[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



ক্রিকেটার শান্ত: যে ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন!


প্রকাশিত: September 25, 2016 , 11:14 pm | বিভাগ: ইন্টারভিউ


Santo1

বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথার অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি। ১৯৯৭-র আইসিসি ট্রফি জয় থেকে শুরু করে দেশের প্রথম বিশ্বকাপ এবং অভিষেক টেস্ট চিরকালীন ফ্রেমে বাঁধাই হওয়া সব ছবিতেই সরব উপস্থিতি হাসিবুল হোসেন-এর। ডাকনাম শান্ত হলেও চলন-বলন আর চিন্তা-চেতনায় অস্থিরমতি এ তরুণ এরপর ক্রমেই নিমজ্জনের দিকে এগোতে থাকেন। তবে ফেলে আসা জীবনের ভুলগুলো এখন দিব্যি বুঝতে পারেন। তাই তাঁর মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় বসে ঘণ্টা দেড়েকের আলাপচারিতায় নিজেকে কাঠগড়ায় তুলতে থাকেন অবিরত। কথায় কথায় খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার অনন্য এক উদাহরণও তুলে আনতে পারলেন মাসুদ পারভেজ:

ক্যাম্পাসলাইভ : গ্যারেজে ইয়ামাহা এফজেড দেখলাম। বাইক চালাতে গিয়েও গতির নেশা পেয়ে বসে নিশ্চয়ই?

হাসিবুল হোসেন শান্ত : নাহ, ঢাকার রাস্তায় সে উপায় আছে নাকি! এই শহরে সহজে চলাফেরার জন্য বাইকের বিকল্পও অবশ্য নেই। ব্যবসার কাজে এদিক-সেদিক ছোটাছুটির ঝক্কিটা তাই আমার শখের এই বাহনের ওপর দিয়েই যায়। গাড়ি খুব কমই চালানো হয়। এটা সত্যি যে রাস্তা ফাঁকা পেলে গতির নেশাটা জেগে ওঠে। মাঝেমধ্যে এয়ারপোর্ট রোডে স্পিড ১২০-৩০ এও তুলে দিই!

ক্যাম্পাসলাইভ: এবার জানতে চাই, জোরে বোলিংয়ের নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন কিভাবে?

হাসিবুল : এমন বিশেষ কোনো ব্যাপার নেই। জোরে বোলিং করতে ভালো লাগত। বোলারই হতে চাইতাম, ব্যাটসম্যান নয়। ব্যাটিং করতে গেলে প্যাড, গ্লাভস এটা-সেটা আরো কত কী পরে নামতে হয়! খুব ঝামেলা মনে হতো আমার! বোলিংয়ে তো এসবের বালাই নেই। ছোটবেলা থেকে আমার পেসারই হতে চাওয়ার আরেকটি রহস্যও অবশ্য আছে।

ক্যাম্পাসলাইভ : বলে ফেলুন না, বাদ থাকবে কেন?

হাসিবুল : সত্যি কথা বললে, ব্যাটিং করতে ভয় পেতাম। বিশেষ করে কাঠের বলে খেলার সময়। একটা সময় কিন্তু ক্রিকেট বলকে ‘কাঠের বল’ বলার প্রচলনই ছিল। বল লেগে ব্যাটসম্যানদের ব্যথা পেতে দেখতাম। সেই থেকে মনে ভয় ঢুকে গেল। ঠিক করলাম, ব্যথা দেব কিন্তু পাব না। এ কারণেই বোলিংয়ে বেশি মনোযোগ, ব্যাটিংয়ে একটুও নয়। হা হা হা।

ক্যাম্পাসলাইভ: কিন্তু ক্রিকেটার হওয়াটা নিশ্চয়ই পরিকল্পনা করে হয়নি?

হাসিবুল : তেমন কোনো পরিকল্পনা আসলেই ছিল না। ছোটবেলায় পড়াশোনা কম হতো, খেলাটা বেশি। ওল্ড ডিওএইচএসে থাকতাম আমরা। সেখানকার মাঠে ফুটবল-ক্রিকেট-হকি থেকে শুরু করে ভলিবল-ব্যাডমিন্টনও হতো। সবই খেলতাম। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইলে গিয়ে ব্যাডমিন্টনের খেপও খেলে এসেছি কত!

ক্যাম্পাসলাইভ: এত খেলার ভিড়ে ক্রিকেট আলাদা হলো কিভাবে?

হাসিবুল : কারণ এত খেলার মধ্যে কেবল ক্রিকেটের জন্যই একটা দল করা হয়েছিল। এলাকার বড় ভাইয়েরা মিলে দ্বিতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেটের জন্য ওল্ড ডিওএইচএস দল বানিয়েছিলেন। ১৯৮৭-৮৮ সালের কথা। মনে আছে, ওই দলের উইকেটকিপার ছিলেন কোকো ভাই (সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান)। এলাকায় ফুটবল দল গড়া হলে হয়তো ফুটবলারই হতাম। প্রথমবার অংশ নিয়েই দ্বিতীয় বিভাগ বাছাইয়ে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। রান তাড়া করে প্রায় হারা ম্যাচ জেতানোয় আমারও কিছুটা অবদান ছিল। শেষ উইকেট জুটিতে ভালো ব্যাটিং করে খারাপ অবস্থা থেকে ম্যাচটা বের করে আনি।

ক্যাম্পাসলাইভ: এরপর দ্বিতীয় বিভাগ লিগে খেলতে শুরু করলেন?

Shanto7

হাসিবুল : হ্যাঁ, পাঁচ বছর খেলি দ্বিতীয় বিভাগে। তখনো আমার বড় দলে খেলার কিংবা বড় ক্রিকেটার হওয়ার কোনো টার্গেট ছিল না। দ্বিতীয় বিভাগের পাশাপাশি ফ্রাইডে ক্রিকেটও খেলতাম তখন। সেখানে খেলার সময়ই প্রথম বিভাগের দল লালমাটিয়ার ভারতীয় ক্রিকেটার আশীষ মলি্লকের নজরে পড়ে যাই। তিনিই আমাকে লালমাটিয়ায় খেলার অফার দেন।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনার তো সে অফার লুফে নেওয়ার কথা।

হাসিবুল : না, লুফে নিইনি। আমি বরং কনফিউজড হয়ে যাই। তখন আমার এই রোগটা ছিল। বড় দলে নাম লেখাব কিন্তু ওরা আমায় খেলাবে তো? নিয়ে যদি বসিয়ে রাখে? এসব ভেবে এক পা এগোই তো দুই পা পেছাই! আশীষ মলি্লকই আমাকে বুঝিয়ে লালমাটিয়ায় নিয়ে যায়।

ক্যাম্পাসলাইভ : এরপর?

হাসিবুল : এরপর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং আবারও সেই কনফিউশন। সেবার প্রথম বিভাগে সর্বোচ্চ উইকেট আমার। সুবাদে মোহামেডানের নজরে পড়ে যাই। ১৯৯২-৯৩ সালের ঘটনা। গেলে খেলার সুযোগ দেবে কি দেবে না, ভাবতে ভাবতে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলি। গিয়ে খেলারও সুযোগ পাই। ওই যে সুযোগ পেলাম, আমাকে আর বাদ দিতে পারল না। প্রিমিয়ারে খেলা প্রথম মৌসুমেই আমি লিগের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। তবু আমার কনফিউশন যায় না!

ক্যাম্পাসলাইভ : কেন?

হাসিবুল : ১৯৯৪ সালে মালয়েশিয়াগামী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পের কথাই বলি। তখন দুর্জয় (নাঈমুর রহমান) ভাইরা বিকেএসপি থেকে বেরিয়ে গেছেন। তাঁর সঙ্গে সিস্টেমের মাধ্যমে বের হওয়া একঝাঁক ক্রিকেটার তখন ক্যাম্পে। ক্যাম্পে তাঁদের সঙ্গে আমিও। কিন্তু দলে সুযোগ পেতে পারি_এই বিশ্বাসটাই আমার ছিল না। কেবলই মনে হতো, আমি বোধ হয় ওদের সঙ্গে পেরে উঠব না। এসব ভেবে ভেবেই দল নির্বাচনের তিন-চার দিন আগে প্র্যাকটিসে যাওয়া বাদ দিলাম। দল হয়ে যাওয়ার পর গিয়ে ওসমান ভাইয়ের কাছে কী বকাটাই না খেয়েছিলাম। হা হা হা। জানলাম, আমি মূল দলেই ছিলাম। কিন্তু আমার গাফিলতির জন্যই নামটা শেষ পর্যন্ত কেটে দেওয়া হয়।

ক্যাম্পাসলাইভ: পরের সুযোগটা পেলেন কোথায়?

হাসিবুল : একই বছর বাংলাদেশে সার্ক ক্রিকেট হয়। আমার সুযোগ হয়নি। সজল চৌধুরী খেলেছিল। সার্ক ক্রিকেটের পরপরই হায়দরাবাদ সফর ছিল। ওই দলে সুযোগ হয়। ওখানে গিয়ে ভালো বোলিংও করি। প্রথম ম্যাচেই তিন উইকেট। ওই সফরের পারফরম্যান্সের কারণেই ১৯৯৫ সালের এশিয়া কাপের দলে জায়গা পাই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর থেকেই একটু সিরিয়াস হই। তবে যতটা হওয়ার দরকার ছিল ততটা নয়। হলে ক্যারিয়ার আরো লম্বা করতে পারতাম। হারিয়ে এখন বুঝি।

ক্যাম্পাসলাইভ: বলা হতো, নিজের বোলিং নিয়েও অত বেশি চিন্তাভাবনা করতেন না আপনি। একটা ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার পর প্রায় দৌড়ে রানআপে ফিরতেন আপনি।

হাসিবুল : এমন অভিযোগ কেউ করে থাকলে মানছি। আসলেই অত চিন্তাভাবনা করতাম না। আর দরকারও হতো না খুব একটা। দেখা যেত আমার ওই ফর্মুলাই কাজ করে যেত। রানও কম দিতাম, উইকেটও পেতাম। তা ছাড়া তখন তো অ্যানালিস্টের যুগ ছিল না। এখন যেমন বোলারদের ধরে ধরে দেখিয়ে দেওয়া হয় ব্যাটসম্যানের কোথায় দুর্বলতা বা কোথায় শক্তিমত্তা। আমাদের সময়ের বেশির ভাগ ক্রিকেটারই ব্যাপারটা মিস করেছেন। এখনকার সুযোগ-সুবিধা আকরাম ভাই (আকরাম খান), বুলবুল ভাই (আমিনুল ইসলাম) ও নান্নু ভাইরা (মিনহাজুল আবেদীন) পেলে তাঁরা আরো নামি ব্যাটসম্যান হয়ে উঠতে পারতেন।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনিও আরো নামি বোলার হয়ে উঠতেন?

হাসিবুল : আমার ব্যাপারটা একটু আলাদাই। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আমি আরো বড় হতে পারতাম। কিন্তু নিজের অবহেলার জন্যই পারিনি। সিরিয়াস ছিলাম না। পেশাদারও ছিলাম না। মনের আনন্দে খেলতাম। বড় হওয়ার জন্য ক্রিকেট নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পারলে হয়তো আরো লম্বা সময় ধরে খেলতে পারতাম। এ ব্যাপারটা অনেক পরে বুঝেছি। যখন বুঝেছি, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বেড়ে গিয়েছিল, তেমনি আমার ফিটনেসেও ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।

ক্যাম্পাসলাইভ: লিগ ম্যাচের সময় বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে হজমি বা চালতার আচার খাওয়ার স্বভাবই অবশ্য প্রমাণ করে যে আপনি কতটা সিরিয়াস ছিলেন!

হাসিবুল : আপনারা এখনো এসব মনে রেখেছেন? হা হা হা। ধানমণ্ডি আবাহনী মাঠে খেলতে গেলেই বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে হজমি-আচার খেতাম। দেখা যেত, বোলিংয়ের পর খিদে লেগেছে! তাই কিছু একটা খেতাম। মজাও লাগত! আর আমাকে খাওয়ানোর জন্য আচারওয়ালা সেই মামুও আমার পেছনে লেগে থাকতেন। আমি যেদিকেই ফিল্ডিং করতাম, তিনি সাইকেল নিয়ে সেদিকেই হাজির। দেখে আমি আর লোভ সামলাতে পারতাম না! আবাহনী মাঠে খেলার দিন তাঁর কাছ থেকে শখানেক টাকার আচার খেতাম। ধানমণ্ডি গেলে এখনো তাঁর সঙ্গে দেখা হয় এবং আচারও খাই। সেই সাইকেল এবং এর পেছনে একটা বাঙ্রে মধ্যে হজমি-আচার এখনো আছে। আসলে আমাদের ক্রিকেটেও তখন পেশাদারিত্ব ছিল না। যে কারণে ওরকম ফাঁকিজুঁকি মারার সুযোগটা পেতাম।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনার মধ্যে ফাস্ট বোলারসুলভ পাগলামির ব্যাপারও তো ছিল কিছু?

হাসিবুল : আমি মজা করতে ভালোবাসতাম। সে জন্য ‘পাগলা’ নামও পেয়ে গিয়েছিলাম। পরে মাশরাফি এই নামের দখল নিয়েছে! হা হা হা। এর-ওর পেছনে লেগেই থাকতাম। বিশেষ করে সুজন ভাইকে (খালেদ মাহমুদ) খুব জ্বালিয়েছি। তাঁর ঘাড়ে উঠে বসে থেকেছি কত! ব্যাটসম্যানদেরও জ্বালাতাম। ‘কিরে ব্যাটা, বল দেখস না চোখে! আবার খেলতে নামছস!’ এ জাতীয় কথা বলে খ্যাপাতাম। তাই বলে কখনো গালি দিতাম না। জহুর এলাহী যেবার আমার বাঁ হাঁটুতে মারল, সেবারও কিন্তু আমি ওকে গালি দেইনি। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে দুজনেই তখন দুর্দান্ত ফর্মে। আমি আবাহনীর, ও কলাবাগানের। ওর উইকেটটা পাওয়ার পর বললাম, ‘আই গট ইউ’। এর পরই ওই কাণ্ডটা ঘটে গেল।

ক্যাম্পাসলাইভ: কাণ্ডটা তিনি ইচ্ছে করেই ঘটিয়েছিলেন বলে মনে হয় আপনার?

হাসিবুল : ওর মনের কথা কী করে বলব? ও যদিও বলে এসেছে যে ইচ্ছে করে নয়। তবে ও যে রাগের চোটেই ব্যাটটা ছুড়ে মেরেছিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। আমাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।

ক্যাম্পাসলাইভ: একটা মনের কথা জানতে চাই। জহুরকে ওই আঘাত ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করেনি কখনো?

হাসিবুল : তাৎক্ষণিকভাবে অবশ্যই ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু তখন তো আমার ব্যথায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থাই ছিল না। আর সময় আসলে মানুষকে ঠাণ্ডা করে দেয়। আমাকেও করে দিয়েছে। ওকে মেরে তো আর আমার হারিয়ে যাওয়া সময়টা ফিরিয়ে আনতে পারতাম না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। ক্ষোভ পুষে রেখে তো লাভ নেই। পরে তো একসঙ্গে ওল্ড ডিওএইচএসের হয়ে খেলেছিও।

ক্যাম্পাসলাইভ: এবার আপনার বোলিং প্রসঙ্গে একটু আসি। গতির পাশাপাশি আপনার বোলিংয়ে আরো অনেক ব্যাপারও ছিল।

হাসিবুল : ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কারের কথাই বলি। তখন তো আর কেউ অত শিখিয়ে দিত না। নিজে নিজে বোলিং করতে করতেই শিখতাম। ওই ডেলিভারিটা আমার ন্যাচারালই ছিল। বললে মনে হবে নিজের কথা বলছি। কিন্তু সত্যি কথা, ওরকম ইয়র্কার দিতে আমাদের কোনো বোলারকে আমি দেখি না। আপনারা দেখেন কিনা জানি না। কিন্তু আমার চোখে পড়ে না। আমার দৃষ্টিতে ওটাই আমার সেরা অস্ত্র ছিল।

ক্যাম্পাসলাইভ : সিস্টেমের মাধ্যমে বের হননি। অথচ এত কিছু শিখলেন কী করে?

হাসিবুল : আমি গড গিফটেডই বলব। শুরুতে আশীষ মলি্লকের কথা বলেছিলাম না? ও আমাকে কিছু কিছু জিনিস শিখিয়েছিল। তবে কারো পরামর্শ নিয়ে যে খুব বেশি কিছু শিখেছি, এটা বলব না। নিজে নিজে অনেক কিছু চেষ্টা করতাম। হয়ে যেত। এ জন্যই বলি গড গিফটেড। আর ১৯৯৭-তে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংক একাডেমিতে গিয়েছিলাম। তখনো অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তবে এসব সুযোগ ক্যারিয়ার শুরুর সময় পেলে ভালো হতো। আমার বেশি কাজে লাগত।

ক্যাম্পাসলাইভ: সমসাময়িক পেসারদের পেছনে ফেলেই তো আপনাকে এগোতে হয়েছিল। কিভাবে পেরেছিলেন?

হাসিবুল : পারফরম্যান্স দিয়েই ওদের পেছনে ফেলেছি। ওই সময় বাপ্পি ও সজল চৌধুরী খুব জোরে বল করত। শিহাব নামের একজনও ছিল। এঁদের মধ্যে সজলের খুব ভালো সম্ভাবনা ছিল। ওর সমস্যা ছিল ও একটু বেঁটেখাটো। আমার হাইট ভালো ছিল। সেই সঙ্গে লাইন-লেন্থ আর সুইংয়ের ওপর দখল থাকাটা ওদের চেয়ে আমাকে এগিয়ে দিয়েছিল।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনি কার্টলি অ্যামব্রোসের বোলিংয়েরও খুব ভক্ত ছিলেন।

হাসিবুল : হ্যাঁ, তাঁর বোলিংটা ফলো করতাম। আরো অনেক কিছুই ফলো করতাম। তাঁর মতো প্রায় হাঁটু পর্যন্ত লম্বা সোয়েটার পরতাম। হ্যাটও পরতাম তাঁর মতো। ক্যাপ কম পরতাম। তিনি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতেন। কিছুদিন আমিও সে রকম ট্রাই করেছি। ১৯৯৯-র বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডে গিয়ে প্রথম তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। সেই দেখি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছেন। ওই ম্যাচটা তিনি খেলেননি। খুব মুডি বলেই মনে হয়েছে তাঁকে। কাছে গিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেই ‘ও মান, ও মান’ বলে বিচিত্র ক্যারিবীয় উচ্চারণে কী কী যেন বললেন, ঠিক বুঝিওনি। যাই হোক আর কথা বাড়াইনি। তিনি যে আমার ‘আইডল’ এ কথাটা বলারও সুযোগ হয়নি।

ক্যাম্পাসলাইভ : আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সেরা পেসার কে?

হাসিবুল : ফিট থাকলে অবশ্যই মাশরাফি। ইনজুরির কারণে ও আরো বিকশিত হতে পারেনি। আর নতুন বোলারদের মধ্যে বলব তাসকিনের কথা। ফিট থাকতে পারলে ও অনেক দূর যাবে। মাশরাফি ফিট থাকলে ওর ধারেকাছেও কেউ আসতে পারত না। রুবেল-শফিউলরা আছে। ওদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, মাশরাফি ফিট থাকলে পার্থক্যটা অনেক বেশি থাকত। উনিশ-বিশ হতো না। পার্থক্যটা হতো হানড্রেড-ফিফটি। ফিট থাকতে পারলে তাসকিনও একসময় মাশরাফির পর্যায়ের বোলার হবে বলে আমার মনে হয়। মাশরাফির সঙ্গে অনেকে প্রিন্স ভাইয়ের (জি এম নওশের) কথাও বলবেন। আমার বিবেচনায় মাশরাফি প্রিন্স ভাইয়ের চেয়েও ভালো বোলার।

ক্যাম্পাসলাইভ: দীর্ঘদিন ক্লাব ক্রিকেটে খেলেছেন। সেরা পারফরম্যান্স?

হাসিবুল : অনেক আছে। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে দামাল স্মৃতি ক্রিকেটের ফাইনালের কথা। সেবার ওয়ান্ডারার্স থেকে শওকত মির্জা নামের এক পাকিস্তানিকে ধারে এনেছিল মোহামেডান। আবাহনী অজয় জাদেজাকে নিয়ে এসেছিল। ওই ম্যাচে আমি হ্যাটট্রিক করেছিলাম।

ক্যাম্পাসলাইভ: জাতীয় দলের হয়ে বলার মতো অনেক কিছুই থাকার কথা।

হাসিবুল : ভেবে গর্ব হয়, এমন একটা কথাই বলি। ১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। বাংলাদেশের হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ইনিংসে পাঁচ বা এর বেশি উইকেট নেওয়ার প্রথম কৃতিত্বটা আমারই। প্রথম ম্যাচেই ইনিংসে ছয় উইকেট নিই আমি। ওই ম্যাচে এক দিনেই ৩৬ ওভার বোলিং করেছিলাম! পরের ম্যাচে রোকন (আল শাহরিয়ার) বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরি করে।

ক্যাম্পাসলাইভ : জাতীয় দল বললেই প্রথম যে দৃশ্যটা চোখে ভেসে ওঠে?

হাসিবুল : অবশ্যই আইসিসি ট্রফির ফাইনালে সেই ভোঁ দৌড়। সেই ঐতিহাসিক লেগবাই। স্বপ্নের মতো একটা টুর্নামেন্ট ছিল আমাদের জন্য। কয়েক দিন আগে ইন্টারনেট থেকে সেই দৌড়ের ভিডিওটা ডাউনলোড করে মোবাইলে নিয়ে রেখেছি। যাতে যখন ইচ্ছে তখন দেখতে পারি। যতবারই দেখি শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। এরপর বিশ্বকাপ খেললাম। খেললাম বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টও। এর পর থেকেই দেশের ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকল। আমিও খেলার প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকলাম। আগে যে আন্তরিকতা নিয়ে খেলতাম, সেটা কমতে থাকল। নিজের ফিটনেসেও ঘাটতি ছিল। সব মিলিয়েই হারিয়ে যেতে থাকলাম। এখন ভাবলে মনে হয় ভুলই করেছি। আমারই ভুলে আমি হারিয়ে গেছি।

ক্যাম্পাসলাইভ: আপনি দেখি নিজের ক্যারিয়ারটাকে ভুলে ভরা এক গল্প বলেই মনে করাচ্ছেন?

হাসিবুল : সিরিয়াস ছিলাম না। নানা ক্ষেত্রে গাফিলতি ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভুল ছিল। হ্যাঁ, আমার ক্যারিয়ারটাকে ভুলে ভরা এক গল্পই বলতে পারেন।

ক্যাম্পাসলাইভ: বিশেষ করে বাংলাদেশ টেস্টের জগতে প্রবেশ করার পর থেকেই আপনার জন্য কঠিন হয়ে গেল অনেক কিছু?

হাসিবুল : হ্যাঁ, প্রতিযোগিতা হঠাৎ করেই বেড়ে গেল। তবে এক হাতে তো তালি বাজে না। আমারও অনেক ভুল ছিল। যেমন সময়ের কাজ সময়ে করতাম না। করলেও ঠিকঠাক করতাম না। কিছু বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিলাম, যাঁদের সঙ্গে চলাফেরা করা আমার একদমই ঠিক ছিল না। ইনডিসিপ্লিনড হয়ে পড়েছিলাম।

ক্যাম্পাসলাইভ : ইনডিসিপ্লিনের কথা বলছিলেন। যার ফলে আপনার মধ্যে কিছু বদভ্যাসও তৈরি হয়েছিল। কোনো হতাশায়?

হাসিবুল : কোনো হতাশায় নয়। কথায় আছে না, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়! আমার অবস্থাও তাই হয়েছিল। আমার পরিবারকে ওই সময়টায় আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। খারাপ সঙ্গ আমাকে ওই পথে ঠেলে দিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত, আজ অনেক দিন হয় আমি বাজে অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করতে পেরেছি। নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছি। এখন ভালো আছি, বেশ ভালো আছি।

ক্যাম্পাসলাইভ: নিজে ফিরেছেন। অন্যদেরও ফেরাতে সহায়তা করছেন বলে জানি।

হাসিবুল : হ্যাঁ, উত্তরার একটি সেবামূলক সংস্থায় সপ্তাহের প্রতি বুধবার আমি লেকচার দিই। আমার লেকচার যাঁরা শুনতে আসেন, তাঁদের মধ্যে অনেক সেলিব্রেটিও আছেন। তাঁদের নিজের অভিজ্ঞতা বলি। কোথায় ছিলাম আর কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। ফিরে যে আসা যায়, আমি তাঁদের সামনে সেই উদাহরণ।

ক্যাম্পাসলাইভ: ফিরে আসার অন্যতম শর্ত কী?

হাসিবুল : ‘বিসি’ থেকে দূরে থাকা। মানে হলো ব্যাড কম্পানি বা খারাপ সঙ্গ। ক্রিকেট সার্কিটে আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকেও তাই এখন সব সময় এড়িয়ে চলি।

ক্যাম্পাসলাইভ: ২০০৪-র ডিসেম্বরে তো একবার শেষ সুযোগ পেয়েছিলেন।

হাসিবুল : হ্যাঁ, খুবই ক্লান্তিকর একটি দিনের শেষে ডাক আসে। পরদিন দুপুরে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ, আমি আগের রাতে হোটেলে দলের সঙ্গে যোগ দিই। ভালো করতে পারিনি। খেলাশেষে জ্বর ও চিকেন পঙ্পড়ি। ২০০৫-০৬ এর জাতীয় লিগে সর্বোচ্চ উইকেট নিয়ে অবশ্য ‘এ’ দলের জিম্বাবুয়ে সফরে সুযোগ পাই। সেখানেও ভালো করতে পারিনি। এরপর তো আর খেলাই হয়নি।

ক্যাম্পাসলাইভ: খেলা ছাড়ার পর অনেক ক্রিকেটারই ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে নানা ভূমিকায় যুক্ত হয়েছেন। আপনি হননি কেন?

হাসিবুল : কারণ আমি তখন নিজের অগোছালো জীবন গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তবে এখন বিসিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটিতে আছি। কোচিংয়ে আসার ইচ্ছে নেই। তবে ম্যানেজমেন্টে থাকতে চাই।

ক্যাম্পাসলাইভ: নিজের পরিবার ও বর্তমান জীবনযাপন নিয়ে একটু ধারণা দিন।

হাসিবুল : বাবা লে. কর্নেল ফয়েজ মারা গেছেন সেই ১৯৮৪ সালে। সেই থেকে মা হাবিবুন্নেসা চৌধুরীই আমাদের আগলে রেখেছেন। মাঝখানে তিনিও জটিল রোগে ভুগেছেন। আমরা আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে তিনিও এখন অনেক ভালো আছেন। বড় বোন সাবেক জাতীয় হ্যান্ডবল খেলোয়াড় শাহরিন হোসেন তানিয়াও আছে ক্রীড়ামনস্ক পরিবারেই। ববি হামিদের স্ত্রী। ওর শাশুড়ি দাবার কিংবদন্তি রাণী হামিদ। ভাসুর বিখ্যাত ফুটবলার কায়সার হামিদ।

ছোট বোন আমরিন হোসেনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই ফজলে হোসেন শুভ ও আমি এক বাসাতেই থাকি। আমার স্ত্রী ফারাহ দীবা খান গৃহিণী। একমাত্র সন্তান ফাবিয়া হোসেন এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। এই তো…। আর হ্যাঁ, আমি ব্যবসা করছি। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সাতটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছের চাষ করছি। টুকটাক আরো কিছু ব্যবসা আছে তবে উল্লেখ করার মতো নয়।

ক্যাম্পাসলাইভ : কোনো আক্ষেপ আছে?

হাসিবুল : নো রিগ্রেটস। আক্ষেপ করে কী হবে যখন জানি যে দোষ আমারই! আমারই কর্মফল আমি ভোগ করেছি!

 

ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর, (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আইএইচ