীলীগের পাওয়ার দেখিয়ে বলে বেড়াচ্ছে রিয়াদকে নেশাখোর দেখাবে। পাগল দেখাবে। রিয়াদ পাগলও নয় , নেশাখোরও নয়। ওই বদমাইশ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, আমরাও আওয়ামীলীগ করি। দলের পাওয়ার দেখিয়ে যেন কোন ভাবেই ধর্ষক রিয়াদ পার না পায়। ধর্ষক রিয়াদের যেন ফাঁসি হয়।

এদিকে এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন এলাকার মানুষ। বিশেষ করে নারীরা। সহপাঠিরা। দুরামিঠিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেনীর ছাত্র রুমি খাতুন জানালেন, এই ধর্ষক রিয়াদ যদি পার পেয়ে যায়। তাহলে আমরা স্কুলে যেতে পারবো না। রাস্তাঘাটে আমাদের মেয়েদের তুলে ধর্ষন করে হত্যা করা হবে। মেয়ে হওয়াটাই কি আমাদের অপরাধ। রুমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এঘটনার উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।

চুমকির বড় বোন রাজিয়া সুলতানা শম্পা পড়ে পীরগঞ্জ কমিছমন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে। আতংকিত উদ্বিগ্ন এই কিশোরী জানান, আমি এখন স্কুলে যেতে ভয় পাই। কোন আওয়াজ হলেই দাড়িয়ে যাই। রিয়াদ আমার ছোট্র শিশু বোনের সাথে যা করলো তা কখনই মেনে নেয়া যায় না। এখন রিয়াদের লোকজন আমার মা বাবা ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে টাকা দিয়ে জমির লোভ দেখিয়ে আপোষ করার কথা বলছে। আমার বাবা মা কি ছোট বোনের ইজ্জত ও লাশের ওপর আপোষ করবে। রাজিয়ার দাবি যারা আপোষ করার কথা বলে বেড়াচ্ছে, ক্ষমতা দেখাচ্ছে তাদেরওকে আইনের আওতায় আনা হোক।

পাশের বাড়ির রিনা খাতুন জানান, আমরা চাই রিয়াদের ফাঁসি। যদি রিয়াদের ফাঁসি দেয়া না হয়, তবে সে বের হয়ে এসে এলাকার ছোটবড় সকল মেয়েকে ধর্ষন করবে। তার অত্যাচারে কোন মেয়ে ঘর থেকে বের হতে পারবে না।

এ ব্যপারে পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল করিম জানান, রিয়াদ ১৬৪ ধারায় ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়ে চুমকিকে ধর্ষন এবং হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমুলিক জবানবন্দি দিয়ে সব কিছু পরিস্কার করে দিয়েছে। সে এখন কারাগারে আটক আছে। অপর এজহারভুক্ত অভিযুক্ত আসামী কাজের মেয়ে ধলি মাইকে আমরা খুঁজছি। মেয়েটি মোবাইল ব্যবহারও করে না।
অভিযান অব্যাহত আছে। আপোষ করার ব্যাপারে টাকা ও জমি দিয়ে লোভ দেখানো এবং রিয়াদকে নেশাখোর দেখানোর প্রচেষ্টার ব্যপারে ওসি জানান, এ ধরনের কোন অভিযোগ আমি বাদির কাছ থেকে পাই নি। বাদির সাথে আমি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছি। তিনি কখনও কোন চাপের কথা আমাকে বলেন নি। যদি এ ধরনের কেউ চাপ প্রয়োগ করে তাহলে বাদি তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।

মামলার বাদি চুমকির পিতা শাহজাহান আলী জানান, আমি তিনদিন ওসিকে কারা কারা আমার ওপর টাকা ও জমি নিয়ে আপোষ করার কথা বলছে। হুমকি ধামকি দিচ্ছে আপোষ করার জন্য। সেটা নামসহ জানিয়েছি। কিন্তু ওসি এ ব্যপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেন নি। আমাকেও কিছু বলেন নি।

অন্যদিকে আপোষ মিমাংসার প্রস্তাবদানকারী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী জানান, আদালতে রিয়াদ স্বাীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। আমি আপোষ মিমাংসার কোন প্রস্তাব আমি দেই নি। আমিও চাই লম্পট ধর্ষক রিয়াদের ফাঁসি। এ ঘটনা মিমাংসা করা যাবে না।

মিঠাপুকুর ৫ নং ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান জানান, এই ঘটনাটি নিয় যারা আপোষ মিমাংসা প্রস্তাব দিচ্ছে সেটাও যেমন ঠিকন নয়, আবার যদি কেউ আপোষ করে সেটাও ঠিক নয়। যারা এটা করবে উভয়েরই ফাঁসি হওয়া উচিৎ।
মিঠিপুর ইউনিয়নের নয়া মারারগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বড় দরগা সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসা ভাইস পৃন্সিপ্যাল লুৎফর রহমান জানান, নৃশংস এই ঘটনাটি যেন প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্ছিত না হয়, সে জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

রংপুর পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ জানান, এই ধর্ষন ও হত্যাকান্ড নৃশংস। নির্মম। এটি একমাত্র আদালতই বিচার করবে। এখানে কোনভাবেই চাপ প্রয়োগ করে আপোষ মিমাংসার বিষয় নয়। মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই কাজের মেয়ে ধলি মাইকে গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দিয়েছি আইওকে। এরা ছাড়াও যারা জড়িত, তদন্তে আসলে তাদেরকেও চার্জশিটে অন্তর্ভূক্ত করা হবে।

প্রসঙ্গত: গেলো ১৪ জুন বাড়িতে পানি খাওয়ার জন্য গেলে চুমকিকে নিজ ঘরে নিয়ে মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করে রিয়াদ(১৮)। এসময় রিয়াদের বাবা আব্দুল মমিন ও মা রিনা বেগম বাড়িতে ছিলেন না। এতে প্রচুর রক্তপাত হলে এক পর্যায়ে জেঠাতো বোন (সোলায়মান আলীর কণ্যা) রোকসানা ও কাজের মেয়ে ধলি মাইয়ের সহায়তায় তাকে গলাটিপে হত্যা করে রিয়াদ। এরপর বাজারের ব্যাগ বন্দি করে লাশ তাতে ভরিয়ে পাচার করার চেষ্টা করে। কিন্তু তা না করতে পারায় ব্যাগভর্তি লাশ নিজ ঘরের খাটের নীচে মাটিতে পুতে রাখে রিয়াদ।
১৭ জুন জনরোষ থেকে বাঁচাতে রিয়াদকে তার জেঠা হাসান মাস্টার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুবী আলী মোটরসাইকেলে করে থানায় গিয়ে পুলিশে দিয়ে আসে। এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ এসে রিয়াদের খাটের নীচ থেকে চুমকির লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় রিয়াদ ও ধলিমাইকে অভিযুক্ত করে পীরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন চুমকির পিতা শাহজাহান আলী।

 

 

ঢাকা, ২৮ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এএম