[english_date], [bangla_day], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]
সর্বশেষ সংবাদ



রাবির ‘লর্ডস গ্যাং’ রা যে ভাবে জঙ্গি


প্রকাশিত: October 13, 2016 , 5:50 am | বিভাগ: আপডেট,এক্সক্লুসিভ,ক্যাম্পাস,পাবলিক ইউনিভার্সিটি,রাজশাহীর ক্যাম্পাস


shuvo

মৃদুল ব্যানার্জি, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি: আহসান হাবিব শুভ। ‘লর্ডস গ্যাং’ এর সক্রিয় সদস্য। দেখতে ভদ্র ও শান্ত। তবে ডানপিটে ছেলে কিশোর বয়স থেকেই। যা বলতো তাই করতে পছন্দ ছিল তার। কলেজে পড়ার সময় অনেকটা উগ্রপ্রকৃতির হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করে শুভ। সে ছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। গোটা পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শুভর চাচা মো. শরীফ হোসেন রানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এলাকার স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)ভর্তি হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে অনেক বড় হবে। মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশের সেবা করবে।

কিন্তু সবই এখন কেবল স্মৃতি। বিষয়টি জানালেন শুভ এর পরিবার। তার স্বজনেরা জানায়, সহজ-সরল থেকে ধীরে ধীরে চলে যায় নাগালের বাইরে। এক সময় অস্ত্র নিয়ে ধরা পড়ে। জেল-জরিমানা হয়। পরিবারের ভাবনা ছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এর কিছুদিন পরেই নিখোঁজ হয়ে যায়। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় মা-বাবা ও স্বজনদের সঙ্গে। জানা যায় সে আস্তে আস্তে জঙ্গীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। গড়ে তোলে ‘লর্ডস গ্যাং’ নামে জঙ্গি মদদের হাতিয়ার।

টাঙ্গাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত ‘জঙ্গি’র মধ্যে আহসান হাবিব শুভ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বয়স (২৪)।

এর আগে ঘটনাস্থলে পাওয়া নিহত জঙ্গিদের জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে তাঁর পরিচয় আতিকুর রহমান বলে জানা গিয়েছিল। পরে মঙ্গলবার রাতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়।

কে ওই শুভ:
বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায় শুভ ২০১৩ সাল থেকেই হিজবুত তাহরীর ও জেএমবির ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গ্রুপের সঙ্গে রাখতে থাকে নিয়মিত যোগাযোগ। তাদের কর্মকান্ড ও কর্মসূচীর প্রতি হয়ে যায় আশক্ত। এ জাতীয় দলে অন্যদের টানতে থাকে। নিজেকে স্বাভাবিক জীবন থেকে ভাবতে থাকে আলাদাভাবে। জঙ্গিদের কর্ম সূচীতে হয়ে যায় সক্রিয়। ছেড়ে দেয় মা-বাবা ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ। নাম লেখায় জঙ্গিদের ক্যাডার তালিকায়।

rajshahi_jongi_shuvo+CL

পুলিশ জানায়, রাবির ১৩ জন ছাত্রকে নিয়ে ফেসবুকে সক্রিয় হয়ে আহসান। ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মুনতাসিরুল আলম অনিন্দ্য, শরিফুল ইসলাম ও আহসান হাবিব শুভ একই সঙ্গে থাকতেন একটি মেসে থাকতেন। এছাড়া আরও ১০ জন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী একই মতাদর্শের ছিল। তারা ‘লর্ডস গ্যাং’ নামে যে পেজটি চালাতো সেই পেজে ধর্মের নাম ব্যববহার করে নানান ধরনের স্ট্যাটাস দিতো। জঙ্গি কর্মকান্ডে উৎসাহিত করতে উদ্বুদ্ধ করতো সাধারণ ও নিরিহ ছাত্রদের। রাবির শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যার পর এরা সতর্ক হয়ে উঠে। তাদের কর্মকান্ড নজরে আসে পুলিশের। পরে ওই ১৩ জন গা ঢাকা দিয়েছে বলে অনেক শিক্ষার্থীর দাবী।

এদিকে টাঙ্গাইল র‌্যাব-১২-এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির (সিপিসি-৩) কমান্ডার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, আহসান হাবিব শুভর বাড়ি নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামে।

তিনি আরও জানান, জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে নিজের পরিচয় লুকানোর জন্যই ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়েছিলেন শুভ। মঙ্গলবার রাতে তাঁর বাবা আলতাফ হোসেন টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল মর্গে শুভর লাশ শনাক্ত করেছেন। শুভ নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে মাধ্যমিক, নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রেসিডেন্ট ড. এ এফ এম মাসউদ আখতার এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, নিহত আহসান হাবিব ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি ২০১৪ সালে তৃতীয় বর্ষে থাকার সময় ক্লাস-পরীক্ষা না দেওয়ায় ড্রপ-আউট হন। পুলিশের প্রকাশিত ছবির সঙ্গে বিভাগে থাকা তাঁর বায়োডাটার ছবির মিল আছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিভাগের শিক্ষক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম হত্যার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আহসান হাবিব শুভ সম্পর্কে আমাদের কাছে খোঁজখবর নিচ্ছিল।’

বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইংরেজি বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র মুনতাসিরুল আলম অনিন্দ্য, শরিফুল ইসলাম ও আহসান হাবিব শুভ একই সঙ্গে থাকতেন। অন্যদের সঙ্গে খুব কম মিশতেন তাঁরা। তাঁরা ‘লর্ডস গ্যাং’ নামে গ্রুপে কাজ করতেন। (বর্তমানে বন্ধ আছে)।সেখানে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দিতেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার থাকা মুনতাসিরুল আলম অনিন্দ্যকে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া শরিফুল জঙ্গি যোগাযোগে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

আহসানের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর প্রফেসর মুজিবুল হক আজাদ খান ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, ‘নিহত জঙ্গি আহসান হাবিব শুভ বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল বলে শুনেছি।

শুভর পিতা আলতাফ হোসেন জানান, আমার দুই সন্তান। মেয়ে বড় ও আহসান হাবীব ছোট। আহসান হাবীব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ালেখা করতো। গত ২০১৩ সালে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালে সে অস্ত্রসহ রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্টে গ্রেপ্তার হয়। এরপর তাকে জামিনে মুক্ত করার পর থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৩ বছর কোন প্রকার যোগাযোগ ছিল না। এ ব্যাপারে আমি রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলাম।

আহসানের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা যে কারণে:
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর গোদাগাড়ী মডেল থানায় (মামলা নম্বর ১৭) অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে আহসান হাবিব শুভ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে ২০১৫ সালের মে মাসে জামিনে ছাড়া পান তিনি। জানাগেছে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অস্ত্র ব্যবসা করে জঙ্গিদের জন্যে ফান্ড বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শুব অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। পরে প্রথম বারেই ধরা পড়ে যাওয়ায় গাবরে যান বলে তখনকার পুলিশকে জানিয়েছিল শুভ। অন্যদিকে জানমনের পর থেকে লোক লজ্জায় তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে। শুভর নিখোঁজের ব্যাপারে তাঁর বাবা আলতাফ হোসেন ২০১৫ সালের ৭ জুলাই নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

উল্লেখ্য, গত শনিবার সকালে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার কাগমারা মির্জামাঠ এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয় দুই জঙ্গি। তারা ওই এলাকার একটি তিনতলা বাসার নিচতলায় ছাত্র পরিচয়ে ভাড়া নিয়ে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছিল। এ সময় সেখান থেকে ১টি রিভলবার, একটি পিস্তল, ১২ রাউন্ড গুলি, ১০টি চাপাতি, দুটি ল্যাপটপ ও ৬৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

দাফন সম্পন্ন:

এদিকে রানীনগর থানার ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিহত আহসান হাবীবের লাশ তাঁর পরিবার বুধবার সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে নিয়ে আসে। রাত পৌনে ৮ টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়েছে। জানাজা এবং দাফনে পরিবার ও গ্রামের ৫০-৬০ জন উপস্থিত ছিলেন।

 

 

ঢাকা, ১৩ অক্টোবর, (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এএসটি