[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



‘প্রকৃত বিসিএস ক্যাডারদের মূল্যায়ন চাই’


প্রকাশিত: September 8, 2016 , 10:22 pm | বিভাগ: গেস্ট কলাম


bcs

মো: মফিজুল ইসলাম মিলন: আমাদের শিক্ষিত হতে হবে, অন্যথায় ধ্বংস অনিবার্য’-একজন বিখ্যাত মনিষীর এ উক্তিটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় দৃশ্যমান সত্য না হলেও অদৃশ্যভাবে শতভাগ সত্য। বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিমানগত শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেও গুনগতমান এখনো সেই মান্ধাতার আমলের। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালের মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে ভিশন তা গুনমানসমৃদ্ধ শিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমেই সম্ভব।

শতভাগ মেধা-মননে শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার প্রয়াসের গ্রহণ করে এ শিক্ষাবান্ধব সরকার। “জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০” এর অনুচ্ছেদ ২৭(৯) এ বলা হয়েছে, “যে সকল উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ নাই সে সকল উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে”।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার, যাতে উপজেলার শিক্ষার্থীগন স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করে,যা প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে সর্বত্র সমাদৃত। কিন্তু সেই উদ্যোগের ফলাফল আমরা কি দেখতেছি সে দিকে একটু নজর দেয়া যাক।

সরকার প্রথম ধাপে যে ১৯৯টি কলেজের জাতীয়করণের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তার মধ্যে অন্তত ৩০টি কলেজের ক্ষেত্রে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যেমন: তালিকায় থাকা কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মহিলা কলেজ এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ ফেল করে রেকর্ড করেছে। এমন কলেজকে জাতীয়করণ করা ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমপিওভুক্ত হয়নি এমন কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে জাতীয়করণের জন্য কোটি টাকা লেনদেনের।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার এ কে সরকার ডিগ্রি কলেজের জাতীয়করণের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা অধ্যক্ষের নেতৃত্বে কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ৫০ লাখ টাকার তহবিল গঠন করেছে ঘুষ দেয়ার জন্য। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকষর্ণ করা হলে তিনি বলেন, “আর্থিক লেনদেন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”

অভিযোগ উঠেছে পুরনো, নামকরা কলেজকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নতুন কলেজকে জাতীয়করণ করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে, কুমিল্লায় হরতাল পালিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে, মাগুরার মোহাম্মদপুরে দেখা দিয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ। জাতীয়করণের এত বড় প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকবে– এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ফিল্ড স্টাডি করা জরুরী,যাতে এ মহান উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

“জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০”-এর প্রাক-কথন এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বলেছেন, “একটি জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হল শিক্ষা। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে শিক্ষাই হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।”

কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার সাইফুর রহমান কলেজ,যা ২০০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত নতুন জাতীয়করণকৃত ১৯৯ কলেজের তালিকায় এ কলেজটিও অন্তর্ভূক্ত।যেহেতু পূর্বে এটি এমপিওভূক্ত ছিলো না,স্বভাবতই এ কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ ভিন্ন পেশায় (গার্মেন্টস কর্মী, ইজি-বাইক চালক,ব্যবসায়ী) নিয়োজিত ছিলো এবং এখানকার শিক্ষকগণ অধিকাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তৃতীয় শ্রেণি প্রাপ্ত। অর্থাৎ যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে চাকরি না পেয়ে এসব কলেজে যোগদান করে।

এখন প্রশ্ন হলো,যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব কলেজ জাতীয়করণ করছেন সে উদ্দেশ্য কি এসকল শিক্ষক আদৌ পূরণ করতে পারবে ?

ভয়ংকর বিষয় হলো এ জাতীয়করণের ফলে এ সকল শিক্ষক সরকারিকরণের মাধ্যমে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে আত্নীকৃত হবে। হায় সেলুকাস। এ আত্নীকৃত শিক্ষকরা ক্যাডার সার্ভিসে এসে তর তর করে প্রমোশন নিয়ে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের পিছনে ফেলে বড় বড় কলেজে পোস্টিং নেবে, প্রিন্সিপাল হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল মহোদয়রা আত্নীকৃত। অথচ প্রকৃত ক্যাডাররা আত্নীকৃতদের চাপে প্রমোশন পাচ্ছেন না।

যে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ এর অনুচ্ছেদ ২৭(৮) অনুসারে কলেজ জাতীয়করণ করা হলো অথচ সেই “জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০” এর অনুচ্ছেদ ২৭(৮) এ আত্মীকৃত এসব শিক্ষক সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের জন্য আলাদা নীতিমালা থাকবে। এবং যাতে কর্ম কমিশন কর্তৃক নিয়োগকৃত শিক্ষকদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে সেই বিষয়ে প্রাধান্য দিতে হবে,”-কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। এ শিক্ষানীতি কার্যকরের পরে ৪৫টি কলেজ জাতীয়করণ হয়েছে। এসব কলেজের শিক্ষকরা সবাই ক্যাডার সার্ভিসে অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন। জীবনে যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার যোগ্যতা পাননি, তাদের ক্যাডার সার্ভিসে আত্মীকৃত করা হয়।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২৭৯টি সরকারি কলেজ আছে। ৪৫টি জাতীয়করণকৃত সম্পন্ন, ১৫টি সম্পন্নের পথে,১৯৯টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে এবং ১০২টি অনুমোদনের পথে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২৭৯টি সরকারি কলেজের মধ্যে প্রায় ২০০টি কলেজের প্রিন্সিপাল আত্নীকৃত। শিক্ষা ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নায়েমের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আত্নীকৃত।

তাহলে আমরা ধরে নিবো যে, যারা বিসিএস নামক পুলসিরাত পার হয়ে মেধার পরিচয় দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে আসেন তারা অযোগ্য আর যারা জাতীয়করণের মাধ্যমে ক্যাডারভুক্ত হন তারা বেশি যোগ্য (!)? এসব মূলত ঘটে রাজনীতির সরল রৈখিক ব্যাপারের কারণে। কারণ যারা এলাকায় এমপিওভুক্ত কলেজে চাকরি করেন, তারা পাঠদানের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন রাজনীতিতে, ব্যবসায়। ফলে মন্ত্রী-এমপিদের খুব কাছের মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন তারা। পরবর্তীতে জাতীয়করণের ফলে আত্নীকরণের মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক পাওয়ার ও মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষমতার দাপটে ঢুকে যান বিভিন্ন অফিসিয়াল ভবনে এবং অত্যাচার চালান মেধাবী অরাজনৈতিক শিক্ষকদের ওপর, যারা পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগকৃত।

শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি ও শতভাগ শিক্ষার হার বৃদ্ধির জন্য সরকারের জাতীয়করণ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই কিন্তু জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্তকরণের বিরোধিতা করছি যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং পিএসসির নীতিমালারও পরিপন্থী। সংবিধানের ১৪০(১) (ক) উপধারায় বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই পরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে”। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন বিধি-১৯৮১ তে পার্ট -৩ এর ১৬ ধারায় পিএসসির দায়িত্ব সম্পর্কে বলা আছে “সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ফলাফল অনুযায়ী মেধাতালিকা প্রকাশ করবে”। সুতরাং সংবিধান ও পিএসসির নির্দেশনা অনুযায়ী কোনোভাবেই তারা ক্যাডারভুক্ত হতে পারে না।

আমাদের (পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগকৃত) উদ্বেগের কারণ হলো যে, আমরা মোটেও জাতীয়করণের বিরোধী নই, কিন্তু আমরা চাই একটা সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক যাতে আমাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে। ইতোমধ্যে আত্নীকরণের বিষয়ে একটা অনুশাসন জারি করা হয়েছে। এ অনুশাসনে বলা হয়েছে যে, আত্নীকৃত কলেজের শিক্ষকরা অন্যত্র বদলী হতে পারবে না। কিন্তু এখানে বলা হয়নি যে, প্রমোশনের পর এরা কোথায় যাবে?এটি অনুশাসন, আইন নয়। যেখানে আত্নীকরণ বিধি ২০০০ ও সুরক্ষা দিতে পারছে না, সেখানে অনুশাসন শুধুই আইওয়াশ মাত্র।

সুতরাং, সকল প্রকার সমস্যাবলী থেকে শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আনয়নের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা জরুরি।

১. নব্য জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকদের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে বিসিএসের মাধ্যমে যোগদানকৃত শিক্ষকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।

২.জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষদের নন-ক্যাডার ঘোষণা করে আত্মীকরণ করতে হবে।

৩.আত্নীকৃত শিক্ষকরা যেনো কখনই অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এর ওপরে প্রমোশন না পায়, এ সংক্রান্ত বিধি নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু এ প্রমোশন হবে নন-ক্যডারের ভিত্তিতে, ক্যাডার হিসেবে নয়।

৪.যারা যে কলেজ থেকে আত্মীকৃত হবেন তাদের সেই কলেজেই (বদলী অযোগ্য) চাকরি করতে হবে।

লেখক: লেকচারার, (বাংলা), টংগী সরকারি কলেজ, টংগী,গাজীপুর।

ঢাকা, ০৮ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এফআর