[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



জীবনযুদ্ধেও লড়াকু সৈনিকের পড়াশোনা


প্রকাশিত: September 27, 2016 , 10:16 pm | বিভাগ: ফিচার,রংপুরের ক্যাম্পাস


shatdham-photo3+ cl

অনীল চন্দ্র রায়, কুড়িগ্রাম : জামিউল ইসলাম সাদ্দাম। বয়স পঁচিশ। একটি নাম। একটি সংগ্রামের ইতিকথা। জীবন যুদ্ধের এক লড়াকু সৈনিক। হাজারো কষ্ট নিয়ে সংগ্রাম করছেন। সকল দু:খ, ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তবুও হাল ছাড়েননি। জীবন যুদ্ধের মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বলছেন যতদিন দাঁড়িয়ে থাকবো ততদিন আমার পড়া শুনা চলবে। গন্তব্যে যেতেই হবে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চন্দ্রখানা গ্রামের মোটর সাইকেলের দক্ষ মেকানিক। একই সঙ্গে ফুলবাড়ী ডিগ্রী কলেজের পরিক্ষার্থী জামিউল ইসলাম সাদ্দাম (২৫)।

তিনি সদর উপজেলার এক অসহায়-গরীব সাইকেল মেকানিক ছাইফুল ইসলাম ভুটুর ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। তার বাবা- মাসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। তাদের বাবাই এক মাত্র সাইকেল মেকানিকের কাজ করে কোনরকমে সংসার চালাতেন। যে দিন তার বাবা মেকানিকের কাজ যে টাকা আয় করে সে দিন হয়ত দু- বেলা পেট ভরে খেতে পারতো। আর যে দিন টাকা আয় হয়ত না সে দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপবাস থাকতেন। এমন কি তারা কোন কোন দিন না খেয়ে জীবন যাপন করেছে।

তাদের অভাব যেন তার পিছু ছাড়ছেনা। যেন অভাবেই তখন তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। তার বাবার খুব ইচ্চা ছিল ছেলেদের কে পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ করে দেশের সেবা করবে। তখন সাদ্দাম ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে বাকি দুই ভাই এক ভাই ১ম শ্রেণীতে আর সব ছোট ভাই সবার ছোট। তার বাবা একাই সংসার চালাতে পারতো না ছোট থেকে সাদ্দাম উপজেলার শহরের এক মটর সাইকেলের গ্যারেজের কাজ করতো। স্কুলে পাশাপাশি মটর গ্যারেজে মটর সাইকেলের ধোয়-মোচার কাজ করে এবং সে আস্তে আস্তে মটর সাইকেলের নাট-বল্টু খিচতে থাকে । এতে সাদ্দাম প্রতিদিন গড়ে ৫০-১০০ টাকা করে আয় করতো এবং সেই টাকা আর বাবার আয় দিয়ে চলতো তাদের সংসার।

এভাবে সাদ্দাম আস্তে আস্তে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে কাজের দক্ষতা বেড়ে যায়। পরে সে নুর অটো মেসার্সে পূর্ণাঙ্গ মেকানিকের কাজ শুরু করে। সেখানে ৫-৬ বছর কাজ করে দক্ষতা অর্জন করে। এর পর সেখান থেকে উপজেলার অনেক বড় প্রতিষ্ঠান নামিরা অটোতে কাজ করার সুযোগ পায়। সেখানেও তিন বছর কাজ করার পর ঢাকার টিভিএস কোম্পানীতে ১৫ হাজার টাকার বেতনে চাকুরী করতে যায় সাদ্দাম।

shatdham-photo5+cl

ঢাকায় তিন বছর চাকুরি করে সাদ্দাম শিখরের টানে আবারও নিজ উপজেলা ফুলবাড়ীতে এসে কেয়া মটরস প্রতিষ্ঠানে মেকানিকের কাজে যোগ দেয়। মেকানিকের কাজের ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে পড়াশুনা করত। তবে সাদ্দাম খুব বেশি স্কুলে যেতে পারেনি মেকানিকের কাজের চাপে। তাই সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে রাতে বন্ধুদের সাথে দেখা করে স্কুলের পড়াগুলো বুঝিয়ে নিয়ে বাড়ীতে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করতো। সাদ্দামের খুব ইচ্ছা ছিল পড়া লেখা করে ভাল একটা চাকুরী করে তার বাবা-মা ভাইকে নিয়ে সচ্ছল ভাবে জীবন-যাপন করবে।

২০১২ সালে ফুলবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পাশ করে। সাদ্দাম বর্তমানে চলতি এইচ এস সি পাশ করেছে। বর্তমানে ফুলবাড়ী ডিগ্রী কলেজের বিএম শাখা (কারিগরি) কম্পিউটার বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিচ্ছেন।

বর্তমানে সাদ্দাম প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করে । তার আয়ের টাকা দিয়ে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, ছোট দুই ভাইদের ও নিজের লেখাপড়া খরচ চালাচ্ছেন। তার মা মানসিক রোগি। ১০ বছর ধরে চিকিৎসা করছে কখনো ভাল হয় আবার কখনো একটু বেশি হয় । প্রতি মাসে গড়ে তার মায়ের পিছনে ৪-৫ হাজার টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়।

সাদ্দাম ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, আমার বেশী কিছু চাই না। তবে অল্প কিছু আশা আছে যদি কোন দিন ব্যাংকের মাধ্যমে মোটা অংকের ঋণের সুযোগ পাই তাহলে সেই টাকা দিয়ে একটা রুম ভাড়া নিয়ে আমার নামে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করবো । সেখানে আমার বাবাকে বসিয়ে আমি স্বাধীন ভাবে মেকানিকের কাজ করবো।

এ ব্যাপারে কেয়া মটরসের মালিক জানান, সাদ্দামের মত ছেলে আমাদের সমাজে একেবারেই বিরল। তার জীবনে অনেক ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেছে। বর্তমানে কোন ছেলেই এত কষ্ট দুঃখ সহ্য করতে পারবে না। সে মেকানিকের কাজ করে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা এবং পরিবারে খরচ চালানোসহ ভাইদের লেখাপড়া ও নিজের লেখাপড়া করছে।

 

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর, (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এএম