[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



সংসার সামলিয়ে বিসিএস ক্যাডার ঢাবির অদম্য ছাত্রী


প্রকাশিত: September 5, 2016 , 1:30 am | বিভাগ: ক্যারিয়ার এন্ড জবস


hiramoni-live

৩৫ তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মেয়ে মারুফা সুলতানা খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তিনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় তার। তবুও দমে যাননি তিনি। অদম্য এ মেধাবী ছাত্রীটি মেধার স্ফূরণ দেখিয়েছেন। চলুন শুনে নেয়া যাক কিভাবে তিনি শত বাধা পেরিয়ে সফলতা পেয়েছেন। 

মারুফা সুলতানা খান : আমি আমার পিতৃভূমি ভাটি বাংলার রাজধানী খ্যাত নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ থানার দ্বীপের মত একটি গ্রাম বরান্তরের খান বাড়ি। আমার বাবা মোঃ নিজাম উদ্দিন খান এমন একজন আদর্শ পিতা যিনি আমার এবং আমার ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য জীবনের সব সুখ শান্তিকে বিসর্জন দিয়েছেন। আব্বুকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন আম্মু রাবেয়া আক্তার। বরান্তর পিতৃভূমি হলেও আমার জন্ম হয় মোহনগঞ্জ থানারই অপর একটি গ্রাম মেদী পাথর কাটায় আমার নানার বাড়িতে।

শৈশবকাল আমার নানার বাড়িতে কাটলেও অধিকতর ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য আব্বু-আম্মু আমাকে ভর্তি করেন ১ নং মোহনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

hira-liveএই বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তিপ্রাপ্ত হই এবং ২০০৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাশ করি। পরবর্তীতে কিছুটা বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে আমি ভর্তি হই ময়মনসিংহে অবস্থিত মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে এবং ২০০৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই নেত্রকোনা জেলার মদন থানার ফতেপুর (দেওয়ান বাড়ি) নিবাসী দেওয়ান মেরাজ ইয়ার চৌধুরীর সাথে। বিয়ের পরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে নানান মানুষ নানান কথা বললেও আমার স্বামী ঐসব কথায় কান দেন নি।

বিয়ের পর সংসার চালিয়ে পড়াশোনা করা একটু কঠিন বটে কিন্তু মোটেও অসম্ভব নয়। সংসার পরিচালনার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এস সি (অনার্স) এ অধ্যায়নরত অবস্থায় ৪র্থ বর্ষে সন্তান সম্ভবা হলেও পড়াশোনায় আঁচ লাগতে দেইনি।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ১ মাস আগে ২৯ ঘন্টা প্রসব বেদনা সহ্য করে ঢাকার একটি ক্লিনিকে ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম দেই। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে আমার ১ মাস বয়সী মেয়েকে আম্মুর কোলে রেখে পরীক্ষার হলে ঢুকতাম আর এভাবে পরীক্ষা দিয়েও আমি ১ম শ্রেণীতে ১ম বিভাগ অর্জন করি।

৩৩তম বিসিএস দিয়েই আমার বিসিএস শুরু হলেও প্রথমবারেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হই। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি তে ভর্তি হই ও ৩৪ তম বিসিএস-এ অংশ গ্রহণ করে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কৃতকার্য হলেও লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হই।

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুু-বান্ধব অনেকেই অনেক কথা বললেও আমি মনোবল হারাইনি। এরই মধ্যে ১ম শ্রেণীতে ১ম বিভাগ পেয়ে এমএসসি শেষ করি এবং ৩৫ তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই।

আমাদের সমাজে মেয়েরা ১৮ বছর পেরুতে না পেরুতেই বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করে। আমার মতে ১৮ বছর পার হলে মেয়েদের বিয়েতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তারা যেন তাদের পড়াশোনা বন্ধ না করেন। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ছেলেদের থেকে তার পরিবার একটু বেশিই আশা করে তবে আমরা মেয়েরাও কোন অংশে কম নই।

দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রমই পারে আমাদেরকে মূল লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে। তাই সকল নারীর প্রতি আমার আহবান থাকবে তারা যেন তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পরিবারকে আনন্দ অশ্রুতে ভাসিয়ে দিয়ে দেশ ও দশের সেবায় নিজেদের মেধাকে নিয়োগ করেন।

আমার এই সাফল্যের পিছনে যাদের একান্ত সহায়তা, অনুপ্রেরণা ও দোয়া ছিল তারা হলেন আমার স্বামী, আব্বু-আম্মু, ছোট দুই ভাই, আমার মেয়ে ও নানা-নানু।

তাছাড়া বিভিন্নভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করেছেন মোঃ মশিউর রহমান খান (২৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার), মোঃ জসীম উদ্দীন (২৯তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার) ও আফজাল আদনান অনন্ত (৩৪তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডার)। সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনে থেকে আমি যেন দেশ ও দশের সেবা করতে পারি সেজন্য সকলের দোয়াপ্রার্থী।

মারুফা সুলতানা খান হীরামনি
৩৫তম বি সি এস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[কার্টেসি : নেত্রবার্তা]

ঢাকা, ০৪ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন