[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সংবাদেরও গণতন্ত্রীকরণ জরুরি


প্রকাশিত: September 3, 2016 , 9:13 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


presss
মো. মিঠুন মিয়া: বর্তমান বিশ্বে সর্বত্র গণতন্ত্রের জয়জয়কার। গণতন্ত্রই উত্তম শাসন ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জন্য কত ত্যাগ, প্রাণহানি, রক্তপাত আর হানাহানি আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করছি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এমন যেখানে সমাজের প্রত্যেক স্তরে সকলের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। প্রত্যেকে যার যার যোগ্যতা অনুসারে সুযোগ ভোগ করবে। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু থাকলেও নেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ।

গণতন্ত্রের সুফল পেতে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সমাজের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে চাই গণতান্ত্রিক চর্চা। গণতান্ত্রিক দেশে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যম। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সুশাসন, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং মানুষের অধিকার আদায়ে গণমাধ্যমের বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে সেই গণমাধ্যম কতটা গণমানুষের সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম কি আসলে গণমানুষের কথা বলছে নাকি বিশেষ শ্রেণি-পেশা তথা এলিট গোষ্ঠীর কথা বলছে। গণমাধ্যমের প্রধান আধেয় হচ্ছে সংবাদ। সেই সংবাদ নির্বাচন, সংবাদের বিষয়বস্তু, উপস্থাপন কিংবা সংবাদ সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্তকরণে আদৌ কি গণতান্ত্রিক মনমানসিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে? নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হচ্ছে বর্তমানে খবরের গণতন্ত্রীকরণ দরকার।

সংবাদ হবে মুক্ত আকাশের মতো। সেখানে পাঠকের মতামত প্রদানের সুযোগ থাকবে। মতের আদান প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। বর্তমানে গণমাধ্যম অনেক দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা কমছে না বাড়ছে তা নিয়ে নানা বিতর্ক হতেই পারে। বর্তমানে পুঁজিবাদের ব্যাপক দৌরাত্ম এবং ব্যক্তিস্বার্থ থেকে শুরু করে নানা কারণে গণমাধ্যম প্রশ্নবিদ্ধ। খবরের যে গণতন্ত্রীকরণ রক্ষা হচ্ছে না, তার নানা উদাহরণই দেয়া যেতে পারে। সমাজে নানা ঘটনাই ঘটছে, কিন্তু সব ঘটনাই কি সংবাদ হয়ে উঠে। প্রত্যেক ঘটনার কি সংবাদ হয়ে উঠার যোগ্যতা আছে? আর সংবাদ আকারে প্রত্যেক ঘটনা উপস্থাপন করা সম্ভবও নয়।

তাহলে ঘটনার সংবাদ হয়ে উঠার নিয়ামক কি ? সেক্ষেত্রে ঘটনার মাঝে খোঁজা হয় সংবাদমূল্য। সন্ধান করা হয় সংবাদ উপাদানের। বের করা হয় সংবাদ হওয়ার নানা যৌক্তিকতা। আর এজন্যই একজন সাংবাদিকের ষষ্ঠ ইন্দিয়ের প্রয়োজন হয়। পঞ্চ ইন্দিয়ের বাইরে আরেক ইন্দ্রিয় হলো সংবাদ চেতনা। যে ঘটনায় জনপরিসর তথা জনগণ যত বেশি জড়িত সেটিই সংবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি কেবল একটি দিক। কিন্তু তা উপেক্ষিত। গণমাধ্যমে আমরা অনেক সংবাদই দেখি, যার কোনো সংবাদমূল্য নেই। অথচ তা বেশ গুরুত্বের সাথে সংবাদ হিসেবে পাঠককে খাওয়ানো হচ্ছে। সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ না হয়ে হচ্ছে মন্তব্যধর্মী।

ঘটনাস্থল থেকে সংবাদ পাঠকের নিকট পৌঁছাতে গিয়ে নানা স্তর অতিক্রম করছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যের বেশির ভাগই আড়ালে ঢাকা পড়ে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে গণমাধ্যমের মালিকানা, বিশেষ শ্রেণি, বিজ্ঞাপনসহ নানা স্বার্থ। ফলে এই সব বিবেচনায় মার খাচ্ছে সংবাদের গণতন্ত্রীকরণ। সংবাদ হয়ে পড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক এবং স্বার্থনির্ভর। ফোন কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক প্রচার এবং প্রসারের জন্য মেধাবৃত্তি প্রদান করলেই ছবিসহ বড় আকারে সংবাদ স্থান পায় প্রথম এবং শেষের পাতায়। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের সখিনা জরিনাদের দুঃখবহ জীবন সংগ্রাম এবং আদিবাসীদের দুর্ভোগ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের বিষয়গুলো সংবাদ হয়ে উঠে না। সংবাদ হলেও তার জন্য গুরুত্ব কম।

কাজেই গণমাধ্যমের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নির্ধারণ করছে কোনটি সংবাদ। সেখানে সংবাদের গণতন্ত্রীকরণ বজায় থাকছে না। সংবাদের গণতন্ত্রীকরণের সবচেয়ে বড় স্থান হলো সংবাদে সকলের অংশগ্রহণ। এখানে অংশগ্রহণের বিষয়টি নির্ভর করছে খবরে পাঠকের মতামত প্রদানে সুযোগ কতটুকু তার ওপর। বর্তমানে সংবাদ এমন হওয়া উচিত যেখানে গণমাধ্যমই কেবল পাঠককে প্রভাবিত করবে না, বরং পাঠকও গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করবে। গণমাধ্যম এবং পাঠকের মাঝে এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া গড়ে উঠবে। পাঠক সংবাদের প্রেক্ষিতে তার প্রতিক্রিয়া দেখাবে, গণমাধ্যম সেই প্রতিক্রিয়া আমলে নিয়ে ফিডব্যাক দিবে। যদিও নিউ মিডিয়ায় ফলাবর্তনের (ফিডব্যাক) মাত্রা বেশি। কিন্তু প্রচলিত গণমাধ্যম যেমন সংবাদপত্রে ফলাবর্তন জানানোর ব্যবস্থা থাকলেও তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। যদিও ইদানিং টিভি চ্যানেল, রেডিও এবং অনলাইন সংবাদপত্রে কোন সংবাদের প্রক্রিয়া জানানোর নানা সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে খবর হবে সংক্ষিপ্ত এবং এই মুহূর্তের। সংবাদপত্র একটি অভ্যাস, খবর মানেই সংবাদপত্র এই সব বস্তাপচা ধ্যান ধারণা আমাদের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এবং যুবক-যুবতীরা বিশ্বাস করেন না।

বর্তমানে পাঠক শ্রেণিকে নির্দিষ্ট ফ্রেমে ফেলা যাবে না। এই সময়ের পাঠকরা যুক্তিবাদী এবং বাস্তবতায় বিশ্বাসী। বিশ্লেষণ, মতামত প্রদানে এই যুগের পাঠকরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এরা কার্যকর যোগাযোগে বিশ্বাসী। পাঠকরা সংবাদ পড়ে বুঝতে পারে গণমাধ্যম আসলে কি বোঝাতে চেয়েছে। সংবাদটি কোন পক্ষে স্বার্থ রক্ষা করছে, কাদের কণ্ঠস্বর বেশি স্থান পাচ্ছে। সংবাদে সকল পক্ষের বক্তব্য আছে কিনা? সংবাদ পড়ার পর পাঠকের মনে নানা জল্পনা কল্পনা বিরাজ করে। তাদের মনে নানা প্রশ্নের উদ্বেগ হচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে সুযোগ খুঁজতে থাকে।

কাজেই পাঠক যদি সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পায় তাহলে গণমাধ্যম তাদের ওপর বেশি প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। এখন দেখা যাক, একজন সাংবাদিক সংবাদ উপস্থাপনে ততটা গণতান্ত্রিক মনমানসিকতার পরিচয় দেন। একটি সংবাদে কি সকল পক্ষের বক্তব্য থাকে। সংবাদ এমনই যা কারো না কারো পক্ষে যাবে এবং কারো বিপক্ষে যাবে। ফলে এতো কিছুর মধ্যেও সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেয়।

সংবাদে কারো পক্ষে গণমাধ্যমের অবস্থান দৃঢ়, আবার কারো পক্ষে ক্ষীণ। একই সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা দৃষ্টিকোন থেকে তুলে ধরা হচ্ছে। আর গণমাধ্যমে বৈচিত্র্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পুরো সংবাদটি একে অপরের বিপরীত হয়ে যাবে। সংবাদে এক পক্ষের বক্তব্য থাকছে, আরেক পক্ষের বক্তব্য থাকছে না। আবার ছবি চয়ন করতেও পক্ষপাতিত্ব। ফলে সংবাদে গণতন্ত্রীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা ভাবার বিষয়। সামাজিক মাধ্যম গণমাধ্যমের চেয়ে দিনদিন জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। এর নেপথ্যেও রয়েছে সামাজিক মাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ। অনেক দিক থেকে বলা যায়, সামাজিক মাধ্যমের আধেয় গণমাধ্যমের আধেয়ের চেয়ে বেশি গণতন্ত্রীকরণ।

গণতন্ত্র এবং সাংবাদিকতা সম্পর্কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘‘আপনারা সাংবাদিক, আপনাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে আপনারা নিজেরাও আত্ম-সমালোচনা করুন, আপনারা শিক্ষিত, আপনারা লেখক, আপনারা ভালো মানুষ, আপনারাই বলুন কোনটা ভালো আর কোনটি মন্দ, গণতন্ত্রের একটি নীতিমালা আছে। সাংবাদিকতার একটি নীতিমালা আছে। এদুটো মনে রাখলে আমরা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারি।’’

লেখক : লেকচারার, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর