[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ছাত্রলীগকে থামাবে কে?


প্রকাশিত: August 29, 2016 , 7:18 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


jnu-2

সোহরাব হাসান: সারা দেশে যখন জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলছে, তখন সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ অন্য রকম ‘অভিযানে’ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেই অভিযান হলো নিজেদের মধ্যে মারামারি, লাঠালাঠি। প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের ওপর হামলা। ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করা।

আমরা সবাই জানি, আগস্ট শোকের মাস। দেশের মানুষ এই মাসটিতে শোক পালন করে থাকে। অথচ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মাসটি শুরুই করেছেন খুনোখুনির ঘটনা দিয়ে। ১ আগস্ট কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সংগঠনের নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ। আহত হন অন্তত ১০ জন। কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করলেও হত্যার বিচার হবে, সেই নিশ্চয়তা নেই।

কেননা, গত সাত বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৫৬ জন নিহত হলেও বিচার হয়েছে মাত্র একটি হত্যার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে পাঁচজনের ফাঁসির আদেশ এবং আরও কয়েকজনের জেল হয়েছে। কিন্তু বাকি হত্যা মামলাগুলো রহস্যজনক কারণে মাঝপথেই থেমে গেছে। ছাত্রলীগের হামলা ও সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়েছে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ।

২৯ আগস্টের পত্রিকায় ছাত্রলীগের অন্তত তিনটি দুষ্কর্মের খবর ছাপা হয়েছে। গতকাল রোববার চট্টগ্রাম সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও মারামারির ঘটনায় চারজন আহত হন। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের আশরাফ ও মনির গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় গ্রুপ মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী বলে দাবি করছে। একই দিন ফুটবল টুর্নামেন্টের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছয়জন আহত হন।
তবে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন ঢাকায় আবাসিক হলের দাবিতে আন্দোলনরত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়ে।

bcl

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রোববার সকাল নয়টায় ছাত্র ধর্মঘটের সমর্থনে বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে মিছিলটি ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে গেলে বাধা দেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বেশ কিছুসংখ্যক নেতা-কর্মী৷ তাঁদের হামলায় আহত ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহরাব আজাদ, শিক্ষার্থী রনিয়া সুলতানা, গোলাম রাব্বী, অনিমেষ রায়, রুহল আমিনসহ ৮ থেকে ১০ জন আন্দোলনকারী। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকার সড়ক অবরোধ করলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দ্বিতীয় দফা হামলা চালান। এতে আরও ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। সোমবারও ছাত্রলীগের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার খুলনা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৫ জন। গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা দিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও টানা পাঁচ দিন অবরোধ করে রাখেন পদবঞ্চিত নেতারা। তাঁদের হামলায় শাটল ট্রেনের দুই রেলকর্মী আহত হন। নিরীহ রেলকর্মীদের ওপর কেন হামলা চালানো হলো? তাঁরা কি ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করেন?

জানা যায়, গত দেড় বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৫ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে এ বছর মারা গেছেন আটজন, গত বছর সাতজন। এ বছরের ২৭ মে বরিশালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে পলিটেকনিক ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম মারা যান। ২৯ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াসা মোড় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম নগর কমিটির উপসম্পাদক নাসিম আহমেদ সোহেল।

এর আগে ২১ মার্চ নোয়াখালী সরকারি কলেজের পুরোনো ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নোয়াখালী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ফজলুল হুদা, জেলা ছাত্রলীগের সদস্য সাইফুল ইসলাম ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ইয়াসিন মারা যান। ১৯ জানুয়ারি সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রতিপক্ষের হামলায় ছাত্রলীগের কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান মারা যান।

২০ মার্চ ছাত্রলীগের বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার মশাজান-নোয়াবাদের গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের সময় তাসপিয়া প্রমি নামের এক শিশু নিহত হয়। এসব হত্যাকাণ্ড ছাড়াও চলতি বছরে ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষের শতাধিক ঘটনা ঘটেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা যখন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতিকে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটি একটার পর একটা অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। বহুদিন ধরেই শিক্ষাঙ্গনে বিরোধী ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা নেই। ছাত্রদল ও শিবির পলাতক। বামপন্থী সংগঠনগুলোও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় ছাত্রলীগ নিজেরাই মারামারি করে। আর সেই মারামারিতে আবশ্যিকভাবে তারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। এসব অস্ত্র ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে কীভাবে এল? অস্ত্রের জোগানদাতাদের খুঁজে বের করতে না পারলে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি আসবে না। ছাত্রলীগের হাতে যে কেবল প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা-কর্মীরা হতাহত হচ্ছেন তা-ই নয়, নিরীহ সাধারণ ছাত্ররাও নিগৃহীত ও নিহত হচ্ছেন।

আমরা ভুলতে পারি না এফ রহমান হলের ছাত্র আবু বকরকে, যিনি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে মারা গেছেন। তাঁরা বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর। আমরা ভুলতে পারি না সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র হাফিজুর মোল্লাকে, যিনি শীতের রাতে ছাত্রলীগের বড় ভাইদের তালিম নিতে গিয়ে নিউমোনিয়ায় ভুগে মারা যান। তিনিও ছিলেন গরিব অটোরিকশাচালকের সন্তান। এভাবে কত আবু বকর ও হাফিজুরেরা যে সন্ত্রাসী রাজনীতির শিকার হয়েছেন, তার হিসাব নেই। এসব হত্যার বিচারও হয় না।

ছাত্রলীগের একশ্রেণির নেতা-কর্মীদের এই দৌরাত্ম্য কে থামাবে? গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালান। এক পুলিশ কর্মকর্তা সাফাই গেয়ে বললেন, তাঁদের কাছে কেউ নালিশ করেনি। যে ঘটনা পুলিশের সামনে ঘটেছে, সেই ঘটনায় নালিশ করার প্রয়োজন হবে কেন? ছাত্রলীগের এক নেতা বলেছেন, তাঁরা হল আন্দোলনের বিরোধী নন। কিন্তু যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সে জন্য বিষয়টি তদারক করছেন। এই দায়িত্ব তাঁদের কে দিয়েছে? এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধার আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতেও দ্বিধা করেননি। যে ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন, সেই ছাত্রসংগঠনের কাছে জাতি কী আশা করতে পারে?

সরকার নির্বিকার। আইনের স্বাভাবিক গতি ছাত্রলীগে এসেই থেমে যায়। আওয়ামী লীগের নেতারা মাঝেমধ্যে ধমক দিলেও ছাত্রলীগের হামবড়াভাব নেতারা মোটেই আমলে নিচ্ছেন না। তাহলে ছাত্রলীগকে থামাবে কে?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

ঢাকা, ২৯ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর