[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



স্বাধীন বাংলাদেশ ও হালচিত্র


প্রকাশিত: September 4, 2016 , 9:51 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন


pic
মাহমুদা রিদিয়া রশ্নি: সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিটি শিশুর একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন বর্তমান পৃথিবীতে দু:স্বপ্নের মতো। নিরাপত্তা, মুক্ত বাতাস, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা ও বিনোদন সেবায় পরিপূর্ণ একটি উপযোগী বাসযোগ্য পৃথিবীতে এসব সেবামূলক চাহিদা উপভোগের অধিকার প্রতিটি মানবকুলের থাকলেও বর্তমান সময়ে তা অমাবস্যার চাঁদ।

সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে মহাপতঙ্গ নামক বিমান হামলায় মাথায় আঘাত প্রাপ্ত পাঁচ বছরের শিশু ওমরান দাকনেশ বাঁচতে চেয়েছিল। আম্বুলেন্সে ওঠার আগ পর্যন্ত নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করতে না পারায় বোধহয় তখনও পর্যন্ত বাঁচার স্বপ্নটা ছিল। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় বিরোধের জেরে ভয়াবহ বিমান হামলায় নিষ্পাপ শিশুটিকে অতীব যন্ত্রণায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে অথচ প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের।

জন্মভূমি বাংলাদেশেও ওমরানের মতো ঢাকার উইলস ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে (১৪) মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিরোধের জেরে ওমরানের মতো রিশা বলীরপাঠা না হলেও বখাটে যুবক কর্তৃক তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

এটাই দৃশ্যমান যে যেভাবেই মৃত্যু হোক না কেন ওমরান বা রিশা কেউই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারেনি। প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে রিশা হত্যার ঘটনায় দেশবাসী নিন্দাজ্ঞাপন করেছে এজন্য যে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগেও নারীদের ইভটিজিং’এর শিকার এমনকি প্রেমের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা বা ছুরিকাঘাতে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

সর্বোচ্চ শাস্তির আসামী হওয়া সত্ত্বেও হত্যাকাণ্ডের পুরো দায়ভার হত্যাকারীর ওপর বর্তালেও আংশিক দায়ভার কিন্তু রাষ্ট্রকেও নিতে হয়। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে রাষ্ট্র ইভটিজিং’এর বিরুদ্ধে তৈরিকৃত বিধানের সঠিক প্রয়োগ এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে যুবক ওবাইদুল রিশাকে ছুরিকাঘাতে আঘাত করার সাহস পেত না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অক্লান্ত পরিশ্রমে ওবাইদুলকে গ্রেফতার করায় রিশার পরিবার ও দেশবাসী হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছে। হয়তো ওবাইদুল মৃত্যু দণ্ডের মতো সর্বচ্চ শাস্তি ভোগ করলেও রিশাকে তো আর তার পরিবার ফিরে পাবে না। এমনকি জীবন চলে যাওয়ার মতো এতো বড় ক্ষতি অপূরণীয় ।

“কথা ছিল একটি পতাকা পেলে; পাতা কুড়ানির মেয়ে শীতের সকালে; ওম নেবে জাতীয় সঙ্গীত শুনে; পাতার মর্মরে “–কবি হেলাল হাফিজের কবিতায় স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে সেটা অসম্ভব তা রিশা বা তনু হত্যা থেকে প্রতীয়মান হয়।

অধিকার আদায় এ দেশের মাটিতে অসম্ভব এই অর্থে বলা যেতে পারে যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও পুলিশ তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বিধান মোতাবেক সকল শিক্ষার্থী হল পাবার দাবিদার এবং অভিভাবক তুল্য রাষ্ট্রের কাছে আন্দোলন করার অধিকার তাদের আছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আগত হাতির সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালির উদ্বেগ ও আন্তরিকতা এমনকি হাতিটি বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার অবস্থান দেশবাসীকে জানানোর জন্য প্রিন্ট মিডিয়ার অবদান থেকে বাংলাদেশের অতিথিপরায়ণের চিত্র ফুটে উঠে । দেশবাসীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মৃত্যুর পর বঙ্গবাহাদুর উপাধি লাভ করে হাতিটি। ফলে মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য রাষ্ট্র তার সচেতনার জায়গা থেকে মামলা করার চিন্তা ভাবনা করেছিল বলে প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে আংশিকভাবে জানা যায়।

অথচ বাংলাদেশ –ভারত সীমান্তবর্তী কাঁটাতার পারাপারের সময় ফেলানি নামক এক কিশোরীকে হত্যা ও হত্যা পরবর্তী সময় কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখায় দেশবাসী ও প্রিন্ট মিডিয়া এ বিষয়ে বঙ্গবাহাদুর মৃত্যুর মতোই একই রকম সোচ্চার ছিল কিনা তা ভাববার বিষয়। শুধুমাত্র বাংলাদেশ –ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় আর্থিক অসচ্ছল ফেলানির পরিবার আইনি জটিলতায় পড়েছিল। বঙ্গবাহাদুর এর মতো ফেলানিও উপাধি পাবার দাবিদার হলেও সে শুধু এখন ইতিহাস।

পত্রিকার পাতা খুললেই মোটা দাগের বড় অক্ষরে “হাতিটি বানের জলে ভাসছে” সহ নানারকম খবর পাওয়া যায় কিন্তু একই সময় পশ্চিম –উত্তরাঞ্চলের ১৯-২০টি জেলায় কয়েক লাখ মানুষের বানের জলে ভাসার খবরটি অল্প কিছু পত্রিকাতেই স্থান পেয়েছে। অথচ তখন বানবাসির ছিল চরম দুর্ভোগ যা অকল্পনীয় এবং অবর্ণনীয় । বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রবণ হওয়াই দেশবাসীকে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বাস করতে হয়।

পরিবেশ দূষণের ফলে বাংলাদেশ চরম দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কার এই ক্রান্তিলগ্নে সিদ্ধান্ত হয় কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ।জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধিতে বন্ধুদেশ ভারতের সাথে সমঝোতা চুক্তি সাক্ষরের মাধ্যমে সুন্দরবনের পরিবেশগত বিপদসীমার মধ্যে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। “পরিবেশের ওপর এটি হুমকি স্বরূপ “ বিষয়টির পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন পরিবেশ বিজ্ঞানী , সুশীল সমাজ এবং রাষ্ট্র পক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞানী, সুশীল সমাজের যুক্তিতর্ক রাষ্ট্রের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য ভাববার বিষয়। রামপাল বিদ্যুৎ ঘাটতিপূরণ করার পাশাপাশি পরিবেশের হুমকির বিষয়টিও রাষ্ট্রের নজরে থাকতে হবে এজন্য যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালানোর জন্য দক্ষ মানবশক্তি প্রয়োজন হবে এমনকি সেখানে তাদের আবাসন ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জীবন ধারণের জন্য সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ,হাট বাজার গড়ে উঠবে। ওই এলাকায় জনবসতি বৃদ্ধি পাবে ফলে সেখানে দুরবিত্তায়ন বেড়ে অপরাধপ্রবন অঞ্চল হতে পারে যা স্থানীয়দের জন্য হুমকিস্বরূপ।

সবচেয়ে বড় বিষয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও পশু-পাখির অভয়ারণ্য সুন্দরবন ধ্বংসে বাংলাদেশ হুমকির মুখে পড়বে বিধায় যেকোনো বিষয়ে রাষ্ট্রের এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন কোনো নাগরিক ক্ষতিগ্রস্থ না হয় কারণ রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যেন প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে এটাই প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা ।

লেখক: জুনিয়র ইনভেস্টিগেশন অফিসার, আইন ও শালিস কেন্দ্র।

ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এফআর