[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



যুগ জামানা ভালো নয়


প্রকাশিত: September 2, 2016 , 5:12 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট


jnu

মিঠুন মিয়া: ঈদের ছুটিতে বাড়িতে বেশ ভালো সময় কাটছে। সেদিন হঠাৎ আমার এক আত্মীয়ের বিয়ের কথা চলছিল। পাশের গ্রামের মেয়ের বাবা ছেলে পক্ষ অর্থাৎ আমাদের কাছে সমন্ধ নিয়ে এলেন।

কথা চলাকালে আমি জিজ্ঞাস করলাম মেয়ে কি করে ? বয়স কত ? মেয়ের বাবা জানালেন, মেয়ের বসয় ১৭ বছর। কলেজে পড়াশোনা করছে। এ কথা জানার সাথে সাথে আমি বললাম, এটা তো বাল্যবিয়ে হয়ে যাবে। তবে এতে তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। আমি মেয়ের বাবাকে জিজ্ঞাস করি, এতো অল্প বসয়ে মেয়ের বিয়ে দেবেন কেন? মেয়ে তো পড়াশোনা করছে। পড়াশোনা চালিয়ে যাক। পরে বিয়ে দেবেন।
মেয়ের বাবা উত্তরে জানালেন, না বাবা, যুগ জামানা ভালো নয়। তাড়াতাড়িই মেয়ের বিয়ে দিলেই বাঁচি।

সত্যিকার অর্থে আমাদের গ্রামাঞ্চলে যুগ জামানা ভালো নয়- এ দোহাই দিয়ে এখন বাল্যবিয়ে অব্যাহত আছে। মেয়ে ঘরে থাকলেই চিন্তিত থাকেন বাবা-মা। বয়স বড় কথা নয়, মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করাই যেন জরুরি। মেয়েরা যতো ভালো পড়াশোনা করুক না কেন, নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের প্রধান লক্ষ্য মেয়েকে আগে পরের ঘরে পাঠিয়ে দেয়া।

গ্রামের নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মেয়ে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়া নিশ্চিয় কোনো সহজ কাজ নয়। তারপরও গ্রামের মেয়েদের পড়াশুনা ব্যাপারে অভিভাবকরা তেমন সচেতন নয়।

আমার চোখে দেখা আমাদের আশেপাশের এলাকায় মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া ইতোমধ্যে একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে কলেজে পা রাখার আগেই অনেকে বিয়ে হয়েছে। মেয়ে বড় হলে ঘরে রাখলেও বাবা-মাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। বাড়ির পাশে বখাটের আনাগোনা বেড়ে যায়। আমি যে মেয়েদের জন্ম দেখেছি, আমাদের চোখের সামনে বেড়ে উঠেছে, তারা এখন প্রত্যেকে এক দুইটি করে সন্তানের মা। তাদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের বেশি হবে না। এখন বাড়িতে আসলে যখন তাদের সন্তানদের দেখি, তখন নিজেই অবাক না হয়ে পারি না। গ্রামের ওই সব মেয়েরা মা হলে কি হবে, এখনই তাদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স।

এই প্রবণতা কেবল মেয়েদের ক্ষেত্রে নয়, ছেলেদেরও একই অবস্থা। কারণ কিন্তু একটাই যুগ জামানা ভালো নয়। ঘরে ছেলে বড় হলেও বাবা-মারাও চিন্তিত থাকেন, কখন না তাদের সন্তানরা অঘটনা ঘটায়। সামাজিক মর্যাদা এবং মান সম্মানের ভয়ে গ্রামে এখনও বাল্যবিয়ে অব্যাহত হয়েছে। একুশ শতাব্দির সমাজ ব্যবস্থায় এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষার হার বাড়ছে, মানুষ সচেতন হচ্ছে কিন্তু মান্দাতা আমলের কিছু চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ফলশ্রুতিতে গ্রামের বাল্যবিয়ে থামছে না, বরং বাড়ছে। ঝুঁকি, চিন্তা বাড়ছে মেয়ের বাবা-মার। ছেলে-মেয়েদের বয়স বাড়া মানেই বাবা-মার উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যাওয়া।

বাল্যবিয়েই তাদের সকল সমস্যার সমাধান। অথচ আমি প্রত্যক্ষ করছি বাল্যবিয়ের ফলে তাদের যে সব সন্তান হয়েছে, তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। প্রত্যেকের কোন না কোন রোগ লেগেই আছে। স্বাস্থ্যের অবস্থাও খুব একটা উন্নত নয়। তাদের মাঝে না বিরাজ করছে সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে তোলার মনমানসিকতা।

অন্যদিকে সন্তানরাও সঠিকভাবে বেড়ে উঠার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের কুফল আমাদের অভিভাবকদের নজরে পড়ছে না। তারা ভাবতেই পারেন না যে বাল্যবিয়ে জীবন-মরনের মতো নানা জটিল ব্যাধির কারণ হতে পারে। ফলে বাল্যবিয়ে চলছেই।

যুগ জামানা ভালো নয়- বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। বর্তমান যুগ জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগ, উন্নয়নের যুগ, প্রচলিত রীতি-নীতি, প্রথা, বিভেদ ভুলে সামনে অগ্রসর হওয়ার যুগ। তথ্যপ্রযুক্তির আলোতে আলোকিত হওয়ার সময়। কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস টপকে নতুন সমাজ বির্নিমানের যুগ। তাহলে এখন কেন অভিভাবকদের মুখে শুনতে হয় ‘যুগ জামানা ভালো নয়’। এই যুগ যদি ভালো না হয়, তাহলে আর কোন যুগ ভালো হবে। বর্তমান দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। ঘরে ঘরে টেলিভিশন। তথ্যেও কোনো ঘাটতি নেই। সচেতনামূলক প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে সর্বদা। তারপর কেন এই যুগ ভালো হবে না।

আমাদের অভিভাবকদের মুখে তো উচ্চারণ হওয়ার কথা ছিল এখন যুগ জামানা ভালো। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা শেখাতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। বাল্যবিয়ে আর নয়। ছেলে-মেয়েকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর বিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু আমাদের অভিভাবকরা এমন চিন্তা চেতনার বিপরীত ধারায় অবস্থান করছেন। আসলে অভিভাবকরাও কতটা সচেতন সেটাও ভাবার বিষয়।

হয় তো আমাদের সমাজ ব্যবস্থা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। কিন্তু নানা অনাকাঙ্কিত ঘটনা আমাদের পিছু ছাড়ছে না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই নজর কাড়ে ছাত্রী ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বখাটের উদ্দীপনা, অপহরণ, শ্লীলতাহানি, আত্মহত্যা, প্রেমঘটিত নানা ঘটনা, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে হয়রানি করার মতো নানা ঘটনা। এই সব ঘটনা গ্রাম শহরসহ সর্বত্র এক তালে চলছে।

আমরা এমন ঘটনাও অবলোকন করেছি প্রেমের প্রস্তাবে ছাত্রী রাজি না হওয়ায় তাকে খুন করা হয়েছে। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটেদের হামলার শিকার হয়েছেন ছাত্রীর বাবা, ভাই, মাসহ স্বজনরা। এখন তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নানা ঘটনার জন্ম দেয়া হচ্ছে। ছাত্রীকে ধর্ষণের পর তার ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে হুমকি দেয়া হয়। কাজেই এতো কিছুর পর আমাদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। তাদের মুখে স্থান পাবে, যুগ জামানা ভালো নয়।

তবে এই যুগ জামানা ভালো করার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত বয়সে বিয়ে দেয়ার মতো সমাজব্যবস্থা কায়েম করার দরকার।
লেখক : লেকচারার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ২ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর