[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



শাবি ছাত্র বদরুলের আদি-অন্ত, ‘কসাই’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে!


প্রকাশিত: October 5, 2016 , 8:14 pm | বিভাগ: অপিনিয়ন,আপডেট


Badrul1

সাইফুর রহমান : আসলে বদরুল যে দলেরই হউক না কেন সে একটা চিহ্নত অপরাধী মূলত সে কিন্তু আমাদের দলেরই। যে দলের নাম “মানবজাতি”। বদরুলেরও আমাদের মতো একটা মাথা আছে, দুইটা হাত আছে, দুইটা পা আছে। বদরুলও ভাত খায়। আমি যখন সংবাদটা দেখলাম তখন আমার আসলে জানতে ইচ্ছা করেনি বদরুলের রাজনৈতিক দল কোনটা। বরং জানতে ইচ্ছা করেছে বদরুলের মায়ের চেহারাটা কেমন?

বাবা কি করেন? কেমন পরিবেশে বড় হয়েছে সে? তার এইরকম খুনি হয়ে ওঠার আসল রূপটা কি? জানলে হয়তো আরেকটা বদরুলকে খুনি হয়ে ওঠার আগেই আমরা শোধরাতে পারতাম। মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা কতটুকু।

বদরুল প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে একটা মেয়ের মাথা, চোখে কুপিয়েছে আমরা সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করেছি। প্রথম কোপটা পড়ার সাথে সাথে ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে যদি আশে পাশের মানুষগুলো দৌড়ে গিয়ে জাপ্টে ধরতো বদমাইশটাকে, তাহলে খাদিজার প্রতি মমত্ত্ববোধ হয়তো বেড়ে যেত।

এই যে বদরুল ধরা পড়লো। এইবার কিন্তু একদল মানুষের দায়িত্ব তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দেয়া। দেখা যাক, এইবার তারা মনুষত্বের পরিচয় দেন নাকি অন্য কোনো বদরুলকে কোপাতে উৎসাহিত করেন……………।

এমসিতে ছাত্রীর উপর হামলাকারী বদরুল ন্যাক্কারজনক কাজ করে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। সে ক্যাম্পাসের একটা পরিচিত ক্যারেক্টার। তার বিভাগের স্টুডেন্টরা ছাড়াও অন্য অনেক ছেলেমেয়েই তাকে চিনে। চেনার কারণ জানতে চাইলে আমাদের যেতে হবে বেশ কয়েকবছর পেছনে।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সুনাইঘাতি কুম্ভবয়ন গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে বদরুল আলম। সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় ২০০৮-০৯ সেশনে। ভর্তির পর সিট পায়নি হলে। তাই লজিং থাকতে শুরু করে সদর উপজেলার আউশা এলাকার সৌদী আরব প্রবাসী মাসুক মিয়ার নগরীর জালালাবাদ এলাকার বাসায়।

২০১১/২০১২ তে। ক্যাম্পাস সংলগ্ন হাউশা গ্রামে বদরুল নার্গিসদের বাড়িতে লজিং থাকতো, নার্গিস তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। সেখান থেকেই নার্গিসের সাথে তার পরিচয়, অত:পর “ঝামেলা!” একপর্যায়ে নার্গিসের অভিভাবকরা তাকে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়!

এরপর সে বিভিন্ন সময় নার্গিসের আত্মীয় স্বজনদের হুমকি দিতে থাকে। এই নার্গিস সংক্রান্ত ব্যাপারটা বদরুলের প্রায় ক্লাসমেটরাই জানে।

২০১২ সালের জানুয়ারিতে একবার বদরুল নার্গিসের এলাকায় গেলে তার আত্মীয় স্বজনরা তাকে পেটায়। অনেক মার দেয়। সিলেটের সবচেয়ে প্রচারিত পত্রিকা “দৈনিক সিলেটের ডাক” এ এই খবরটি আসে, “তথাকথিত প্রেমের জের ধরে হামলার শিকার শাবিছাত্র… এরকম নিউজ হয়”।

দীর্ঘ দিনের জমে থাকা ক্ষোভকে আর চেপে থাকলনা প্রকাশ পেল পাষণ্ড কায়দায় রামদা দিয়ে নার্গিসের উপর যে হামলা চালিয়ে। এধরনের কর্মকাণ্ড জঘন্য ইতর প্রাণীকেও হার মানাবে। অনেক পত্রিকায় আসছে “বখাটের হামলা!” তার পরিচয় লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

লজিং শিক্ষক হিসেবে বাসায় আশ্রয় নিয়েই স্কুলপড়ুয়া খাদিজা আক্তার নার্গিসকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে বদরুল আলম। পড়ানোর নামে প্রেমে বাধ্য করার বহু চেষ্টা চালায়। নানা হুমকিও দেয়। এসব জানাজানি হলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয় বাসা থেকে। তারপরও পিছু ছাড়েনি বদরুল। অন্যদিকে প্ররোচনা ও হুমকিতে হার মানেনি নার্গিস। এ কারণে বদরুল সিদ্ধান্ত নেয় খাদিজাকে হত্যার।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বদরুল আলমের কথায় উঠে আসে এসব তথ্য। খাদিজা দীর্ঘদিন থেকে আমাকে পাত্তা না দেয়ার কারণেই তার ওপর আমি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি। নগরীর আম্বরখানার এক দোকান থেকে ২৫০ টাকা দিয়ে চাপাতি কিনি এবং হত্যার উদ্দেশ্যেই তাকে কোপাই। ইচ্ছা ছিল ওখানেই তাকে শেষ করে দেয়ার।

দু’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে নার্গিস। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় ছিল ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে। আর মেয়ের এ সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা মনোয়ারা বেগম। তার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে বাড়ি। গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ সান্ত্বনা দিতে ছুটে আসছেন সেখানে।

মঙ্গলবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, পুলিশ ছাড়া পরিবার, স্বজন বা সংগঠনের কেউ নেই বদরুলের পাশে। অন্য রোগীদের দেখতে যারা ওই ওয়ার্ডে যান তারাও তাকান তির্যক দৃষ্টিতে। রূঢ় মন্তব্য করেন। এরই ফাঁকে কথা হয় বদরুলের সঙ্গে। সে বলে, আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হলে সিট পাইনি। এ সময় লজিং ছিলাম নার্গিসদের বাড়িতে। এ সুবাদে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু পরে কথা রাখেনি নার্গিস।

আমি তাকে নিয়ে সব সময়ই সিরিয়াস। কিন্তু আমার বেলায় সে ছিল একবারে উদাসীন। তাই তাকে শেষ করে দিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নেই।

বদরুল আরও বলে, সোমবার এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় চাপাতিটি লুকিয়ে রাখি সঙ্গে থাকা ব্যাগে। পরীক্ষার আগেই এমসি ক্যাম্পাসে পৌঁছাই। ওর কাছে গিয়ে কথা বলি। কিন্তু সে সন্তোষজনকভাবে কোনো কথার উত্তর দেয়নি। এতে আমি আরও প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠি। পরীক্ষা শেষে নার্গিসকে হল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখি। তাকে মসজিদের পাশে দেখে কাছে ভিড়তে থাকি। কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু সে আবারও পাত্তা দিতে চায় না।

উল্টো রূঢ় আচরণ করে। আমি ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে কোপাতে থাকি। ইচ্ছা ছিল ওখানেই তাকে শেষ করে দেয়ার। এরপর লোকজন নার্গিসকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ও আমাকে গণপিটুনি দিতে শুরু করে।

বদরুল আরও জানায়, আগেই আমি তাকে বলেছিলাম, আমার মায়ের বুক খালি হলে তোর মায়ের বুকও খালি হয়ে যাবে। তারপরও সে আমাকে অবজ্ঞা করেই চলতে থাকে। বদরুলের দাবি, নার্গিস যে মোবাইল সিম ব্যবহার করত সেটা আমার নামে কেনা। ওই সিমের কললিস্ট সংগ্রহ করে দেখেছি, আমি ছাড়া অন্য সবার সঙ্গেই সে যোগাযোগ রাখছে। একমাত্র আমাকে, আমার ফোনের পাত্তা দেয় না সে। এসব কারণেই তার ওপর আমি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সুনাইঘাতি কুম্ভবয়ন গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে বদরুল আলম। সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় ২০০৮-০৯ সেশনে। ভর্তির পর সিট পায়নি হলে। তাই লজিং থাকে সদর উপজেলার আউশা এলাকার সৌদী আরব প্রবাসী মাসুক মিয়ার নগরীর জালালাবাদ এলাকার বাসায়।

২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি টুকের বাজারে দা নিয়ে খাদিজাকে মারতে গেলে এলাকাবাসী ধরে পিটুনি দেয়। মান বাঁচাতে শিবির মেরেছে বলে ক্যাম্পাসে প্রচার করে বদরুল। তারপর থেকে ক্যাম্পাসে খুব একটা দেখা যায়নি তাকে। এমনকি বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়র-জুনিয়রদের সঙ্গেও খুব বেশি মিশত না সে। শিক্ষাজীবন সম্পন্ন না করেই সে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়।

বেশ কিছুদিন পর সে ছাতকের আয়াজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করে। এ সময় বদরুল আবার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় নার্গিসের সঙ্গে। রাজি না হওয়ায় শুরু হয় হয়রানি। যার নিষ্ঠুর প্রয়োগ হল এমসি কলেজে বর্বরতার মাধ্যমে।

সাইফুর রহমান
লেখক ও সাংবাদিক
সিলেট

ঢাকা, ০৫ অক্টোবর, (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// আইএইচ